ডেস্ক

Published:
2021-07-17 11:29:26 BdST

গবাদি পশুর চামড়া নিয়ে সাতকাহন


 


ডা.সুরেশ তুলসান
_________________


কোরবানি ঈদ এবং গবাদি পশুর চামড়া ( পর্ব - ২ )
---------------
দ্বিতীয় পর্বেও পশুর চামড়া নিয়েই কথা বলবো।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ছাত্র এবং চিকিৎসক হিসাব জানি কোন প্রাণীদেহের সর্ববৃহৎ অংগ হলো তার শরীরের বাহ্যিক আচ্ছাদন বা চামড়া।
অথচ সেই চামড়ার মুল্য কিনা শরীরের মুল্যের ৩০০÷৯০,০০০×১০০= ০°৩৩ টাকা, অর্থাৎ ০°৩৩%।
( আগের পর্বে লিখেছিলাম আমার পরিচিত একজন ডাক্তার সাহেব তার ৯০,০০০ টাকায় কেনা গরুর চামড়া বিক্রি করেছেন মাত্র ৩০০ টাকায় )

সেই প্রাচীন কালে মানুষ তখনও সভ্যতার ছোয়া পায়নি, কেবলমাত্র আত্মরক্ষা আর আহারের জন্য বন্য পশুপাখি শিকার করা শিখেছিল, সেযুগেও মানুষের কাছে পশুর চামড়ার মুল্য ছিলো অপরিসীম।
চামড়া দিয়ে মানুষ তার পোষাক তাবু ইত্যাদি বানিয়ে লজ্জা নিবারন, শীত নিবারন করার পাশাপাশি আশ্রয়স্থল বানিয়েছে।
তাছাড়া সেই কালে অমসৃণ পথে চলার সময় মানুষ চামড়া দিয়ে পা মুড়ে রাখতো যেন পায়ে আঘাত না লাগে - সেটাও কবিগুরুর জুতা আবিস্কার কবিতা লেখারও লক্ষ লক্ষ বছর আগেই।

আরব বেদুঈনদের কাছে আরেকটা কারণে পশুর চামড়ার কদর ছিলো, সেটা হলো পানি বহনের জন্য।
মরুভূমিতে পানি বহন এবং সংরক্ষণের জন্য তারা পশুর চামড়া দিয়ে তৈরী একধরনের বিশেষ থলি ব্যাবহার করতো তারা। পশুর চামড়ার তৈরী এই পানির থলির ব্যাবহারের কথা ভারতের রাজস্থানের মরুভূমির কিছু উপকথাতেও পাওয়া যায়।

মানুষ যখনই বিভিন্ন সাংকেতিক চিহ্ন বা বর্ণমালার মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করা শিখে তখন তারা চামড়া দিয়ে তৈরী করে পার্চমেন্ট পেপার। এই পার্চমেন্ট পেপার সহজেই নষ্ট হয় না। আজও মুল্যবান দলিল-পত্রাদির জন্য টেকসই কাগজ তৈরিতে চামড়ার ব্যাবহার হয়।

আর বর্তমানে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে তো চামড়ার ব্যবহারের কথা বলে শেষ করা যাবে না।

পশুজাত চামড়ার একটা বিলাসী দিকও আছে। ধনী এবং বিলাসী শ্রেণির মানুষেরা লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে দুর্লভ আর বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীর চামড়াজাত কোন একটা পন্য কেনার জন্য অথবা আস্ত একটা হরিণ বা বাঘের চামড়া ড্রইংরুমে ঝুলিয়ে রাখে অহমিকা আর আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে।

অথচ এবার কোরবানির চামড়া এতটাই মূল্যহীন আর ফেলনা হয়ে গেছে যে, কেনার লোক নাই, মাদ্রাসা বা এতিমখানা ফোন করলে চামড়া সংগ্রহ করতে আসার প্রতি আগ্রহ কম এই ভয়ে যদি গাড়ি ভাড়ার টাকাও না উঠে। ( ঈদের দিন এমনিতেই রিক্সা বা গাড়ি ভাড়া বেশি থাকে )।
মানুষ প্রকৃত মুল্য না পাওয়ায় মনের দুঃখে চামড়া মাটিতে পুঁতে দিয়েছে আর স্যোশাল মিডিয়া পোস্ট দিয়ে অন্যদেরও পুঁতে ফেলতে উৎসাহ দিয়েছে।
চট্টগ্রামে তো দেখলাম সাধারণ মানুষ আর মৌসুমি ব্যাবসায়ীরা হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ পিস চামড়া রাস্তায় ফেলে গেছেন, বিক্রি করতে না পেরে।
পরে সিটি করপোরেশনের গাড়ি এসে কোরবানির অন্যান্য বর্জের সাথে সেই পঁচে যাওয়া সেই চামড়াগুলোকেও ভাগাড়ে ফেলে আসে।
এক্ষেত্রে মৌলভীবাজারের মাদ্রাসা ছাত্ররা আবার এক ধাপ এগিয়ে, তারা চামড়া বিক্রি করতে না পেরে শত শত চামড়া মনু নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে সেই ভিডিও সযতনে সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করেছে।

সভ্যতার শুরু থেকে আজ অবধি যে পশুজাত চামড়া এতোটা গুরুত্বপূর্ণ, সে চামড়া চোখের নিমিষেই কিভাবে, কাদের কারসাজিতে, কাদের স্বার্থে এতটা ফেলনা আর মূল্যহীন হয়ে গেলো ভাবনার বিষয়।

এইবার একটা গল্প বলি, একগ্রামে ছিলো অনেক গোয়ালা পরিবার । তাদের প্রায় সকালের বাড়িতেই গরু লালন-পালন করে আর প্রচুর দুধ উৎপাদন করে।
সেই গ্রাম আছে প্রায় গোটা দশেক ময়রা ( যারা মিষ্টি তৈরী করে )।
সেই গ্রামে অদ্ভুত একটা নিয়ম আছে। নিয়মটা হলো গ্রামের গোয়ালার তাদের সব দুধ শুধুমাত্র গ্রামের সেই দশটা ময়রা ছাড়া আর কাউকে বেচতে পারবে না। এমনকি পাশের কোন গ্রাম বা দূরে কোথাও না।
আর ময়রারা গোয়ালাদের কাছ থেকে সেই দুধ কি দামে কিনবে, কবে কিনবে বা কোনদিন কিনবে না তা ময়রারা নিজেরাই ঠিক করবে।
আবার ময়রাদের কাছে দুধ বেচতে হবে বাঁকিতে,
দুধের দাম ময়রারা কবে দিবেন, কিভাবে দিবেন সেটাও ময়রাদের খেয়াল-খুশি আর মর্জিমাফিক।
আর ময়রারা সেই দুধ দিয়ে বানানো মিষ্টি, অন্যান্য দুগ্ধজাত পন্য বা দুধ গ্রামের অন্যান্য বাসিন্দাদের বা পাশের গ্রামে বা দূরে কোথাও কি দামে বেচবে, কিভাবে বেচবে, বা কত লাভ করবে তা জানার অধিকার গোয়ালাদের নাই।
তাই গোয়ালাদের সুদিন আর আসেই না।

ডা সুরেশ তুলসান।
কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ।

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়