Ameen Qudir

Published:
2018-01-15 10:41:57 BdST

বেতন বৃদ্ধি করলে দুর্নীতি কমবে : অবশেষে এ ধারনা ভুল প্রমাণিত হল


 


ডা. বাহারুল আলম

_________________________________


বেতন বৃদ্ধি করলে দুর্নীতি কমবে – অবশেষে এ ধারনা ভুল প্রমাণিত হল।
দুর্নীতিবাজরা কৌশলে বৈষম্যমূলক ৮ম পেস্কেলে বেতন বৃদ্ধির কাজ করিয়ে নিয়েছে। বিশ্বাস-প্রবণ সাধারণ মানুষকে ভুল বুঝিয়েছে- ‘বেতন বাড়লেই দুর্নীতি কমবে’। এখন উভয় সংকট , বেতন বেড়েছে, দুর্নীতিও আগের চেয়ে বেড়েছে।

প্রজাতন্ত্রের যে কোন ক্ষমতা প্রয়োগের অবস্থানের প্রতিনিধি বা কর্মচারী যেই হোক না কেন তার সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্যক্তিরা মনে করে , ক্ষমতা বা পদ জনগণের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার উপযুক্ত মাধ্যম। স্ব-নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ করে, জনগণের কাজে বাঁধা বা দির্ঘায়িত করে, তাদের মনে অবৈধ কাজের লোভ সৃষ্টি করে এ অর্থ সংগ্রহ করে তারা। ওদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন ও বিচারিক আদালত – কিছুই করতে পারছে না কারণ উভয় বিভাগ দুর্নীতিবাজদের নিয়ন্ত্রণে ।

৮ম পে স্কেলে ঊর্ধ্বতন ও অধস্তন কর্মচারীদের মধ্যে বেতন বৈষম্যও বিশাল। এ সিদ্ধান্ত ছিল একটি দুর্নীতি। ফলে ৮ম পেস্কেল জন্ম লাভ করেছে বৈষম্যমূলক দুর্নীতির মধ্য দিয়ে। আমলাদের হাতে তৈরি এ বৈষম্যমূলক পেস্কেল দুর্নীতি রোধ না করে আরও দুর্নীতির জন্ম দিয়েছে। প্রায় দ্বিগুণ বেতন বৃদ্ধি করে দুর্নীতি কমানোর এ সিদ্ধান্তই ছিল ভুল।

 

প্রতীকী ছবি

 

 

রাষ্ট্রের সর্বাঙ্গে দুর্নীতি হলে দুর্নীতিমুক্ত মলম লাগাবে কোথায়? একটা দুর্নীতির বিচার হতে সময় লাগে দুই যুগের অধিক সময়। বর্তমানে দুর্নীতির প্রতিকার বা বিচারের রায় পাওয়া এত দীর্ঘমেয়াদি যে এক প্রজন্মে সম্ভব হয়ে উঠছে না । সমকালীন সময়ে- ‘শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি, হল-মার্ক কেলেঙ্কারি, বাংলাদেশ ব্যাংকের হ্যাকিং কেলেঙ্কারি ও ব্যাংক লুট , মানি লন্ডারিং । এরও পূর্বে রাষ্ট্রে সংঘটিত অনেক দুর্নীতির ঘটনা চাপা পড়ে গেছে। এ সকল রাজকীয় সব কেলেঙ্কারির বিচার করবে কোন রাজা ? সাধ্য কি তার ? তাদের অনেকেই রাজার রাজা হয়ে বসে আছে, ধরাছোঁয়ার বাইরে।

নূতন প্রজন্ম বিশ্বাস করতে শুরু করেছে রাষ্ট্রে দুর্নীতি একটি স্বীকৃত বিষয়, দুর্নীতি প্রতিরোধ একটি সনাতনী ভাবনা, যা এখন অচল। দুজন শীর্ষস্থানীয় মন্ত্রীর মন্তব্যে তারা উৎসাহ পেয়েছে। দুর্নীতিবাজরাই এখন রাষ্ট্র, রাজনীতির শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে। ক্ষমতাবান হওয়ার জন্য জনসমর্থন পেতে কোন কষ্টই হয় না। সমর্থনের জন্য দুর্নীতির অর্থ দেদারছে খরচ করলে সমর্থন আসে সংখ্যাগরিষ্ঠে । ৫১ জন দুর্নীতির সমর্থকের সাথে ৪৯ জনের সততা রাষ্ট্র স্বীকৃত নয়।

গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি টিকে থাকার এই শুভঙ্করের ফাঁকি যতদিন বজায় থাকবে ততদিন দুর্নীতি দূর না হয়ে চিরস্থায়ী হবে। এই পদ্ধতির বিরুদ্ধেই ছিল বঙ্গবন্ধুর বাকশাল, রাষ্ট্র সেটি ধারণ করতে পারে নাই। বর্তমান দুর্নীতিবাজরা তখন বাকশালকে প্রতিষ্ঠিত হতে দেয় নি।

রাষ্ট্রে কোন অপরাধের কৈফিয়ত বা জবাবদিহিতার সুনির্দিষ্ট কাঠামো নাই। সকলেই দুর্নীতির ক্ষেত্রে স্ব স্বাধীন । জনপ্রতিনিধিত্বশীল সংসদের কাছে সরকার বা নির্বাহী বিভাগের কোন জবাবদিহির ব্যবস্থা নাই। সংসদ নেতা ও সরকার প্রধান এক ব্যক্তি হওয়ায় ‘ফ্লোর ক্রসিং’-এর ভয়ে কেউ মুখ খোলে না। বিচার বিভাগকে সরকার/ নির্বাহী বিভাগ নিয়ন্ত্রণের নামে ভীতিতে রেখেছে। মাসদার হোসেন মামলার রায়ের কোন কার্যকারিতা নাই এবং এ রায়ের ঘোর বিরোধিতা করেছে দুর্নীতিবাজ আমলারা। সরকার বা সরকারের আশেপাশে দুর্নীতিগ্রস্ত কোন ব্যক্তির বিচার করতে বিচারকরা বিব্রত বোধ করে এবং ভীতসন্ত্রস্ত থাকে। এ সুবিধাভোগীরাই মূলত বাংলাদেশকে দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে, সাধারণ মানুষের দুর্নীতির সাথে কোন সম্পর্ক নাই।

রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ/সরকারের ছত্রছায়ার কারণে দুর্নীতি বা দুর্নীতিবাজদের সংসদে যেমন জবাবদিহিতা নাই তেমনই বিচার বিভাগে বিচারহীনতার সংস্কৃতি বিরাজমান। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে জনগণ ফরিয়াদ কোথায় জানাবে ? কি ফল হবে?

উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় - প্রকাশ্যে রাষ্ট্রের পুলিশ প্রশাসন ঘোষণা করেছে -‘মাদক নিয়ন্ত্রণ তাদের দ্বারা সম্ভব নয়’। এ ভয়ঙ্কর উচ্চারণের মধ্য দিয়ে মাদক দুর্নীতি ও মাদক ব্যবসায়ীদের ছাড় দেওয়া হল এবং স্পষ্ট করে জনগণ বুঝল, বাংলাদেশের মানুষ নৃশংস মাদকের ছোবল থেকে মুক্ত হতে পারবে না। অথচ রাষ্ট্র চাইলে মুহূর্তে এটি বন্ধ হয়। এ উচ্চারণের জন্য পুলিশ প্রশাসনের কাছে কৈফিয়ত চাইবে এ ক্ষমতা রাষ্ট্রের নাই। কারণ সেই সুবিধাভোগী ক্ষমতাবানরাই এ মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত। সংসদ ও বিচার বিভাগ ঠুঁটো জগন্নাথ।

রাষ্ট্রের ক্ষমতাবানদের জবাবদিহিতা না থাকলে, নিয়ন্ত্রণ মুক্ত থাকলে, চরম স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির জন্ম হয়। আমাদের প্রযুক্তিগত কাঠামো থাকলেও চরিত্র গঠনের কোন রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নাই। ‘রোজগার এবং কেবলই রোজগার’- এ স্বপ্ন সামনে নিয়ে প্রজন্মকে গড়ে তুললে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ। এমনকি শিক্ষা সনদ ছারাই বিপুল অর্থের বিনিময়ে রাষ্ট্রের চাকরি গ্রহণ করে প্রয়োজনে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে। এ বিষয়ে পরিবারের কোন বাঁধা থাকে না।

রাষ্ট্রের দুর্নীতিবাজ এ শ্রেণিকে শায়েস্তা করার জন্য জন্ম হয়েছিল ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের। দুর্নীতিবাজরা সে যুদ্ধকেই নানা কৌশলে কব্জা করে ফেলে। জন্মলগ্নে বেহাত হয়ে যাওয়া মুক্তিযুদ্ধ অসমাপ্ত থেকে অকার্যকর হয়ে যায়। চূড়ান্ত বিজয় আসে নি, অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধের ফসল বাংলাদেশ দুর্নীতিগ্রস্থ হয়ে পড়ে। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীকে পরাজিত করে স্বাধীনতা এসেছে বটে কিন্তু রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে দুর্নীতিগ্রস্ত কাঠামো অবিকল থেকে যায়। বিদ্যমান কাঠামোর সাথে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিশ্রুত মূল্যবোধের কোন ছোঁয়া নেই।

এভাবেই ৪৭ বছরে পা রাখল বাংলাদেশ, দুর্নীতিও সমান্তরাল পথে এগোচ্ছে।

_______________________________

ডা. বাহারুল আলম । প্রখ্যাত লোকসেবী চিকিৎসক । পেশাজীবী নেতা। সুলেখক।


মানুষের জন্য এর জনপ্রিয়