Ameen Qudir

Published:
2019-08-07 04:31:08 BdST

ডেঙ্গি জ্বরঃ কী সত্য আর কী মিথ্যা বা মিথ জেনে নিন


 

ডেস্ক
______________________

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী প্রখ্যাত চিকিৎসক, গবেষক, লেখক অধ্যাপক ডা. সেজান মাহমুদ বাংলাদেশের ডেঙ্গি সঙ্কটজনক পরিস্থিতিতে করণীয় নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ লেখা লিখেছেন। জনস্বার্থে লেখাটি প্রকাশ করা হল।

ডেঙ্গি জ্বরঃ কী সত্য আর কী মিথ্যা বা মিথ জেনে নিন
সেজান মাহমুদ
================================

ডেঙ্গি একটি মশাবাহিত ভাইরাল সংক্রমণ যা সাধারণ ইনফ্লেয়েঞ্জার মতো জ্বর দিয়ে শুরু হয়। কিন্তু মোট চার রকমের ডেঙ্গি ভাইরাস আছে যা থেকে ধীরে ধীরে হেমোরেজিক (রক্তপাত থেকে শক তৈরি করে যাকে বলা হয় ডেঙ্গি শক সিনড্রোম) এবং খুব অল্প সংখ্যক হলেও ডেঙ্গি একসেফালাইটিস (যা মস্তিস্কে সংক্রমণ করে)হতে পারে যা মানুষের মৃত্যু ঘটাতে পারে। ফিলিপাইন এবং থাইল্যান্ডে ১৯৫০ সালের দিকে প্রথম ডেঙ্গি ধরা পড়লেও এখন বর্তমানে পৃথিবীর ১২৮টি দেশে প্রায় ৩.৯ বিলিয়ন মানুষকে আক্রান্ত করছে। যে জাতের মশা (এডিস এডিপ্টিস স্ত্রী জাতীয়) ডেঙ্গি ভাইরাস ছড়ায়, সেই একি মশা চিকুনগুনিয়া, ইয়েলো ফিভার এবং জিকা ভাইরাস সংক্রমণ করে থাকে।

মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, বিশেষ করে গরম এবং বর্ষার সময়টাতেই ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ বেশি থাকে। শীতকালে এই জ্বর হয় না বললেই চলে। শীতে লার্ভা অবস্থায় ডেঙ্গু মশা অনেক দিন বেঁচে থাকতে পারে। বর্ষার শুরুতেই সেগুলো থেকে নতুন করে ডেঙ্গু ভাইরাস বাহিত মশা বিস্তার লাভ করে।
সাধারণত শহর অঞ্চলে অভিজাত এলাকায়, বড় বড় দালান কোঠায় এই মশার প্রাদুর্ভাব বেশি, তাই ডেঙ্গু জ্বরও এই এলাকার বাসিন্দাদের বেশি হয়। বস্তিতে বা গ্রামে বসবাসরত লোকজনের ডেঙ্গু কম হয় বা একেবারেই হয় না বললেই চলে।
ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু জ্বরে সাধারণত তীব্র জ্বর ও সেই সঙ্গে সারা শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা হয়ে থাকে। জ্বর ১০৫ ফারেনহাইট পর্যন্ত হয়ে থাকে। শরীরে বিশেষ করে হাড়, কোমড়, পিঠসহ অস্থি সন্ধি এবং মাংসপেশীতে তীব্র ব্যথা হয়। এছাড়া মাথাব্যথা ও চোখের পিছনে ব্যথা হয়। অনেক সময় ব্যথা এত তীব্র হয় যে মনে হয় বুঝি হাড় ভেঙ্গে যাচ্ছে। তাই এই জ্বরের আরেক নাম ‘ব্রেক বোন ফিভার’।
জ্বর হওয়ার ৪ বা ৫ দিনের সময় সারা শরীরজুড়ে লালচে দানা দেখা যায়, যাকে বলা হয় স্কিন র‍্যাশ, অনেকটা এলার্জি বা ঘামাচির মতো। এর সঙ্গে বমি বমি ভাব, এমনকি বমি হতে পারে। রোগী অতিরিক্ত ক্লান্তিবোধ করে এবং রুচি কমে যায়। সাধারণত ৪ বা ৫ দিন জ্বর থাকার পর তা এমনিতেই চলে যায় এবং কোন কোন রোগীর ক্ষেত্রে এর ২ বা ৩ দিন পর আবার জ্বর আসে। একে “বাই ফেজিক ফিভার”বলে।
ডেঙ্গু শক সিনড্রোম
ডেঙ্গু জ্বরের ভয়াবহ রূপ হল ডেঙ্গু শক সিনড্রোম। ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারের সাথে সার্কুলেটরী ফেইলিউর হয়ে ডেঙ্গু শক সিনড্রোম হয়। এর লক্ষণ হলো-
– রক্তচাপ হঠাৎ কমে যাওয়া।
– নাড়ীর স্পন্দন অত্যন্ত ক্ষীণ ও দ্রুত হয়।
– শরীরের হাত পা ও অন্যান্য অংশ ঠাণ্ডা হয়ে যায়।
– প্রস্রাব কমে যায়।
– হঠাৎ করে রোগী জ্ঞান হারিয়ে ফেলতে পারে। এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
ডেঙ্গু জ্বরের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। তবে এই জ্বর সাধারণত নিজে নিজেই ভালো হয়ে যায়। তাই উপসর্গ অনুযায়ী সাধারণ চিকিৎসাই যথেষ্ট। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়াই ভালো-
– শরীরের যে কোন অংশ থেকে রক্তপাত হলে।
– প্লেটলেটের মাত্রা কমে গেলে।
– শ্বাসকষ্ট হলে বা পেট ফুলে পানি আসলে।
– প্রস্রাবের পরিমাণ কমে গেলে।
– জন্ডিস দেখা দিলে।
– অতিরিক্ত ক্লান্তি বা দুর্বলতা দেখা দিলে।
– প্রচণ্ড পেটে ব্যথা বা বমি হলে।
কী কী পরীক্ষা করা উচিত?
আসলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডেঙ্গু জ্বর হলে খুব বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার দরকার নাই, এতে অযথা অর্থের অপচয় হয়। জ্বরের ৪-৫ দিন পরে সিবিসি এবং প্লেটলেট করাই যথেষ্ট। এর আগে করলে রিপোর্ট স্বাভাবিক থাকে এবং অনেকে বিভ্রান্তিতে পড়তে পারেন।প্লেটলেট কাউন্ট ১ লক্ষের কম হলে, ডেঙ্গু ভাইরাসের কথা মাথায় রেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া উচিত। ডেঙ্গু এন্টিবডির পরীক্ষা ৫ বা ৬ দিনের পর করা যেতে পারে। এই পরীক্ষা রোগ সনাক্তকরণে সাহায্য করলেও রোগের চিকিৎসায় এর কোন ভূমিকা নেই। এই পরীক্ষা না করলেও কোন সমস্যা নাই, এতে শুধু শুধু অর্থের অপচয় হয়। তবে একমাত্র ভ্যাক্সিন যেটি ৯-১৬ বছরের শিশুদের জন্যে ২০১৯ সালে অনুমোদন পেয়েছে, তা দিতে আগে পরীক্ষা করে রোগ ছিল কীনা তা শনাক্ত করে নিতে হবে। প্রয়োজনে ব্লাড সুগার, লিভারের পরীক্ষাসমূহ যেমন এসজিপিটি, এসজিওটি, এলকালাইন ফসফাটেজ ইত্যাদি করা যাবে। এছাড়াও প্রয়োজনে পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাম, বুকের এক্সরে ইত্যাদি করা যাবে। চিকিৎসক যদি মনে করেন যে রোগী ডিআইসি জাতীয় জটিলতায় আক্রান্ত, সেক্ষেত্রে প্রোথ্রোম্বিন টাইম, এপিটিটি, ডি-ডাইমার ইত্যাদি পরীক্ষা করতে পারেন।
ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসা কি করতে হবে?
ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত বেশির ভাগ রোগী সাধারণত ৫ থেকে ১০ দিনের মধ্যে নিজে নিজেই ভালো হয়ে যায়, এমনকি কোনো চিকিৎসা না করালেও। তবে রোগীকে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েই চলতে হবে, যাতে ডেঙ্গু জনিত কোনো মারাত্মক জটিলতা না হয়। ডেঙ্গু জ্বরটা আসলে একটা গোলমেলে রোগ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লক্ষণ অনুযায়ী চিকিৎসা দিতে হয়। সম্পূর্ণ ভালো না হওয়া পর্যন্ত বিশ্রামে থাকতে হবে। যথেষ্ট পরিমাণে পানি, শরবত, ডাবের পানি ও অন্যান্য তরল জাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হবে। খেতে না পারলে দরকার হলে শিরাপথে স্যালাইন দেওয়া যেতে পারে। জ্বর কমানোর জন্য শুধুমাত্র প্যারাসিটামল জাতীয় ঔষধই যথেষ্ট। এসপিরিন বা ডাইক্লোফেনাক জাতীয় ব্যথার ঔষধ কোনক্রমেই খাওয়া যাবে না। এতে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়বে। জ্বর কমানোর জন্য ভেজা কাপড় দিয়ে গা মোছাতে হবে।
ডেঙ্গু জ্বর কিভাবে প্রতিরোধ করা যায়?
ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধের মূল মন্ত্রই হলো এডিস মশার বিস্তার রোধ এবং এই মশা যেন কামড়াতে না পারে, তার ব্যবস্থা করা। মনে রাখতে হবে, এডিস মশা অভিজাত এলাকায় বড় বড় সুন্দর সুন্দর দালান কোঠায় বাস করে। স্বচ্ছ পরিষ্কার পানিতে এই মশা ডিম পাড়ে। ময়লা দুর্গন্ধযুক্ত ড্রেনের পানি এদের পছন্দ নয়। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার ডিম পাড়ার উপযোগী স্থানগুলোকে পরিষ্কার রাখতে হবে এবং একই সাথে মশক নিধনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। বাড়ির আশপাশের ঝোপঝাড়, জঙ্গল, জলাশয় ইত্যাদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
যেহেতু এডিস মশা মূলত এমন বস্তুর মধ্যে ডিম পাড়ে যেখানে স্বচ্ছ পানি জমে থাকে, তাই ফুলদানি, অব্যবহৃত কৌটা, ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত টায়ার ইত্যাদি সরিয়ে ফেলতে হবে। ব্যবহৃত জিনিস যেমন মুখ খোলা পানির ট্যাংক, ফুলের টব ইত্যাদিতে যেন পানি জমে না থাকে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। ঘরের বাথরুমে কোথাও জমানো পানি ৫ দিনের বেশি যেন না থাকে। একুরিয়াম, ফ্রিজ বা এয়ার কন্ডিশনারের নিচেও যেন পানি জমে না থাকে।
এডিস মশা সাধারণত সকাল ও সন্ধ্যায় কামড়ায়। তবে অন্য সময়ও কামড়াতে পারে। তাই দিনের বেলা শরীর ভালোভাবে কাপড়ে ঢেকে বের হতে হবে, প্রয়োজনে মসকুইটো রিপেলেন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে। ঘরের চারদিকে দরজা জানালায় নেট লাগাতে হবে। দিনে ঘুমালে মশারি টাঙিয়ে অথবা কয়েল জ্বালিয়ে ঘুমাতে হবে। শিশুদের মধ্যে যারা স্কুলে যায়, তাদের হাফপ্যান্ট না পরিয়ে ফুল প্যান্ট বা পায়জামা পরিয়ে স্কুলে পাঠাতে হবে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে অবশ্যই সব সময় মশারির মধ্যে রাখতে হবে, যাতে করে রোগীকে কোন মশা কামড়াতে না পারে। মশক নিধনের জন্য স্প্রে, কয়েল, ম্যাট ব্যবহারের সাথে সাথে মশার কামড় থেকে বাঁচার জন্য দিনে ও রাতে মশারী ব্যবহার করতে হবে।
ডেঙ্গু জ্বর হয়তো বা নির্মূল করা যাবে না। কোন কার্যকরী ঔষধও আবিস্কৃত হয় নাই। ডেঙ্গু জ্বরের মশাটি আমাদের দেশে আগেও ছিল, এখনও আছে, মশা প্রজননের এবং বংশবৃদ্ধির পরিবেশও আছে। তাই ডেঙ্গু জ্বর ভবিষ্যতেও থাকবে। একমাত্র সচেতনতা ও প্রতিরোধের মাধ্যমেই এর হাত থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব।

ডেঙ্গি জ্বরঃ কী সত্য আর কী মিথ বা গুজব
=======================================

এক। ডেঙ্গি মশা (এডিস এডিপ্টিস) শুধু মাত্র দিনের বেলা কামড়ায়?
ডেঙ্গি মশা পছন্দ করে দিনের বেলায় আক্রমণ করতে, কামড়াতে। তাঁর অর্থ আবার এই নয় যে এরা একদম রাতে কামড়াবে না। সংখ্যা বেশি হয়ে গেলে রাতেও কামড়াতে পারে। তবে টিপিক্যালি দিনের বেলায় কামড়ায়।

দুই। ডেঙ্গি মশা (এডিস এডিপ্টিস) শুধু কনুইয়ের নিচে আর হাঁটুর নিচে কামড়ায়? শরীরের উপরের অংশে কামড়ায় না।

কথাটি পুরোপুরি ঠিক না। ডেঙ্গি মশার কামড়ানোর পছন্দের জায়গা হলো কনুইয়ের নিচের এবং হাটুর নিচের অংশে। তার অর্থ এই নয় যে অন্য জায়গায় কামড় দেবে না। আপনি কি আপনার পছন্দের মুরগির রান ছাড়া অন্য কিছু খান না? অনেকটা সেইরকম।

তিন। শীতকালে ডেঙ্গি মশা বাঁচে না।

কথাটা কিছুটা সত্যি। ডেঙ্গি মশা ১৬ ডিগ্রীর নিচে তাপমাত্রা থাকলে ডিম পাড়তে পারে না। এজন্যেই জুলাই থেকে অক্টোবর সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গি এবং ম্যালেরিয়া দেখা যায়। তবে, শীতকালে কালেভদ্রে কিছু ডেঙ্গি ভাইরাসের আক্রমণ দেখা গেছে।

চার। পেপের পাতার জুস, ছাগলের দুধ, ইত্যাদি খেলে রক্তের অণূচক্রিকা বা প্লেটলেট বেড়ে যায়।

এই ধরনের দাবি একেবারেই ভিত্তিহীন। কোন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো পাওয়া যায় নি।

পাচঃ ডেঙ্গির কোন চিকিতসা নেই।
কথাটি কিছুটা সত্যি যে ডেঙ্গির জন্যে আলাদা কোন চিকিৎসা নেই কিন্তু সিম্পটমগুলোর চিকিৎসা করালে সর্বোচ্চ কুড়ি ভাগের বেশি রোগীর মৃত্যু হবার কথা না। সাধারণ উন্নত চিকিৎসায় মাত্র একভাগ রোগী মারা যাতে পারে। এখন পর্যন্ত কিছু এন্টি-ভাইরাল ড্রাগ কার্যকরী কিনা তাঁর পরীক্ষা চলছে।

ছয়। ডেঙ্গির কোন ভ্যাক্সিন বা প্রতিষেধক নেই
কথাটা ঠিক না। এই বছর মে মাসে আমেরিকার ড্রাগ এন্ড ফুড এডমিনিস্ট্রেশন ডেংভ্যাক্সিয়া নামের একটি ভ্যাকসিন অনুমোদন দিয়েছে, ৯-১৬ বছরের শিশু যাঁদের আগে ডেঙ্গি হয়েছে তাদের পরীক্ষা করে পজিটিভ হোলে দেয়ার জন্যে। এটি কার্যকরী (৭৬%) প্রমাণিত হয়েছে। যার আগে ডেঙ্গি হয়নি তাঁকে দেয়া যাবে না। তবে আরও নতুন নতুন ভ্যাক্সিন যা সকল কে দেয়া যাবে তা ফাইনাল স্টেজে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় আছে। অচিরেই বাজারে আসতে পারে।

সাত। ডেঙ্গি রোগ শুধু এডিস এডিপ্টিস মশা দিয়ে ছড়ায়।

কথাটি মিথ্যা। এডিস এডিপ্টিস ছাড়া এডিস এলবোপিক্টাস মশার কামড়ে ডেঙ্গি ছড়াতে পারে।

আট। ডেঙ্গি কি ছোঁয়াচে রোগ? অর্থাৎ মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায়?

না। ডেঙ্গি ছোঁয়াচে না। একমাত্র মশার কামড়ে একজন থেকে অন্য মানুষে যায়।

আপনার মতামত দিন:


মানুষের জন্য এর জনপ্রিয়