Dr. Aminul Islam

Published:
2021-09-29 08:57:43 BdST

ক্রাইম পেট্রল বাংলাদেশস্বপ্ন-ওষুধের আবিস্কারক মুফতি ইব্রাহীমের বিরুদ্ধে প্রতারণাসহ ২ মামলা ও অন্যান্য অভিযোগ 


 


সংবাদ দাতা
_____________
প্রতারণার অভিযোগে ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে   স্বপ্ন-ওষুধের আবিস্কারক মুফতি ইব্রাহীমের বিরুদ্ধে দুটি মামলা দায়ের হয়েছে। আজ বুধবার সকালে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের মোহাম্মদপুর জোনের সহকারী কমিশনার মুজিব আহম্মদ পাটওয়ারী মিডিয়াকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, গতকাল জেড এম রানা নামে একজন মুফতি কাজী ইব্রাহীমসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ এনে মোহাম্মদপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। এ ছাড়া, পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একটি মামলা দায়ের করেছে। এ বিষয়ে পরে বিস্তারিত জানানো হবে।

গতকাল ভোরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে মুফতি কাজী ইব্রাহীমকে আটক করা হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, সম্প্রতি তার দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্যের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গোয়েন্দাদের একটি দল তাকে আটক করেছে।

বহুল প্রচারিত Bangla Tribune পত্রিকা ও প্রতিবেদক আমানুর রহমান রনি জানান,


যেসব উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন মুফতি ইব্রাহীম

 

হিন্দুস্তানের দালাল, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র’র এজেন্ট, করোনা টিকা নিয়ে অপপ্রচার, জন্মনিয়ন্ত্রণ হারাম, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ডাকাত বলাসহ বিভিন্ন সময় উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় আসেন মুফতি কাজী ইব্রাহীম। তার বিরুদ্ধে চ্যানেল আই’র উপস্থাপক মাওলানা ফারুকী খুনের পরিকল্পনারও অভিযোগ রয়েছে। ওই সময়ে তাকে আসামি করে একটি নালিশি মামলা হয়েছিল।

কয়েক বছর ধরে মুফতি ইব্রাহীম বিতর্কিত এমন সব বক্তব্য দিয়ে মানুষের কাছে পরিচিতি লাভ করেন। ধর্মীয় বক্তা হলেও তার এসব বক্তব্যের ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক কোনও দালিলিক প্রমাণ নেই। তার এসব বক্তব্যে জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।

সবশেষ সোমবার (২৭ সেপ্টেম্বর) রাতে ফেসবুক লাইভে আসেন মুফতি ইব্রাহীম। ২০ মিনিটের লাইভে তিনি বলেন, “আমার বাসার সামনে ডাকাত এসেছে। হিন্দুস্তানের দালাল, র’র এজেন্টরা আমাকে নিয়ে যেতে চায়।”

তার লাইভের পর মঙ্গলবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সকালে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ জানায়, মুফতি ইব্রাহীমকে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার কারণে আটক করা হয়েছে। তার কাছে এসব বক্তব্যের ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। পুলিশ তার সব উসকানিমূলক বক্তব্যের ভিডিও ক্লিপস ও প্রমাণ সংগ্রহ করেছে।

হিন্দুস্তানের দালাল

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (উত্তর) যুগ্ম কমিশনার হারুন অর রশীদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিভিন্ন মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষকে হিন্দুস্তানের দালাল ও র’-এর এজেন্ট বলছেন মুফতি ইব্রাহীম। কারা এই দালাল বা র’-এর এজেন্ট, তাদের পরিচয়সহ বিভিন্ন বিষয় জানতেই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।’

জিজ্ঞাসাবাদে সন্তোষজনক উত্তর দিতে না পারলে তার বিরুদ্ধে মামলাসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

আটকের বিষয়ে হারুন অর রশীদ সাংবাদিকদের বলেন, “করোনা নিয়ে মিথ্যা তথ্য প্রচার করছেন কাজী ইব্রাহীম। সম্প্রতি করোনাভাইরাসের টিকা নিয়ে তার বক্তব্য ভাইরাল হয়। মুফতি ইব্রাহীম ফেসবুক, ইউটিউবসহ তার ওয়াজে উল্টাপাল্টা কথা বলে আসছেন। গতরাতেও ফেসবুক লাইভে তিনি বাংলাদেশের মানুষকে হিন্দুস্তানের দালাল ও র’-এর এজেন্ট বলেছেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে করোনা নিয়ে মিথ্যা তথ্য প্রচার ও ধর্মীয় উসকানিমূলক বক্তব্য প্রচার করেছেন। এসব নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা, বিতর্ক হচ্ছে। তাকে এসব বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।’

করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে তথ্য পাচার হবে

২০২০ সালের ডিসেম্বর এক খুতবায় মুফতি ইব্রাহীম একটি অপপ্রচার চালায়। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, ‘ভ্যাকসিন আবিষ্কারে বিলগেটস ও ইসরায়েলের চক্রান্ত ফাঁস হয়েছে। ভ্যাকসিনের মাধ্যমে শরীরে মাইক্রোচিপ প্রবেশ করানো হবে। এতে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য বেহাত হয়ে যেতে পারে। অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন গ্রহীতা অসুস্থ হয়ে গেছেন, ভারতের ভ্যাকসিন যিনি প্রথম নিয়েছেন তিনিও অসুস্থ। আরেক দেশে ভ্যাকসিন গ্রহীতাকে খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না।’

এছাড়া ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ‘ব্রাজিলে ভ্যাকসিন দেওয়ায় নারীদের দাড়িগোঁফ হচ্ছে, পুরুষের কণ্ঠ নারীতে বদলে যাচ্ছে।’

বেশি সন্তান জন্ম দিয়ে ইউরোপ দখল করতে হবে

গত বছর এক মাহফিলে মুফতি কাজী ইব্রাহিম জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্য দেন। তিনি এ ব্যবস্থাকে সন্তান খুন করার সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি ১১টি সন্তান নিয়েছেন, অন্যদেরও তাকে অনুসরণ করতে বলেন।

ওই বক্তব্যে বেশি সন্তান জন্ম দিয়ে ইউরোপ দখল করে নেওয়ার স্বপ্নের কথাও বলেন তিনি।

শিশুদের টিকা দিলে এইডস হয়

কাজী ইব্রাহিম আরেকটি ওয়াজে বলেছিলেন, টিকা দিলে এইডস হয়, শিশুদের টিকা দেবেন না। একজন তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, গর্ভবতী নারী ও শিশুদের রোগ প্রতিরোধে টিকা দেওয়া জায়েজ কিনা?

তিনি জবাব দেন, ‘আমার ১১টি সন্তানের একজনকেও টিকা দিইনি। আমার সন্দেহ হয়, কী না কী আছে এই টিকার মধ্যে! আফ্রিকান জাতির এইডসের জন্য টিকা দায়ী। কোটি কোটি আফ্রিকান মুসলমানকে এইডসে আক্রান্ত করে দেওয়া হয়েছে এই টিকার মাধ্যমে। মুসলমানের সন্তানদের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা হলো আকিকা (নাম রাখার জন্য পশু উৎসর্গের প্রক্রিয়া)। আকিকা দিলে শিশু থাকবে নিরাপদ। তিনি সহিহ হাদিস থেকে ব্যাখ্যা করেন, আকিকার পশুর প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে আল্লাহ শিশুর নিরাপত্তা দেন।’

চ্যানেল আই’র উপস্থাপক মাওলানা নূরুল ইসলাম ফারুকী হত্যার পরিকল্পনার অভিযোগ

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত নেতা ও চ্যানেল আইর জনপ্রিয় উপস্থাপক মাওলানা নূরুল ইসলাম ফারুকী হত্যার ঘটনায় ৪টি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ৬ জন উপস্থাপককে আসামি করে পিটিশন মামলা দায়ের করা হয়েছিল। ওই মামলায় পিসটিভির উপস্থাপক কাজী ইব্রাহিমের নামও রয়েছে। এই ৬ জনকে হত্যার পরিকল্পনাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে মাওলানা ফারুকীর পরিবারের আর্জিতে। ওই মামলাটি তদন্তাধীন।

বক্তব্য দিয়ে ট্রলের শিকার মুফতি ইব্রাহীম

মুফতি ইব্রাহিম এক বক্তৃতায় করোনাভাইরাসের টিকা আবিষ্কারের গাণিতিক ‘সূত্র’ও দিয়েছিলেন। সেটি হচ্ছে 1.q7+6=13 । তার এমন বক্তব্য নিয়ে সামাজিকমাধ্যমে হাস্যরস হয়েছে। এভাবে কাজী ইব্রাহীম জুমার খুতবায় বিভিন্ন সময় করোনার চিকিৎসা, করোনায় মুসলিমরা আক্রান্ত হবে না, পৃথিবীর সৃষ্টি ও ভৌগোলিক বিভিন্ন বিষয় মতবাদ দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রল হয়েছেন। এমনকি ‘এক প্রবাসীর স্বপ্ন দেখা করোনার সঙ্গে কথোপকথনের’ বর্ণনা করেও তিনি হাস্যরসের পাত্র হন।

তার পুরুষদের টেস্টোস্টেরন উৎপাদন হয় পায়ের গোড়ালি থেকে, রাত ৯টার পর ঘরে লাইট জ্বালানো থাকলে ক্যান্সার হয়, মাটির নিচে আরও ৭টা পৃথিবী আছে, যেখানে হিটলার লুকিয়ে আছে ইত্যাদি বক্তব্য ব্যাপক হাস্যরস সৃষ্টি করে।

অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশ নিয়ে রহস্যজনক এক মতবাদ দিতে গিয়ে তিনি এটিকে ‘এন্টারকটিক’ মহাদেশ বলেও ট্রলের শিকার হন। তার ‘হিটলার মারা যাননি’, ‘শেক্সপিয়ারের প্রকৃত নাম শেখ যুবায়ের’ প্রভৃতি বক্তব্য বিভিন্ন সময় ভাইরাল হয়েছে।

পুলিশের বক্তব্য

পিসটিভির একসময়ের উপস্থাপক মুফতি ইব্রাহীমকে এসব বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন হারুন অর রশীদ। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি বিষয়ে তার কাছে জানতে চাওয়া হবে। উত্তর দিতে না পারলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়