রাজিক হাসান

Published:
2021-03-31 10:44:31 BdST

লোকধর্ম থেকে ধর্মযাজক-পুরোহিত-মোল্লার রাজধর্ম


 

রাজিক হাসান 

লন্ডন থেকে 

---------------------------

আদিতে সব ধর্মই ছিল লৌকিক ধর্ম। লোকসাধারণের আশা-আকাঙ্ক্ষা-স্বপ্নকে ধারণ করে তাদের মধ্যেই ধর্মের উদ্ভব এবং বিস্তার। কিন্তু পরে প্রায় সব ধর্মই সাধারণের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, সমাজের অধিপতি শ্রেণী ধর্মকে নিজেদের স্বার্থ সাধনে নিয়োজিত করে, তৈরী হয় বিধিবদ্ধ শাস্ত্রীয় ধর্ম। কখনো বা সরাসরি বল প্রয়োগে এবং কখনো বা ছল কৌশলের আশ্রয়ে লোক সাধারণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় সেই শাস্ত্রীয় ধর্ম, যাজক-পুরোহিত-মোল্লার দল নিয়োজিত হয় সে ধর্মের খবরদারির দায়িত্বে। পৃথিবীর সব ধর্মের ইতিহাস পরিক্রমাতেই এ সত্যের সন্ধান মেলে।

এবার ইতিহাসের পাতা থেকে বলছি।

সময়কাল চতুর্থ শতাব্দি। রোমান সাম্রাজ্য ভেঙে চার টুকরা, পুরো সাম্রাজ্যের বেহাল অবস্থা, ভেঙে পড়েছে কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা। পার্সিয়ান ও গোথ এর আক্রমণে শক্তিশালি রোম ক্রমেই দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে উঠছে। সিজার বা ডেমিগডের যুগ শেষ। প্যাগান টেম্পল নানাধারায় বিভক্ত। তাদের মধ্যে চলছিল নানা ক্ষমতার দ্বন্দ্ব।

কন্সট্যান্টাইন দ্য গ্রেট, সাধারণ এক সৈন্য থেকে দ্রুত সেনাপতি বনে যান তাঁর ব্যক্তিগত ক্যারিশমায়। সাম্রাজ্যের চারখণ্ডকে জুড়ে একখণ্ড করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। সুযোগ বুঝে কন্সট্যান্টাইন ভর করলেন খ্রিস্ট ধর্মের উপর। “ওয়ান গড ওয়ান ইম্পেরর ওয়ান টেম্পল” - স্লোগানটি সৈনিকদের মধ্যে হয়ে ওঠে তুমুল জনপ্রিয়। প্যাগানদের সাথে একাধিক যুদ্ধ হয় খ্রিস্টান সৈন্যদের। বলা হয় “ওয়ান গড ওয়ান ইম্পেরর ওয়ান টেম্পল” শ্লোগানটির কারণে যুদ্ধে কন্সট্যান্টাইন হয়ে ওঠেন অপ্রতিরোধ্য। প্রত্যেকটি যুদ্ধ জয় করেন কন্সট্যান্টাইন। এক করেন সাম্রাজ্যের চার টুকরো কে। চালু করেন কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা। ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে ওঠে রোমান সাম্রাজ্য। টিকে যায় কয়েক শত বছর।

কন্সট্যান্টাইন দ্য গ্রেট এর হাত ধরে ক্রিস্টিনিয়াটি প্রবেশ করে পশ্চিমা দুনিয়াতে। চিরতরে বদলে যায় পশ্চিমা দুনিয়ার ভাগ্য। ছয়শত বছর পর একাদশ শতাব্দীতে ভাঙ্গনের হাত থেকে টিকে রাখার কারণে রোমান সাম্রাজ্যকে ঘোষণা করা হয় “হোলি রোমানসাম্রাজ্য”। সারা ইউরোপ তখন ডিউকডোম, ব্যারনডোম, নগররাস্ট্র ইত্যাদিতে বিভক্ত। ক্যাথলিক-চার্চ ততদিনে ধর্মীয় সংগঠন থেকে বিবর্তিত হয়ে পুরোদস্তুর ধর্ম-রাজনৈতিক সংগঠন। ক্যাথলিক চার্চ এর হাতে তখন নিরঙ্কুশ ক্ষমতা। তারাই নিযুক্ত করে সব রাজ্যের রাজা বা অধিকর্তা।

ধর্মই তখন ইউরোপের জীবনযাত্রার সবচে গুরুত্বপূর্ণ অনুষংগ। ক্যাথলিক-চার্চ তার একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রাখে ধর্মীয় দিকগুলোতে তার আধিপত্য দিয়ে। সকল নাগরিকের জীবনের সমস্ত দিকের দিক-নির্দেশনা দেয় বাইবেল গ্রন্থটি। যদিও সেই বাইবেল পড়া তো দূরের কথা, চোখেও দেখেনি সাধারণ প্রজা। ক্যাথলিক চার্চ যেভাবে বলছে বাইবেলে যা লেখা আছে, সেটাই মেনে নিতে বাধ্য তারা।

খ্রিস্টধর্মের সূচনাকারী যিশু এবং তাঁর শিষ্যরা সবাই ছিলেন ভবঘুরে, নিগৃহীত ও নির্যাতীত। তার তিনশত বছর পরে রোমান সম্রাট কনস্টানটিন দ্য গ্রেট সাম্রাজ্যের প্রয়োজনে খ্রিস্টধর্মকে দাপ্তরিকভাবে প্রতিষ্ঠা করে। তখন আর খ্রিস্টধর্ম ভবঘুরে নিগৃহীতদের ধর্ম নয়, তখন তা রাজ ধর্ম। তারপর মোল্লা পুরুতের কারিশমায় ডালপালা মেলে সেই ক্যাথলিক চার্চ নিজেই হয়ে উঠে শোষণ, নির্যাতন ও নিপীড়ণের মূল কেন্দ্র। ক্যাথলিক চার্চ বৈধ অবৈধ নানানভাবে আয় রোজগার করেও তার রাক্ষুসে ক্ষুধা মিটাতে সক্ষম ছিল না, তখন তারা প্রবর্তন করে ইনডালজেন্স বা পাপপুণ্য কাটাকাটির ব্যবস্থা। অর্থাৎ যে কোন পাপ করার পর চার্চকে ধার্য্যকৃত অর্থ দিলেই সেই পাপ মুছে যাবে।

ধনী ও ক্ষমতাধররা তখন নিজেদের খেয়াল খুশিমতো প্রজাদের উপর নানা নির্যাতন নিপীড়ণ চালিয়ে জীবনযাপন করছিল। যতটুকু বাঁধা ছিল ধর্মের ভয়। সেই ভয়কেও হাস্যকরভাবে অর্থহীন করে ফেললো ইনডালজেন্স। “ইনডালজেন্স” ব্যবসা দিয়ে ক্যাথলিক চার্চ প্রভূত ধনসম্পদের মালিক হল। গচ্ছিত টাকাপয়সা গড’স ব্যাঙ্কে জড়ো হতো। মজার কথা এই গড’স ব্যাঙ্কে লেনদেন যা হয় সবই আনহোলি।

“ডোন্ট ওভারএস্টিমেট দ্য পাওয়ার অব ফরগিভনেস” - বিখ্যাত এই সংলাপটি পাওয়া যায় মারিও পুজোর "দ্য গডফাদার" বইতে। যেখানে মাইকেল কর্লিয়নির কাছে ক্যাথলিক চার্চ দাবি করে ৮০০ মিলিয়ন ডলার। অর্থের বিনিময়ে পোপ স্বয়ং ঈশ্বরের সঙ্গে কথা বলে মাইকেল কর্লিয়নির সব পাপ মোচনের ব্যবস্থা করবেন। আয়কৃত টাকা জমা হয় গড’স ব্যাঙ্কে। গড’স ব্যাঙ্কের নিয়ন্ত্রণকর্তা ভয়ংকর কিছু মাফিয়া সর্দার। সেই কাহিনীটি দেখানো হয়েছে হলিউডের "দ্য গডফাদার" ছবির পার্ট থ্রিতে। সত্য ঘটনার উপর নির্মিত ছবির শেষ দৃশ্যে দেখা যায় লন্ডন ব্রিজের উপর গড’স ব্যাঙ্কের ম্যানেজারের ঝুলন্ত লাশ।

গডস ব্যাঙ্ক বা ভ্যাটিকান ব্যাঙ্ক নগদ লেনদেনে গোপনীয়তার সংস্কৃতির কারণে পরিণত হয় পৃথিবীর সবচে কুখ্যাত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে। এই ভ্যাটিকান ব্যাঙ্কের অর্থই শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে দেয় হোলি ভ্যাটিক্যান সিটি নামক দেশটির।

অন্যদিকে ষোড়শ শতাব্দীতে সৌদি জাতিসত্ত্বার মূল ভিত্তি গড়ে দেয় ওয়াহাবিজম নামক একটি মতবাদ। এই মতবাদের জনক মুহম্মদ ইবন আব্দ আল ওয়াহাব। মুহম্মদ ইবন আব্দ আল ওয়াহাবের “এক নেতা, এক শাসক, এক মসজিদ” মতবাদকে শাসনের তিন স্তম্ভ হিসাবে গ্রহণ করা হয়। অর্থাৎ সৌদি বাদশাহকে প্রাতিষ্ঠানিক ওয়াহাবিজমের সর্বময় কর্তৃত্ব এবং “মসজিদের” মানুষের “বক্তব্য” নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা হয়।

১৭৯০ সালের মধ্যে এই জোট প্রায় পুরো আরব উপদ্বীপ দখল করে কয়েক দফায় মদিনা, সিরিয়া এবং ইরাক আক্রমণ করে। তাদের স্ট্র্যাটেজি ছিলো বিজিত জনগোষ্ঠিকে নিজেদের সামনে আত্মসমর্পণ করানো। তাদের আসল উদ্দেশ্য ছিলো মানুষের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া। ১৮০১ সালে এই জোট ইরাকের পবিত্র শহর কারবালা আক্রমণ করে। তারা নারী ও শিশুসহ হাজার হাজার শিয়া মুসলিম হত্যা করে, ধ্বংস করে শিয়া উপাসনালয়। ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয় নবী মুহম্মদের দৌহিত্র ইমাম হুসেইনের কবর।

সৌদি রাষ্ট্রের প্রথম ইতিহাসবিদ ওসমান ইবন বাশির নাজদি অনুসারে, ১৮০১ সালে ইবন সৌদ কারবালায় গণহত্যা চালিয়েছেন। তিনি গর্বের সাথে এই গনহত্যার দলিল লিখেছেন, “আমরা কারবালা দখল করেছি। হত্যা করেছি এবং দাস হিসাবে নিয়েছি এর মানুষকে, কেননা সকল প্রশংসা আল্লাহর। যিনি সমস্ত পৃথিবীর মালিক; আমরা ক্ষমা চাইবো না, বরং বলবোঃ ‘হে অবিশ্বাসীগণঃ তোমাদের জন্যও অপেক্ষা করছে একই শাস্তি!’”

১৮০৩ তে এক গুপ্তঘাতক কারবালার গণহত্যার প্রতিশোধ নিতে বাদশাহ আব্দ আল আজিজকে হত্যা করে। তার ছেলে, সৌদ বিন আব্দ আল আজিজ বাদশাহ পদবী নেন এবং সেই সাথে আরব বিজয়ের সংকল্প করেন।

অটোমান সুলতান অবশ্য নিরুপায় বসে থেকে তাদের সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে যাওয়া দেখতে পারছিল না।

১৮১২ সালে মিশরিয়দের নিয়ে তৈরি করা অটোমান সেনাবাহিনী এই জোটকে মদিনা, জেদ্দা এবং মক্কা থেকে উৎখাত করতে সক্ষম হয়।
১৮১৪ সালে সৌদ বিন আব্দ আল আজিজ জ্বরে ভুগে মারা যান। তার ছেলে, আব্দুল্লাহ বিন সৌদ অটোমানদের হাতে ধরা পড়ে। তাকে ইস্তানবুলে নিয়ে গিয়ে বিভৎসভাবে হত্যা করা হয়। তার বিচ্ছিন্ন মাথা কামানের ভেতর ঢুকিয়ে আকাশে ছুঁড়ে মারা মারা হয়, তার শরীর থেকে হৃদপিন্ড বের করে এনে বাকি শরীরকে শূলে চড়ানো হয়।

১৮১৫ সালের এক যুদ্ধে অটোমানরা ওয়াহাবি শক্তিকে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করে। ১৮১৮ সালে অটোমানরা ওয়াহাবি রাজধানী দারিয়াহ ধ্বংস করে দেয়। প্রথম সৌদি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব তখন বিলুপ্ত হয়। বেঁচে যাওয়া ওয়াহাবিরা মরুভূমিতে পালিয়ে গিয়ে নতুন দল তৈরির চেষ্টা করে। তারা নিস্ক্রিয় এবং চুপচাপ হয়ে বেঁচে থাকে ১৯শ’ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত।

১৮শ’ শতকের ওয়াহাবিজমের তত্ত্ব না’জদের মরুভূমিতে শুকিয়ে হারিয়ে যায় না, বরং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিশৃংখলায় অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের সাথে সাথে তা আবার স্বগৌরবে জীবনে ফিরে আসে।

আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ ১৯৩২ সালে সৌদি আরব সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। দেশটি পুরোপুরি রাজতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়।

মানব সভ্যতার ইতিহাস আসলে ক্ষমতা, লোভ, ধনসম্পদ আর ধর্মতন্ত্র হাত ধরাধরি করে চলার ইতিহাস। ক্ষমতার জন্য যুগে যুগে ধর্মকে ব্যবহার করা হয়েছে , আজও হচ্ছে।

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়