Ameen Qudir

Published:
2019-06-24 11:09:25 BdST

চিকিৎসক বন্ধুদের সাথে এক বিরল সন্ধ্যায়



চিকিৎসক বন্ধুদের সাথে লেখক প্রথিতযশ ভ্রমণকার অধ্যাপক কবি কামরুল হাসান



অধ্যাপক কবি কামরুল হাসান
________________________

আজ বহুদিন পরে চিকিৎসক বন্ধুদের গেট-টুগেদারে যোগ দিয়ে প্রীতবোধ করি, কেটে যায় মনের অনেক মেঘ। ভোরবেলা আমাকে আচমকা আমন্ত্রণ জানাল ডা. মো. আখতারুজ্জামান। যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক কান গলার এ অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান থাকেন যশোরেই। ঢাকা এসে সহপাঠী বন্ধুদের এ মিলনমেলার আয়োজন করেছেন বিলেতপ্রবাসী বন্ধুদম্পতি জাহেদ ইকরাম ও রাহিলা খানের সৌজন্যে।

চিকিৎসকদের রোগী দেখার দায়িত্ব ফুরাতে চায় না, তাদের সময়ের অপরচুনিটি কস্টও খুব বেশি। উপরন্তু আজ কোন ছুটির দিন নয়। ধানমন্ডির জিনজিয়ান রেস্তোরাঁটি তাদের প্রথম পছন্দ, কারণ এর লোকেশন, পরিবেশ ও খাবারের স্বাদ- সবই ভালো। আমি যখন পৌঁছলাম, তখনো কেউ আসেনি। সময় ছিল সাড়ে আটটা, আমি শুনেছিলাম সাড়ে সাতটা। আগে গিয়ে আর কী করি, নিচের বড় একুরিয়ামটিতে একুরিয়ামের তুলনায় বড় বড় মাছদের সাঁতার দেখি আর উপরে গিয়ে দেখি নিউজিল্যান্ড বনাম দক্ষিণ আফ্রিকার বিশ্বকাপ ক্রিকেটের খেলা। রেস্তোরাঁর দুটি ফ্লোরেই অতিথি বলতে একমাত্র আমি। কালো পোষাকপরা পরিবেশকদেরও কোন কাজ নেই, তারাও খেলা দেখে। মাছ দেখে না, কারণ ঐ দৃশ্য বহুকাল ধরে চোখে গেঁথে আছে।

পৌনে আটটা নাগাদ প্রথম আসে জাহেদ ও রাহিলা, যাদের সম্বর্ধনায় আজকের গেট-টুগেদার ও ভোজসভা। আমি এগিয়ে গিয়ে তাদের স্বাগত জানাই। জাহেদ লিভারপুলের পাঢ় সমর্থক, আমিও লিভারপুলের খেলা দেখে মুগ্ধ। আমাদের মাঝে সামান্য মিলের ঐ এক জাদুকরী ও ঐতিহ্যবাহী ফুটবল ক্লাব। লিভারপুল এবার ইউরোপীয়ান চ্যাম্পিয়নশপ জিতেছে, জাহেদ তাই ফুরফুরে মেজাজে আছে। আমাদের কথা হয় ফুটবল আর আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপ নিয়ে। রাহিলা বরাবরের মতোই অমায়িক ও
প্রিয়ভাষিণী।

একে একে অন্যান্য চিকিৎসক বন্ধুরা আসতে থাকে। একেকজন আসা মাত্রই বাকিরা এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে, আলিঙ্গন ও শুভেচ্ছা বিনিময় চলে কিছুক্ষণ, অতঃপর অবিরল ফটোসেশন। সেখানে যতজন উপস্থিত ক্যামেরাও ততগুলো, ফলে একই ছবি অনেক ক্যামেরায় তোলা হয় একাধিকবার। প্রথমে মনে হয়েছিল ১৬ জনের একটি টেবিল ভরবে না, পরে দুটি অনুরূপ টেবিল তো ভরলই, অতিরিক্ত চেয়ার জুড়তে হলো দুটো। এক কর্মব্যস্ত দিনে ৩৪ জন সিনিয়র চিকিৎসককে রেস্তোরাঁয় জড়ো করা কম কথা নয়, আর এরা সকলে হলো অধ্যাপক। সাড়ে আটটা থেকে নয়টার মধ্যে এসে গেল বেশিরভাগ, নয়টা ছাড়িয়ে ঘড়ি যখন যাত্রা শুরু করেছে সোয়া নয়টার দিকে তখনো একজন দুজন করে আসছিল। তাদের কেউ কেউ আমাকে দেখে অবাক ও আনন্দিত। কাউকে কাউকে বহুকাল পরে দেখলাম, একজনকে তো সেই মেডিকেল জীবনের পরে এই প্রথম। বস্তুত শহীদ আমাদের স্মৃতি থেকে হারিয়ে গিয়েছিল।

আমি ফ্লোর নিয়ে সভাকে বলি আমাকে ভ্রমণকাহিনী লিখতে প্রথম আইডিয়া দিয়ে উৎসাহিত করেছিল জাহেদ ইকরাম। 'বিলেতের দিনলিপি', আমার প্রথম ভ্রমণগ্রন্থ, সেই উৎসাহের ফসল। সুযোগ পেয়ে আমি বইটি জাহেদ ও রাহিলাকে উপহার দিয়ে আনন্দবোধ করি। এতে নাম স্বাক্ষরের প্রয়োজন পড়েনি, কেননা 'বিলেতের দিনলিপি' আমার বিলেতপ্রবাসী চিকিৎসক বন্ধুদেরকেই উৎসর্গ করা, জাহেদ ও রাহিলা সেই তালিকার দুই বিশিষ্ট নাম। যেহেতু তারা একসঙ্গে একই ঘরে থাকে, তাই একটি বই-ই যথেষ্ট হয়, দুটির প্রয়োজন পড়ে না।

সেখানে অভাবিতরূপে দেখা পাই অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী চিকিৎসক বন্ধু মোহাম্মদ আলীর। আমি আমার অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণকাহিনী 'মহাদেশের মতো এক দেশে'-র একটি কপিই নিয়ে গিয়েছিলাম আজকের হোস্ট আখতারুজ্জামানের জন্য, যে ঐ মহাদেশীয় ভ্রমণদলে ছিল। আলীকে পেয়ে একটু দোলাচলে পড়ে যাই, কিন্তু শেষাবধি বইয়ের প্রতি আখতারুজ্জামানের অধিক আগ্রহ লক্ষ্য করে তাকেই তা উপহার দিই। আখতারের ঔদার্যেই আজকের এ ভোজসভায় আমার যোগদান, তার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।

ঘড়ির কাঁটা দশটার দিকে যাত্রা শুরু করেছে এমনি সময়ে খাবার পরিবেশন শুরু হলো। এপিটাইজার এসে গিয়েছিল সাড়ে নয়টার মধ্যেই, তাতে ছিল ফিশ কাবাব ও কাজুবাদামের সালাদ। স্যূপ এলো দুপ্রকার- লালরঙের থাই স্যূপ ও সাদারঙের ক্রিমবল ভেজিটেবল স্যূপ। মূল খাবারে ছিল প্রনচিকেন রাইস, চিকেন নুডলস, ভেজিটেবল, চিকেন ফ্রাই, সিজলিং বীফ, চিকেন কারি। সবশেষে ফ্রুট কাস্টার্ড। খাবার ছিল অপরিমেয় ও সুস্বাদু। আড্ডা আর কোলাহলের ভেতর, আগেও ফটো সেশন, শেষেও ফটো সেশন, এমনকি মাঝেও ফটো সেশন শেষ হলো ঢাকা মেডিকেল কলেজের কে-৩৭ ব্যাচের আরো একটি গেট-টুগেদার। হৈ-হল্লা আর মজা দেখে কে বলবে এরা এখন রিটায়ারমেন্টের পথে? সহপাঠীনিরা ফিরে যায় তাদের প্রাকযৌবনে, সহপাঠীরা পুরনো কৌতুকে এ ওকে ঘায়েল করে। তবে তাদের ভারী দায়িত্ব আর ব্যস্ততা, জীবনের ঐ যে ক্লান্তিকর ছুটে চলা আর একঘেয়েমি, তার ভেতর এই গেট-টুগেদার এক অপরিসীম আনন্দকর বিরতি এনে দেয়। তাদের ভারী পদবী আর লম্বা ডিগ্রিগুলো, উচ্চ আসনের কৃত্রিম মুখোশগুশো এখানে খুলে রাখতে হয়, এখানে তারা চল্লিশ বছর আগের যুবক কিংবা যুবতী- কখনোবা কিশোর-কিশোরী হয়ে যায়।

আমি বসেছিলাম প্রথম লম্বা টেবিলটির শেষ প্রান্তে। আমার এ পাশে প্রিন্স, বিসিসিআইএর ঊর্ধতন কর্মকর্তা, মেডিকেল ডিরেক্টর, আগ্রহ নিয়ে 'মহাদেশের মতো এক দেশে' বইটি দেখে, কেননা সেও ছিল সে ভ্রমণে। এপাশে বসেছে সানিয়া ঝোরা ও সোনিয়া। ঝোরা মেডিকেল কাউন্সিলের একজন ডিরেক্টর, সোনিয়া ঢাকা মেডিকেল কলেজের একটি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান। কাছেই বসেছে সুদর্শন ও চিরতরুণ মন্টু, যে এখন অতিরিক্ত সচিব। রয়েছে আখতারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু তরফদার মুজতবা আলী, বোর্ডের ফার্স্ট বয়, রেস্তোরাঁর বুকিং আখতারের হয়ে সে-ই দিয়েছিল। আমরা খাচ্ছি হঠাৎ সে চলে গিয়েছিল কাছেই ধানমন্ডির লেকের ধারে হাঁটতে। তার নিত্যদিনের রুটিন সে ভাঙতে চায়নি। ফিরে এসেছে ক্ষুধা নিয়েই। পরিবেশকদের দেখলাম তার অতিরিক্ত যত্ন নিচ্ছে।

আমাদের আসরে ছিল সেনাবাহিনীর চার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, চারজনই আর্মি মেডিকেল কোরের। ভেবেছিলাম তাদের সাথেই ফিরব, কেননা মিরপুরের যে অঞ্চলে আমি থাকি, সেটা সেনানিবাস থেকে দূরে নয় (তাই বলে আমাকে কেউ প্যারা মিলিটারি ভাববেন না)। কিন্তু পরে ফিরি সেনাবাহিনীরই আরেক অবসরপ্রাপ্ত অফিসার, আমার কলেজ জীবনের বন্ধু, শামস আহমেদ জিয়ার সাথে। ফিরে আসার পথে শামসকে শোনাই আমার সাম্প্রতিক মেঘালয় সফরের গল্প। গল্প শুনে, যে ঢাকার বাইরে দুই পা ফেলে না , সেই শামস মেঘালয়ে যেতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। মনে হয় তার পুরনো পঙ্খীরাজ টয়োটাটি নিয়ে এখনি সে উড়াল দেয় মেঘলোকে। সহযাত্রী আর কেউ নয়, মেঘলোকের অভিজ্ঞ গাইড কামরুল হাসান।

__________________________

অধ্যাপক কবি কামরুল হাসান । বাংলাদেশের প্রথিতযশ কবি , ভ্রমণ লেখক। শিক্ষক।

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়