Ameen Qudir

Published:
2019-07-09 10:21:40 BdST

সেক্সুয়াল হেডেক: চিনচিন করে ব্যথা এবং সেটা প্রায়শই তাদের দৈহিক মিলনের পর...


 

ডা. সাঈদ এনাম

___________________________

এক.

মনিকা এবং তার স্বামী এসেছেন মাথাব্যথার সমস্যা নিয়ে। অনেক চিকিৎসা করিয়েছেন কিন্তু ভালো হচ্ছেনা। নিরুপায় হয়ে "শেষ দর্শন" হিসেবে সাইকিয়াট্রিস্ট এর কাছে এসেছেন। ডিটেইলস হিস্ট্রি নিয়ে জানা গেলো মনিকার মাথাব্যথার শুরু বাসর রাত থেকেই। চিনচিন করে ব্যথা এবং সেটা প্রায়শই তাদের দৈহিক মিলনের পর। মনিকার স্বামীর ধারনা তিনি মনিকার মনের মতো স্বামী নন।

তাদের দুজনের শারিরীক মিলনে কোন ছন্দপতন নেই এমনকি তাদের কারো প্রি- মেরিটাল বা এক্সট্রামেরিটাল এফেয়ার ও নেই। পারিবারিক ভাবেই বিয়ে। দিনরাত্রির আর কোন সময়ে মনিকার মাথাব্যথা না থাকলেও কেবল এ বিশেষ সময়টিতে মনিকার কেনো এরকম মাথাব্যথা এটা তাদের দুজনকেই ভাবিয়ে তুলেছে।

আসলে মনিকা ভুগছেন যে ধরনের মাথাব্যথায় মেডিকেলের ভাষায় তার নাম হচ্ছে সেক্সুয়েল হেডেক।

শারিরীক মিলনের সময় প্রচন্ড এক্সারশন থেকে হয় এবং লজ্জায় অনেকে এ ব্যপারটা খুলে বলেন না বলে এ মাথাব্যথার যথাযথ কোন চিকিৎসা তার পাননা। সেক্সুয়েল হেডেক সম্পর্কে জেনে নেবার আগে আসুন মাথাব্যথা সম্পর্কে কিছু খুটিনাটি জানি।

মাথাব্যথা কি ও কেনো?

মাথা ও ঘাড় বরাবর ব্যথাই মাথা ব্যথা নামে পরিচিত। ব্রেইন ও হাড়ের আবরণ তার চার পাশের রক্তনালি, নার্ভ তাদের আবরন, মাথার চামড়ার নীচের মাংসপেশী, চোখ, সাইনাস, কান ও ঘাড়ের মাংসপেশির ইত্যাদির প্রদাহ এবং টানই মুলত মাথা ব্যথার প্রধান কারন।

চিকিৎসা বিজ্ঞানে প্রায় দেড়শো প্রকারের মাথা ব্যথা রয়েছে। প্রতিটি মাথা ব্যথার আলাদা আলাদা সুনির্দিষ্ট কারন রয়েছে। এখানে উল্লেখযোগ্য যে অনেকের ভুল ধারনা রয়েছে মাথাব্যথা মানেই হাই প্রেশার বা ব্রেইনের ক্যান্সার । আসলে সেটা সত্য নয়।

হাইপ্রেশারের মাথা জাতীয় কোন লক্ষন সাধারণত পাওয়া যায়না। তাই হাইপ্রেশার কে বলা হয় সায়লেন্ট কিলার। আর ব্রেইনের নিজস্ব কোন পেইন ফাইবার নেই। তাই ব্রেইন তার নিজেত ব্যথা নিজে বুঝতে পারেনা। ব্রেইনের ভিতর টিউমার হলে তার প্রধান লক্ষন যে ব্যথা এটা ঠিক নয়।

মাথার একেক পাশে ব্যথার একেকটা কারন। যেমন মাইগ্রেন এর ব্যথা সাধারণত মাথার এক দিকে হয়। আবার টেনশন টাইপ ব্যথা হয় সাধারণত পুরো মাথা জুড়ে। ক্লাস্টার মাথা ব্যথা হয় চোখের ভিতর আর সাইনাস প্রদাহের জন্যে সাইনাস ব্যথা হয় নাকের পাশ বরাবর ও কপালের ভিতর।

টেনশন টাইপ হেডেক:

সবচেয়ে বেশি মাথাব্যথার নাম হলো টেনশন টাইপ হেডেক (TTH) । টি.টি. এইচ. সারা মাথা জুড়ে হয় এবং খুব একটা তীব্র না হলেও সারাক্ষণ থাকে। মনে হয় কে যেনো একটা রশি বা গামছা দিয়ে পুরো মাথাটা শক্ত করে বেঁধে দিয়েছে। চলাফেরায় এ ব্যথা বাড়েনা। সকালের দিকে এই ব্যথা কম থাকলেও বেলা বাড়ার সাথে সাথে এর তীব্রতা বাড়তে থাকে। ক্লান্তি, অবসাদ, ঘুমের ব্যঘাত এই ব্যথা বেড়ে যায়।

মাইগ্রেন

দ্বিতীয় যে মাথাব্যথা হলো মাইগ্রেন। ছেলেদের থেকে মেয়েরা এতে বেশি ভুগে। সাধারণত মাথা একপাশে এ ব্যথা অনুভুত হয়। এটি টি.টি. এইচ এর মতো সারাক্ষন চিনচিন করে নয় বরং থেমে থেমে হয় এবং সেটা তীব্র থেকে তীব্রতর। মনে হয় কে যেনো কিছুক্ষণ পর পর হাতুড়ি দিয়ে পিটাচ্ছে মাথা বরাবর। আলোয় ও শারিরীক পরিশ্রমে এ ব্যথা বাড়ে তাই রোগী চুপচাপ অন্ধকার ঘরে শুয়ে থাকতে ভালোবাসে। কয়েক ঘন্টা থেকে কয়েকদিন পর্যন্ত মাইগ্রেন পেইন থাকতে পারে। কিছুটা জেনেটিক বলে পরিবারের কারো থাকলে মাইগ্রেন হবার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

ক্লাস্টার হেডেক

সাধারণত চোখ বরাবর এ ব্যথা হয়। একটা নির্দিষ্ট সময় হয়, এবং দিনে কয়েকবার হয়। ক্লাস্টার হেডেক এ চোখ লাল হয়, চোখ দিয়ে পানি পড়ে, চোখের দৃস্টিতেও সামান্য ব্যঘাত হয়। দিনে রাতে একটা নির্দিষ্ট সময় পর পর হয়, নির্দিষ্ট সময় নিয়ে থাকে তাই একে ক্লাস্টার হেডেক বলে।

সাইনাসঃ

নাকের দু পাশের হাড়ে ও কপালের হাড়ের ভিতর ছোট ছোট কিছু ফাঁকা জায়গা থাকে। এগুলোকে সাইনাস বলে। এতে বাতাস থাকে এবং এই বাতাস ব্রেইনের ভারের সাম্যতা রাখে। হাড়ের ভিতর এসব সাইনাসের আবরণে প্রদাহ হলে বাতাস ও সর্দি জমে থাকে। এর ফলে সাইনাস গুলো বরাবর তীব্র ব্যথা হয়। এটাই সাইনুসাইটিস ব্যথা নামে সাইনাস হেডেক নামে পরিচিত। এ ব্যথার সাথে সর্দি হাঁচি কাশি থাকে।

ক্রনিক ডেইলি হেডেক

মাসের প্রতিদিনই চিন চিন করে মাথাব্যথা হওয়াকে ক্রনিক ডেইলি হেডেক বলে।

মেয়েদের শরীরের হরমোনের তারতম্যের জন্যে প্রায়ই মাথাব্যথা হয়। একে হরমোনাল হেডেক বলে। সাধারণত মাসিকের সময় বা আগে পরে ইস্ট্রোজেন হরমোন কমে যায় বলে এই ব্যথা হয়। তাছাড়া গর্ভাবস্থায় ও হরমোনের তারতম্যের জন্যে মাথাব্যথা হয়।

সেক্সুয়েল হেডেক

স্বামী স্ত্রীর মিলনের সময় বা আগে ও পরে মাথাব্যথা হতে পারে। এর নাম সেক্সুয়াল হেডেক। সাধারণত প্রচন্ড এক্সারশনে এ ব্রেইনে রক্তচাপ বেড়ে গিয়ে এ ধরনের ব্যথা হয়। এ ব্যথা খুব একটা তীব্র হয়না। এবং সেরে যায় কিছুক্ষণের মধ্যে।

তবে শারীরিক মিলনে হঠাৎ যদি কখনও তীব্র মাথাব্যথা হয় সেই সাথে বমি ভাব, খিচুনি অজ্ঞান হয়ে যাওয়া তবে অবশ্যই চিকিৎসকের শরনাপন্ন হতে হবে, কারন রক্তনালির ত্রুটির (এনিউরিজম/ ম্যালফরমেশন) জন্যে এ ব্যথা তীব্রতর হয় এবং এ থেকে অনেক সময় স্ট্রোক হয়ে মৃত্যু হতে পারে।

এক্সারশন ছাড়া স্বামী স্ত্রীর মিলনে ছন্দপতন থাকলেও অনেক সময় মাথাব্যথা হয়। সাধারণত মেয়েদের এ ব্যথা বেশি হয়। এ ব্যথাকে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয়না। অথচ স্বামী স্ত্রীর শুধুমাত্র মিলনের ছন্দপতনে ধীরে ধীরে সম্পর্কে ফাটল ধরে এবং ডিভোর্স হয়ে যায়।

অতিরিক্ত চা বা কফি পানে যেমন মাথাব্যথা হয় তেমনি অনেক সময় চা বা কফি পান থেকে বিরত থাকলেও মাথাব্যথা হয়।

কখনও কখনও কোন কারন ছাড়াই মাথাব্যথা হয়। কেবল মন খারাপ থাকলেও মাথা ব্যথা হয়। একে সাইকোজেনিক পেইন বলে এবং এ সাইকোলজিকেল পেইনের সাইকোলজিক্যাল কারন থাকে। সাইকিয়াট্রিক কাউনসেলিং ব্যতীত কখনোই এই ব্যথা সারার নয়।

দুই.

মাথাব্যথা অবহেলা করা ঠিক নয়। মামুলী কারনে যেমন মাথাব্যথা হয় তেমন অনেক বড় রকমের অসুখ বিসুখের জন্যেও মাথাব্যথা হয়। তাই মাথাব্যথা কারন সঠিক ভাবে নিরুপণ, পুরোপুরি হিস্ট্রি নেয়া এবং যথাযথ চিকিৎসার জন্যে অবশ্যই মাথাব্যথা কে গুরুত্ব দিতে হবে।

ডা. সাঈদ এনাম
সাইকিয়াট্রিস্ট

মেম্বার, আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন
মেম্বার, ইউরোপিয়ান সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন।

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়