Ameen Qudir

Published:
2019-10-10 18:04:00 BdST

প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একটি আত্মহত্যা : প্রতিরোধের উপায় গল্পে গল্পে জানাচ্ছেন চিকিৎসক


ডাঃ জোবায়ের আহমেদ

___________________________

সাস্টে পড়তো ছেলেটা।
৩১শে আগস্ট ২০১৮ তে ফেসবুকে লিখলো "ব্যস্তময় নির্মম বাস্তবতার ভীড়ে, জানি হারিয়ে যাবো একদিন চিরতরে। "

২৮ নভেম্বর ২০১৮ তে ফেসবুকে লিখলো
বাঁচার জন্য যদি আমি একটি কারণ পাই,মৃত্যুর জন্য হাজারো কারণ আমার সামনে এসে দাঁড়ায়।

২ অক্টোবর সে লিখলো একটা সুইসাইড নোট।

"আমি স্বেচ্ছায় স্ব- জ্ঞানে বিষ খেয়ে নিজের মৃত্যুকে স্বীকার করে নিচ্ছি।
আমার মৃত্যুর জন্য আমার কোন রুমমেট, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন বন্ধু বান্ধব কেউ দায়ী নয়।

আমি কারো কারণে মনে আঘাত পেয়ে বিষ খাইনি।
আমি নিজের ইচ্ছায় বিষ খেয়েছি।

জীবনের প্রতি আমার ধিক্কার চলে আসছে।
দুঃখ, কান্না, অবহেলা আমার মস্তিস্ক আর নিতে পারছিলোনা।
তাই আমি স্বেচ্ছায় মারা গেছি।"

তারপর ছেলেটি সত্যি বিষ পান করে মারা গেলো গতরাতে।
সাস্টের কোন ক্লাসে, অডিটরিয়ামে,কোন অনুষ্ঠানে, টং দোকানে ছেলেটিকে আর দেখা যাবেনা।
উঁচু টিলায় উপর শহীদ মিনারে ছেলেটি আর মায়াবী বিকেলে বসে আনমনা হবেনা।।

কেন মরে গেলো ছেলেটি??
খুব বোকা ছিলো তাই মরে গেলো।।
তার শিক্ষক, সহপাঠী,বন্ধুরা ভুলে যাবে অচিরেই তাকে।
কিন্ত ছেলেটির পৃথিবীকে কিছু দেবার কথা ছিলো।
কিন্ত দিতে পারলো না।।
তার আগেই হারিয়ে গেলো দূর অজানায়।

আমার ব্যক্তিগত ও পেশাগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি
এই দেশের বিশাল একটা অংশ প্রচন্ড রকমের নীরব হতাশায় ভুগছেন।

আর এই হতাশা ও বিষন্নতা থেকে অনেকের মাঝেই তৈরী হয়েছে আত্মহত্যার প্রবনতা।
ইতিমধ্যে অনেকেই সেই প্রবনতা কে বাস্তবে রুপ দিয়ে ফেলেছেন ছেলেটির মত।
হারিয়ে গেছেন অজানায়।শেষ হয়ে গেছে অমিত সম্ভাবনা।।

এদের মাঝে আশার আলো নেই। সাহস নেই।
নিজেকে অযোগ্য ও মূল্যহীন ভাবেন তারা।
জীবনের গুরুত্ব এরা বুঝেনা।

পরীক্ষায় ফেল করলো কেউ, বাবা মা বকা দিলেন,তারপর আত্মহত্যা।
লেখাপড়ার প্রচন্ড চাপ,এক্সামে পাশ হবে কিনা এই চিন্তা থেকে আত্মহত্যা।
প্রেমিক প্রেমিকার সাথে মনোমালিন্য তারপর আত্মহত্যা।
জব নিয়ে সেটিস্ফেকশান নাই,অফিস পলিটিক্স এর শিকার তারপর আত্মহত্যা।
বাবা মা এর অমতে বিয়ে, তারপর অশান্তি ও পরিনতি আত্মহত্যা।
স্বামীর সাথে ঝগড়া, অপমানবোধ থেকে আত্মহত্যা।
প্রেমে প্রতারিত হয়ে আত্মহত্যা।
সংসারে অশান্তি, সবার চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না, প্রচন্ড চাপ থেকে আত্মহত্যা।।
ইলিগ্যাল প্রেগন্যান্সি, বয়ফ্রেন্ডের দায় না নেওয়া, লোক লজ্জার ভয় ও আত্মহত্যা।।
ব্যবসায় লস, শেয়ার বাজারে লস, লোনের বোঝা
তারপর আত্মহত্যা।।

কেমন একটা অস্থিরতা সবার মাঝে।।
সবাই মরে যেতে চায়।

কেউ যেকোন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে চায়না।
সাহসহীন ধৈর্য্যহীন অস্থির মানুষে ভরে যাচ্ছে চারপাশ।।

জীবন একটাই।
একবারই এই সুন্দর পৃথিবীতে আসা যায়।।
এখানে সমস্যা আছে নানাবিধ কিন্ত এগুলো সমাধানযোগ্যই বেশিরভাগ।
সাহস ও ধৈর্য নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করলে সুন্দর সকাল আসবেই।।
সবাই নিজের ভেতর একটা অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে।।
মানসিক স্থিরতার বড়ই অভাব।
মানসিক অস্থিরতা ও অসুস্থতা বাড়বে ভয়ংকর রকমের।।।

পরিত্রানের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ না থাকলেও ব্যক্তিগত, সামাজিক, পারিবারিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবী।।

আপন মানুষের মায়াবী হাত বাড়ানো প্রয়োজন এসব ব্যক্তিদের প্রতি।

আপনার প্রিয়জনের সাথে কথা বলুন।
তাদেরকে মেন্টাল সাপোর্ট দিন।
আপনার হতাশা ও অপ্রাপ্তির দুঃখ তাদের উপর না চাপিয়ে তাদের দোষারোপ থেকে বিরত থাকুন।।
তাদের কাছে টানুন।
তাদের মনের কথা শুনুন।সাহস দিন।।
তাদের ভেতর যে অমিত সম্ভাবনা আছে তা জাগাতে সহযোগী হউন।
তাদের জীবন ও কর্ম মূল্যবান, তারা মূল্যহীন নয় এই সমাজ ও দেশের প্র‍তি তা বুঝান।।
তাদের নীরব যন্ত্রনা গুলো পরম মমতায় শুনুন।।
তাদের মেন্টাল কাউন্সেলিং এর জন্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এর সহায়তা ও পরামর্শ নিন।।।

একমাত্র সুস্থ মানুষদের মমত্তবোধ, ভালবাসা ও মায়ার নজর ই এই অসুস্থ ও অস্থির আত্মহত্যা প্রবন শ্রেনীর মূল্যবান জীবন রক্ষা করতে পারে।।

একজন সুখী মানুষ কখন আত্মহত্যা করে??

সূর্য ডোবার সময়ে কিছুক্ষণ এর জন্য আকাশে ভোরের মত রঙ দেখা যায় যাতে মানুষ আশা করে কাল আবার সকাল হবে।।ভোর হবার ঠিক আগেই রাত সবচেয়ে বেশি অন্ধকার হয়।।
কিন্ত সেই অন্ধকার ভোরের স্নিগ্ধ আলোতে দূরীভূত হয়ে যায়।।
আমাদের জীবন টাও এমন।।

এখানে হতাশা আছে,বিষাদ আছে,গভীর দুঃখবোধ আছে,একাকীত্ব ও নীরব যন্ত্রনা আছে,ভালোবাসার মানুষ এর হারিয়ে যাওয়া আছে, স্বপ্নগুলো চুরমার হয়ে যাওয়া আছে, না বলা বেদনা ও হাহাকার আছে কিন্ত এগুলো কোনটাই স্থায়ী সমস্যা নয়।।

এইসব অন্ধকারে আমরা যদি ধৈর্য্যহারা হয়ে নিজের অমূল্য জীবন নিজ হাতে শেষ করে দেই তবে ভোরের স্নিগ্ধ আলো থেকে নিজেকেই বঞ্চিত করা হয়।।

একজন মেয়ে ২৫ বছর বয়স যার,দুই সন্তানের মা,খোলা চোখে সে একজন সুখী মানুষ।

তার ফেসবুকের বায়ো তে লিখা "সুখী মানুষ " ফ্ল্যাট, গাড়ি, টাকা, অলংকার, ডায়মন্ড সব ই তো তার ছিল।

আমরা যাদের দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতাম তাদের উজ্জ্বল চাকচিক্যময় জীবন দেখে সেখানে কি এমন তীব্র গাঢ় বিষাদ লুকিয়ে ছিল যার জন্য মূল্যবান জীবন তুচ্ছ হয়ে যায়।

বেঁচে থাকার মত এত অনুপ্রেরণা থাকার পরেও কেন সে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিল।।
কি এমন নীরব যন্ত্রনা ছিল তার যা বয়ে বেড়াতে আর পারছিলনা সে, যার জন্য নিজের কলিজার টুকরো দুই সন্তানের মায়াবী মুখগুলো তার কাছে তুচ্ছ হয়ে গেলো।।
আমার একজন আত্মীয়া গত মে মাসে সুইসাইড করলেন।
দুই সন্তানের মা সেই নারীর মনের অবস্থা বুঝার চেষ্টা করে ছিলাম।
এটা গ্রহনযোগ্য নয় কোনভাবেই।
এটা মেনে নেওয়া যায়না।।

কারা তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিলো।?
সে যা করেছে তা অনেক বড় ভুল।
এর প্রায়শ্চিত্ত করে যাবে তার আদরের সন্তানরা।
মা হীন এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকা কতটা নিদারুণ যন্ত্রনার এই বাচ্চা দুইটা হাড়ে হাড়ে টের পাবে।।
অনেক খারাপ লাগছে বাচ্চাগুলোর মুখ দেখে।
বুক ফেটে যায় তীব্র ব্যাথায়।

আমি দূরের কেউ হয়ে যখন এত তীব্র শোকে ভারাক্রান্ত হই, তখন তার প্রিয়জনদের মনের অবস্থা কি??
তার মা এর ছবির দিকে তাকিয়ে ছিলাম অনেকক্ষন, কিভাবে সয়ে যাবেন তিনি??

যারা সুইসাইড করে তারা বোকা।
কিন্ত আমরা যারা তাদের বোকা বানাই তারা কি এর দায় এড়াতে পারি?

একজন মানুষ এর কাছে কেন তার মূল্যবান জীবন মূল্যহীন হয়ে পড়ে??

যিনি সুইসাইড করে ফেললেন তাকে দোষারোপ করে আমরা অনেক কথা বলি কিন্ত যারা তাকে সুইসাইড এর দিকে ধাবিত করে নীরব যন্ত্রনা দিয়ে তাদের আমরা কখনো কিছু বলেছি কি??

তার কষ্ট গুলো অনুধাবন করে আমরা আপনজনরা কি তার পাশে দাঁড়িয়েছিলাম??

তার মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে আশা ও সাহস দিয়েছিলাম কি??

যান্ত্রিক এই নাগরিক জীবনে ঘরে ঘরে বাড়ছে অশান্তি,হতাশা,ডিপ্রেশন আত্মহত্যার প্রবনতা।
প্রতিকার কি?
প্রতিকার কোথায়???
একজন সুখী মানুষ কখন ও কেন আত্মহত্যা করে, এর দায় কি আমাদের উপর আসেনা।

ভেবে ভেবে আর সময় নষ্ট না করে দরকার রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এর উদ্যোগ ও পরিবারের সচেতনতা।
আপনার প্রিয়জনের সাথে কথা বলুন।
তার আচরণ পর্যবেক্ষন করুন।
তার মন খারাপের কারণ জানুন।

মায়া ও দরদ নিয়ে সত্যিকার ভাবে হতাশার অন্ধকারে ডুবে যাওয়া মানুষদের পাশে দাঁড়ান।

Sympathy নয়, Empathy দেখান তাদের প্রতি।

মনো চিকিৎসক এর পরামর্শ নিন।
প্রয়োজনে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট দিয়ে কাউন্সেলিং করান।।
আপনার মমতার পরশমাখা হাত বাড়ান তাদের দিকে।।
অমূল্য জীবনগুলো ঝরে না যাক।।

ডাঃ জোবায়ের আহমেদ।
সিওমেক ৪২
সেশন ২০০৩-০৪

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়