DESK

Published:
2026-04-09 20:06:00 BdST

২৮ হাজার বৎসর আগেও নিয়েন্ডারথলরা ছিল



ডেস্ক
তুষারমুখার্জি অসাধারণ এক লেখক। মানুষ ও সভ্যতার ইতিহাস নিয়ে লিখে চলেছেন অনন্য দক্ষতায়। তাঁর একটি লেখা প্রকাশ করা হল।
___________________________


‍" তুষারমুখার্জির অনন্য লেখা
নিয়েন্ডারথলদের জিন আমাদের শরীরে থাকায় প্রমানিত তাদের সাথে আমাদের দৈহিক মিলন ঘটেছিল। যেহেতু আমাদের মোট জিনের মাত্র ১% থেকে ২% তাই তাদের শারীরিক বৈশিষ্ট্যগুলো আমাদের মধ্যে খুব একটা প্রকট নয়। এখানে আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হলো এই গড়ে ১% থেকে ২% হলেও সবার মধ্যে একই জিন নেই। বৈচিত্র আছে। এই সবগুলো বৈচিত্র যোগ করলে নিয়েন্ডারথলদের মোট জিনের ২০ শতাংশ আমাদের মধ্যে পাওয়া যাবে। খুব কম নয়।
যদিও জিনের পরিমান গুনতিতে মাত্র ১% থেকে ২% আর তার কোন বাহ্যিক শারীরিক প্রভাব আমাদের চোখে পড়ে না, তার মানে এই না যে নিয়েন্ডারথল জিনগুলোর নেহাতই অলস হয়ে বসে আছে। সেই জিনগুলো কিন্তু আমাদের শরীরের আভ্যন্তরীন কাজকর্মে ভালোই প্রভাব ফেলে। যেহেতু সবার শরীরে আলাদা আলাদা জিন সব কটা জিন কখনই একজনের মধ্যে নেই তাই শারীরিক প্রভাবও অনেক সময়ই নজর এড়িয়ে যায়। তবে নিয়েন্ডারথল জিন মোটামুটি ভাবে আমাদের নেশা করার অভ্যাস, মানসিক অবসাদ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এই সবে প্রভাব ফেলে।
এই বিষয়ে গবেষণার জন্য বিজ্ঞানী স্বান্তে পাবো চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছিলেন।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে ভারতীয়দের মধ্যে কি নিয়েন্ডারথল জিন আছে?
হ্যাঁ আছে। জানিয়েছেন বিজ্ঞানী প্রিয়া মুরজানী গতবৎসর মার্চে সংবাদপত্রে সে খবর বের হয়েছিল। এটা অবশ্য প্রিয়া মুরজানীর কোন একক গবেষণা ছিল না। তিনি একটি আমেরিকান গবেষক দলের সদস্য হিসাবে কাজ করছিলেন।
ভারতীয়দের মধ্যে নিয়েন্ডারথল জিন এল কোন পথে সেটা ভিন্ন গবেষণার বিযয়। তবে এখন অবধি জানা মতে ভারতে নিয়েন্ডারথলদের আবাস ছিল না। নিয়েন্ডারথলরা মধ্যপ্রাচ্যের কিছু অংশে এশিয়ার সাইবেরিয়া ও স্তেপে এলাকার কিছু অংশে আর প্রধানত ইয়োরোপে ছিল।
ইয়োরোপে যাওয়া স্যাপিয়েন্সদের সাথে মিলন হয় নিয়েন্ডারথলদের প্রায় প্রথম থেকেই। পূর্ব ইয়োরোপের বুলগেরিয়ার বাচো কিরো গুহাতে পাওয়া নমুনা অনুযায়ী ৪৬ হাজার বৎসর আগেই নিয়েন্ডারথল পিতা ও স্যাপিয়েন্স মাতার সন্তানদের পঞ্চম ও সপ্তম প্রজন্মের পুরুষ ও নারীর দেখা পাওয়া গেছে। অবশ্যই তাদের মধ্যে নিয়েন্ডারথল জিনের হার ছিল কিছুটা বেশি। ৩ থেকে ৩.৮ শতাংশ।
যেহেতু বাচো কিরোতে কোন পূর্ণাঙ্গ কঙ্কাল পাওয়া যায়নি, তাই এরা বাহ্যিক শারীরক ভাবে কতটা নিয়েন্ডারথলদের মত ছিল তা অনুমান করা সম্ভব হয় নি। তবে একজন নারীর জিন থেকে জানা গেছে সে কৃষ্ণবর্ণা কৃষ্ণকেশি আর তার চোখের মণিও ছিল কৃষ্ণবর্ণ। তবে এই নারী নিয়ে লক্ষণীয় ঘটনা হল ইনি বুলগেরিয়া বা চেক প্রজাতন্ত্রের বা লাগোয়া এলাকার বাসিন্দা ছিলেন না, এবং এনার কোন বংশধরও আশেপাশে পাওয়া যায় নি।
এতো গেল কত আগে থেকে নিয়েন্ডারথল আর স্যাপিয়েন্সদের মেলামেশা চলছিল সেই কথা।
কিন্তু আমরা জানি একসময় নিয়েন্ডারথলরা একদম নেই হয়ে গেল। পৃথিবীতে নিয়েন্ডারথলরা আর নেই। কেন নেই তা নিয়ে নানা আলোচনা প্রাথমিক গবেষণা হতে থাকে। নানা মতবাদ বের হয়। তারমধ্যে কয়েকটি একটু অদলবদল করে আসলে একই মতবাদ তা হল স্যাপিয়েন্সরা নিয়েন্ডারথলদের বিলুপ্ত করেছে, মুলত তাদের উন্নত বুদ্ধি আর উন্নত অস্ত্রের সাহায্যে।
কিন্তু এটাও ঘটনা যে বহু নিয়েন্ডারথল দেহাবশেষ তাদের বাসস্থান খুঁজে পাওয়ার পরেও কোথাও একটিও সংঘর্ষের চিহ্ন পাওয়া যায় নি। বরং একেরপর এক গুহায় পাওয়া গেছে নিয়েন্ডারথল স্যাপিয়েন্স পিতা- মাতার সন্তান। আর বিশ্বব্যাপি আমাদের জিনে বৈচিত্রে ভরা নিয়েন্ডারথল জিন বলে একবার দুইবার নয় বহবার বহুস্থানে এই নিয়েন্ডারথল-স্যাপিয়েন্স মিলন ঘটেছিল। কিন্তু এই মিলনমেলার পূর্ণ সমাপ্তি ঘটে গেল ৩৫ হাজার বৎসর আগে। ৩৫ হাজার বৎসরের পরের কোন নিয়েনডারথল দেহাবশেষ পাওয়া যায় নি। তাই ৩৫ হাজার বৎসর আগেই নিয়েন্ডারথলরা লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল এমনটা আমরা শিখতে শুরু করলাম।
সেই এতকালের জানাটা ঠিক না ভুল জানা তা ফিরে যাচাই করার সময় এসেছে।
নিয়েন্ডারথলদের সমসাময়িক ডেনিসোভান। নিয়েন্ডারথলদের দেহাবশেষ পাওয়া গেছে তাই তাদের নিয়ে আমাদের একটা মোটামুটি ধারনা গড়ে উঠেছে। কিন্তু ডেনিসোভানদের কোন দেহাবশেষ আজ পর্যন্ত পাওয়া যায় নি। ডেনিসোভানরা ছিল মুলত এশিয়াতে। ডেনিসোভান জিন থেকে ডেনিসোভানদের অস্তিত্ব প্রমানিত হল। তারপরের দফায় পাওয়া গেল ডেনিসোভান-নিয়েন্ডারথল পিতামাতার সন্তান এক কিশোরির দেহাস্থির একটি ক্ষুদ্রাংশ। তাই থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করে তার পরিচয় জেনে বিজ্ঞানীরা তার আদুরে নাম রাখলেন ডেন্নি।
এরপরে ডেনিসোভান দাঁত ও চোয়ালের হাড় থেকে জানা গেল ডেনিসোভানরা ছিল তিব্বতের অতি স্বল্প অক্সিজেন এলাকায়। ক্রমে জানা গেল ডেনিসোভান-স্যাপিয়েন্স সন্তানেরা যারা তিব্বতে বসবাস করছে তারা ডেনিসোভানদের কম অক্সিজেনে টিকে থাকার উপযুক্ত একটি জিন মিউটেশন পেয়ে তিব্বতের কম অক্সিজেন এলাকায় স্বাভাবিক জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। সেই জিন মিউটেশনটি এল নেপালের শেরপাদের কাছে। এখন শেরপা ছাড়া হিমালয় অভিযান অচল।
কিন্তু ডেনিসোভানদের সবচেয়ে বেশি জনঘনত্ব বোধহয় ছিল দক্ষিণ পূর্ব-এশিয়ায়। কিছুকাল আগেও কেবল পাপুয়াবাসীদের সাথে ডেনিসোভানদের মিলনের কথা জানা ছিল। এখন একাধিক জাতি উপজাতির নাম বের হয়ে আসছে। তারমধ্যে ফিলিপিন্সেরও একটি উপজাতির উল্লেখ বেশ নজর কাড়া। কারণ সেখানে যেতে হলে সমুদ্র পার হতে হয়। তার মানে ডেনিসোভানরা সমুদ্র পাড়ি দিয়েছিল। যত ছোটই হোক সমুদ্র তো বটেই।
প্রথমে ভাবা হত ডেনিসোভান আর নিয়েন্ডারথল সমসাময়িক তাই তাদের বিলুপ্তিও সমসায়িক। কিন্তু না। জানা গেল ডেনিসোভানরা মাত্র পনের হাজার বৎসর আগেও পাপুয়াতে ছিল।
তাহলে দাঁড়াল নিয়েন্ডারথল বিলুপ্ত ৩৫ হাজার বৎসর আগে। ডেনিসোভান বিলুপ্ত ১৫ হাজার বৎসর আগে।
না এই তথ্য এবার সংশোধন করতে হবে।
এতকাল প্রত্নখননে একটা খামতি থেকে গিয়েছিল, নিয়েন্ডারথল-স্যাপিয়েন্স পিতামাতার সন্তানের মধ্যে নিয়েন্ডারথলদের দৈহিক বৈশিষ্ট্যের লক্ষণ দেখতে পাওয়াটা হচ্ছিল না।
১৯৯৮ লাগর ভেলহো পাথুরে আস্তানা। ভৌগোলিক অবস্থান হল ল্যাপেডো ভ্যালি, পর্তুগাল।
এখানে একটি কবরখানায় পাওয়া গেল একটি চার পাঁচ বৎসরের শিশুর মৃতদেহ।
এই শিশুটির মুতদেহটি দেখে বিজ্ঞানীরা অবাকই হন। কারণ এর পায়ের দিক নিয়েন্ডারথলদের মত। অথচ শরীরে উপরের অংশ স্যাপিয়েন্সদের মতই। স্যাপিয়েন্সদের মতই তার দাঁত, কান, খুলির গড়ন। শুধু খুলির পেছনদিক একেবারে মার্কামারা নিয়েন্ডারথলদের মত।
১৯৯৮, জেনেটিক বিজ্ঞান চর্চার হিসাবে অনেক আগের। তথনও প্রাচীন ডিএনএ বিশ্লেষণে তেমন সড়গড় হয়ে ওঠেননি বিজ্ঞানীরা। তার চেয়েও বড় কথা তখনও নিয়েন্ডারথল জেনোম পাঠ হয়নি।
তাই এই শিশুটি যে নিয়েন্ডারথল-স্যাপিয়েন্স পিতা-মাতার সন্তান হতে পারে সেটা কেউ ভাবেই নি।
তারউপরে তখন যে কার্বন ডেটিং করা হয়েছিল তার ফল বের হয়েছিল ২০-২৬ হাজার বৎসর। এবার ২০-২৬ বৎসর আগে তো নিয়েন্ডারথলদের ইয়োরোপে থাকারই কথা না।
সব মিলিয়ে একটা তালগোল পাকানো অবস্থা।
এখন আমরা জানি নিয়েন্ডারথল-স্যাপিয়েন্স শন্তান নিয়মিত জন্মাত ইয়োরোপে। কাজেই এই শিশুটিকে সেই রকমই একটি শিশু হিসাবে স্বীকার করে নেওয়া হল।
কার্বন ডেটিং তখনও বিজ্ঞানীরাই খুব একটা নিশ্চিত ছিলেন না। তাঁদের মনে সন্দেহ ছিলই।
অতএব নতুন করে কার্বন ডেটিং করা হল। এক বিশেষ পদ্ধতিতে। কম্পাউন্ড স্পেসিফিক রেডিওকার্বন অ্যানালাইসিস। এই পদ্ধতিতে একেবারে নিখুঁত কার্বনডেটিং ফল পাওয়া গেল। ২৭,৭৮০-২৮৮৫০ বৎসর। (৯৪,৫% নিশ্চয়তা)। এই পদ্ধতিতে হাড়ের কোলাজেন থেকে অ্যামিনো অ্যাসিড আলাদা করে নেওয়া হয়েছিল।ফলে কোন রকম সংক্রমণ আর ঘটেনি। এবং একেবারে ঠিক ফল পাওয়া সম্ভব হল।
তারপরেও নিশ্চিত হবার জন্য কবরে থাকা খরগোশের হাড়ের ও কার্বন ডেটিং করা হল। সেটা শিশুটির কার্বন ডেটিং ফলের সাথে মিলে গেল।
তা ছাড়া ও পাওয়া গিয়েছিল কিছু কাঠকয়লা আর হরিনের হাড়। সেগুলোরও কার্বন ডেটিং বের হল। কাঠ কয়লা ২৮,৮৬০-২৯,৭০০)। হরিনের হাড় ২৮,২৩০-২৯,৬৩০ বৎসর আগের। এগুলো শিশুটির কোমরের সাথে একেবারে সাঁটিয়ে রাখা ছিল। তুলনায় খরগোশের হাড় সামান্য সরে ছিল।
এই কবরের সাথে ধর্মাচরণের সম্পর্ক আছে ভাবা হয়, কারণ কবরের উপরে লাল গেরুয়া মাটি ছড়ানো ছিল, তা ছাড়া শিশুর হাতের হাড়ে লাল গেরুয়া মাটি লেগেছিল।
এই পর্তুগালের ল্যাপেডো ভ্যালির শিশুর দেহাবশেষ দুটি কারণে বিখ্যাত হয়ে থাকবে। একটি হল নিয়েন্ডারথল-স্যাপিয়েন্স সন্তানদের শারীরিক ভাবে দেখতে কেমন হত তার একটা আভাস পাওয়া গেল। অবশ্যই এটা কোন নির্দ্দিষ্ট নিয়ম না। শারীরিক বৈশিষ্ট্যে বিভিন্নতা ঘটতেই পারে আরো নানা ভাবে।
সবচেয়ে যেটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেল, তা হল ইয়োরোপে নিয়েনডারথলরা ২৮-২৯ হাজার বৎসর আগেও বসবাস করত।
তথ্যসূচীঃ-
1. Direct Hydroxiproline radiocarbon dating of the Lapedo child (Abrigo do Lagar VelhoLeiria, Portugal). : By Bethan Linscot, Thibout Deviese, Cidalia Durate, Erik Trinkaus, Joao Zhilhao. Published in Science Advance. March 2025.
চিত্রপরিচিতিঃ- Model of Homo neanderthalensis child in the Natural History Museum, Vienna.
Source: Jakub Halun"

আপনার মতামত দিন:


মানুষের জন্য এর জনপ্রিয়