Ameen Qudir

Published:
2019-05-04 13:37:15 BdST

ডাক্তারদের মর্যাদার রক্ষাকবচ পেয়েছিলাম প্রাক্তন প্রধান বিচারপতির অনন্য ভাষণে


প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক স্যার; ফাইল ছবি 

 



ডা. শহীদুল্লাহ

_____________________

অশিক্ষিত, অভব্য লোকজনের কাছে আজ ডাক্তারদের মর্যাদা ভূলুন্ঠিত হওয়ার দূর্দিনে আমাদের আত্মমর্যাদার রক্ষাকবচ হিসেবে বাংলাদেশের সর্বজন শ্রদ্বেয় আইনবিদ , মানবাধিকারের মহান রক্ষক প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক স্যারের মূল্যবান দিকনির্দেশনার মন্তব্য এখন বড় মনে পড়ছে। ২০১৭ সালের আগস্টে এক সেমিনারে তিনি পরিস্কার ভাবেই বলেছিলেন,
ডাক্তারদের বিরুদ্ধে কোন ক্রিমিনাল কেইস (অপরাধমূলক মামলা) হওয়ারই কথা না । সে সময়ে পত্রপত্রিকায় সে কথা প্রকাশ হয়েছিল।

মনে আছে, সোসাইটি অব সার্জনস বাংলাদেশ (এসওএসবি) চট্টগ্রাম শাখার আয়োজনে কারেন্ট রিলেশনশিপ বিটুইন সার্জনস এন্ড সোসাইটি শীর্ষক সেমিনারে এই বক্তব্য রেখেছিলেন প্রধান অতিথি বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ।


আজ চারদিকে অশিক্ষিত , অর্ধশিক্ষিত , স্বল্প শিক্ষিত লোকজন, পাড়া মহল্লার মাস্তানদের হাতে চিকিৎসকদের যখন লাঞ্চিত , অত্যাচারিত , অকারণ অপমানিত প্রহৃত হতে দেখি, তখন বুকে সাহস যোগায় বিচারপতি খায়রুল স্যারের মূল্যবান কথাগুলো। কথায় তো আছে, মানীর মর্যাদা মানীর কাছে। শিক্ষিত জনের মূল্য  বিদ্বান লোকজনের কাছে। মূর্খ , লেখাপড়াবিমুখরা বরং শিক্ষিতজনকে মাস্তান সূলভ অপমান করেই আনন্দ পায়।
প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি স্যার সেদিন বলেছিলেন, রোগীর ক্ষতি হবে এমনটা জেনে কোন ডাক্তারের এমন কাজ করার প্রশ্নই ওঠে না। ১৬ কোটি লোকের দেশে আমরা সবচেয়ে কৃতজ্ঞ এই ডাক্তারদের কাছে। অসুখ বিসুখ কিছু হলেই আমরা ছুটে যাই তাদের কাছেই।

তিনি বলেছিলেন, যদি কোন সার্জন, ডাক্তার কিংবা মেডিক্যাল ম্যানের কোনকাজ যদি অফেন্সের ডেফিনেশনের মধ্যে না আসে তাহলে তাকে কোনভাবেই ক্রিমিনাল কেসের আওতায় আনা যাবেনা।

কোন রোগীর সংক্ষুব্ধ আত্মীয়-স্বজন যদি কোন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে মামলা করতে যান তাহলে বিদ্যমান আইনের আওতায় ওসি সাহেব যেটি করতে পারেন, সেটি হলো– অভিযুক্ত চিকিৎসককে একটি নোটিশ করতে পারেন।

বলতে পারেন, আপনি একটু থানায় আসেন। চিকিৎসকের বক্তব্যে তিনি সন্তুষ্ট হোন কিংবা না হোন ওসিসাহেব একটি মুচলেকা নিয়ে চিকিৎসককে ছেড়ে দিতে পারেন। মুচলেকায় বলতে পারেন, প্রয়োজন হলে ডাকলে একটু আসবেন।

কিন্তু ওসি সাহেবরা এরকম করে না। কেন করেন না- সেটা আমার চেয়ে আপনারা আরো ভালো বলতে পারবেন।

সেই অনন্য সেমিনারের ছবি । বক্তব্য রাখছেন বিচারপতি স্যার___________________

 

এবিএম খায়রুল হক আরো বলেছিলেন, অভিযোগ জানানোর আরেকটি পদ্ধতি হচ্ছে, রোগীর আত্মীয় স্বজন সরাসরি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অভিযোগ জানাতে পারেন।

ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব অভিযোগ পেলেই যে জামিন অযোগ্য ওয়ারেন্ট ইস্যু করবেন, সেটা না। যিনি অভিযোগ করলেন তাকে এক্সামিন করতে হবে।

এরপর যদি ম্যাজিস্ট্রেটের মনে হয় সত্যিই চিকিৎসক রেগে গিয়ে রোগীকে ইচ্ছাকৃতভাবে খুন করেছেন। তাহলে তিনি সমনও জারি করতে পারেন কিংবা ওয়ারেন্টও ইস্যু করতে পারেন।

তাছাড়া কাউন্টেবল নেগলেজেন্সি হলেও চিকিৎসককে সেভাবেই দায়ী করা যেতে পারে। তবে আমি যতটুকু বুঝি, সাধারণভাবে ডাক্তারদের বিরুদ্ধে কোন ক্রিমিনাল কেইস হওয়ারই কথা না।

সাবেক এই প্রধান বিচারপতি আরও বলেন, আমাদের নৈতিক মূল্যবোধ (এথিক্যাল ভ্যালু) সম্পর্কে চিন্তা করার সময় এসেছে।

ইন্স্যুরেন্স প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উন্নত বিশ্বে রোগীর ক্ষতিপূরণের অর্থ দিয়ে থাকে ইনস্টিটিউশনগুলো। ডাক্তারদের নিজেদের পয়সা খরচ করে ইন্স্যুরেন্স করা লাগে না।

আমরা আমাদের আইনের ড্রাফটে (স্বাস্থ্যসেবা আইন ২০১৬) বলে দিয়েছি, সরকারি–বেসরকারী যেখানেই হোক সমস্ত ডাক্তারদের ইন্স্যুরেন্স করার দায়িত্ব হচ্ছে ইনস্টিটিউশনের।

তবে কেউ যদি বাইরে চেম্বার করেন তবে সেই চিকিৎসককে নিজের ইন্স্যুরেন্স করে নিতে হবে।

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেছিলেন, সোসাইটির চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি অধ্যাপক এস এম আশরাফ আলী। সঞ্চালনা করেন অধ্যাপক সানাউল্লাহ শেলী।

সেমিনারে বিশেষ অতিথি ছিলেন আইন কমিশনের সদস্য ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবির।

স্বাগত বক্তদব্য রাখেন সোসাইটির চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদক ডা. শ্রীকান্ত বণিক।

ইংল্যান্ড আমেরিকার ডাক্তারদের মতো এখানকার ডাক্তারদের জন্যও গাইডলাইন অনুসরণের তাগিদ দিয়ে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান বলেছিলেন, বিএমডিসি যদি গাইডলাইন করে থাকে তাহলে তো ভাল।

অন্যথায় একটি গাইড লাইনকরে তা ডাক্তারদের অনুসরণ করার ব্যবস্থা করে দিতে পারে।রুলস রেগুলেশন করতে পারে।

ডাক্তারদের সুরক্ষার জন্য যে খসড়া আইন করা হয়েছে, সেটিও বিএমডিসি দেখে মতামত দিয়ে দ্রুত আইনটি পাস করায় সহায়তা করতে পারে।

ডাক্তারদের সেফগার্ডের জন্যই এটা প্রয়োজন। নইলে কারো রোগী মারা গেলে তখন শুরু হয়ে যায় ব্লেইম গেম।কারণ তখন রোগীর স্বজনদের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না।

দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, আমার দেশের বিচার ব্যবস্থা এখনও এতো ফ্লারিশ করেনি যে চট করে বুকের জোর দিয়ে কেউ বলবে, ‘নো, দেয়ার ইজ নো কেস এগেইনস্ট ডক্টর’।

এটা বলার জন্য যে সাহসের দরকার সেটা এখন পর্যন্ত  হয়েছে বলে আমার মনে হয় না।

আপনার মতামত দিন:


মানুষের জন্য এর জনপ্রিয়