SAHA ANTAR

Published:
2021-02-15 12:06:10 BdST

নীতু, তোমাকে ভালোবাসি


 

ডা মো. বেলায়েত হোসেন 

 

নীতু;তোমাকে ভালোবাসি
----------------------------------

১.

নীতুর গলায় যখন আমার আঙুলগুলো শক্ত হয়ে বসে যাচ্ছিলো,ও কোন বাধাই দেয়নি।ওর ফরসা গলায় আমার দশ আঙুলের ছাপ পড়ে যাচ্ছিলো খুব দ্রুত,ওর অসম্ভব সুন্দর মায়াবী মুখখানি তে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠছিল।ওর কালো গভীর চোখ জোড়া;যার গভীরতায় আমি রোজ ডুবে যেতাম,সেখানে মায়ার পরিবর্তে জায়গা করে নিচ্ছিলো বিস্ময় আর প্রশ্ন।

"কেন আবির,কেন?কেন তুমি আমার সাথে এমন করছো?"

এটাই কি জানতে চাচ্ছে তোমার চোখ,নীতু?

২.

অথচ আমাদের দিনটা শুরু হয়েছে খুব চমৎকার ভাবে।আজ ফেব্রুয়ারীর ১৪,দ্যা সো কল্ড ভ্যালেন্টাইন্স ডে।ভ্যালেন্টাইন মাই ফুট।গালি চলে আসছিলো ভেতর থেকে আমার।এই ভ্যালেন্টাইনের ঝামেলাটা না হলে হয়তো সবকিছু আরো অনেক অন্যরকম হতো।রাতের আকাশের অগনিত তারার ক্ষীণ আলোয় আমি বারবার নীতু দেখতাম,বারবার।

নীতুর সাথে আমার পরিচয়ের আজ দুই বছর।আর সম্পর্কের বয়স ঠিক এক।মানে গত বছরের এই দিনেই ও আমাকে প্রপোজ করে।আমার পচিশ বছরের জীবনে এমন অসংখ্য প্রস্তাব আমি পেয়েছি;কখনো সরাসরি,কখনো পরোক্ষে।আমি দেখতে নাকি একেবারে রাজপুত্রের মতো,অন্তত মা তাই বলেন।গায়ের রঙ উজ্জ্বল শ্যামলা,কাটা কাটা চেহারার ধার,আর কালো গভীর চোখ।আমার জন্য অনেক মেয়েই পাগল,বলতে দ্বিধা নেই।কিন্তু আমার কিছুতেই এই সব প্রেম ভালোবাসায় আগ্রহ ছিলো না,কিন্তু নীতু নিজেই ছিলো একটা ম্যাজিক।ওর ভেতর এমন কিছু ছিলো,যার ইন্দ্রজাল কাটানো আমি কেন,কোন মানুষের পক্ষেই সম্ভব ছিলো না।

আমি অন্য প্রেমিকদের মতো ছিলাম না।উষ্ণতার জন্য আমি ওর কাছে শুধু ভালোবাসা চাইতাম,প্রেম না।আমার নিজেকে শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের নায়ক মনে হতো সবসময়।যার কাছে প্রেম মানে ভালোবাসার অন্য নাম,উষ্ণতা মানে প্রেমিকার হাত ধরে সময় কাটিয়ে দেবার স্মৃতি।

নীতু অবাক হয় ভেতরে ভেতরে,আমি বুঝি।এবং বুঝেও না বোঝার ভান করে বসে থাকি।আমার কেন যেন নিজেকে অশুচি মনে হয় ওইসব ভাবনাতেও।নীতু আমার কাছে পবিত্র এক অস্তিত্ব,তাকে কি করে আমি শারীরিক আকর্ষণের মতো ঠুনকো বিষয়ে জড়িয়ে কলুষিত করতে পারি?

৩.

আজ অবশ্য নীতুর আবদার ছিলো সারাদিন আমার সাথে ঘুরে বেড়াবে।আমরা ঘুরে বেড়িয়েছি,দুপুরে লাঞ্চ করেছি,বিকালে রিক্সায় ঘন্টা চুক্তিতে ঢাকা শহর ঘুরেছি।সন্ধ্যায় কি হলো,ওর ইচ্ছে হলো আমাকে ওর বাবা মায়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে।আমি না করতে যেয়েও করিনি,চাইনি এই সুন্দর দিনটার শেষটা ওর মন খারাপ দিয়ে নষ্ট হোক।

ওর বাসায় আগে কখনো যাইনি আমি,আসলে চিনিও না।সন্ধ্যা ঘনাতেই আমাদের রিক্সা এসে থামলো বনানী ১১ নাম্বার সেক্টরের একটা সাদা বাড়ির সামনে।

"এইটা তোমাদের বাড়ি?"
জিজ্ঞেস করলাম।নীতু মুখে কিছু না বলে রহস্যময় হাসি দিয়ে আরো অন্ধকারে নিয়ে গেলো আমাকে।

"বাড়িতে কেউ নেই?"
আমার দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাবেও নীতু সেই একই রহস্যময় হাসি হেসে উত্তর দিলো।ততক্ষণে আমরা দুইজন মুখোমুখি বিশাল সেই বাড়ির ঝা চকচকে ড্রইংরুমের নরম সোফায় ডুবে যেতে যেতে।

নীতু উঠে গেলো ভেতরে।খানিক পড়েই হাতে করে এক গ্লাস ঠান্ডা কোমল পানীয় নিয়ে এসে আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো।নিজের গ্লাসটায় ছোট্ট একটা চুমুক দিয়ে বললো,

'না নেই।আজ শুধু তুমি আর আমি।'
বলেই আবার সেই হাসি,যার জন্য আমি একশো আটটা নীল পদ্ম এনে দিতেও রাজি।

"কিন্তু তুমি তো বলেছিলে তোমার বাবা মা আছেন,তাদের সাথে দেখা করাতে নিয়ে যাবে আমাকে;তাহলে?"

বুঝতে পারছিলাম কি হতে যাচ্ছে,তবুও বোকার মতো বলে বসলাম।

জবাবে নীতু আমার পাশে এসে বসে।আমার হাত থেকে কোকের গ্লাসটা সরিয়ে মার্বেল পাথরের টি টেবিলের ওপরে রেখে আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে।আমার কানের কাছে নিজের মুখটা বাড়িয়ে এনে ফিসফিস করে বলে,

'তোমার সামনে এখন পৃথিবীর সবচেয়ে দূর্লভ আর রহস্যময় মানবী সম্প্রদায়ের একজন অসম্ভব সুন্দরী সদস্য বসে আছে।আমি সুন্দর নই,বলো?'

"তুমি অবশ্যই সুন্দর,কিন্তু নীতু.."

আমি এর বেশি আর বলবার সুযোগ পেলাম না।তার আগেই নীতুর নরম ঠোটের ভেতর আমি একেবারে ডুবে গেলাম।ও আমার গলাটা জড়িয়ে ধরে আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে আসে,কড়া পারফিউমের সাথে ওর শরীরের গন্ধে আমি বিমোহিত হয়ে যাই।এতো রহস্য তাহলে লুকিয়ে থাকে একজন মানবীর ভেতর?

কিন্তু ভেতর ভেতর টের পাই,আমার এখুনি থেমে যাওয়া উচিৎ,এখুনি।পরক্ষণেই ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিই আমি নীতুকে।আমার এই ধরনের আচরণে বিহ্বল হয়ে যায় নীতু।ব্যক্তিত্ব কিংবা নারীত্বের অপমানে বন বেড়ালির মতো ফুসতে থাকে ও।কি হয় কে জানে,এক্কেবারে ঝাপিয়ে পড়ে আমার ওপর।বড় বড় নখ দিয়ে আচড়ে খামচে দিতে থাকে।

'বল তুই কেন এমন করলি?বল।কেন তুই আমাকে এইভাবে ফিরিয়ে দিলি?তোকে আজকে আমি মেরেই ফেলবো জানোয়ার..'

রাগে রীতিমতো চিৎকার করতে থাকে ও।আমি ওর এই হিংস্র আচরণের মাঝেও ওর শরীরের গন্ধে ডুবে যাচ্ছিলাম প্রায়।পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিই,উঠে বসে ওর গলা চেপে ধরি।আমার এই পাল্টা আক্রমণেই কি না,নীতুর সব প্রতিরোধ একেবারে থেমে যায়।ওর অবাক বিস্ময় ভর্তি চোখ জোড়া ঠেলে বেরিয়ে আসতে থাকে,আমি হাতের জোর একটুও না কমিয়ে ওর চোখ আর মুখের মায়ায় মুগ্ধ হয়ে যেতে থাকি।
আমার খুব বলতে ইচ্ছে হয়,

নীতু;তোমাকে ভালোবাসি।

৪.

চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে আমি বেরিয়ে এলাম ওই অভিশপ্ত সাদা বাড়ির ভেতর থেকে।নীতুর জন্য খারাপ লাগছে,কিন্তু আমার কিছুই করার ছিলো না।কোনভাবেই আমার পক্ষে নীতুকে জানানো সম্ভব ছিলো না,আমি একজন বৃহন্নলা।মানুষ হিসেবে আমি বড়জোর কাউকে ভালোই বাসতে পারি,কিন্তু প্রকৃতি আমার কাউকে গ্রহণ করার পথ খোলা রাখেনি।শুধু নীতু কেন,কাউকেই কোন দিন জানাবো না আমি আমার ভেতরের মানুষের পরিচয়।কাউকে জানতে দেবো না,কাউকে না....

সাহাবউদ্দিন মেডিকেল কলেজ
০২ ব্যাচ
এমপিএইচ, নিপসম (ইন কোর্স)

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়