ডাক্তার প্রতিদিন

Published:
2020-05-27 11:32:23 BdST

ইদি কাহিনিজীবনের গল্প: স্টেপ মম


 

 

 

লেখকের ছবি

অধ্যাপক ডা. ঝুনু শামসুন নাহার
বাংলাদেশের প্রথিতযশ
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ
প্রাক্তন চেয়ারপারসন , মনোরোগ বিদ্যা বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা
___________________________

আমি তো এখন সুস্থ্য, আমি তো এখন ড্রাগ ফ্রি। তবু কেন আমাকে মাঝে-মধ্যেই এ্যাডিক্ট বলে?

আমি মিলা। গত দুই বছর আমি ইয়াবা আসক্ত ছিলাম। কিন্তু চিকিৎসার পরে আমি তো ভাল আছি। ভার্সিটিতে যাচ্ছি নিয়মিত।
আমার মা মারা যান তিন বছর আগে। তখন আমি এ- লেভেলে পড়ি। মা দীর্ঘদিন কিডনির অসুখে ভুগে মারা যান। বাবা মায়ের দেখভাল করতেন ভালই। তবে বাবার একজন গার্ল ফ্রেন্ড ছিল। লিসা আন্টি। খুব ফ্যাশনেবল, চটপটে ও স্মার্ট। বাবার বিজনেসের অনেক কিছুই তিনি দেখাশোনা করতেন। বিজনেসের জন্য বাবার সাথে পার্টিতে যাওয়া, কাস্টমারদের সাথে কথা বলা, তাদের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে নেগোশিয়েট করা.....আরো অনেক ব্যাপারে লিসা আন্টি ইনভলভ্ ছিলেন। মার মৃত্যুর ছয় মাসের মাথায় বাবা লিসা আন্টিকে বিয়ে করলেন।
আমরা দুই বোন। শারমিন আপু আমার চেয়ে সাত বছরের বড়। স্বামী-সন্তান সহ নিউইউর্কে থাকে। মার মৃত্যুর পর আমি খুব লোনলি হয়ে গেলাম। বাবা আমাকে সময় দিতেন; বেড়াতেও নিয়ে যেতেন। কিন্তু লিসা আন্টিকে বিয়ের পরে আমাকে সময় দিতে চাইলেও পারতেন না। আন্টি সবসময় বলতেন-- এই তো আমি মিলার কাছে যাচ্ছি। আন্টি আমাকে সময় দিতেন ঠিকই কিন্তু আমি বুঝতাম তার মধ্যে কোনো আন্তরিকতা নেই। মনে হতো তিনি আমাকে বাবার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন ইচ্ছে করেই। বাবা বাসায় থাকলেও আমার কাছে তাকে ঘেষতে দিতেন না। আমি সারাদিন কি করেছি, কি খেয়েছি --- এগুলো বিস্তারিত ভাবে বাবাকে বলতেন। বাবাও ভাবতেন আমি বুঝি well taken cared of।
আস্তে আস্তে বিষন্নতা আমাকে গ্রাস করতে থাকলো। এই সময় আমার দুই ক্লাসমেট সাদমান ও নীলা আমাকে ইয়াবা অফার করে। মুড ভাল হবে, টেনশন ফ্রি হবো.... ইত্যাদি। আমি ইয়াবা নিতে থাকলাম টুকটাক। আর ঠিক এ সময়েই আমার জীবনে আসে আরমান।
আরমান আমার চেয়ে বছর তিনেকের বড়। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে ট্রিপল ই ইঞ্জিনীয়ারিং পড়ছে। ঝকঝকে স্মার্ট--- খুব সুন্দর করে কথা বলে। আমি সাদমান ও নীলা একদিন NSU- তে বেড়াতে গিয়েছি তখনই পরিচয়। মোবাইল নম্বর আদান প্রদান হলো। প্রায়ই কথা হতো মোবাইলে। আমি ওর প্রেমে পড়ে গেলাম। আমার একাকীত্বের কষ্টে ও যেন প্রলেপ বুলিয়ে দিল। আরমান তখনো জানতো না যে আমি মাদকাসক্ত। সেটা জানবার পরে ওর মনে কোনো পরিবর্তন এলো কি? এসেছিল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে আমি বুঝতে পারিনি। এখন বুঝতে পারছি।
আরমান নিজে উদ্যোগ নিয়ে একটা drud deaddiction center -এর সাথে যোগাযোগ করলো। আমার বাবা ও লিসা আন্টিকেও সব জানালো। আমার বিষন্নতা, একাকীত্ব -এ সম্পর্কে তাদেরকে বিস্তারিত বলল ও ভালভাবে বোঝাতেও পারলো। নিউ ইয়র্ক থেকে শারমিন আপা, দুলাভাই ও আমার ছোট্ট ভাগ্নী মৌটুসীও চলে এল আমাকে সাপোর্ট দিতে। এরকম পারিবারিক পরিবেশে লিসা আন্টির ব্যাবহারেও অনেক পরিবর্তন এলো। মনে হলো আমি বুঝি সত্যিই তার মেয়ে। আমার খুব ভাল লাগছিল।
নেশা ছাড়তে চাইছিলাম। কিন্তু পারছিলাম না। এমন অবস্থায় গুলশানে একটা ক্লিনিকে ভর্তি হলাম। প্রায় চার মাস থাকলাম। প্রতি সপ্তাহেই আমার আত্বীয়স্বজন এসে দেখা করতো। আর আসতো আরমান। আমাকে কোয়ালিটি টাইম দিত। অনেক মজার মজার কথা বলতো। উজ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখাতো। আমার ক্যারিয়ার নিয়ে কথা বলতো ..... আমি বিবিএ পাশ করে চার্টার্ড একাউনেন্ট হবো....ইত্যাদি। মাদকমুক্ত হয়ে মাদকাসক্তির হাত থেকে তরুন প্রজন্মকে ফেরাতে আমিও দৃঢ় ভাবে কাজ করবো এমন অনেক কথা। আমি জীবনকে নতুন ভাবে দেখা শুরু করলাম। সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম। মনের অজান্তে আরমানকে ঘিরে একটা সুখস্বপ্ন বুনতে শুরু করলাম। ছোট্ট সুন্দর সংসার। কাজ শেষে দুজনে ফিরছি সেই ঘরে। রান্না করছি একসাথে, খুনসুটি করছি, মুভি দেখছি, গান শুনছি, বই পড়ছি....।

মাদকমুক্ত হয়ে রিহ্যাব থেকে ফিরলাম। সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে ক্লাশে যাওয়াও শুরু করলাম। সেই সাথে প্রতি সপ্তাহে ড্রাগ বিষয়ক কাউন্সেলিং-ও করি। আমি এখন অনেক আত্মবিশ্বাসী, অনেক পরিপূর্ন। পরিবারের সবাই আমার পাশে আছে। আছে আরমানও। আপা দুলাভাই নিউ ইয়র্কে ফিরে গিয়েছে। তবে প্রতিদিনই ফোন করে। আমার পরীক্ষা শুরু হয়ে গিয়েছে। খুব ব্যস্ত। রেজাল্টও ভাল হলো। এবার আমি বিবিএ থার্ড ইয়ারে। পড়াশোনার ব্যস্ততায় অনেক দিন আরমানের সাথে কথা হয়নি। ফোন করলাম। কথা হলো। আমাকে অনেক ভাল ভাল কথা বলল। এরপরে জীবনে কিভাবে চলব সে ব্যাপারে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ন সাজেশনও দিল। কিন্তু দেখা করার কথা বলতেই অনেক ব্যস্ততার কথা বলল। আমার কেন যেন মনে হলো আমাকে এড়িয়ে চলতে চাইছে। যদিও ওর সাথে আমার পরিচয় বেশি দিনের নয়। ছয় মাস মতো হবে। কোন রিলাশন বা কোনো ধরনের কমিটমেন্টের কথাও কখনো হয়নি।
কিন্তু আমার তো ওর প্রতি একটা প্রেমের অনুভূতি এসেছে। আমি তো ওকে ভালবেসে ফেলেছি। বিষন্ন হয়ে গেলাম। সব কিছু ফাঁকা ফাঁকা লাগতে লাগলো। পরের সপ্তাহে আরমানের বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করলাম। এর ওর মুখ থেকে জানতে পারলাম আমার ব্যাপারে আরমান আগ্রহী নয়। আমি ব্রোকেন ফ্যমিলির মেয়ে...আমি ড্রাগ এ্যাডিক্ট। এমন মেয়েকে কি বৌ হিসেবে মেনে নেবেন কোনো বাবা মা? আমি খুব ক্রেজি আচরন করতে থাকলাম। আরমানের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলাম। ও ফোনে ভাল ভাল কথা বলে। কিন্তু আমার কাছে ওর কথাগুলো উপদেশের মতো শোনায়। আমার বন্ধুরা বলে আরমান তোকে ড্রাগ থেকে বের করে এনেছে, পরিবারকে তোর পাশে ফিরিয়ে দিয়েছে, তুই পড়াশোনায় ভাল করছিস...এই তো অনেক। আরমান তোর জন্য অনেক করেছে....ওকে তুই ধন্যবাদ দিবি ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু আমার মন যে মানেনা!

আমার প্রথম প্রেম। মার মৃত্যুর পরে আরমানের কাছ থেকেই তো এ্যাটেনশন পেয়েছি সবচে' বেশি। তার কথায়ই তো আমি উজ্জীবিত হয়েছি।
আমি বিষন্ন, সবকিছুতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলাছি। আবার ড্রাগে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছি।
আমি এখন সুস্থ্য। সম্পূর্ন ড্রাগ ফ্রি। তারপরেও কারো বৌ হওয়ার উপযুক্ত নই! আমি তো সুস্থ্য হয়েও সুস্থ্য নই। 'ড্রাগ' শব্দটা আমাকে তাড়া করে ফিরছে। সুস্থ্য স্বাভাবিক জীবনে কিভাবে ফিরবো আমি?
লিসা আন্টি। সেই লিসা আন্টি যিনি আমার ব্যাপারে কখনোই তেমম আন্তরিক ছিলেন না....তিনিই এগিয়ে এলেন।

বেশ কবছর পার হয়ে গিয়েছে। আজ আমি একজন সফল নারী উদ্যোক্তা। বিজনেসের পাশাপাশি আমি একটা NGO- এর নির্বাহী দ্বায়িত্বে আছি। মাদকাসক্তি প্রতিরোধে সচেতনতার প্রচারনাই আমার NGO- এর প্রধান কাজ। মাদকাসক্তির মতো ভয়াবহ নেশাকে আজ আমি শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পেরেছি। সমাজকে সেবা দিতে পারছি। আমার আজকের সাফল্যের পেছনে যারা আছেন তাদের সবাইকে আমি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরন করছি। আরমানের প্রতি আজ আমার কোনো রাগ নেই। আমার জন্য তখন যেটার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল ও সেটাই করেছে।

আর লিসা আন্টি? আমার স্টেপ মম অর্থাৎ সৎ মা তিনি। পাশে থেকে আমার মনোবল ফিরিয়ে দিতে তিনিই কিন্তু সর্বাধিক অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। মাদকাসক্ত বলে আমাকে দূরে ঠেলে দেননি। পরম মমতায় বুকে টেনে নিয়ে সাহস দিয়েছেন সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার। অজান্তেই স্টেপ মম থেকে সত্যিকারের মা হয়ে উঠেছেন।

......

আমার বিয়ের পাকা কথাবার্তা চলছে। পাত্র ইঞ্জিনীয়ার। সবাই খুব ব্যস্ত। শারমিন আপা দুলাভাই নিউ ইয়র্ক থেকে এসেছেন, বাবা আত্মীয়-স্বজন দের দাওয়াতের লিস্ট করছেন। শাড়ী-গয়না কেনা কাটা থেকে শুরু করে পার্টি সেন্টার বুকিং সবকিছুর দ্বায়িত্ব নিয়েছেন আমার মা লিসা আন্টি।

____________________________

AD...

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়