Ameen Qudir

Published:
2019-07-05 09:40:20 BdST

হানিমুন ইমপোটেন্সি : মধুচন্দ্রিমায় বিরস বিড়ম্বনা


 



ডা. মোহাম্মদ সাঈদ এনাম


__________________________

এক.

"হ্যালো স্যার বলছেন, আমি সুরমান আলী ফুলপুর থেকে। আমার স্ত্রীকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম। আমাদের গ্রামের ডাক্তার। তিনি বলেছেন আমার স্ত্রী'র সব ঠিক আছে। তিনি আমার সিমিন (সিমেন) টেস্ট করতে দিয়েছিলেন'।

'আমি সিমিন (সিমেন) টেস্ট করেছি। আমার সিমিন (সিমেন) নাকি খুব পাতলা। 'কাউন্ট কম'। এই কাউন্টে অনেক সময় বাচ্চা হয়না। কাউন্ট সামান্য বাড়লেই হয়ে যাবে। কাউন্ট বাড়ানোর জন্যে ওষুধ খেতে হয়। পাশাপাশি দু একটা হরমোনের টেস্ট করতে হবে। এগুলো ঢাকায় করতে হয়। আমি খবর নিয়েছিলাম। ঐ টেস্টে গুলোতে অনেক টাকা। স্যার কি করবো। হ্যালো হ্যালো স্যার...শুনছেন.....?"

কথা গুলো এক নাগাড়ে বলছিলো সুরমান। প্রথমে চিনিনি। পরে স্বরে চিনলাম। তাকে দেখা করতে বললাম।
...........

চৌদ্দ বছর আগে যখন সাব সেন্টারে পোস্টিং হয় তার পাশের গ্রামেই ছিলো সুরমানের বাড়ি। একদিন তার মা'র ভীষণ জ্বর । তাদের বাড়ি যেতে হয়েছিলো। সে থেকেই তার সাথে পরিচয়। খুবই সাদাসিধে প্রকৃতির ছেলে।

গেলো বছর দু'য়েক আগে বিয়ে করেছে। বিয়ের কার্ড নিয়ে এসেছিলো। ছোট করে বললো, "স্যার আমার বিয়ে। আপনি আসবেন, না আসলে বিয়ে হবেনা। আমার স্ত্রী ও আপনার রোগী। দীঘির পার বাড়ি, আপনি চিনেন। সেও বলেছে, স্যার না আসলে হবেনা"।

হেসে হেসে বললাম, "কি যে বলোনা । আচ্ছা দেখি কি করা যায়.."

বিয়ের আগে গভীর রাতে আবার ফোন । কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো..., "স্যার বিয়ে করতে আমার ভীষণ ভয় হচ্ছে, আমার শারীরিক উত্তেজনা খুব কম..,আর আমার সব আগ্রহ নিমিষেই শেষ হয়ে যায়। আমি কি করবো?"

একটু অবাক হলাম। ছেলেটা বিয়েই করেনি। এখুনি উত্তেজনা কম, আগ্রহ ফুরিয়ে যায় গুরুতর সিমটম । তার সাথে কথা বলা উচিৎ তাই বললাম, "ভয়ের কিছু নেই, কাল এসো'।

"তুমিতো বিয়েই করোনি তা তোমার আগ্রহ, উত্তেজনা কম, বুঝলা ক্যামনে..", তাকেজিগ্যেস করলাম।

"আমি বই পড়ে বুঝেছি স্যার, আমার আগ্রহ কম, শক্তি কম", সে মাথা নিচু করে জবাব দিলো।

আমি বললাম, "কেউ কি তোমাকে বলেছে বা ভয় দেখিয়েছে, যেমন বন্ধুবান্ধব। বিয়ের সময় অনেকে হালকা ঠাট্টা তামাসা করে এসব নিয়ে.."?

সে বললো...,
"না স্যার, দুই একটা বইয়ে পড়েছিলাম, তার সাথে মিলিয়েছি। তাছাড়া স্যার, মাফ করবেন আমি কিছু খারাপ বন্ধুদের সাথে মিশে খারাপ ছবি দেখেছিলাম। আমার ভয় করে, দুএক মিনিটের বেশি নীল ছবি দেখতে পারিনা। স্যার আমি বিয়ে করবোনা, আমার বিয়ে করা মনে হয় উচিৎ হবেনা। আমাকে বাঁচান", সুরমান প্রায় কেঁদেই দিলো।

সুরমান কে বুঝালাম,
"বোকামি করোনা। বিয়ের আগে ছেলেদের এরকম হয়। ভয়ে হয়। প্রথম কয়েক রাত এমন হয়। একে হানিমুন ইম্পোটেন্সী বলে। অতি আগ্রহে সৃষ্ট উত্তেজনা। শতকরা পচান্নব্বই ভাগের এসব টুকটাক ভয় ধীরে ধীরে কেটে যায়। এ ব্যাপারে যথাযথ সেক্স এডুকেশন না থাকায় হয়। এসব কিছুনা, তুমি আগাতে পারো'।

দুই.

বেশ ক'দিন পর বউ কে নিয়ে চেম্বারে আসলো। তার স্ত্রীকে চিনতে পারি। একবার কান ফুটো করতে যেয়ে এলার্জি জনিত ইনফেকশন দেখা দেয় । পরে কমে যায়।

জিগ্যেস করলাম, 'কি ব্যাপার, আবার কি হলো তোমাদের ...?'

"স্যার আমারতো সমস্যা হচ্ছে। আমি দুই তিন মিনিটের বেশি মিশতে পারিনা। ভয়ে হাত পা কাঁপতে থাকে। কি করবো"।

সুরমানের ভয় থেকেই এসব হচ্ছিলো। উল্টোপাল্টা সংগ, বই আর নীল ছবি এসবে অনেক সময় ভয়ের সৃষ্টি হয়ে থাকে। তাছাড়া শারিরীক বা হরমোনগত সব রিপোর্ট এ ওর কোন সমস্যা ছিলোনা ।

সে আবার বললো, "স্যার দু'বছরতো হয়ে গেলো। আমাদের সন্তান হচ্ছেনা। কি করবো? আমার সিমিনের (সেমিনাল ফ্লুইড /স্পার্ম) কাউন্ট নাকি কম? আমাদের কি কোন সন্তান হবেনা...?"

সুরমানের কাউন্ট খুব একটা কম মনে হলো না। সব রিপোর্ট নরমাল।

সব কিছু নরমাল থাকলেও অনেক সময় বাচ্চা আসতে অনেকের দেরী হয়। কারো ছ'মাস, কারো এক বছর। আবার এমন ও আছে কেউ বিয়ের দশ বছরের মাথায় সন্তানের দেখা পায়। তাকে বললাম, 'বাচ্চা পেতে কারো কারো অনেক সময় দেরি হয়। চেস্টা করো, সব আল্লাহর হাতে.....'

তাকে এক গল্প বললাম,

"আমার এক পরিচিত পেশেন্ট প্রায় চার বছর হাল ছেড়ে দিয়ে পরে সন্তানের আসায় আবার দ্বিতীয় বিয়ে করলেন। প্রথম স্ত্রী'ই জোর করেই তার এক আত্মীয় বোন কে সতীন হিসেবে ঘরে আনলেন । বছর ঘুরতে না ঘুরতেই দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরে বাচ্চা এলো। সবাই ভীষন খুশি। কিন্তু ভদ্রলোক জানতেন না যে, তার সামনে কি বিপদ আল্লাহ রেখেছেন।

পরের বছর দেখাগেলো দু স্ত্রীর গর্ভে সন্তান। এবার ডাবল খুশি। বেশি খুশি প্রথম স্ত্রী। এভাবেই চলতে লাগলো। গেলো ক'বছরে ঘরে তার নয় জন সন্তান। বড় বউ এর পাঁচ জন, ছোট বউয়ের ঘরে চারজন। এর মধ্যে একটা হলো টুইন। ঘরে আন্ডার টেন ক্রিকেট টিম। সব আল্লাহর লীলা।

পড়িধড়ি করে ভদ্রলোক একদিন চেম্বারে এলেন।

জিগ্যেস করলাম, 'কি বিষয় ভাইজান, মন খারাপ কেনো? বাংলা অক্ষরের পাঁচের মতো ক্যান করে রাখছেন'?

তিনি বললেন, 'ভাই আর বইলেন না, কইসিলেন ধৈর্য ধরতে, ধরিনাই। ঘরেতো টি টুয়েন্টি ম্যাচ শুরু হইসে। আর আমার অবস্থা মরার মতো। দুই বউয়ের ঝগড়ায় আম্পায়ারিং করতে করতে জীবন তেজপাতা"

ডা. মোহাম্মদ সাঈদ এনাম

ডি এম সি,কে-৫২
সাইকিয়াট্রিস্ট
মেম্বার, ইউরোপিয়ান সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়