Ameen Qudir

Published:
2019-10-22 11:02:37 BdST

২২ অক্টোবর মহাপ্রয়াণজীবনানন্দ দাশের মৃত্যু রহস্য, লাবণ্য দাশ: ট্রামের শত বর্ষের ইতিহাসে একমাত্র মৃত্যু ও অন্যান্য


 

ডা. রাইসুল ইসলাম সুমন ___________________

জীবনানন্দ দাশের মৃত্যু নিয়ে রয়েছে রহস্য। কবির মৃত্যু নিছক দুর্ঘটনা না আত্মহত্যা এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।প্রিয় কবির এমন মৃত্যু আজও কেউ মেনে নিতে পারেননি। তাই বারবার উঠে এসেছে বিতর্ক।

২২ অক্টোবর শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে মারা যাওয়ার পর থেকেই তাঁর মৃত্যু রহস্যময়তা সৃষ্টি হয়। বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে এসে সেই জনপ্রিয়তা আকাশ স্পর্শ করে। ট্রাম দুর্ঘটনায় মৃত্যু সাধারণ কোনো দুর্ঘটনা না আত্মহত্যা ; এবার সেই দুর্ঘটনার কথায় আসি। প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যে জানা যায়, জীবনানন্দ দাশ যখন ট্রাম লাইন পার হচ্ছিলেন তখন তার হাতে ডাব ছিল। একজন মানুষ হাতে ডাব নিয়ে আত্মহত্যা করতে পারেন কি না এ নিয়ে প্রশ্ন থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এর পরের প্রশ্নটা হলো, সেই ট্রাম দুর্ঘটনা যদি হয় একশ বছরে একটি এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটি জীবনানন্দ দাশের, কেন!

মৃত্যুর কয়েকমাস আগে হুমায়ূন কবিরের কাছে লেখা জীবনানন্দ দাশের ৩টি চিঠি
২৫ শে নভেম্বর, ২০১০ রাত ১২:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


শেষ কয়েকবছর কবি জীবনানন্দ দাশ চরম অর্থকষ্টে ছিলেন। তুচ্ছ কারণে একটার পর একটা চাকরি হারিয়েছেন। কলকাতার ১৮৩ নম্বর ল্যান্সডাউন স্ট্রিটের একটি ভাড়াবাড়িতে থাকতেন। লাবণ্যগুপ্তর অসুস্থতা সহ পুরো পরিবারের ভার তাকে অস্থির এবং ক্রমশ অসহায় করে তুলেছিলো। নিদারুণ অর্থকষ্টে ভাড়াবাড়ির একটা ঘর সাবলেটও দিয়েছিলেন বেআইনিভাবে একজন নর্তকীর কাছে, যিনি কবি'র লেখা পড়ার পরিবেশ এবং সকল নৈঃশব্দ্য ভেঙে দিয়েছিলেন। টিউশনি করেছেন, এমন কি বিমা কোম্পানির দালালি পর্যন্ত করেছেন। টাকা ধার করেছেন সম্ভব-অসম্ভব যে-কোনও সূত্র থেকে : ভাই-বোন, ভাইয়ের বউ, বিমা কোম্পানি, স্কটিশ ইউনিয়ন, সঞ্জয় ভট্টাচার্য, সত্যপ্রসন্ন দত্ত, বিমলাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, বাণী রায়, প্রতিভা বসু সহ আরো অনেকের কাছ থেকে। শোধ করেছেন ভেঙে ভেঙে।
মৃত্যুর কয়েকমাস আগে স্বরাজ পত্রিকার সম্পাদক অধ্যাপক হুমায়ূন কবিরের কাছে জীবনানন্দ তিনটি চিঠি লিখেছিলেন পরপর। যে চিঠির কোনো প্রত্যুত্তর পান নি তিনি। হুমায়ূন কবির শেষপর্যন্ত কিছুই করেন নি, বা করতে পারেন নি। অবশ্য জীবনানন্দ বেঘোরে মারে যাওয়ার পর তাকে মরণোত্তর সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারটা পাইয়ে দিয়েছিলেন।
-----------------------------------------------------------------------------

চিঠি-১
১৭.৩.৫৪

আমার প্রিয় মিস্টার কবির,
আপনি এখন একটা খুব প্রভাবশালী জায়গায় আছেন। শিক্ষা, সাংস্কৃতিক সম্পর্ক, সাহিত্য, প্রকাশনা এবং অন্যান্য অনেক বিষয় আপনার সাক্ষাৎ তত্ত্বাবধানে আছে, যাদের মাধ্যমে আপনি আমাকে কোনও একটা উপযুক্ত চাকরিতে বসিয়ে দিতে পারেন। দয়া করে কিছু একটা করুন এক্ষুনি। আশা করে রইলাম তাড়াতাড়ি করে আপনি আমাকে কিছু জানাবেন।

শুভেচ্ছা এবং শ্রদ্ধা নিবেদন-সহ
আপনার জীবনানন্দ দাশ

--------------------------------------------------------------------------
চিঠি-২

১৬.৪.৫৪

আমার প্রিয় অধ্যাপক কবির,
বিশিষ্ট বাঙালিদের ভিতর আমি পড়ি না; আমার বিশ্বাস, জীবিত মহত্তর বাঙালিদের প্রশ্রয় পাওয়ার মতনও কেউ নই আমি। কিন’ আমি সেই মানুষ, যে প্রচুর প্রতিকূলতা সত্ত্বেও প্রতিটি দ্রব্যকে সোনা বানিয়ে তুলতে চায় অথবা মহৎ কোনও কিছু – যা শেষ বিচারে একটা কোনও জিনিসের-মতন-জিনিস; – কিন্তু, ভাগ্য এমনই যে, আজ তার পেটের-ভাত জুটছে না। কিন্তু, আশা করি, একটা দিন আসবে, যখন খাঁটি মূল্যের যথার্থ ও উপযুক্ত বিচার হবে; আমার ভয় হয়, সেই ভালো দিন দেখতে আমি বেঁচে থাকব না। আপনার কথা-মতো আমি জ্যোতিবাবুর অথবা বি.সি. রায়’এর সঙ্গে এখনও দেখা করার চেষ্টা করি নি; আমার মনে হয়, আমার মতন মানুষের পক্ষে তাঁরা দূরের মানুষ। আমি যেন অনুভব করি, আপনিই আমাদের মতন লোকের জন্য এক-মাত্র মানুষ; আপনার উপর আমার গভীর আস্থা আছে। আমি সর্বদা বিশ্বাস করি যে, আপনার নিজের পরিপূর্ণ শাসনের ভিতরে আছে, এমন কোনও একটা, আমার পক্ষে মানানসই, জায়গায় আপনি আমাকে বসিয়ে দিতে পারেন; আমাকে একটা উপযুক্ত কাজ দিয়ে দেবার মতন সুযোগ-সুবিধা আপনার খুবই আছে। আমার আর্থিক অবস্থাটা এখন এতটাই শোচনীয় যে, যেকোনো একজন সকর্মক ‘অপর’ মানুষ যে-কাজ করতে পারে, কেন্দ্রীয় সরকার’এর অধীনে সে-কাজ আমারও করতে পারা উচিত। আমি মনে করি, এ-রকম একটা কাজ এক জন মানুষকে সেই সম্মানটা দিয়ে দিতে পারে, যা প্রতিটি মানুষ নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারলে অর্জন করে নেয়; তার বেশি আমি আর কিছু চাই না। আমার দেশ আমার অস্তিত্বের স-র-মাত্রাটার সাপেক্ষে সেই যথাযোগ্য সুযোগটা আমাকে দিক, যাতে আমি আমার ন্যূনতম জীবনযাপন নিয়ে থেকে যেতে পারি। প্রাইভেট কলেজের অধ্যাপকের কাজ ক্ষুদ্র কাজ : অধিকন্তু অন্যান্য নানা কারণেও ওই কাজটা আমি আর করতে চাই না। আমার খুবই পছন্দ তেমন কোনও একটা মানানসই কাজ, যাতে অনেকটা গবেষণা করতে হয়, লিখতে হয় এবং ভাবনা-চিন্তা করতে হয়।

ইতি
আপনার জীবনানন্দ দাশ

-----------------------------------------------------------------------
চিঠি-৩

২৩.৪.৫৪

প্রিয় মিস্টার কবির,
আশা করি, ভালো আছেন। আপনি এখন খুব একটা উঁচু জায়গায় আছেন, এবং খুব সহজেই আমার জন্য কিছু-একটা করতে পারেন। আপনার নিজের ডিপার্টমেন্ট আছে। খুবই যুক্তিসঙ্গত ভাবে আপনার ডিপার্টমেন্টে কোনো এক জায়গায় আপনি আমার জন্য একটা চাকরি খুঁজে পেতে পারেন, যেমন অল-ইন্ডিয়া রেডিও আছে। আমি আপনাকে সনির্বন্ধ অনুরোধ করছি, আমাকে সাহায্য করতে এক্ষুনি আপনি যথাসাধ্য করুন, আমি খুবই অসুবিধের ভিতর আছি।

শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ-সহ
আপনার জীবনানন্দ দাশ

------------------------------------------------------------------------------
সূত্র:
শেষ ছ'বছর- ভূমেন্দ্র গুহ

 

আব্দুল মান্নান সৈয়দ জীবনানন্দের প্রকাশিত-অপ্রকাশিত কবিতাসমগ্র গ্রন্থে বলেছেন: ‘আমার মনে হয় জীবনানন্দ ঠিক ট্রাম দুর্ঘনটায় মারা যাননি। যদিও এই কথাটাই সর্বত্র বলা হয়ে থাকে এবং আমরা দেখেছি। তথাপি আমার ধারণা তিনি আত্মহত্যা করেছেন’। প্রায় একই রকম মন্তব্য করেছেন কবি ও জীবনানন্দ গবেষক ভূমেন্দ্র গুহ। তিনি বলেছেন, ‘কলকাতার ইতিহাসে জীবনানন্দই একমাত্র ব্যক্তি যিনি ট্রাম দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। তার লেখাগুলো পড়লেই বোঝা যায়, তিনি মৃত্যুচিন্তায় চিন্তিত ছিলেন। এক্ষেত্রে এটা আত্মহত্যা হলেও হতে পারে।’ আসলে মৃত্যু এমন একটি বিষয় যা কারও আওতাধীন নয়। তাই জীবনানন্দের মৃত্যু বহুকাল ধরে কেবল রহস্যাবৃতই থেকে গেল। বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। কবির সহধর্মীণি লাবণ্য দাশের কথায় আত্মহত্যার বিষয়টি সামনে চলে আসে। তার উক্তি ছিল: ‘মৃত্যুর পরপার সম্পর্কে ওর একটা অদ্ভুত আকর্ষণ ছিল। মাঝে মাঝেই ওই কথা বলতেন। বলতেন, মৃত্যুর পরে অনেক প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা হয়। আর খালি বলতেন, আচ্ছা বলতো আমি মারা গেলে তুমি কী করবে?’ (আমার স্বামী জীবনানন্দ দাশ, লাবণ্য দাশ)। জীবনানন্দ দাশের কবিতার সমালোচকের অনেকেই তাঁর কবিতার ধারা বিশ্লেষণ করে আত্মহত্যার বিষয়টি সামনে এনেছেন। কবির অনেক কবিতাই যে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে যাওয়ার পর আবার মায়ায় ফিরে আসার।

জীবনানন্দের মৃত্যু রহস্য

জীবনানন্দ দাশের মৃত্যু রহস্য নিয়ে আলোচনার আগে জীবনানন্দের বাস্তব জীবনের কিছু কথা বলে রাখা ভাল। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম আধুনিক কবি জীবনানন্দ।
বাংলা কবিতায় জীবনানন্দ দাশ একটি মজবুত স্তম্বের মতো, বাংলা কবিতার ইতিহাস জীবনানন্দ ছাড়া লেখা যাবেনা। সাম্প্রতিক রোদ্দুরের দিক চিহ্নের মতো জীবনানন্দ আমার কাব্য সাহিত্যকে সাজিয়েছিলেন। তার অস্তিত্ব দিগন্তরেখার মতো এই রেখার সূচনা আছে; কিন্তু শেষ দেখা যায় না। বাংলা সাহিত্যে জীবনানন্দ এক অমর নাম। যদিও তিনি জীবিত অবস্থায় তেমন সাড়া পাননি। "তার জন্ম
১৩০৫ বঙ্গাব্দের ৬ ফাল্গুন ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দ বরিশাল শহরে। জীবনানন্দ দাশ বরিশালের ব্রজমোহন স্কুল ও কলেজে অধ্যয়ন আরম্ভ এবং পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ করেন ১৯২১ সালে। ১৯২২ সালেই তিনি যোগ দেন কলকাতার সিটি কলেজে, ছিলেন ১৯২৮ অবধি। ১৯৩৫ সালে বরিশালে চলে এসে যোগ দেন ব্রজমোহন কলেজে, ছিলেন ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত। ১৯৫১ থেকে '৫২ সাল পর্যন্ত পড়িয়েছেন খড়গপুর কলেজে, ১৯৫৩ সালে বাড়িষা কলেজে, পরের বছর হাওড়া গার্লস কলেজে তিনি অধ্যাপনা করেন। ১৯৩০ সালে বিয়ে করেন লাবণ্য গুপ্তকে; তাদের দুই সন্তান_ মঞ্জুশ্রী ও সমরানন্দ।" (সূত্রঃ সৌমিত্র শেখর)
জীবনানন্দের কবিতা পড়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখলেন : "তোমার কবিতা চিত্ররূপময়, সেখানে তাকিয়ে দেখার আনন্দ আছে।" বুদ্ধদেব বসু লিখলেন : "ছবি আঁকতে তার অসাধারণ নিপুণতা; তার ছবিগুলো শুধু দৃশ্যের নয়, বিশেষভাবে গন্ধের ও স্পর্শের।"
"জীবনানন্দ দাশকে বলা হয় ধূসরতার কবি, নির্জনতার কবি" আবদুল মান্নান সৈয়দ লিখেছেনঃ "আত্মমগ্ন কবি।" তার কবিতায় যে ধীর গতীর গতীময়তা সত্যি পাঠককে নিয়ে যায় অনেক দূরে। তিনি যে গভীর আবেগ তার রচনায় রেখে গেছেন তা বাংলা কবিতায় বিরল ইতিহাস।এক কথায় জীবনানন্দ দাশ গভীরতর থেকে গভীরতাস্পর্শী কবি। আবেগের তীব্র তীর আর হৃদয় খুঁড়ে জেগে ওঠা বেদনা প্রকাশের ভাব ও ভাষা বাংলা সাহিত্যে তুলনারহিত। তাই, কোন এক জীবনানন্দ গবেষক বলেছিলেনঃ "জীবনানন্দ দাশ শুধু নির্জনতা আর ধূসরতার কবি নন, তিনি স্থিতধী সময়-সচেতন কবিপ্রাণ, তিমির হন্তা আলোকরশ্মিমালা।"
আমরা জীবনানন্দের জীবনী পাঠ করলে দেখি ১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর কলকাতার বালিগঞ্জে ট্রাম দুর্ঘটনায় আহত হন কবি জীবনানন্দ দাশ। এই দুর্ঘটনার কারণেই ২২ অক্টোবর শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে মৃত্যু হয় তার। আজকের আলোচনা মৃত্যু রহস্য নিয়ে। রহস্যের কবি জীবনানন্দ কতো রহস্যের জন্ম দিয়েছেন বাংলা সাহিত্যে এমনকি মৃত্যুটাও রহস্যাবৃত।
জীবনানন্দ সংসারজীবনে সুখী ছিলেন না- এই সন্দেহটা কবির পরিবার ছাড়িয়ে পাঠক মহলে অনুরণিত হতে শুরু করে ট্রাম দূর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যুর পর। "লাবণ্য দাশের অনেক অভিযোগ ছিল জীবনানন্দের প্রতি। সরাসরি বলব: রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল সংসারজীবনে ছিলেন সুখী, জীবনানন্দ তা ছিলেন না।" ( আবদুল মান্নান সৈয়দ ) আসলে জীবনানন্দ দুর্ঘটনার শিকার নাকি সেচ্ছায় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছিলেন ? একটা বিশাল প্রশ্ন জীবনানন্দ পাঠকদের।
১৪ october "জলখাবার" "জুয়েল হাউজের" সামনে দিয়ে রাস্তা অতিক্রম করছিলেন জীবনানন্দ দাশ। শুধু অন্যমনস্ক নয়, কী এক গভীর চিন্তায় নিমগ্ন ছিলেন কবি। চলন্ত ডাউন বালিগঞ্জ ট্রাম স্পটিং স্টেশন থেকে তখনো প্রায় পঁচিশ-ত্রিশ হাত দূরে। অবিরাম ঘণ্টা বাজানো ছাড়াও বারংবার সতর্কবাণী উচ্চারণ করছিল ট্রাম ড্রাইভার। যা অনিবার্য তাই ঘটলো। গাড়ি থামল তখন, প্রচন্ড এক ধাক্কার সঙ্গে সঙ্গেই কবির দেহ যখন ক্যাচারের ভিতর ঢুকে গেছে। ক্যাচারের কঠিন কবল থেকে অতি কষ্টে টেনে হিঁচড়ে বার করলেন সবাই কবির রক্তাপ্লুত, অচেতন দেহ। কেটে, ছিঁড়ে থেঁতলে গেছে এখানে সেখানে।।....... চুরমার হয়ে গেছে বুকের পাঁজরা, ডান দিকের কটা আর উরুর হাড়।"
( জীবনানন্দ স্মৃতি । সুবোধ রায়)
জীবনানন্দ সমালোচকরা অনেকেই বলেন জীবনানন্দ আত্মহত্যা করেছেন তারা তার অনেক কবিতা উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন জীবনানন্দ আত্মহত্যাই করেছেন । কারণ তার কবিতায় মৃত্যুময়তার প্রতি আকর্ষণ লক্ষ্য করা গেছে। "পাই নাই কিছু, ঝরা ফসলের বিদায়ের গান তাই
গেয়ে যাই আমি, মরণেরে ঘিরে এ মোর সপ্তপদী" (ঝরা ফসলের গান)
"যেই ঘুম ভাঙ্গেনাকো কোনদিন ঘুমাতে ঘুমাতে সবচেয়ে সুখ আর সবচেয়ে শান্তি আছে তাতে”।
"কোথায় রয়েছে মৃত্যু? কোনদিকে? খুঁজি আমি তারে,"

তারা আরো প্রমাণ পেশ করেন কবি পত্নি লাবণ্য দাশের উক্তি দিয়েঃ "...মৃত্যুর পরপার সম্বন্ধে ওর একটা অদ্ভুত আকর্ষন ছিল। মাঝে মাঝেই ওই কথা বলতেন। বলতেন, মৃত্যুর পরে অনেক প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা হয়। আর খালি বলতেন আচ্ছা বলোতো আমি মারা গেলে তুমি কী করবে? "
(আমার স্বামী জীবনানন্দ দাশঃ লাবণ্য দাশ)
অন্তত একজন লেখক, জীবনানন্দ বিষয়ে অসীম উৎসাহী, জীবনানন্দেরই সমকালীন কবি সঞ্জয় ভট্টাচার্যের একটি সাক্ষ্য আমাদের ধারণার সপক্ষে আমরা দাঁড় করাতে পারি। সঞ্জয় ভট্টাচার্যের একটি পত্রাংশঃ
"আমার মনে হয় জীবনানন্দ ঠিক ট্রাম দূর্ঘটনায় মারা যাননি। যদিও এই কথাটাই সর্বত্র বলা হয়ে থাকে এবং আমরা দেখেছি; তথাপি আমার ধারণা তিনি আত্মহত্যা করেছেন।"
(জীবনানন্দের প্রকাশিত)
২০ এপ্রিল বেঙ্গল গ্যালারিতে সাহিত্য পত্রিকা 'কালি ও কলম'-এর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় জীবনানন্দ দাশের সৃষ্টি, জীবন ও কর্ম সম্পর্কে আলোচনা। আলোচক ভূমেন্দ্র গুহ। জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুটা আত্মহত্যা ছিল কি না এ জাতীয় প্রশ্ন করা হলে ভূমেন্দ্র গুহ বলেনঃ "কলকাতার ইতিহাসে জীবনানন্দই একমাত্র ব্যক্তি যিনি ট্রাম দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। তার ডায়েরির লেখাগুলো পড়লেই বোঝা যায়, তিনি মৃত্যুচিন্তায় চিন্তিত ছিলেন। এক্ষেত্রে এটা আত্মহত্যা হলেও হতে পারে।"

অন্যদিকে আমরা যখন ট্রাম পরবর্তী অবস্থার বর্ণনা সুবোধ রায়ের মুখে শুনতে পাই তখন বিব্রত হয়ে পড়ি । সিদ্ধান্তে উপনিত হতে পারিনা। শুনুন তার মুখ থেকেঃ "শম্ভুনাথ পন্ডিত হাসপাতালে দু নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয় কবিকে। খবর পেয়ে দেখতে আসেন অনেকেই। এসে পড়েন কবির নিকটাত্নীয় স্বনামধন্য চিকিৎসক শ্রী অমল দাশ, এবং আরেকজন খ্যাতনামা বিশেষজ্ঞ ডঃ এ.কে.বসু। "ডাক্তার অমল দাশকে দেখে ধড়ে প্রাণ এলো কবির, কে বুবু ? বুবু এসেছিস ? বাঁচিয়ে দে....। শিশুর মতো অসহায় কণ্ঠ বুবু, বাঁচিয়ে দে ভাই!" এখানে কবিকে বেঁচে থাকার জন্য ব্যাকুল হতে দেখতে পাই !
( জীবনানন্দ স্মৃতি । সুবোধ রায় )
অবশেষে এই সিদ্ধান্তে উপনিত হতে পারি অজানা রয়ে গেল জীবনানন্দের মৃত্যু রহস্য।

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়