Ameen Qudir

Published:
2019-05-27 19:32:46 BdST

স্বর্ণভুখ ছত্রাকের অদ্ভুত কাহিনী


 

 

আজিজুল শাহজী
_____________________________

অস্ট্রেলিয়ার বেশ কিছু গবেষক একটি অদ্ভুত বিশেষত্ব নিয়ে কাজ করছেন যা আমাদের সবার জন্য অতীব বিস্ময়কর।তাঁরা পেয়েছেন বিশেষ কিছু ছত্রাক মানে ফাঙ্গি /ফাঙ্গাস যা আণবিক মানে অতীব কম মাত্রার সোনা মাটিতে থাকলেও তাকে গ্রহণ করে আর নিজের শরীরে সাজিয়ে রাখে।এর ফলে অস্ট্রেলিয়ার অনেক গুলো বন্ধ হয়ে যাওয়া বা অলাভদায়ক সোনার খনি আবার লাভের মুখ দেখতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিমে মানে বোডিংটন যা পার্থ শহরের দক্ষিণে অবস্থিত, এই জায়গায় অস্ট্রেলিয়ার গবেষণা সংস্থা CSIRO কাজ করছিল।এই গবেষক সংস্থার প্রধান মানে ডাইরেক্টর সিঙ্গ বহু(Tsing Bohu ) তুলে ধরেছেন একটি বিশেষ ছত্রাকের কথা যার নাম Fusarium oxysporum ,এটি সোনা সঞ্চয় করে এবং নিজেদের শরীরে ধরে রাখে।দাঁড়ান, আবার বাড়িতে চাষ করে সোনা ফলানোর কোনো পরিকল্পনা ভাববেন না, যেমন বলেছি, মানুষের আহরণের প্রযুক্তির খরচ সাপেক্ষে সোনা আহরণ করার বিষয়টা লাভ দায়ক হয়।তাই,এই প্রাকৃতিক কাজ একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা বলেই এতো আকর্ষণীয়।
এতে একটা সুবিধা আরো আছে,এটি অন্য সব ছত্রাকের থেকে অনেক তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে যায় মানে বৃদ্ধি হয় আর আকৃতিতেও অনেক বড় হয় যা অন্য ধাতু আকর্ষন করে এই রকম ছত্রাকের থেকে অনেক বেশি।ও ,ধাতু আকর্ষক ছত্রাক বলতে বলা হয় নি, কিছু ছত্রাক কিন্তু এমনিতেই ধাতু মানে এলুমিনিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, লোহা বা ক্যালসিয়াম নিজের শরীরে নিয়েই থাকে কিন্তু ঐগুলো সোনা নেয় না বা নিতে পারে না।এইখানেই বিষয়টা এতো আকর্ষণীয়।এই সংস্থার গবেষকদের কাছে এটি অতীব রহস্যের কারন সোনা মূলত কোনোভাবেই জৈব মিশ্রনে সক্রিয় কোনো ভূমিকা নেয় না তা হলে এক্ষেত্রে কেন এই ছত্রাকগুলো ওটা শরীরে নিচ্ছে ,ওটাই একটা মূল রহস্য।এই কারন খোঁজার পাশাপাশি তাঁরা চেষ্টা করছেন এই ভাবেই কি এই ছত্রাক গুলো মাটির নীচেতে আরো বিস্তারে এই সোনা দেহে সঞ্চয় করে কি না।প্রসঙ্গত আগেও বলেছি, অর্থকরী কোনো উপাদান না থাকলে মানুষের গবেষণার উৎসাহ বা তাতে গতি বৃদ্ধি হয় না।ওই যে বলে না নেসেসিটি ইজ দা মাদার অফ ইনভেনশেন অর্থাৎ ঠেলায় পড়লে সব ব্যাটাই দৌড় দেয়,ঐরকম আর কি। আবার বেলাইনে যাচ্ছি, না বিষয়ে আসি।

অস্ট্রেলিয়া হলো পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম স্বর্ণ উৎপাদক দেশ।এখন পর্যন্ত তো বেশ চলছে তবে সংশ্লিষ্ট মহল বলছে নতুন খনি না পেলে এই ধারা বেশি চলবে না।এর ফলে আবার অন্য রাস্তা খোঁজাখুঁজি যাতে জোগানে টান না পড়ে।এই প্রসঙ্গে একজন সংশ্লিষ্ট অনাবাসী ভারতীয় মূল নিবাসী গবেষক ডক্টর রবি আনন্দ বলেন এই শিল্পে আগেও এই ধরণের আহরণের জন্য নির্দিষ্ট আঠা বা উই ঢিপির ভিতরে জমে থাকা অতীব কম সোনার উপস্থিতির ভিত্তিতে এলাকায় সোনা খোঁজার কাজ হয়েছে তবে এই কাজ? না, এর সন্ধান কেউ আগে পায় নি!ডক্টর আনন্দ এর ভাষায় এতে শুধু সোনা আহরণের সম্ভাবনাই না সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলাকায় সোনা খোঁজার আরো একটা হাতিয়ার ও হয়ে উঠলো এই আবিষ্কার।

এই ছত্রাক এর সঞ্চয় আপনি চর্মচক্ষে মানে সাধারণ ভাবে দেখতে পারবেন না।এর জন্য আণুবীক্ষণিক প্রযুক্তির প্রয়োজন।অর্থাৎ দরকার অন্তত একটি সাধারণ মাইক্রোস্কোপ।এই গবেষণাতে যা দেখা যায় তা হলো এই ধরণের ছত্রাকের শরীরে ভিতর যেন সোনা দিয়ে সাজিয়ে রাখে। মূলত তাঁরা যা দেখছেন তাতে হতচকিত হয়ে গিয়েছেন।

বিশেষ সুপার অক্সাইড দিয়ে ওই মাটির সাথে মিশে থাকা সোনা কে আয়নিত মানে ভেঙে আণুবীক্ষণিক আকারে নিয়ে এরপর শরীরে সংশ্লেষ করে এই ছত্রাক। সম্পর্কিত একটি ছবি জুড়ে দিয়েছে এবং এই সম্পর্কিত গবেষণার একটি সূত্র ও দিয়েছে। রসায়নে বিশেষজ্ঞ কিছু বন্ধু এই অন্তর্জালে আছেন ,তাদের আগ্রহের বা আরো কিছু সংযোগের অনুরোধ ও একই সাথে রাখলাম।আবার বলছি , সোনা নিচ্ছে তা বোঝা যাচ্ছে কিন্তু কি জন্য ওটা নিচ্ছে এই ছত্রাকগুলো তা বোঝা যাচ্ছে না। সোনা যে কোনো জৈবিক প্রাণীর (আমাদের সমেত ) শরীরে প্রবেশ করালেও তার কার্যকরী হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। একটা তাত্বিক কথা বলা যায় যে ওই বিশেষ ছত্রাক গুলো আকৃতিতে বড় মানে এই বড় হওয়ার জন্য হয়তো সোনার একটা ভূমিকা থাকতে পারে যার ফলে আদিতে এদের সৃষ্টির পরে প্রকৃতির স্বাভাবিক বিবর্তনের ধাপ ধরে এই আকৃতি বৃদ্ধি বা ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে এই উপযোগিতা কে আত্বস্থ করেছে এই ছত্রাকগুলো। আবার বলছি ,এটি একটি তাত্বিক কারন ,প্রামাণ্য কিছু না তাই আমাদের অপেক্ষা করতে হবে কেন এই ছত্রাক গুলো এই সোনা সংশ্লেষ করে নিজেদের শরীরে।

এই গবেষণার সাথে সম্পৃক্ত না হলেও, সুইজারল্যান্ডের আরো এক মাইক্রোবায়োলোজির গবেষিকা সাসকিয়া এই কাজ দেখে অতীব উৎসাহী। তিনি বলছেন ,একই ভাবে হয়তো আমরা অন্য খনিজ ধাতু নিষ্কাশন বা এর ফেলে দেওয়া অংশের সংশ্লেষ করে পৃথিবীর দূষণ রোধ করতে পারি। সোনা পৃধিবীর অভ্যন্তরে অনেক নিচে প্রচন্ড তাপে সৃষ্টি হয় যা কালের নিয়মে ধীরে ধীরে উপরিভাগে মানে আমাদের কাছে উঠে আসে নদীর ধারার সাথে বা খণনযোগ্য মাটির নিচে। এই অতীব দুরহ কাজের সহজ রাস্তা হতে পারে এই ছত্রাক যা সোনা কে উত্তোলন করতে পারে নিজেদের তাগিদে আর তাতে আমরা পেতে পারি অনেক প্রাকৃতিক আর সুলভ একটি আহরণের রাস্তা।

উপরে যেমন বলেছি ওটা ছাড়াও আরো যা নতুন উদ্যোগের বা অর্থাগমের সুযোগ দেওয়ার রাস্তা হলো আমাদের নিত্য ব্যবহার্য এবং ফেলে দেওয়া বৈদ্যুতিন বা বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি বা বস্তু যাতে কিন্তু কিছু করে সোনার ব্যবহার হয়। সাধারণ প্রযুক্তিতে যে পরিমান পুনরায় ব্যবহারের কাজ হয় তাতে খরচ বেশ বেশি।এক্ষেত্রে কিন্তু এই ছত্রাকের ব্যবহার অতীব লাভদায়ক হতেও পারে!
এই প্রসঙ্গে বলা যায় ,অস্ট্রেলীয় এই গবেষনা সংস্থা একই সাথে অনুজীব আর ব্যাকটেরিয়ার এই সোনা আহরন আর প্রলেপের মতো করে তা প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়া আবার কিছু গাছের একই সংশ্লেষের মাধ্যমে আবার পাতার মধ্যে তার সংরক্ষন এবং এক পর্যায়ে তা আবার মাটিতে যাওয়ার চক্র নির্ণয় করেছেন তবে এই ছত্রাক অতীব ভিন্ন একটি আঙ্গিক।তারা নিজেরা পর্যবেক্ষণ করেছেন যে এই ছত্রাক সোনার খনিতে পর্যাপ্ত ভাবে ছড়িয়ে থাকে।আজকে আমরা জানতে পারছি এই ছত্রাকের থাকার কারণ কি, আরো যা এই ছত্রাক কে আলাদা করে আগ্রহের বস্তু করেছে তা হলো এটি সোনা কে ভুতলের উপরিভাগে নিয়ে আসার কাজ করতে পারে, আশা করাই যায় যে জৈব-রসায়নিক প্রযুক্তির আধুনিক ছোয়াতে এটি একটি নতুন পথ করে দেবে আমাদের।আগে নানান জায়গায় বারেবারে বলেছি আমাদের সভ্যতার পথে চলা কয়েক হাজার বছরের। উন্নত সভ্যতার পথে কেবল অর্ধ শতাব্দী তাই বিপুল এ ধরণীর বিবিধ রহস্য উদ্ধার এবং তার মাধ্যমে নিজেদের উত্তরণের সবে তো যাত্রা শুরু , সামনের দিনগুলি অতীব বিস্ময়ের ওটা কিন্তু নিশ্চিত জানবেন। আমরা আগামী সেই শক্তিঘর মানুষের উত্তরসূরি হিসেবে আসুন নিজেদের কাজ করি সার্বিক ভাবে মানুষের উত্তরণের জন্য।

সবাইকে ধন্যবাদ !

তথ্যসূত্র :
১. https://www.nature.com/articles/s41467-019-10006-5
২. https://www.theguardian.com/…/fungi-that-draws-gold-from-it…
৩. সম্পর্কিত একটি ভিডিও দেখুন এইখানে https://www.youtube.com/watch?v=Mp4Umeduhuw
৪. আরো একটি https://amp.abc.net.au/article/11143230
৫. সুবর্ণময় বা সোনার পাথর যা অস্ট্রেলিয়ার ওই দিকে পাওয়া গিয়েছে এই ছত্রাকের পাথরের উপরে করা আস্তরণের কারণে,জানুন এই সূত্র থেকে https://www.tvnz.co.nz/…/gold-coated-fungus-stuns-aussie-sc…

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়