Desk

Published:
2022-07-07 12:16:18 BdST

একাকী মৃত্যুবরণকারী প্রবীণ ডাক্তারের লাশ উদ্ধারের প্রত্যক্ষদর্শী কর্মকর্তার মর্মস্পর্শী স্টাটাস :কাঁদাচ্ছে হাজারো পাঠককে


"রাত বাড়ছে। হাজার বছরের পুরোনো সেই রাত।" ছবি সৌজন্য মো. বায়েজীদুর রহমান

 

 

ডেস্ক
___________________

মগবাজারের ডাক্তার গলিতে মর্মান্তিক নি:সঙ্গতায় একাকী মৃত্যুবরণকারী প্রবীণ ডাক্তারের লাশ উদ্ধারের প্রত্যক্ষদর্শী কর্মকর্তার মর্মস্পর্শী স্টাটাস হাজারো পাঠককে কাঁদাচ্ছে।
এই কর্মকর্তার নাম
মো. বায়েজীদুর রহমান। তিনি তার জীবনস্পর্শী স্টাটাসে লিখেছেন ,
"মগবাজারের ডাক্তার গলি, এখানেই কোন একটা বাসায় বাস করতেন নামকরা ডাক্তার ড. ইকবাল উদ্দিন আহমেদ। প্রতিবেশীর কাছে ভদ্রলোকের ব্যাপারে যা জানা গেল তাতে এটা পরিষ্কার পেশাগত জীবনে তিনি অত্যন্ত সফল ছিলেন। স্ত্রী-সন্তানের সুখের চিন্তায় তার জীবনের স্বর্ণালী সময়টা তিনি সৌদি আরবে ডাক্তারি পেশায় কাটিয়ে শেষ জীবনে ডাক্তার গলির বাসায় থিতু হন। কিন্ত ততদিনে সন্তান বড় হয়ে গিয়েছে, উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে কানাডায় পাড়ি দিয়েছে। কানাডার গতিময় জীবন অনেক চ্যালেঞ্জের, নিজেকেই নিজে সময় দেওয়া যায় না সেখানে। সন্তানের সুখের জন্য আমাদের ড. ইকবাল উদ্দিন আহমেদের স্ত্রী পাড়ি জমালেন কানাডায়। সারাজীবন একাকী কাটানো ডাক্তার সাহেব জীবন সায়াহ্নে আবারো একা হয়ে গেলেন।

স্ত্রী-সন্তান দেশ ছেড়েছেন তাও প্রায় ১২ দিন হতে চলল। আজ বিকালে ফ্ল্যাটের দারোয়ান ভদ্রলোকের বাসায় নক দেন সার্ভিস চার্জের জন্য। অনেকক্ষণ কলিং বেল দেওয়ার পরেও যখন তিনি দরজা খুলেননি, তখন ফ্ল্যাট মলিক সমিতিকে বিষয়টা জানানো হয়। মালিক সমিতির লোকজন কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে ৯৯৯-এ কল। থানা থেকে টহল পার্টি পাঠানো হয় বিষয়টি দেখার জন্য।

এসে দেখা গেল ৬ তলায় ভদ্রলোকের বাসার সামনে কলাপসিবল গেট তালা মারা। ভাঙ্গা হলো কলাপসিবল গেট। মেইন দরজা খুবই মজবুত এবং ডোর নব গুলিও বেশ ভালো। সাথে আবার ভিতর থেকে ছিটকিনি লাগানো। ভাঙ্গা হলো মেইন দরজাও। ভাঙার সাথে সাথেই একটা পরিচিত উৎকট গন্ধ গা গুলিয়ে দিল। এই আশঙ্কা করেছিলাম মনেমনে। একবক্স মাস্ক কিনে এনে রাখা হয়েছে। সবাই ৩/৪ টা করে মাস্ক পরলাম। গন্ধ কিন্ত একটুও কমলো না। একজন এয়ার ফ্রেশনার মেরেই যাচ্ছে। একজন কনস্টেবলকে পাঠানো হয়েছিল কেরোসিন এবং পলিথিন কেনার জন্য। সে এখনো এসে পৌঁছেনি।

প্রতিবেশী কেউই আর ভিতরে ঢুকল না। উল্টো সবাই দুর্গন্ধ থেকে বাঁচতে যতটা সম্ভব দূরে চলে গেল। মেইন দরজা দিয়ে ঢুকে ড্রইং রুম পার হয়ে ভদ্রলোকের বেডরুম এবং বেডরুমের দরজাও ভিতর থেকে আটকানো। এত সিকিউরিটিও শেষ পর্যন্ত মৃত্যুকে আটকে রাখতে পারল না! যথারীতি আবারো দরজা ভেঙে ভিতরে ঢোকা হল। গন্ধ কি জিনিস এবার বোঝা গেল। বাইরে এসে সবাই মাস্কের ভিতরে টিস্যু পেপার দিলাম তার উপর আবারো ৩/৪ টা করে মাস্ক।
বেডরুমে ঢুকে হাতের ডান পাশেই এটাচড বাথরুম। ভদ্রলোকের অর্ধগলিত মৃতদেহ পড়ে আছে বাথরুমে। সারাদেহ পচে কালো ফোস্কা পড়ে গেছে, মেঝে জুড়ে গলিত তরল ছড়িয়ে পড়েছে। এয়ার ফ্রেশনারের লেবু, কমলা, গোলাপের সুবাস প্রোটিন পচা গন্ধকে অসহ্য করে তুলেছে।

ছবি তুলে বাইরে এসে স্যারদের ছবি পাঠালাম, শর্ট ব্রিফ করলাম। কোথাও কোন প্রতিবেশীকে দেখতে পেলাম না। সবাই হয়তো ব্যস্ত! সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট এসেছে, তারা কাজ করছে। পর্যাপ্ত পরিমাণ কেরোসিন তেল ছিটানো হয়েছে ঘরের ভিতর। কে যেন ভিতরে শব্দ করে বমি করছে।

কে কখন কোথায় কিভাবে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করবে সেটা কেউ নিশ্চিত জানে না। অনিশ্চিত পথের যাত্রায় সবাই যেন তার প্রিয়জনকে পাশে পায় আমরা সেই দোয়া করি। তবুও জীবন অনেক সময় নিষ্ঠুর আচরণ করে। যদি কাউকে এমন নিয়তি বরণ করতে হয় , জেনে রাখবেন আপনার মৃতদেহের কোন অসম্মান হবে না। তখনও নিয়মমাফিক সিআইডি ক্রাইম সিনের কেউ আপনার মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করবে, কাজ শেষে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে মৃতদেহ সতকারের ব্যবস্থা করবে। আমার মত কেউ একজন গন্ধের মধ্যে বসে বসে ফেসবুকে পোস্ট করবে। কেউ না থাকলেও পুলিশ থাকবে।

"রাত বাড়ছে। হাজার বছরের পুরোনো সেই রাত।"-জহির রায়হান

পুনশ্চ: এই লেখার কোন উদ্দেশ্য নাই। গন্ধ থেকে ব্রেনকে অন্যদিকে ব্যস্ত রাখাই একমাত্র উদ্দেশ্য।"

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়