Ameen Qudir

Published:
2018-07-28 12:00:53 BdST

পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিল নির্বাচন প্রসঙ্গ


 

ডা.রেজাউল করীম।
_____________________________

অভূতপূর্ব পরিস্থিতিতে এবারের মেডিকেল কাউন্সিল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। পাঁচবছর আগের নির্বাচনে বর্তমান কাউন্সিলের বিরুদ্ধে অনেকে ভোটে দাঁড়িয়ে বিশেষ সুবিধা করতে পারেন নি। তার মূল কারন অবশ্য ছিল প্রবল প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়া ও দুর্বল প্রতিপক্ষ। এই বছরে মেডিকেল কাউন্সিল নিয়ে চিকিৎসকরা তিতিরিরক্ত। মূল কারন অবশ্যই কাউন্সিলের বেছে বেছে শাস্তিবিধান নীতি। কাউন্সিল বিগত একবছরে প্রায় ডজন খানেক চিকিৎসকের রেজিস্ট্রেশন বাতিল করেছে কিন্তু প্রায় প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে হাইকোর্ট কাউন্সিলের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন। একটি দুটি ক্ষেত্রে কোর্ট কাউন্সিলকে ভর্তসনা করেছে ও একজন চিকিৎসককে কাউন্সিলের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরনের মামলা করার আদেশ দিয়েছেন, বলে জানা গিয়েছে। খুব স্বাভাবিক কারনে চিকিৎসকরা কাউন্সিলের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েন ও তার বর্তমান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন।
নির্বাচনের প্রাক্কালে ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টর্স ফোরাম হাইকোর্টে একটি পি আই এল দাখিল করে অভিযোগ করে যে বর্তমান কাউন্সিলের নেতৃত্বে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব নয় এবং মহামান্য আদালতের পর্যবেক্ষণে ভোট পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু, বহুবার আদালতের দৃষ্টি আকর্ষনের চেষ্টা করেও সেই আবেদনের শুনানী সম্ভব হয় নি। ইতিমধ্যে ভোট প্রক্রিয়া চলাকালীন ক্ষমতাসীন কাউন্সিলের কিছু সদস্য চিকিৎসকদের মধ্যে ভীতি উৎপাদনের চেষ্টা করেন। একজন সার্জেন সদস্য তো প্রকাশ্যে বলে বেড়াচ্ছেন যে তিনি আমাকে "ফিনিশ করে দেবেন"। যাইহোক যতদিন ফিনিশ করতে পারছেন না, ততদিন চিৎকার করতে অসুবিধা নেই। তাছাড়া ফিনিশের দায়িত্ব ভগবান কবে এই সব এলেবেলে সার্জেন আর তাদের নেতাদের দিয়েছেন জানিনা। কিন্তু, তাদের এইসব হুমকিতে চিকিৎসকরা যে মোটেই চিন্তিত নন, তা বলাই বাহুল্য।
এই অবস্থায় মেডিক্যাল কাউন্সিল ভোটের প্রচারে চিকিৎসকদের যুক্তমঞ্চ পুরোদমে নেমে পড়ে। কিন্তু গত দুদিনে কিছু অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে। শিক্ষক কেন্দ্রের ভোটারদের কাছে ব্যালট পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০ তারিখে। গভীর বিস্ময়ের ব্যাপার হল এই যে তাদের অনেকের কাছে ব্যালটের খাম পৌঁচেছে কিন্তু তার মধ্যে ব্যালট পেপারটি অন্তর্ধান করেছে। প্রায় কোন পারা-ক্লিনিক্যাল ও প্রি-ক্লিনিক্যাল শিক্ষকের কাছেই ব্যালট পেপার পৌঁছয় নি। ক্লিনিক্যাল শিক্ষকদের বেশির ভাগের কাছেই ব্যালট পৌঁচেছে। ব্যালট পেপারের এই অনির্দেশ মিস্ড এবরশন নিয়ে যখন জেরবার তখন জানা গেল যে জেনেরাল ক্যাটেগরির ভোটারদের কাছে ব্যালট পৌঁচেছে কিন্তু তাদের কারো কারো মধ্য নাম বা অন্ত্য নামে গোলমাল। কারো লিঙ্গ পরিবর্তন হয়ে গেছে। ফলে ব্যালট তাদের ছোঁয়া দিয়ে চলে গেলেও তারা তা সংগ্রহ করতে পারেন নি।
আমরা রিটার্নিং অফিসারের কাছে ব্যাখা চেয়েছিলাম। তাঁর ব্যাখাটি রূপকথার মত সুন্দর সৃষ্টি। তিনি বলছেন- ছাপাখানা থেকে ব্যালট নাকি সরাসরি জিপিওতে গেছে। সেখানে কে ব্যালট খামে ঢুকিয়েছে তিনি বলতে চাননি কিন্তু বলছেন যে তাঁর অফিসাররা নাকি খুব সুন্দর পর্যবেক্ষণ করে মৌখিক রিপোর্ট দিয়েছেন যে ব্যালট খামবন্দী হয়েছে সুচারুরূপে। তাঁর আরো মত যে তাঁর পাঠানোর দায়িত্ব ছিল তিনি পাঠিয়েছেন। এর পরে যা হচ্ছে তার জন্য তিনি দায়ী নন। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল তিনি বলছেন যে মধ্য নাম ও অন্ত নামের গরমিল সম্ভব নয় কারন ভোটার লিস্ট অনুযায়ী নামের স্টিকার তৈরী হয়েছে। এই অবস্থায় স্বয়ং ব্যোমকেশ বা ফেলুদা ছাড়া কারো পক্ষে এই রহস্য ভেদ করা সম্ভব নয়।
এই অবস্থায়, আমরা মনে করি বর্তমান রিটার্নিং অফিসারের দ্বারা অবাধ ও নিরপেক্ষ ভোট পরিচালনা সম্ভব নয়। আমরা মহামান্য আদালতের শরণাপন্ন হয়ে তার কাছে অবাধ ও নিরপেক্ষ ভোটের জন্য কোর্টের হস্তক্ষেপ চাইবো। পাশাপাশি রাজ্য সরকারের কাছে আমাদের আবেদন: নিরপেক্ষতার স্বার্থে বর্তমান কাউন্সিলকে বরখাস্ত করা হোক ও অবাধ ভোটের উপযুক্ত পরিবেশ রচনা করা হোক। যে বা যারা প্রার্থী ও চিকিৎসকদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে হুমকি দিচ্ছে সরকার তার তদন্ত করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিক। সরকারের ভাবমূর্তির তুলনায় মেডিকেল কাউন্সিলের ভোট তুচ্ছ। আমরা যারা স্বাস্থ্য বিতর্ক তুলে ধরার চেষ্টা করছি তারা কেউ সরকার বা বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রতিপক্ষ নই, বস্তুত: আমরা সরকারের প্রকৃত বন্ধুর মত দৃষ্টিকটু বিষয়ে তার মনোযোগ আকর্ষন করছি। প্রশাসনিক প্রধানরা কিভাবে সরকারের মানহানি করতে পারেন সাম্প্রতিক কালে তার অনেক উদাহরণ তৈরী হয়েছে। এই সব অভিযোগ আমরা দীর্ঘদিন করছিলাম। সরকার মনোযোগ দিলে তার সুনাম বাড়ত। তাই, চাটুকাররা নন, আমরাই সরকারের প্রকৃত বন্ধু।

এইমাত্র জানা গেল অন্ততঃ একজন অচিকিৎসক ব্যালট পেয়ে থানায় অভিযোগ করেছেন। চিকিৎসকরাও অভিযোগ জানাতে অনীহা প্রকাশ করছেন, অথচ এই অশীতিপর বৃদ্ধ সরাসরি অভিযোগ জানিয়ে আমাদের কৃতজ্ঞ করেছেন। তাঁকে প্রণাম জানাচ্ছি।
_____________________________

ডা.রেজাউল করীম। প্রখ্যাত ভারতীয় বুদ্ধিজীবি। চিন্তক। লোকসেবী চিকিৎসক।

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়