|

'ভিনদেশ প্রেমে' নিজ দেশকে হেয় করা


Published: 2017-01-06 09:40:45 BdST, Updated: 2017-01-19 08:14:48 BdST

 

 

 

ডা. বাহারুল আলম
_____________________________


ভিনদেশী চিকিৎসকরা স্বদেশী চিকিৎসকদের চেয়ে বেশি জানে – কিছু মানুষ এ ধারনার বশবর্তী হয়ে 'ভিনদেশ প্রেমে' নিজ দেশকে হেয় করে আভিজাত্য, ক্ষমতা ও পুঁজির তাড়নায় সর্দি জ্বরেও সিঙ্গাপুর, লন্ডন যায়।

 

কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করার মধ্য দিয়ে সমাজে সচেতনতা সৃষ্টি হয় । অভিযুক্ত ব্যক্তির শাস্তি পাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে এটা যেমন সত্য, অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত সত্য না হলে সমাজে সচেতনতা সৃষ্টির বিপরীতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। আমরা সমাজ, রাষ্ট্রকে সচেতন করতে না পারি, কিন্তু যেন বিভ্রান্ত না করি ।

 

কথিত নারী সাংবাদিক রোগী ঝর্ণা-র ফেসবুকের বর্ণনায় বাংলাদেশের সকল চিকিৎসা ও চিকিৎসককে ভিনদেশি চিকিৎসকের উৎসাহব্যঞ্জক বিরূপ মন্তব্যের প্রেক্ষিতে কটাক্ষ করার বিষয়টি দায়িত্বহীনতা ও শিষ্টাচার বিবর্জিত। তার উপলব্ধিতে আসা প্রয়োজন ছিল যে, চিকিৎসা ও চিকিৎসা ব্যবস্থায় যথার্থ জ্ঞান অর্জন না করে ঢালাও মন্তব্য দায়িত্বহীনতার পরিচয় বহন করে। দায়িত্বহীন ব্যক্তি কোন মন্তব্য করলে বিভ্রান্তি ছাড়া আর কিছুই সৃষ্টি হয় না।

রোগী ঝর্ণা-র প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে বলছি, চিকিৎসা ঝুঁকিপূর্ণ আধুনিক বিজ্ঞান। রোগী চিকিৎসায় এ বিজ্ঞান প্রয়োগের সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।মাথা যন্ত্রণার চিকিৎসা পেতে গিয়ে সে বাংলাদেশের অনেক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছে। তার পায়ে স্ক্যানিং অর্থাৎ MRI করে রক্ত সরবরাহের শিরায় ত্রুটি পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের কোন চিকিৎসক রোগীকে বলে নি এই ত্রুটি তার খাওয়া ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ফল । এ মতামত দেওয়ার ক্ষেত্রে কোন সমস্যা ছিল না। এমন মতামতও আসছে পায়ের একপাশের শিরা জন্মগত অনুপস্থিত হতে পারে ।বাংলাদেশের চিকিৎসকদের চূড়ান্ত মতামত পাওয়ার আগেই রোগী ভারতে চলে যায়। সেখানের চিকিৎসকরা মত প্রকাশ করেছে যে, বাংলাদেশের চিকিৎসকদের দেওয়া ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় তার এই শিরা নষ্ট হয়েছে।

 

চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করলে অনেক প্রশ্নের জন্ম হয়। যার জবাব রোগী ঝর্ণা লিখে নাইঃ

১। বাংলাদেশে চিকিৎসকদের দেওয়া কোন ঔষধ বা ঔষধগুলির ক্ষতিকারক প্রতিক্রিয়ায় এ ঘটনা ঘটেছে? ভারতীয় চিকিৎসকের বর্ণনায় এর কোন উল্লেখ নাই।

২। রোগী উল্লেখ করে নি ক্ষতিকারক ঔষধগুলি বাংলাদেশের কোন চিকিৎসক তার ব্যবস্থাপত্রে দিয়েছে।

৩।নিউরোলজিস্ট রক্ত চলাচলের বিশেষজ্ঞ নয়, এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হল ভাস্কুলার বা শিরা বিশেষজ্ঞ। শিরা বিশেষজ্ঞের চূড়ান্ত মতামত উল্লেখ নাই।

৪। ক্ষতিকারক ঔষধের নাম উল্লেখ থাকলে, ব্যবস্থাপত্র প্রদানকারী চিকিৎসক ও প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান উভয়ের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপন করা যেত।

বর্ণনা দৃষ্টে সন্দেহ হয়, ভারতীয় চিকিৎসকরা আদৌ দায়িত্বহীনতার পরিচয় বহন করার এরূপ মন্তব্য করেছিল কি না ? না কি স্বদেশের চিকিৎসকদের হেয় করার উগ্র মানসিকতা থেকে এসব কল্পকাহিনী?

বাংলাদেশের যে সকল ঔষধ বাজারজাত হয় তার প্রতিক্রিয়ায় পায়ের শিরা ধ্বংস করে দিতে পারে তা ঔষধ প্রশাসনের অনুমোদন পাওয়া সম্ভব কিনা ? বা রোগীর অতীব প্রয়োজনের তাগিদে বাংলাদেশের কোন চিকিৎসক সে ঔষধ ব্যবস্থাপত্রে লিখলেও রোগীকে সাবধান না করে দেওয়ার ঘটনা সন্দেহের উদ্রেক করে।

বাংলাদেশে মানব শরীরের প্রায় সকল মৌলিক অংশের আধুনিক চিকিৎসা উন্নত বিশ্বের তুলনায় সংখ্যা কম হলেও নিয়মিত হচ্ছে । দুর্বল অনাধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার কারণে বা কখনো কখনো অনিবার্য চিকিৎসা দুর্ঘটনার কারণে অনাকাংখিতভাবে রোগীর মৃত্যুও ঘটছে । তবে অসংখ্য মানুষ প্রতিদিন , প্রতি মাসে, বছরে- মস্তিষ্ক , হৃৎপিণ্ড , কিডনি, লিভার পাকস্থালী ও জরায়ুর চিকিৎসা পাচ্ছে , যাদের দেশের বাইরে যাওয়ার সামর্থ্য নাই। নিশ্চিত না হয়ে নিজ দেশের চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ উত্থাপন করা কতটা যৌক্তিক?-- প্রথম আলো ও রোগী সাংবাদিক ঝর্ণা-র বিবেকের উপর ছেড়ে দেওয়া হল। নিশ্চয়ই তাদের শুভ বুদ্ধির উদয় হবে।

ঝর্ণা- র জ্ঞাতার্থে বলছি, যুক্তরাষ্ট্রে লেখক, সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের চিকিৎসা ভুলের কারণে তার অকাল মৃত্যু হয়েছিল তা বাংলাদেশের চিকিৎসকরা বিশ্লেষণ করে সারা পৃথিবীকে দেখিয়ে দিয়েছিল। ক্যান্সার আক্রান্ত সদ্য প্রয়াত সব্যসাচী কবি ও সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হক-এর বিষয়ে বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা মত দিয়েছিলেন- ভাল হওয়ার কোন সম্ভাবনা নাই। অনাস্থা ও অবিশ্বাস থেকে কবি লন্ডন গিয়েছিলেন। সেখান থেকে একই মতামত নিয়ে দেশে ফিরে আসলেন।

বিদেশি চিকিৎসকরা আমাদের থেকে বেশি জানে এ দুরত্ব এখন ছোট হয়ে আসছে। তারপরও কিছু মানুষের বিদেশ প্রীতি জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ায়- তারা পুঁজি, ক্ষমতা আভিজাত্যের তাড়নায় সর্দির চিকিৎসা করাতে সিঙ্গাপুর লন্ডন যায়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজে মায়ের গর্ভের শিশু গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ভর্তি হলে মা ও শিশুর জীবন রক্ষা করে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে গুলি অপসারণ করেছে। বিরল রোগে আক্রান্ত বৃক্ষমানব আবুল বাজনদার কে সুস্থ করে তোলার কৃতিত্ব এদেশীয় চিকিৎসকদের-ই।

এ দেশেরই শৈল্য চিকিৎসকরা সিলেটে প্রেমিক কর্তৃক আক্রান্ত খাদিজাকে সংকটাপন্ন মুমূর্ষু অবস্থা থেকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনার দুরূহ কাজটি করেছে। এ সকল রোগীদের কারোই সামর্থ্য ছিল না দেশের বাইরে যাওয়ার। সামর্থ্য-বান হুমায়ুন আহমদ বাইরে গেলেও ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করে দেশেই ফিরে এসেছেন।

কোন চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রে ও কোন ঔষধের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা নিশ্চিত হয়ে ঐ চিকিৎসক ও ঔষধ প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধতা প্রকাশ করলে যথার্থ হত। রোগী সাংবাদিক হওয়ায় ও পত্রিকার সহযোগিতা থাকায় সে অপমান করল, স্ব-দেশের চিকিৎসকদেরকে। অনেক বড় করতে গিয়ে ভারতীয় চিকিৎসকদেরও একইভাবে অমর্যাদায় প্রশ্নবিদ্ধ করল।

ঔচিত্যবোধ থেকে রোগী/সাংবাদিক/নারী ঝর্ণা এ অভিযোগ উত্থাপন করে নি। এ ধরনের পরশ্রীকাতরতা ও হীনমন্য দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে কোন কিছু বিশ্লেষণ না করাই শ্রেয়।
______________________________


লেখক ডা. বাহারুল আলম । প্রখ্যাত পেশাজীবি নেতা। সুলেখক । সুবক্তা। লোকসেবী চিকিৎসক।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।