Ameen Qudir

Published:
2019-06-18 12:55:53 BdST

শিশুর কানের শিম বিচি ডাক্তার বের করে দেওয়ার পরও রোগীর কানের পর্দা ফাটানোর মামলা



শিশুর কানের চিকিৎসার প্রতিকী ফাইল ছবি

ডেস্ক
_______________________

শিশুর কানের শিম বিচি ডাক্তার বের করে দেওয়ার পরও রোগীর কানের পর্দা ফাটানোর মামলা হল। সেবা করেও চিকিৎিসা দিয়েও মামলা হামলা গালি। এই হল বর্তমানের চিত্র। এ নিয়ে মর্মস্পর্শী লেখা লিখেছেন ডা. শেখ শাহাদত হোসেন।
লেখাটি প্রকাশ করলাম।
এক লোক তার বাচ্চাকে নিয়ে বিশেষজ্ঞের কাছে গেছেন। ডাক্তার পরীক্ষা করে দেখলেন বাচ্চাটার কানের ভেতর শিম বিচি বেড়াতে গেছে। তিনি তা বের করলেন, যা বাচ্চাটা খেলাচ্ছলে ঢুকিয়েছিলো। যাহোক কানের ভেতর থেকে ফরেন বডি বের করলে অনেক সময় কিছুটা রক্তপাত হতে পারে। এটা স্বাভাবিক। অবাক কান্ড, সেই লোক ডাক্তারের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন! ডাক্তার নাকি তার রোগীর কানের পর্দা ফাটিয়ে ফেলেছেন! তার যুক্তি রক্ত! কেমনটা লাগে বলেন? কোর্ট, মামলা, বিচার এসবে হয়তো ঠিকটাই বের হয়ে আসবে, কিন্তু কত দিনে? ততদিনে তিলে তিলে সঞ্চিত সম্মান, নাম, যশ, প্রফেশনাল ক্যারিয়ার হুমকির মুখে যে পড়বে না, কে বলতে পারে? অতএব মিউচুয়াল। বাহ, এটাই তো চেয়েছিলো বাদীপক্ষ। অবশেষে কেল্লাফতে! জেকপট! একসাথে অনেকগুলো অর্থযোগ। সহজ আর্নিং। একটা শ্রেনী নাকি দাড়িয়েই গেছে এই কাজে! এই লোককে বা এদেরকে চিকিৎসা না দিলে ডাক্তারের কী অন্যায় হবে? নিরপরাধ একজন লোক, প্রফেশনাল কাজ করতে এসে ফেঁসে যাবেন, এটা হল কিছু?

আমি যেহেতু রোগীর সমস্যা নিয়ে একটু আধটু লিখি, ডাক্তারি বিদ্যার খটোমটো বিষয় আপনাদের কাছে সহজ করে তুলে ধরার চেষ্টা করি, তাই ভাবলাম পেশা নিয়ে আমার না বলা কথাগুলো একটু বলি। প্রায়শই শোনা যায় ভুল চিকিৎসার ধূয়া তুলে ডাক্তারদের লাঞ্চিত করা হচ্ছে। ভুল চিকিৎসা যে একেবারেই হয় না, তা নয়। কাজ করতে গেলে কিছুটা ভুল ভ্রান্তি তো হতেই পারে। তবে ভুল চিকিৎসাটা কী, কে প্রমাণ করল যে ভুল, এমন কোনো তথ্য কখনোই পাওয়া যায়না। একজন চিকিৎসকের ভুল শুধু মাত্র অন্য চিকিৎসকেরই বোঝার কথা, অথচ রাম, সাম, যদু, মধু, বিশেষ করে সাংবাদিকরা বলে দিলো ভুল চিকিৎসা হয়েছে; ওমনি কান নিয়েছে চিলে মতো দৌড়াতে শুরু করলাম। এমন অবস্থা চলতে থাকলে একসময় ডাক্তাররা চিকিৎসা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে তখন আমরা কোথায় যাবো? ঢালাওভাবে চিকিৎসকদের দোষারোপ না করে সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার ব্যাপারে অধিক দৃষ্টি দেয়া উচিত।

একজন ডাক্তার কি যে কাউকে চিকিৎসা দিতে বাধ্য? অবশ্যই না। তাহলে কখন একজন ডাক্তার রুগীকে চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করতে পারে? আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ডাক্তারদের এসব অধিকার সবার জানা দরকার-

১. ডাক্তার যদি নিজেই সুস্থ না থাকেন।
.
২. পূর্বে সেই রোগ সম্পর্কে যদি তিক্ত অভিজ্ঞতা থাকে, তাহলে ডাক্তার চাইলে এমন রোগের নতুন রুগীকে চিকিৎসা নাও দিতে পারেন।
.
৩. নিজের কর্মঘণ্টা ও কর্মস্থলের বাহিরে তিনি চাইলে রুগী দেখতেও পারেন, নাও পারেন।

৪. রুগীর বাড়ি গিয়ে রুগীকে দেখার কোন বাধ্যবাধকতা ডাক্তারের নেই।
.
৫. অনেক সময় ইমার্জেন্সি মুহূর্তে একজন রুগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয় মানবিকতা বিচার করে। তবে এর মানে এই নয় যে সেই রুগীকে ডাক্তার তার নিজস্ব রুগী হিসেবে গ্রহন করে নিয়েছেন এবং পরবর্তীতে তিনিই সেই রুগীর চিকিৎসা চালিয়ে যাবেন। তিনি চাইলে প্রাথমিক ম্যানেজ করার পর সেই রুগীকে অন্য হাসপাতাল কিংবা ডাক্তারের কাছে পাঠিয়ে দিতে পারেন।

৬. প্রাইভেটভাবে দেখালে ডাক্তারের ফি যদি না দেয় কিংবা তিনি যেভাবে চিকিৎসা দিতে চান সেটা যদি রুগী মেনে না নেয়, তাহলে একজন ডাক্তার চাইলে সেই রুগীকে চিকিৎসা নাও দিতে পারেন।

৭. যদি একজন ডাক্তার মনে করেন যে তিনি সেই রোগের চিকিৎসা দিতে পারবেন না কিংবা চিকিৎসা দেওয়ার মত প্রয়োজনীয় সুবিধা, যন্ত্রপাতি, ওষুধ, স্টাফ ইত্যাদি তার কাছে নেই, তাহলে তিনি চাইলেই রুগীকে সেখানে চিকিৎসা না দিয়ে উপযুক্ত জায়গায় রেফার করে দিয়ে পাঠাতে পারেন।

৮. মানসিক সমস্যা ছাড়া রুগী যদি ডাক্তারের সাথে দুর্ব্যবহার করে।

৯. যদি ডাক্তারের নিজের কিংবা পরিবারের ক্ষতি কিংবা জীবননাশের আশংকা থাকে।

১০. চিকিৎসা প্রদানকালীন সময়ে জীবনের নিরাপত্তার অভাব বোধ করলে।
.
১১. রুগী নিজেই যদি ক্ষতিকর কোন ওষুধ চায়।
তথ্যসুত্র- Medical law and Ethics

আমরা কবে বুঝব, ডাক্তাররা আমাদেরই মতো রক্ত মাংসে গড়া মানুষ? দুঃখ পেলে তাদেরও কষ্ট হয়। আপনার অবিবেচক কথা, আচরণে তাদের মধ্যে বিবমিষা তৈরি করে, তারা মন খুলে আপনাকে আপনার প্রিয়জনকে চিকিৎসা দিতে ভয় পায়। বাঁচা মরা তো উপরওয়ালার ইচ্ছে, ডাক্তাররা শুধু চেষ্টা করতে পারেন। এখন সেই চেষ্টাও তো করতে ভয় লাগে আপনাদের ভুল চিকিৎসা নামক অপবাদের ভয়ে। অপবাদের ভয় কাঁধে নিয়ে আর যাই হোক স্ট্যান্ডার্ড চিকিৎসা দেয়া যায় না। তারচেয়ে ভালো চিকিৎসাই না দেওয়া। দিনশেষে ক্ষতি কার, বোঝা গেলো ব্যপারটা?

আপনি যেমন মাঝরাতে প্রিয়জনকে বুকে নিয়ে ঘুমাতে পছন্দ করেন, তাদেরও তাই। তাদেরও বাচ্চাকে প্রাণভরে বুকের দুধ খাওয়াতে ইচ্ছে করে, তাদেরও ইচ্ছে করে বাচ্চাকে একটু আদর করে কিছু খাওয়া তে, স্কুলে নিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। আপনার ইচ্ছেগুলো আপনি পূরণ করলেন অথচ এতসব জলাঞ্জলি দিয়ে যে ডাক্তার আপনার প্রিয়জনের অন্তিম মুহূর্তে পাশে থাকল, তাকে অপবাদ দেন? কেনো করেন এসব? হ্যাঁ, আপনাকে চিকিৎসার বিনিময়ে ডাক্তার টাকা পায়। বাপুরে আপনিও তো কাজের বিনিময়ে টাকা পান, কিন্তু ক্লায়েন্টের অন্তীম শয্যায় দাঁড়িয়ে তার নাড়ীর গতি মাপতে মাপতে তার জন্য আনমনে দুফোঁটা চোখের জল ফেলেছেন কখনো? যদিও এসব জল টল কাজের কিছু না, তারপরও...
চোখ বেয়ে জল নামলে লোকে বলে কান্না কিন্তু মন বেয়ে যেটা নামে সেটা অদৃশ্য, অদৃশ্যই থাকুক; আমার এই অদৃশ্যতাই আনন্দ!

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়