ডাক্তার প্রতিদিন

Published:
2020-05-29 11:52:13 BdST

নজরুল ও প্রমীলার দুঃখে ভরা বিবাহিত জীবন:সন্তান ও অন্যান্য


 

রাজিক হাসান
লন্ডন প্রবাসী প্রখ্যাত বাঙালি লেখক
_______________________

কাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন প্রমীলা সেনগুপ্ত ইসলাম।

নজরুলের প্রথম বিবাহ একজন মুসলিম মেয়ের সঙ্গে হয়। কিন্তু ওই বিয়ে একদিনও টেকে নি। শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে কি নিয়ে তাঁর বিরোধ বাধে আমার জানা নেই, কিন্তু নজরুল কোন কারণে এতই ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন যে বিয়ের দিনই সেখান থেকে চলে আসেন।

এরপর তাঁর সঙ্গে প্রমীলা দেবীর বিয়ে হয়। তাদের প্রথম সন্তান জন্মের অল্পদিনের মধ্যেই অকালে মারা যায়। তিনি প্রথম সন্তানের মৃত্যুর পর তার উদ্দেশে গান লিখেছিলেন শূন্য এ বুকে পাখি মোর আর ফিরে আয় ফিরে আয় এরপর তাঁদের পরপর চারটি সন্তান হয়। প্রথম দুই সন্তান মারা যায়।

নজরুল ও প্রমীলার বিবাহিত জীবন ছিল দুঃখে দারিদ্র্যে ভরা। নজরুল নিজের প্রতিভাবলে প্রচুর অর্থ উপার্জন করলেও তা রাখার মত বিষয়বুদ্ধি তাঁর ছিল না। খানিকটা দায়িত্ববোধহীন ও ভোলাভালা ধরণের ছিলেন। সম্ভবত তার কারণ হল, নজরুল নিজে কোন পারিবারিক জীবন পান নি। তিনি ছিলেন তাঁর বাবার দ্বিতীয় স্ত্রীর ষষ্ঠ সন্তান। শিশুকাল থেকেই তিনি বাড়ির বাইরে, কখনও অনাথ আশ্রমে কখনও চায়ের দোকানের কর্মী, এভাবেই কেটেছে তাঁর ছোটবেলাটা। তিনি যখন গানে অভিনয়ে কাব্যে সাহিত্যে খ্যাতির মধ্যগগনে ছিলেন তখন তাঁর বন্ধুবান্ধবের বৃত্তটিও ছিল বিশাল।

কিন্তু নজরুল যখন অসুস্থ হলেন (১৯৪১) ও মূক হয়ে গেলেন তখন তাঁর পাশে সেবা করার জন্য ছিলেন কেবল তাঁর স্ত্রী প্রমীলা দেবী। যে সব বন্ধুবান্ধব সব সময় তাকে ঘিরে থাকত, একসাথে গানবাজনার আসর বসাত, চা পান চলত তারা সবাই তাঁর দুর্দিনে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করল। এমন কি তাঁর আত্মীয়স্বজনও তাঁর চিকিৎসার ব্যাপারে কোন উদ্যোগ নেয় নি। এইভাবে প্রায় দশ বছর কেটে গেল।
ভারতের স্বাধীনতার পর শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর উদ্যোগে নজরুল চিকিৎসা কমিটি নামে একটি কমিটি গঠন করা হয় ও অর্থ সংগ্রহ করে তাকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো হয়। কিন্তু শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর যাবতীয় উদ্যোগ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। নজরুলের অবস্থার কোন উন্নতি হয় না। লন্ডন ও ভিয়েনার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা তাকে পরীক্ষা করে বলেন নজরুল দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভুগছেন। এই রোগ সারবার কোন সম্ভাবনাই নেই।

নজরুল তাঁর বাড়িতে ফিরে আসেন। এর মধ্যে প্রমীলা দেবী অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিয়ের পর পর উপর্যুপরি সন্তান প্রসবের ধকল দুটি সন্তানের মৃত্যুশোক এবং সর্বোপরি দারিদ্র্য তাঁর স্বাস্থ্য নষ্ট করে দিয়েছিল। তিনি অসুস্থ হয়ে একেবারেই শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। দেহমনের উপর এত চাপ তাঁর শরীর নিতে পারে নি।
তিনি অসুস্থ হওয়ার পর নজরুলকে সেবা করার আর কেউই রইল না। তাঁর দুই সন্তানই ছিলেন ফুর্তিবাজ ও মদ্যপ। সব্যসাচী আবৃত্তি করতেন আর অনিরুদ্ধ গিটার বাজাতেন। নজরুলের বইয়ের বিক্রি বাবদ বেশ মোটা অংকের টাকা তাদের হাতে আসত। কিন্তু শুধু বই বিক্রির টাকায় তারা বেশ স্বচ্ছলভাবে চলত, তা কিন্তু নয়। যখন '৭১ এর যুদ্ধ শুরু হল তখন জানা গেল পাকিস্তান সরকার নজরুলের খাওয়াপরা ও চিকিৎসা বাবদ মোটা অংকের টাকা দিত। '৭১ এ নজরুলের ছেলেরা সেই টাকা নিতে অস্বীকার করে। কিন্তু এটা জানা গেল না পাকিস্তান সরকার কেন এই টাকা দিচ্ছিল আর ভারত সরকারই বা সেটা অ্যালাও করেছিল কেন?
এ নিয়ে কোন চর্চা আজ পর্যন্ত হয় নি। বাঙালি হল ইতিহাস বিস্মৃত জাতি। কিছু জানতে চায় না। তার কাছে বর্তমানটাই সব। এই চরিত্রের জন্য সবচেয়ে বেশি ভুগছে বাঙালি নিজে।

মাঝে মাঝে দর্শনার্থীদের নিয়ে এসে বাবাকে উত্যক্ত করত।
এক বার একজনঅটোগ্রাফ শিকারীকে বাবার কাছে নিয়ে এসে কাজী সব্যসাচী বললেন
বাবা একটা সই করে দাও।
নজরুল ফ্যাল ফ্যাল করে তাঁর দিকে তাকালেন। কিছুই বুঝতে পারছেন না তাকে কি করতে বলা হচ্ছে। সব্যসাচী বললেন
কি হল সই করো।
তাতেও কোন কাজ হল না। সব্যসাচী তাঁর হাতে জোর করে কাগজ কলম গুঁজে দিয়ে চিৎকার করে বললেন
বাবা সই বাবা সই..
নজরুল কাঁপা কাঁপা হাতে কাগজ কলম নিয়ে অনেক ক্ষণ ধরে লিখলেন।
কাগজ হাতে নিয়ে অটোগ্রাফ শিকারী হতভম্ব। আঁকাবাঁকা অক্ষরে এইভাবে লেখা আছে।
প্রমীলা
দে
বী


লা

এর থেকে বোঝা যায় স্ত্রীর জন্য তাঁর মনে কত বড় জায়গা ছিল। নিজের নাম ভুলে গেছেন কিন্তু স্ত্রীর নাম ভোলেন নি। প্রমীলা দেবীর মৃত্যুর পর (১৯৬২) তাকে অত্যন্ত অস্থির দেখা গিয়েছিল। তিনি কথা বলতে পারতেন না। প্রমীলা দেবীর বিছানায় শোয়ার জায়গাটিতে তিনি বারবার হাত দিয়ে চাপড়াতেন ও কাঁদতেন।
স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশে নজরুলকে নিয়ে যাওয়া হল। তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হল। তাকে একটি বড় দোতলা বাড়িতে বেশ আরামেই রাখা হল। নজরুলের আগমন নিয়ে সারা বাংলাদেশে বিশাল উন্মাদনা দেখা গিয়েছিল। তাকে শোপিসের মত প্রতিদিন প্রদর্শন করা হতো। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই মানুষের আগ্রহ চলে গেল। এই নজরুল তো সেই নজরুল নয়। এতো মূক জড় একটি বৃদ্ধ। এরপর নজরুলকে নিয়ে মাতামাতি বন্ধ হতেই তাকে অন্য বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। অন্য একটি ছোট বাড়িতে। সেখানে আরাম আয়েশের ব্যবস্থা তেমন ছিল না।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলে নজরুল না কি সেই দোতলা বাড়ি ছেড়ে যেতে চান নি। সিঁড়ির রেলিং আঁকড়ে ধরে আপত্তি জানিয়েছিলেন। এর কিছুদিন পরই তাঁর মৃত্যু হয়। তিনি ১৯৭৬ সালে মারা যান মাত্র ৭৭ বছর বয়সে।

নজরুল চেয়েছিলেন (মানসিকভাবে সুস্থ অবস্থায়) তাঁর ও তাঁর স্ত্রীকে যেন মৃত্যুর পর পাশাপাশি একই জায়গায় সমাধিস্থ করা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য, তাঁর স্ত্রীকে চুরুলিয়ায় ও তাকে ঢাকায় সমাধিস্থ করা হয়।

--------------------------------------------------------------------------------
লেখাটি আমার "ফেসবুক ফ্যান্টাসি" বইয়ের কপিরাইট আইনভুক্ত।

_________________

AD...

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়