RAHANUMA NURAIN AONTY
Published:2026-01-17 19:13:46 BdST
গোপনব্রতধারিণী জয়শ্রী রায় ... রহস্যের আরেক নাম
DESK
___________________
জয়শ্রী রায় : কলকাতার নায়িকা উত্তমা ; পরবর্তীতে ঢাকায় এসে চলচ্চিত্রকর আলমগীর কবিরের সঙ্গে পরিণয়ে হলেন জয়শ্রী কবির। প্রয়াতা হলেন সম্প্রতি। তাকে নিয়ে শোক এপিটাফ লিখেছেন শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় ।
সাতের দশকের ঝড় তোলা নায়িকা জয়শ্রী রায়। নীরবেই পাড়ি দিলেন স্বর্গে। দীর্ঘ অন্তরাল জীবনে তাঁর অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়নি। সুচিত্রা সেন অন্তরাল জীবনে চলে গেলেও তিনি চিরকাল শিরোনামেই ছিলেন। একে তিনি মহানায়িকা, তারওপর তাঁর কন্যা দৌহিত্রিরা চলচ্চিত্র জগতে আলোকিত ছিলেন। কিন্তু সুচিত্রার পর সাতের দশকের বাংলা ছবির একাধিক অভিনেত্রীরাও অন্তরাল জীবনে চলে গিয়েছিলেন। অথচ তাঁরা ক বার শিরোনামে এসেছেন? মিঠু মুখার্জি, রাজশ্রী বসু, শিবানী বসু, জয়শ্রী রায়ের মতো অভিনেত্রীদের পরবর্তী জীবনের খোঁজ আর পাওয়া যায়নি। শিবানী বসু শুনলাম কয়েক মাস আগে প্রয়াত হয়েছেন। এবার ২০২৬এর ১২ জানুয়ারি লন্ডন শহরে প্রয়াত হলেন ১৯৬৮ সালের 'মিস ক্যালকাটা' জয়শ্রী রায়। জয়শ্রীর মৃত্যুর খবর এই বাংলায় পৌঁছে দিলেন তাঁর প্রাক্তন প্রথম স্বামী।
জয়শ্রী যেন এক সাহসের নাম। কলকাতার হিন্দু ঘরের মেয়ে হয়ে বারবার মিথ ভেঙেছেন তিনি। সমাজ, সংসার মিছে করে জয়শ্রী হেঁটেছেন রোমাঞ্চকর জীবনে। কখনও ঠকেছেন, কখনও জিতেছেন। ধর্ম বদলেছেন, পুরুষ বদলেছেন। তবু হারেননি। গ্ল্যামার আর রহস্যের মিশেল যেন এই অভিনেত্রীর জীবন। জয়শ্রী রায়কে এই প্রজন্ম চিনবে না। কারণ কলকাতা দূরদর্শনে তাঁর শেষ অভিনয় 'তেরো পার্বণ'। তারপর এখানে আর তিনি কাজ করেননি।
১৯৫২ সালের জাতিকা জয়শ্রী ছিলেন প্রকৃত অর্থে ক্লাসিকাল সুন্দরী। ছিলেন সাউথ পয়েন্ট স্কুলের ছাত্রী। কলকাতার এই মেয়ের আসল নাম ছিল জয়শ্রী দাশগুপ্ত। 'মিস ক্যালকাটা' শিরোপা জিতে গ্ল্যামার জগতে চলে আসেন তিনি। আবেদনময় চোখ আর মুখশ্রীতে নজর কাড়তেন তিনি।
শুধু তাই নয়, বিশ্ববন্দিত সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরে 'প্রতিদ্বন্দ্বী' সিনেমার নায়িকা হন জয়শ্রী। সাতের দশকের এই জ্বলন্ত ছবিতে অভিনয় করে জয়শ্রী শিরোনামে চলে আসেন। জয়শ্রীর প্রথম স্বামী ছিলেন প্রবীর রায়। যাঁর সঙ্গে 'আজকের নায়ক' ছবিতে অভিনয় করেছিলেন জয়শ্রী। তবে প্রবীর রায় সেভাবে খ্যাতি পাননি কখনও, পরে পরিচালক প্রযোজক হলেও লাইমলাইট পাননি। অন্যদিকে জয়শ্রী রায়ের উত্তরণ ঘটতে থাকে। উত্তমকুমারের সঙ্গে জয়শ্রীর স্মরণীয় অভিনয় ভারতী চরিত্রে 'সব্যসাচী' ছবিতে। ভারতী চরিত্র দিয়ে জয়শ্রী এপার বাংলার দর্শকদের মনে থাকবেন। সুপ্রিয়া দেবীর চোখ ঝলসানো আবেদনের পাশে জয়শ্রী ছিলেন স্নিগ্ধ সুন্দরী 'সব্যসাচী' ছবিতে। উত্তমকুমারের সঙ্গে 'রোদন ভরা বসন্ত' ও 'অসাধারণ' ছবিতেও কাজ করেছিলেন জয়শ্রী রায়।
ইন্দর সেনের মিউজিক্যাল ছবি 'পিকনিক' এ রঞ্জিত মল্লিকের বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন জয়শ্রী। ক'জন উঠতি বয়সের তরুণ তরুণী পিকনিক করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় আটকে এক রাত বাইরে কাটিয়ে আসে। অবিবাহিতা মেয়েদের রাতে বাইরে থাকা কতটা কলঙ্ক এনে দেয় তা ফুটে উঠেছিল জয়শ্রীর অভিনয়ে। তাঁর সঙ্গে আরতি ভট্টাচার্য ও অর্চনা দুই অভিনেত্রীও ছিলেন। সুধীন দাশগুপ্তর সুরে সব কটি গান হিট।
প্রবীর রায়ের সঙ্গে জয়শ্রীর সংসার বেশিদিন টেকেনি। বাংলাদেশে ছবি করতে গিয়ে পরিচালক আলমগীর কবিরের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে ওঠে জয়শ্রীর। 'সূর্যকন্যা' ছবিতে জয়শ্রীর অভিনয় বাংলাদেশে সাড়া ফেলে দেয়। এই ছবিতে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গান ছিল। আলমগীর কবিরের 'সীমানা পেরিয়ে' ছবিতেও জয়শ্রীর অভিনয় মনে রাখার মতো। বাংলাদেশের পরিচালক আলমগীর কবিরকে বিয়ে করতে নিজের ধর্ম পরিবর্তন করেন জয়শ্রী। ডিভোর্স দেন প্রথম স্বামী প্রবীরকেও। আলমগীর কবিরের একাধিক ছবির নায়িকা ছিলেন তিনি। তাঁদের একটি পুত্রসন্তান লেনিন সৌরভ কবির হয়। যিনি আজ প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু যৌবনে জয়শ্রীকে আলমগীরের সংসারও ছাড়তে হয়েছিল। তখন জয়শ্রী কবির রূপে সাড়া বাংলাদেশে বিখ্যাত তিনি। কিন্তু স্বামীর ঘর ছেড়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ান অভিনেত্রী। এক পুত্রকে নিয়ে কলকাতায় চলে আসেন তিনি। ১৯৮৬ সালে টেলিভিশন চলে আসে বাংলা বিনোদনে। কলকাতা দূরদর্শনে জোছন দস্তিদারের 'তেরো পার্বণ' ধারাবাহিকে জয়শ্রী অভিনয় করেন ইন্দ্রজিৎ দেবের বিপরীতে। জয়শ্রীর মেয়ে হয়েছিলেন ইন্দ্রাণী হালদার। এরপর আর দেখা পাওয়া যায়নি জয়শ্রীর।
অভিনয় জগৎকে বিদায় জানিয়ে এক পুত্রকে নিয়ে লন্ডনে পাকাপাকি চলে যান জয়শ্রী। সেখানে শোনা যায় পড়াশোনার জগতে যুক্ত ছিলেন অভিনেত্রী। লন্ডনেই অন্তরালে প্রচারের আলোর বাইরে বাকি জীবন কাটালেন জয়শ্রী। কলকাতার থেকেও বাংলাদেশের দর্শকের কাছে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন জয়শ্রী কবির। জয়শ্রী রায়ের থেকেও বেশি জনপ্রিয়তা পান জয়শ্রী কবির।
এমন এক সাহসী সুন্দরীর খোঁজ এখনকার মিডিয়া করেনি। তাঁকে বাংলা ছবিতে ফেরাতে চাননি এখনকার পরিচালকরা। জয়শ্রী নিজেও সংযম সীমানা টেনে রেখেছিলেন। তাই তাঁর বিদায়ও হল সবার আড়ালে।
শেষ করেও হয়তো সব শেষ হয় না। তাই লন্ডনে প্রাক্তন স্ত্রীর মৃত্যুর খবর কলকাতার লোকদের কাছে দিলেন তাঁর প্রথম স্বামী। প্রবীরও দ্বিতীয় বিবাহ করেছেন। রয়েছে এক পুত্র। প্রবীরও ক্যান্সার জয় করে সেরে উঠছেন। কিন্তু প্রেম বেঁচে রইল মৃত্যুতে। সেকালের বিচ্ছেদ মিলন হয়ে গেল একালের মৃত্যুতে। প্রেমের বেদনায় প্রেমের মূল্য আছে, জীবন প্রমাণ করে দিল।
আপনার মতামত দিন:
