ডাক্তার প্রতিদিন

Published:
2020-05-29 11:15:02 BdST

করোনায় চলে যাওয়া প্রখ্যাত ডাক্তার আমিনা খানকে নিয়ে তাঁর ডাক্তার কন্যার মর্মস্পর্শী লেখা


 

ডেস্ক
___________________

ডা. বর্ণা সিদ্দিকা । বাংলাদেশের একজন উদীয়মান চিকিৎসক। তার মা-ও ছিলেন প্রখ্যাত চিকিৎসক। ডাঃ আমিনা খান । নারায়ণগঞ্জের সবাই তাকে এক নামে চেনে। সম্প্রতি তিনি করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তার প্রয়াণের পর কন্যা ডা. বর্ণা সিদ্দিকা এক মর্মস্পর্শী লেখা লিখেছেন ফেসবুকে। লেখাটি প্রকাশ হল পাঠকদের জন্য।

_______________


আমার মা ডাঃ আমিনা খান এর চলে যাওয়া ও আমাদের শিখন।
স্থানঃ ঢাকা মেডিকেল করোনা আইসিইউ।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহোদয় কে ধন্যবাদ করোনা আক্রান্তদের জন্য পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার ব্যবস্হা গ্রহন করার জন্য।

স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার জন্য পর্যাপ্ত ডাক্তার ও নার্স নিয়োগ দিয়েছেন তাদের দায়িত্ব দিয়েছেন কিন্তু তাদের কি সে সক্ষমতা আছে কি না এটা আমার প্রশ্ন? পর্যাপ্ত ভেন্টিলেটর ও অন্যান্য মেডিকেল ইকুইপমেন্ট দিয়েছেন আইসিইউ ওয়ার্ডের জন্য যা বেডের ও রুগির তুলনায় অনেক বেশি তাহলে সার্ভিস মনিটরিং হচ্ছে কোথায়?

# গত ২০ মে থেকে ২৬ মে ২০২০ পর্যন্ত আমার মা ডাঃ আমিনা খান সিনিয়র কনসালটেন্ট গাইনি, নারায়ণগঞ্জ এ জনগনকে স্বাস্থসেবা দিতে গিয়ে করোনায় আক্রান্ত হন। আক্রান্ত হওয়ার পর তিনি নিজ বাসায় আইসলেশনে ছিলেন এবং চিকিৎসা নিচ্ছিলেন পরবর্তীতে অবস্থার অবনতি হলে ঢাকা মেডিকেল এ করোনা আইসিইউ এ ভর্তি করা হয়। উক্ত আইসিইউ এ ঘটে যাওয়া ও আমাদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করছি

# প্রতি শিফটে (৬ ঘন্টা দিন ও রাতে ১২ ঘন্টা) ৫জন নার্স একসাথে থাকার কথা কিন্তু ৫জন এসে ৩জন ভিতরে নার্সেস রুমে বসে থাকে ২জন ৩-৪ ঘন্টা করে চলে যায় পরে আবার ২-৩জন আসে এভাবে তারা তাদের শিফট ম্যানেজ করে। (সূত্রঃ ডিউটি নার্স) এখানে কথা হচ্ছে আইসিইউ এমন একটা জায়গায় যেখানে রুগীর জীবনের অনেক সংশয় থাকে। যারা যখন ডিউটিতে আসে তারা কেউ কারো কাছে ডিউটি হ্যান্ডওভার করে না। হ্যান্ডওভার রেজিস্ট্রার থাকলেও কোন আপডেট করা হয় না। যা দেখে পরবর্তী জন কোন কাজ করবে তা লেখা থাকে না। এসে রুগির লোক কে জিজ্ঞাসা করে কি ঔষধ পাইছে আর এখন কি পাবে। এজন্য কখনো রুগীকে ওভার ডোজ কখনো আন্ডার ডোজ ঔষধ দেয়া হয় । ২০০ এম.জি দেয়ার ডোজ ২০ এম.জি দিয়ে চলে যায়। আবার কখনো ঔষধ দেয়াও হয় না। ডাক্তার নার্স শূন্য আইসিইউ থাকে অনেক সময়। তাহলে কি তারা ইচ্ছা করে রুগীর জীবন নিয়ে খেলা করছে নাকি সরকারকে বেকায়দায় ফেলছেন?

# দু একজন ডাক্তার ও নার্স ছাড়া আইসিইউ হ্যান্ডেল করার মত সক্ষমতা তাদের নাই। কোন ভেন্টিলেটর ও ইনফিউশান পাম্প চালানোর মত দক্ষতা ও তাদের নাই । কারণ এ কয়দিন এ যা দেখলাম তা হলো আইসিইউ বেড ও সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইন চালানোর কোন জ্ঞান ও তাদের নাই তাহলে নাম কা ওস্তে আইসিইউ কেন?

# আমাদের প্যাশেন্ট যে বেড এ ছিলেন সেটা ভেন্টিলেশন দেওয়ার জন্য যে সকল সুবিধা থাকার কথা তা ছিল না বা থাকলেও তা কাজ করছিলও না। তাহলে বেড যারা সাপ্লাই দিয়েছে আর যারা এটা গ্রহন করেছে তারা কি দেখে করেছে? (সবগুলো নতুন বেড) যেহেতু বেডটা ভেন্টিলেশন এর উপযোগী ছিল না তাই বেড শিফট এর প্রয়োজন ছিল। এ সময় তিনি প্রচন্ড শ্বাস কষ্ট ও রেষ্ট লেস অবস্থায় ছিলেন এমতাবস্থায় ডাঃ এর পরামর্শক্রমে বেড শিফট করতে যেয়ে এ্যাসপিরেশন হয় এবং উনি কার্ডিয়াক এরেস্ট হন তখন যিনি ডিউটিতে ছিলেন তিনি সিপিআর দেন ও ৪-৫মিনিট এর ভিতর রুগি আবার ফেরত আসেন। এক্ষেত্রে কোন কিছুই (ইকুইপমেন্টস) সঠিকভাবে চেক না করেই তাকে শিফট করা হয় যার ফলে তখন বেডের কাছে কোন অক্সিজেন লাইন কাজ করছিল না। কোনভাবে সেন্ট্রাল লাইন এর অক্সিজেন কাজ করছিল না। লাইন কেউ লাগাতে পারছিলেন না পরে আমার ভাইয়া (পলাশ) বলে, "দেন আমি চেষ্টা করি" ও পরে তিনি সংযোগ দিতে সক্ষম হয়। পরবর্তীতে ডাক্তার সফলভাবে ভেন্টিলেশন দিতে সক্ষম হন। তার পর আর ও ২টা লাইন লাগানোর জন্য ভাইয়াকে বললে সেটা করে দেন। উক্ত ডাক্তার তার ডিউটি আওয়ার শেষ করে চলে যায়। পরের শিফটে একজন নারী ডাক্তার আসেন এবং বলেন আমি হলে কোন করোনা রুগিকে সিপিআর দিতাম না। আমার প্রশ্ন ডাক্তার হিসেবে না উনি কি উনার মা হলেও দিতেন না? তাহলে উনার কি কাজ এর মধ্যে উনি যেটা করলেন সেটা হলো সিভি লাইন করতে যেয়ে আর্টারিতে লাইন দিয়ে চলে গেলেন যা ভেইন এ দিবেন তা আর্টারীতে দিলেন। উনি তাহলে কি কাজ শিখে আইসিইউ এর দায়িত্ব পেলেন? এখানে ডাক্তার এর দক্ষতা ও যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। অধিকাংশ ডাক্তার আইসিইউ এ একবার নিজের চেহারাটা দেখিয়ে কোথায় যে উধাও হয়ে যায় আর খুঁজে পাওয়া যায় না। ওয়ার্ড বয় আয়া তো সে অনেক দূর। নার্সদের কে বললে ডাক্তার ডাকার নাম করে হাওয়া হয়ে যায় প্রায় ঘন্টা পর ফিরে। এর মধ্যে শিফট পরিবর্তন হয়ে যায় পরের শিফটে যে ডাক্তার আসলেন তিনি ঐ নারী ডাক্তার এর কাজ নিয়ে প্রশ্ন করলেন ও আমাদেরকে ঐ কাজ যে ভুল হয়েছে তা বললেন ততক্ষণে ৫-৬ঘন্টা হয়ে গেছে পরে উনি ওটা খুলে দিয়ে আর একটা সিভি লাইন করলেন পায়ে।

# ভেন্টিলেশন দেওয়ার ২দিনের মধ্যে রোগীর অক্সিজেন স্যাচুরেশন ১০০% হয় এবং অন্যান্য শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়। ভেন্টিলেশনের রুগীকে কিছু ইনজেকশন ইনফিউশন পাম্পের মাধ্যমে দিয়ে সিডেট ও মাসল রিল্যাক্স করে রাখা হয় যার মাধ্যমে গভীর ঘুমে থাকে। এ দু'দিন পর আর আর্ডার আপডেট না করা ও ফ্রেস ওর্ডার না করার দরুন কোন নার্স পূর্বের অর্ডার ফলো না করে ইনফিউশান পাম্পে যে ইনজেকশন পাওয়ার কথা তা বন্ধ করে দেয় এবং রুগির সেন্স চলে আসে পরবর্তীতে নিজেই ভেন্টিলেশন ও এনজি পাইপসহ সবকিছুই খুলে ফেলে। তখন আইসিইউতে কোন ডাক্তার বা নার্স ছিল না কোন অক্সিজেনও চালু করা যাচ্ছিল না। অনেক ডাকাডাকির পর ডাক্তার নার্স প্রায় ১৫-২০মিনিট পর আসে। এভাবে অব্যবস্থাপনার ফলে তিনি আবার সংকটাপন্ন হয়ে যান ফলে পুনরায় ভেন্টিলেশনে নেওয়া হয় কিন্তু শেষ রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। আমি নিজে ডাক্তার হয়েও চিকিৎসা-খাতের এ অব্যবস্থাপনা দেখে একটাই প্রশ্ন এ দায় কার? তাই সবার কাছে অনুরোধ যে যে দায়িত্বে আছেন তারা তাদের মিনিমাম দায়িত্বটুকু পালন করবেন।

# নিয়মিতভাবে অর্ডার আপডেট তো হয় ই নাই ২০ তারিখের পর ২১তারিখে আপডেট করেছে আর ২৬ তারিখ তিনি মারা গিয়েছেন কেউ ২০তারিখের টা ফলো করে কেউ ২১তারিখেরটা। প্রতিদিন অর্ডার শিট আপডেট করা ডাক্তারদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। যা মেইনটেন করা জরুরী।

# ইনফিউশান পাম্প চালানোর মত দক্ষতা নার্সদের তো না ই দু একজন ডাক্তার এর ছিল। আমাদের রুগির পাম্প এ যে ইনজেকশন পাওয়ার কথা তা কোনভাবে ফলো তো করাই হয় নি এমন কি আমরা যখন বুঝতে পেরেছি ততক্ষণে ভাল মানুষটার অবস্থার অবনতি হয়ে গেছে। পরে যতটা পাম্প চালানোর হয়েছে কোনটা ঠিকমত কাজই করে নাই অপারেট ও করতে পারে না। বলে সব নষ্ট তাহলে এ নষ্ট পাম্প কারা দিলো আর কারা গ্রহন করলো আর কারা অপারেট করলো।

#আমরা আমাদের অভিভাবক হারালাম।

# দেশ ও জাতি একজন দক্ষ ও যোগ্য ডাক্তার হারালো।

#ডিএমসিএইচ এর করোনা আইসিইউ তে দক্ষ ডাক্তার ও নার্স নিয়োগ করা জরুরী ।

# করোনা আইসিইউ এ সচল ইকুইপমেন্ট রাখা ও চালানো শিখানো।

# করোনা আইসিইউ তে ডাক্তার নার্সদের ডিউটিতে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা।

# ডাক্তার ও নার্সদের এত ( ১০০% PPE) নিরাপত্তা ও সুযোগ সুবিধা দেওয়ার পরও সেবা পরায়ন মনোভাব নিয়ে সেবা নিশ্চিত করা। যেন আর কোন পরিবার ক্ষতিগ্রস্থ না হয়।

কোন অভিযোগ নয় এটা একটা সতর্কতা আমাদের সবার জন্য।

লেখা সংগ্রহ সূত্র : ডা. বর্ণা সিদ্দিকার ফেসবুক স্ট্যাটাস।

___________________________

AD...

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়