SAHA ANTAR

Published:
2021-05-04 08:17:24 BdST

মা'য়ের শ্বাসকষ্ট, আইসিইউ, ১২দিনের লড়াই, ফেরা, আদ্যোপান্ত জানালেন কবি শ্রীজাত


 

শ্রীজাত বন্দোপাধ্যায়
বাংলা কবিতার সমকালীন সেরা কন্ঠ
______________________
মা’কে নার্সিং হোম থেকে বাড়িতে নিয়ে এসেছি আজ ঠিক ১২ দিন হলো। এ-কথা হয়তো এখানে জানানোর নয়, তাছাড়া ব্যক্তিগত সংকটের দিনলিপির জায়গাও এটা নয় বলেই আমি মনে করি। তবু, আজ এতদিন পর যে লিখছি এ-কথা, তার কারণ আছে বলেই।
এক সকালে হঠাৎই মা’র শ্বাসকষ্ট এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে ভর্তি করানো ছাড়া উপায় ছিল না। বাড়িতে অক্সিজেন দিয়েও যখন কিছুতেই সামাল দেওয়া যাচ্ছে না, তখন হন্যে হয়ে চেনাশোনা হাসপাতাল আর নার্সিং হোমের সমস্ত নম্বর ডায়াল করেও একটি বেডও জুটল না। এবং মা’র অবস্থার যখন দ্রুত অবনতি ঘটছে, তখন একটি বেড পাওয়া গেল, উড স্ট্রিটের লাইফলাইন নার্সিং হোমে। সে-খোঁজ পাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না, যদি-না বাপ্পাদা (ডাক্তার সব্যসাচী সেন) নিজে উদ্যোগ নিয়ে সে-হদিশ দিত এবং ভর্তির ব্যবস্থা করত। এর আগেও এমন আপৎকালীন পরিস্থিতিতে বাপ্পাদা’র দৌলতে বেঁচে গেছি আমরা কেউ না কেউ, এবারও গেলাম।
আইসিইউ-তে ভর্তি করতে হলো মা’কে এবং দিনখানেকের মধ্যে বোঝা গেল, ফুসফুসে সংক্রমণ হয়েছে ভালরকম, যাকে ডাক্তারি ভাষায় নিউমোনিয়া বলা চলে। সেইসঙ্গে আরও কাবু করে ফেলেছে রক্তাল্পতা ও হৃদযন্ত্রের কিছু অনিয়ম। কোভিড টেস্ট নেগেটিভ এসেছে ততক্ষণে। বাপ্পাদা-ই অক্লান্তভাবে মা’র চিকিৎসা করে তাঁকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনার মতো অবস্থায় পৌঁছে দিয়েছে। এনেওছি। কিন্তু এই বয়সে এতখানি অসুস্থতা ও ওষুধের ধকল সামলে মা এখনও পুরোপুরি সুস্থ নন। বরং বলা চলে, এখনও লড়াইটা জারি আছে। প্রায় প্রত্যেক দিন নতুন উপসর্গ দেখা দিচ্ছে শরীরে এবং তার সঙ্গে মোকাবিলা করতে ওষুধ বদলাতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। একটা দিনও পুরোপুরি স্বস্তিতে কাটছে না তাই। মা’র মন ভেঙে গেছে স্বাভাবিকভাবেই, শরীরও হাল ছেড়ে দিতে চাইছে একেক সময়ে। আমরা ধরে আছি সেই হাল, দু’দিক থেকে, যাতে আবার সুস্থ, স্বাভাবিক ছন্দের জীবনে ফিরে আসতে পারেন মা। যদিও মনে হচ্ছে, তা খুব সহজে ও দ্রুত হবার নয়।
রোজকার অবিচ্ছেদ্য যোগাযোগের বন্ধুবান্ধব ও পরিজন ছাড়া এ-খবর কাউকেই জানানো হয়নি। প্রত্যেকের বাড়িতেই যা পরিস্থিতি, তাতে আমাদের বিপন্নতার কথা জানান দিয়ে আরও উদ্বিগ্ন করে তুলতে চাইনি কাউকে। আজ বিপদ অনেকটা কেটেছে বলেই এখানে লিখতে আসা। লেখা অবশ্য দুটো কারণে, এক, মার্জনা চাওয়া, দুই, ঋণ স্বীকার।
মা’র ভর্তি হওয়া থেকে আজ পর্যন্ত এই যে ২২ দিনের একটা পর্যায়, এই পর্যায়ে এক ঝটকায় দেশের ও রাজ্যের কোভিড পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এ নিয়ে নতুন করে বলার কিছুই নেই, এখন এ-দেশের প্রত্যেক নাগরিক দুঃস্বপ্নের মধ্যে দিয়ে সময় পেরোচ্ছেন। ২২ দিন আগেও যাঁদের জীবিত বলে জেনেছি, তাঁদের অনেকেই আজ আর নেই। মড়কের এমন উগ্র রূপ এর আগে আর আসেনি। সেইসঙ্গে হাসপাতালে বেডের আকাল, অক্সিজেন ও ওষুধের জন্যে হাহাকার তো আছেই। অ্যাম্বুলেন্সের হুটারের শব্দ থামতে চাইছে না রাস্তায়, নিভতে চাইছে না চিতা, কবর খোঁড়ায় বিরাম পড়ছে না।
এ-সময়ে সমস্ত শক্তি ও শুভাকাঙ্ক্ষা উজাড় করে প্রচুর মানুষ লড়ছেন। অনেকে পথে নেমে অক্সিজেন সিলিন্ডার জোগাড় করে পৌঁছে দিচ্ছেন, অনেকে কোভিড রোগীদের জন্যে খাবার প্রস্তুত করে বিলি করছেন। পথে না নামলেও, অনেকে বাড়ি থেকেই যোদ্ধার কাজ করছেন। সোশ্যাল মিডিয়ার দেয়াল ভরে উঠছে তাঁদের শেয়ার করা তথ্যে। অক্লান্তভাবে এইসব তথ্য, আর্জি, হদিশ ভাগ করে চলেছেন আমারই কত বন্ধু ও পরিচিত। সত্যিকারের সংকটে মানুষের শুভবোধ ও লড়াকু সত্তা বোধহয় এভাবেই জেগে ওঠে। এঁদের প্রত্যেককে আমার কুর্নিশ জানাই। শেষমেশ কী হবে জানি না, কিন্তু ডাক্তার বা নার্সদের মতো আজ এঁরাও ফ্রন্টলাইনার হয়ে উঠেছেন। এঁদের নামও ইতিহাস থেকে বাদ পড়বে না।
এই ব্যবস্থা গড়ে ওঠা বড্ড জরুরি ছিল। আর জরুরি ছিল, আমারও, এই ব্যবস্থায় যোগ দেওয়া। আমার প্রোফাইলে অনেক বন্ধুজন আছে, প্রোফাইল ফলো করেন, এমন মানুষের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। আমিও এঁদেরই মতো অক্লান্তভাবে এইসমস্ত তথ্য ও হদিশ ভাগ করে নিতে পারলে হয়তো কারও কাজে লাগত কিছু। বা না লাগলেও এটুকু জানতাম, এই দুর্দিনে আমি আমার কর্তব্য থেকে সরিনি। কিন্তু সেরকমটা করে উঠতে পারিনি। ব্যক্তিগত বিপন্নতা এমনই আকার নিয়েছিল যে, সবকিছু থেকে সরে থাকতে বাধ্য হচ্ছিলাম। এমনকী তাতেও যুঝে উঠতে পারছিলাম না পুরোপুরি। আমার আর দূর্বা’র যে-অকল্পনীয় ধকল গেছে, তাতে নিজেদের জন্যেও কিছু করে উঠতে পারছিলাম না। আমার শরীরও বেশ খারাপ হতে থাকে। এরই মধ্যে চলে গেলেন শঙ্খবাবু, বিদায় নিলেন প্রতিমাদি। পরম শোকের এই অভিঘাত সহ্য করতে করতেই চারপাশ সামলাতে হয়েছে। সময়ের নির্মমতা এক নিপুণ শিল্প, সে কোথাও কোনও খামতি রাখে না। এসব কোনও সাফাইয়ের জন্যে বলা নয়, কেননা হয়তো উচিত ছিল ব্যক্তি-সংকটের বাইরে গিয়ে সমষ্টির বিপন্নতায় হাত বাড়িয়ে দেওয়া, অনেকেই নিশ্চয়ই তেমনটাই করেছেন। আমি নিজে পারিনি যে, তা আমারই ব্যর্থতা। সে-জন্য আমি মার্জনাপ্রার্থী। কিন্তু আপনারা যে এভাবে পেরেছেন এবং পারছেন, তার জন্য গর্বিত হবার অধিকার থেকে যেন বঞ্চিত না হই, এটুকুই চাওয়া।
ঋণ এমন এক বিষয়, যা স্বীকার করলেও শোধ করা যায় না। অন্তত এসব ক্ষেত্রে তো নয়ই। কিন্তু স্বীকার না করলে অপরাধী হয়ে থাকতে হয়, নিজের কাছেই। তাই এই বেলা সেটা করে নিই। কাল আমিও যে কেমন অবস্থায় থাকব, কে-ই বা বলতে পারে। বাপ্পাদা’র কথা আগেও বললাম, আবারও বলি। এবং যত বলব, কম বলা হবে। যে-অপরিসীম যত্ন নিয়ে মা’র চিকিৎসা করেছে বাপ্পাদা, তা তুলনারহিত। দিনে সতেরোবার ফোন করলেও বিরক্ত হয়নি, বরং ধৈর্য ধরে সবটা বুঝিয়ে বলেছে আমাদের। ডাক্তারের সফেদ পোশাক গায়ে দিনে এক কি দু’বার বাপ্পাদা এসে দাঁড়ানোয় মা যে-ভরসা পেয়েছেন, তার বড়ই প্রয়োজন ছিল। এখনও মা’র অবস্থা টালমাটাল। ধকলটা সহ্য করে উঠে সামাল দিতে পারছেন না এখনও। প্রতিদিন বেশ কয়েকবার ফোন করে ওষুধ জানতে হচ্ছে। ভোর সাড়ে ছ’টা হোক বা রাত একটা, বাপ্পাদা’র কণ্ঠে অসহিষ্ণুতা বা বিরক্তির প্রশ্নই নেই। বরং ওই ফোন তুলে, ‘হ্যাঁ রে, বল’-টুকু শুনলে আমিও বল পাই। কপাল করে এমন একজন বন্ধু, অগ্রজ, ত্রাতা পেয়েছি। বাপ্পাদাকে অনেক ভালবাসা।
রেহমান অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবার কাছে ঋণ থাকল, তাঁরা না হলে এই যানজটের শহরে মা’কে অত দ্রুত পৌঁছে দেওয়া বা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতো না। বিপন্নতার সময় বারবার ওষুধ ও অক্সিজেন এনে দিয়েছেন আমাদের রাতবিরেতের গাড়িচালক সুখদেবদা, তাঁকে ধন্যবাদ। আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের দ্বাররক্ষী নিমাইদা এনেছিলেন তাঁর পরিচিত আরও তিনজনকে, যাঁদের সাহায্যে মা’কে চারতলার দরজা পর্যন্ত তুলে নিয়ে আসা হয়, তাঁদের ধন্যবাদ।
যে-সমস্ত বন্ধু ও পরিজন প্রতিনিয়ত ফোন করে খোঁজ নিয়েছেন, আশ্বাস ও সাহস জুগিয়েছেন, পাশে এসে দাঁড়ানোর কথা বলেছেন, তাঁদের সকলের ঋণ অপরিশোধ্য। চাইলেই যে ডেকে পাওয়া যাবে তাঁদের, বিপদের দিনে এই জোরের দাম অনেকখানি। তাঁদের সকলকে ভালবাসা জানাই।
ঋণ থেকে গেল লাইফলাইন নার্সিং হোমের সমস্ত চিকিৎসাকর্মী ও অন্যান্য কর্মীদের কাছে, যারা প্রতিটি বিষয়ে এক কথায় আমাদের সহযোগিতা করেছেন। একজন পারদর্শী নার্স সেই নার্সিং হোম থেকেই মা’র দেখভাল করছেন, আপাতত মা’র সঙ্গে বাড়িতেও আছেন। তাঁর নাম ঝুম্পা, তাঁকেও ধন্যবাদ। বিশেষ করে উল্লেখ করব লাইফলাইনের সর্বময় কর্ত্রী বা সিইও সুজাতা মুখোপাধ্যায়ের কথা, যাঁর উষ্ণ আপ্যায়ণ আমাদের ভার লাঘব করেছে প্রতিদিন আর যাঁর তৎপরতা ছাড়া আমরা দিশাহীন বোধ করতাম। তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্বই হয়ে গেছে একরকম। তাঁকে আমাদের অশেষ কৃতজ্ঞতা। তিনি না থাকলে সবকিছু এতটা মসৃণভাবে হতো কিনা জানি না।
অনেক সময়ে আমরা মনে করি, পাশের মানুষটার কাছ থেকে যা যা পাচ্ছি, তার জন্য ঋণী না থাকলেও চলে, তার অবদানের কথা উল্লেখ না করলেও চলে, কেননা সে তো আমার প্রাপ্যই। কিন্তু আমি তেমন ভাবনার আড়ালে দূর্বা’র লড়াইকে অনুল্লিখিত রাখতে পারব না, চাইও না তা। আগের আরও অজস্র বিপন্নতার মতোই, এতগুলো দিনের টানা এই সংকটে দূর্বা না থাকলে আমি তলিয়ে যেতাম। এই কথাটাই সত্যি। দিশা পেতাম না, নোঙরও পেতাম না। ভেসে যেতাম বিপদের তোড়ে। প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে, প্রত্যেক পদক্ষেপে যেভাবে পায়ে পা মিলিয়ে হেঁটেছে দূর্বা, যেভাবে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে সকাল থেকে রাত, বাড়ি থেকে হাসপাতাল পর্যন্ত যেভাবে লড়ে গেছে, তার কোনও তুলনা নেই। অবশ্য এটাই ওর বরাবরের স্বভাব। আর আমার সৌভাগ্য। সঙ্গী অনেকেই পায়, সহযোদ্ধা পাওয়া বড় কঠিন। আমি একই মানুষের মধ্যে এই দুজনকে পেয়ে গেছি, সে আমার প্রাপ্তি। দূর্বা’র কাছে আরও একবার অনেকখানি ঋণ জমল আমার। ওকে আদর, ভালবাসা, শ্রদ্ধা, সবটুকু।
আমাদের এই বাড়িতেই একটি অ্যাপার্টমেন্টে বাস করেন দূর্বা’র মা ও বাবা, আমার শাশুড়িমা ও শ্বশুরমশায়, চৈতালি এবং অবনী বন্দ্যোপাধ্যায়। আরেকটিতে থাকেন ওর মাসি ও মেসোমশাই, বৈতালী গঙ্গোপাধ্যায় এবং শুভাশিস মিত্র। এইসব ঝোড়ো বেখেয়াল দিনে-রাতে তাঁদের সুপরামর্শ ও সবরকম সাংসারিক সহায়তা না-পেলে কী যে হতো, ভাবতেও পারি না। তাঁদের আমার প্রণাম।
সবশেষে বলি দু’জনের কথা, যাঁদের একজনকে আমি দু’দশকেরও বেশি সময় ধরে চিনি, আরেকজনকে দু’ঘণ্টার কিছু কম। দিনদুয়েক যেতেই নার্সিং হোম থেকে রক্তের চাহিদা জানানো হলো। এক ইউনিটের ব্যবস্থা ওঁরাই করছেন, আরেক ইউনিট আমাদের জোগাড় করে দিতে হবে। মধ্য কলকাতার এক ব্লাড ব্যাঙ্কে যোগাযোগ করে জানা গেল, রক্ত তাঁরা প্রস্তুত করে দিতে পারবেন (এবি পজিটিভ ঘনীভূত লোহিতকণিকা প্রয়োজন ছিল), কিন্তু টাকা দিয়ে তা কেনা যাবে না। রক্তের জোগানে ভাঁটা, তাই বদলে কাউকে এক ইউনিট রক্ত দিতে হবে, সে যে-গ্রুপেরই হোক না কেন। তবেই রক্ত মিলবে। প্রথমেই হাত তুলল দূর্বা। কিন্তু জানা গেল, ছ’মাসের মধ্যে কোভিড হয়েছে, এমন কারও রক্ত নেবে কিনা, এ নিয়ে খোদ ব্লাড ব্যাঙ্কেরই দ্বিধা আছে। তারপর রইলাম আমি। এবারও জানা গেল, আমি এমন কিছু ওষুধ খাই, যার কারণে আমার রক্ত চিরতরে তার গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে।
অসহায় হয়ে ফোন করলাম মলয়কে, আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু, সুখের সময়ে যার মুখ না দেখলেও, বিপদের সময়ে যার হাত কাঁধে এসে পড়েছে চিরকাল। ওর মতো নিঃস্বার্থ উপকারী মানুষ এ-যুগে প্রায় অলীক ও অচল বলা চলে। মলয় আধ ঘণ্টার মধ্যেই জানালো, আমরা যেন রক্তের নমুনা নিয়ে ব্লাড ব্যাঙ্কে পৌঁছে যাই, ও পরিচিত এক যুবককে নিয়ে আসছে, তিনি দেবেন রক্ত। আমরা পৌঁছলাম, মলয়ও এল তাঁকে নিয়ে। ছোটখাটো চেহারার এক যুবক, খানিক লাজুক, খানিক উদাস। দেখলে বোঝা যায়, জীবনের সংগ্রাম এখনও পিছু ছাড়েনি, দিন এনে দিন খেতে হয় তাঁকে। তবু, এক ডাকে রক্ত দিতে চলে এসেছেন। নাম, আব্বাস আলি। বয়স, ৩২। দেড় ঘণ্টার মধ্যে আব্বাসের রক্তের বিনিময়ে আমাদের হাতে উঠে এল বরফে শোয়ানো রক্তের প্যাকেট, যা মা'কে দিতে হবে সন্ধের মধ্যে।
অন্য সময় হলে এতখানি রক্ত দেওয়ার পর আব্বাসকে কোথাও নিয়ে গিয়ে খাওয়ানো যেত, কিন্তু তখন আমাদের দাঁড়ানোরও সময় নেই। আব্বাসকে কৃতজ্ঞতা জানাতে, আরও একবার লাজুক ও নীরব হাসলেন। এই দুর্দিনে, এই বিপন্নতায় একজন অপরিচিত সহনাগরিকের জন্য তিনি যা করলেন, তার কোনও মূল্য হয় না। আব্বাসের রক্তের বিনিময়ে আমার মা’র দেহে ফিরে এল সজীবতা। কী দিই ওকে? সাধ্যমতো কিছু টাকা এগিয়ে দিতেই হাতজোড় করে বললেন, ‘পারব না স্যার। রক্ত দিয়ে টাকা নিতে পারব না’। আমারই মুখ লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। এই পণ্যসভ্যতার গনগনে এক দুপুরবেলায় টাকার ঔদ্ধত্য দিয়ে রক্ত কিনতে চাইলাম, এমনটাই কি মনে করলেন তিনি? তা যে নয়, বোঝালাম আব্বাসকে। বললাম, আমাদের উচিত ছিল এখন আপনাকে পেট পুরে খাওয়ানো, কিন্তু সময় নেই, আপনি কিছু খেলে আমরা খুশি হবো। তাতেও নাছোড় আব্বাস, রক্তের বিনিময়ে টাকা নেওয়া তাঁর ইমান নয়। আর আমার মন ভরে উঠল এই আশ্বাসে যে, আজও আমার শহরে, আমার রাজ্যে এমন মানুষ আছেন, যাঁর রক্ত টাকায় কেনা যায় না। অথচ টাকা যাঁর প্রয়োজন খুব।
‘টানাটানির সংসার, বউ আর এক বছরের পুঁচকে মেয়েকে নিয়ে কোনও রকমে চালাচ্ছে’, আব্বাস যখন রক্ত দিচ্ছেন, তখন বাইরে দাঁড়িয়ে আমাকে বলছিল মলয়। ওর অনেকদিনের চেনা আব্বাস, ওর কথা ফেলতে পারে না। আমি অগত্যা মলয়ের পকেটেই আমাদের সাধ্যটুকু পুরে দিয়ে আব্বাসকে বললাম, ‘রক্তের জন্যে দিচ্ছি না, মেয়ের জন্যে দিচ্ছি, রক্তের দাম যে দেওয়া যায় না, সে তো জানি। মেয়েকে কিছু একটা কিনে দিলে আমরা খুশি হবো’। সামনেই ঈদ। আজ মলয় জানালো, আমাদের সাধ্যটুকু খরচ করে ছোট্ট মেয়ের জন্যে ঈদের জামা কিনে দিয়েছেন আব্বাস। তাকে অনেক আদর জানাই। সে যেন বড় হয়ে বাবা’র মতো মানুষ হয়।
ভাল থাকুক আমার দিনকাল, বেঁচে থাকুক আমার শহর। রক্তের ঋণে বেঁধে রাখুক একে অপরকে। যেমন আব্বাস বাঁধলেন, আমাদের। এই ছবিতে দূর্বা, মলয় আর আমার সঙ্গে দাঁড়ানো মানুষটিই আব্বাস। নাগরিক ভিড়ে অচেনা মুখ হয়ে ঘুরে বেড়ানো একজন আদ্যন্ত মানুষ, টাকা যাঁকে কিনতে পারেনি, ভালবাসা পেরেছে।
ভাল থাকবেন সকলে। সামনে আরও যুদ্ধ। সামলে থাকবেন।

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়