Dr. Aminul Islam

Published:
2020-06-03 08:29:00 BdST

'আমি আর নি:শ্বাস নিতে পারছি না' বলে মাকে ডাকছিল সে: আহা!


 

ফারহিম ভীনা
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও লেখক
______________________

We can’t breathe
আজ আমরা সবাই জানি জর্জ ফ্লয়েডকে শুধু কালো হওয়ার কারণে সাদা পুলিশ শ্বাসরোধ করেছে –সাদা হাঁটু চেপে ধরেছে কৃষ্ণাঙ্গের মাথা | ফ্লয়েড বার বার বলেছে –I can’t breath –৮ মিনিটে ১৫ বার অনুনয় করেছে, মাকে ডেকেছে, কেঁদেছে আহা |ঘটনাস্থলে সঙ্গী সাদা পুলিশ তাকিয়ে দেখেছে কালো রং লাল হচ্ছে |সাদা সন্ত্রাসীর হাঁটুর নীচে এভাবেই নিহত হয় কালো রং আর আমরা কিন্তা কুন্তেরা আর শ্বাস নিতে পারিনা |দম বন্ধ হয়ে আসে অদৃশ্য সাদা হাঁটুর নীচে |
শুধু কি এইবার খুন হয়েছে কালো রং? চলুন মনে করি মানব রতন আব্রাহাম লিংকনের কথা –সেই কোন সুদূর অতীতে মানে ১৮৬৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে আমেরিকায় দাস প্রথা নিষিদ্ধ করেন আর ঘোষণা করেন দাসদের মুক্তির | মনে হয়েছিল বটে, আমরা সভ্য হচ্ছি| ঠিক তার দু বছর পর শ্বেত সন্ত্রাস খুন করে লিংকনকে |তারও দীর্ঘ শত বছর পর মার্টিন লুথার কিং আমেরিকায় কালোদের নিয়ে গড়ে তোলেন সিভিল রাইটস মুভমেন্ট , অভিবাসীরা তাতে ছিল সহযোগী শক্তি |১৯৬৩ সালে লিংকন মেমোরিয়ালে লক্ষ লক্ষ মানুষের সামনে ভাষণ দেন, আই হ্যাভ আ ড্রিম| এই ভাষণ পড়লে দেখবেন, আমেরিকার কালোদের ভোটাধিকার ছিল না, রেস্তোরা ও গণপরিবহনে সাদার পাশে কালোর বসার অনুমতি ছিলোনা—ছিল সাদাকে সীট ছেড়ে দেওয়ার ঐতিহ্য |তিনি বললেন, দাস প্রথা নিষিদ্ধের একশত বছর পরও নিগ্রোরা জগতের ধন সম্পদের সাগরে দারিদ্রের এক দ্বীপে বাস করে |তিনি স্বপ্নের কথা শোনালেন যেদিন সব মানুষের ঐকতান শোনা যাবে, তিনি সেই স্বপ্নপূরণের পর গেয়ে উঠলেন –‘অবশেষে মুক্তি পেলাম, অবশেষে মুক্তি পেলাম|মহাশক্তিধর ইশ্বরকে ধন্যবাদ |কিন্তু মুক্তি পায়না কালো মানুষ, বরং মার্টিন লুথার কিং বর্ণবাদীদের গুলিতে নিহত হন |

১৯৭৬ সালে আলিক্স হ্যালির রুটস্ প্রকাশিত হলে পৃথিবী দেখেছিল নৃশংসতার নির্মম দলিল |দাস হিসেবে আফ্রিকা থেকে বিক্রি হয়ে আসে কুন্ত –তার নাম হয় টবি |সে তার নাম, পরিচয় ভাষা ও সংস্কৃতি হারায় |সে দাসত্ব মেনে নিতে পারে না, বার বার পালাতে যায় আর অত্যাচারে জর্জরিত হয় |এ কাহিনির প্রতিটি বাক্য হাজার হাজার কালো মানুষের রক্ত, অশ্রু আর স্বপ্নভঙ্গের কথা বলে |গনগনে সত্তুরের দশক আমেরিকায় –সাব ওয়েতে পর্যন্ত বর্ণবাদী হামলা চলছিল | কালো মানুষকে ভাষা যোগালেন আফ্রো আমেরিকান ঔপন্যাসিক টনি মরিসন |তাঁর প্রথম উপন্যাস – The Bluest Eye এর নায়িকা ছোট কালো মেয়ে পিকালো, উপন্যাস জুড়ে এক কালো মেয়ের অভিশপ্ত জীবনের গল্প |ইস্পাত কারখানার পাশে লেখকের যে শৈশব মরিসন কি তার কথাই বলে গেছেন এই উপন্যাসে ?

পিকালোর রং কালো, ঠোঁট মোটা ও বোঁচা বলে সবাই তাকে কুত্সিথ বলে |আর বড় হতে হতে পিকালো জেনে যায় কুত্সিত মানুষের কোন মূল্য এ সমাজে নেই |এজন্য এইসব মানুষ গরিব হতে পারে, গৃহছাড়া হতে পারে –এমনকি খুন হতে পারে | এই কুন্ঠিত বিবর্ণ ও মর্যাদাহীন জীবনে সে স্বপ্ন দেখে নীল রঙের চোখ ও সোনালী চুলের |অবশেষে পিতার কাছে ধর্ষণের পর গর্ভবতী হয়ে পড়লে সমাজ এইবার তাকায় তার দিকে |আর পিকালো যে কোনদিন জন্মের পর কারুর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেনি, কুড়োয়নি বিন্দু মনোযোগ , সে ভাবে এইবার বোধহয় ঈশ্বর তার স্বপ্ন পূরণ করেছেন –তার চোখ এবার নীল হয়েছে, চুল হয়েছে সোনালী |তিনি সাতটি উপন্যাস লেখেন –তাঁর প্রতিটি উপন্যাস যেন যুক্তরাষ্ট্রের বসবাসরত কালোদের ইতিহাস ও সমাজ্তত্তের পাঠ |তিনি পৃথিবীজুড়ে টিকে থাকা দাসত্ব প্রথার বিরুদ্ধে চাবুক তোলেন –তিনি প্রকাশ করেন Black Book –তাতে চমকে যায় শ্বেত সমাজ |সেখানে দাসত্বের চিত্রকর্ম, বিবরণ, প্রতিবেদন, ইতিহাস সব লিপিবদ্ধ করা হয় |
কবি জানে কখন প্রতিবাদী হতে হয় |অন্ধকার সেসময়ে কালো কবি লেখকরা সৃষ্টি করেন সাংস্কতিক কালো অভ্যুত্থান-হারলেম রেনেসা |নিউ ইয়র্ক –এ তাদের ক্লাব গড়ে ওঠে গোপনে, ডার্ক টাওযার তার নাম |এখানে তৈরী হয় প্রতিবাদী কবিতা |এগুলো ছোড়া হয়েছিল পাথর সমাজকে |লোরকার মত কবিরা প্রস্তুত হয় নীরবে |বর্ণবাদ বিরোধী কবি মায়া এঞ্জেলো খাঁচার পাখি কবিতায় ডানাকাটা পাখির স্বপ্ন হরণের কথা বলেন |তিনি বলেন,
‘অজানা সুরে কম্পিত কন্ঠে
গান গায় খাঁচার পাখি
দীর্ঘকাল ধরে
গান গায় নিধুয়া সুরে
সেই সুর শোনা যায়
দূর পাহাড়ের কাছে
আহা খাঁচার পাখি গান গায় স্বাধীনতার গান |’

মায়া এঞ্জেলো তাঁর ‘আমি উত্থিত হই’ কবিতায় বলেন ইতিহাস ও সমাজ কি পরাজিত, আনত, অস্রুমুখী দুর্বল কালো মানুষকে দেখতে চায় ? বেদনা ও নিপীড়নের গহিনে যে ইতিহাস তার ভেতর থেকে কালো মানুষ উঠে দাঁড়ায়-উত্থিত হয় স্বাধীন ও সাহসী মানুষ |
‘সন্ত্রাস ও ভয়ের অন্ধকার ছেড়ে
আমি উত্থিত হই
আশ্চর্য সুন্দর ভোরের মত
আমি উত্থিত হই |’

মায়া এঞ্জেলো সাহিত্যের কালো গোলাপ –সংস্কৃতির প্রতিটি অঙ্গনে ঝড় তুলে তিনি সাদার আধিপত্যের বিরুদ্ধে মূখর হয়েছিলেন| তিনি তাঁর আত্মজীবনী Why the caged bird sings – বর্ণবাদের দানবীয় চেহারা তুলে ধরেন |তাঁর কবিতা নিষিদ্ধ হয়েছিল একসময়-কিন্তু কবিতা চড়িয়ে পড়ত রাতের আঁধারে| ছিলেন বর্ণবাদ বিরোধী কবি ল্যাংস্টন হিউজ –তিনিও বলে গেছেন কালোদের নিপীড়নের বিরুদ্ধে জীবনভর |তাঁর কবিতা আমাদের সুকান্ত ভট্টাচার্য করেছিলেন-মজুরদের ঝড় নামে|তাদের কবিতা স্বপ্নের কথা বলে, সাম্যের কথা বলে আর বলে স্বাধীনতার কথা |কবিতা বলেছে জাগো লুকিয়ে থাকা মানুষেরা জাগো, নিরব মানুষেরা জাগো |কবি বলে গেছেন কবি মরে না | স্পেনের গৃহযুদ্ধে নিহত হওয়ার আগে যেমন লোরকা বলেছিলেন
‘ঘুম দেব আমি এক মুহূর্তের
এক মুহূর্ত, একটি মিনিট
এক শতাব্দী
কিন্তু সবাই জেনে রেখো আমি
এখনো মরিনি |’
পাশাপাশি সাদা ও কালো বসবাস করেও দুই রং মেশেনি –নতুন মানুষ ও নতুন সংস্কৃতির স্বপ্ন দেখে মানুষ |সাদা সমাজ নেই না কালো রং | কবি সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল লেখেন বর্ণবাদের বিরুদ্ধে বর্ণমালার চিত্কার ছড়িয়ে পড়ছে |আর কবি খন্দকার খসরু পারভেজ বলছেন
ভীষণ তৃষ্ণার্ত ছেলেটি
ওকে জল দাও অথবা পানি
.......
জলের সাথে একটু পানি মিশিয়ে
অথবা পানির সাথে একটু জল |’
আহা সাদা ও কালো মানুষ কিন্তু ঠিক নেমেছে মানুষের মুক্তির জন্য | করোনার মৃত্যু ভয় তুচ্ছ করে পথে নেমেছে মানুষ –অন্যায়ের প্রতিবাদ না করতে পারলে মিছেই এই মানব জীবন | আসুন আমরা সবাই পানি আর জল মিলিয়ে দেই , মিলিয়ে দেই সাদা আর কালো | আমরা আর নিশ্বাস নিতে পারিনা we can’t breath.

---------------------
খুনই করা হয়েছে জর্জ ফ্লয়েডকে, দাবি ময়নাতদন্তের রিপোর্টে
জানায় আনন্দবাজার পত্রিকা।
হাঁটু দিয়ে জর্জ ফ্লয়েডের গলা চেপে রাখা পুলিশের এই ছবিই ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র।
শ্বাসরোধ করে খুনই করা হয়েছিল ৪৬ বছরের জর্জ ফ্লয়েডকে। শ্বেতাঙ্গ পুলিশের হাতে কৃষ্ণাঙ্গ যুবকের মৃত্যু ঘিরে গত এক সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভের আগুনে জ্বলছে গোটা আমেরিকা। তার মধ্যেই জর্জ ফ্লয়েডের ময়নাতদন্তের রিপোর্ট সামনে এসেছে। তাতে সাফ বলা হয়েছে, হাঁটু দিয়ে তাঁর গলা চেপে ধরেছিল পুলিশ। এর ফলে শ্বাসকষ্ট শুরু হয় জর্জ ফ্লয়েডের। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় তাঁর। এটা খুনের ঘটনা।

এর আগে, জর্জ ফ্লয়েডের পরিবারের তরফে আলাদা করে ময়নাতদন্ত করা হয়েছিল। তাতেও গোটা ঘটনাকে খুন বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। শরীরে অক্সিজেন পৌঁছতে না পারায় তাঁর মৃত্যু হয়েছিল বলে জানানো হয়। এ বার হেনেপিন কাউন্টি মেডিক্যাল একজামিনারের দফতরের তরফে যে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে, তাতেও একই দাবি করা হয়েছে। বলা হয়েছে, গলায় চাপ পড়ায় কার্ডিয়োপালমোনারি অ্যারেস্টে আক্রান্ত হন জর্জ।

এ ছাড়াও জর্জ হৃদরোগজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন এবং তাঁর শরীরে মেথাম্ফেটামাইন ওষুধের উপস্থিতি মিলেছে বলেও জানানো হয় ওই রিপোর্টে। তবে গোটা ঘটনাকে খুন বলে উল্লেখ করলেও, ইচ্ছাকৃত ভাবে তাঁকে খুন করা হয়েছে নাকি অনিচ্ছাকৃত ভাবে, তা বলা সম্ভব নয় বলে জানানো হয়েছে।

চেক জালিয়াতির অভিযোগে গত সপ্তাহে মিনিয়াপলিসে জর্জ ফ্লয়েডকে রাস্তায় ফেলে তাঁর উপর নৃশংস অত্যাচার চালায় পুলিশ। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে বলে বার বার আর্জি জানাতে থাকলেও, হাঁটু দিয়ে তাঁর গলা চেপে বসে থাকেন ডেরেক শওভিন নামের এক পুলিশ কর্মী। জর্জের পিঠের উপর চাপ দিয়ে বসেছিলেন আরও দুই পুলিশকর্মী। তার জেরে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় জর্জ ফ্লয়েডের।

সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে সেই ভিডিয়ো সামনে আসতেই বিক্ষোভ শুরু হয় দেশ জুড়ে। গত কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন জায়গায় তা হিংসাত্মক আকারও ধারণ করেছে। গোটা ঘটনায় ডেরেক শওভিন নামের ওই পুলিশকর্মীর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই থার্ড ডিগ্রি মার্ডার এবং নরহত্যার চার্জ আনা হয়েছে। আগামী সপ্তাহে কোর্টে তোলা হবে তাঁকে। ঘটনার সময় তাঁকে সাহায্য করার জন্য আরও তিন পুলিশকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

তবে তাতেও বিক্ষোভ থামেনি। বরং সাধারণ মানুষের সঙ্গে রাস্তায় নেমে এসেছেন বিশিষ্টজনেরাও। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর সরকারের উপরই গোটা ঘটনার দায় চাপিয়েছেন তাঁরা।

____________________________

 

AD...

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়