RAHANUMA NURAIN AONTY
Published:2026-02-23 20:20:12 BdST
আমাদের তথা অতীতের জেন-এম দের কথা
DESK
___________________
তুষার মুখার্জি র অনন্য লেখা পাঠকদের দরবারে
___________________________________
আদ্যিকাল থেকে আমরা আপন রূপমুগ্ধ প্রজাতি।
আপনি রূপেই দেবতাদেরও কল্পনা করেছি এমনকি ভূত পেত্নী বা শয়তানদেরও একটু এদিক-ওদিক করে ক্ষান্ত দিয়েছি। আর দানিকেন সাহেবের এলিয়েন তথা ভিন গ্রহের গ্রহণ অতি উন্নত প্রাণী? তারাও আমাদের মতই । সামান্য একটুখানি বদল না হলে চিনতে গোলমাল হয়ে যাবে তাই একটুখানি ও অদলবদল করা।
এমনকি রোবটও বানানো হয়েছে আমাদের মত করেই।
এবার সেই যান্ত্রিক রোবট তথা স্যাম্পিয়ন্সদের মাথার খুলিতে আমরা পুরে দিচ্ছি আমাদের পরম গর্বের জিনিস, আমাদের বুদ্ধিমত্তা। বৈদ্যুতিন রূপে। পরে এই বৈদ্যুতিন বুদ্ধিমত্তাকে মহাকাশে বিচরণরত ডাটা সেন্টারের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে।
করে?....... আমাদের স্যাপিয়েন্সদের ইতি?
বিবর্তনের শেষ ধাপ?
রক্তমাংসের দুর্বল দেহী নড়বড়ে রোগা ভোগা আধ পাগলা মানুষরা টিকে থাকবে, না টিকে থাকবে টাইটানিয়ামের দেহে বৈদ্যুতির মস্তিষ্ক নিয়ে আমাদের যান্ত্রিক প্রতিরূপ?
ইহাকেই বিবর্তন কহে?
কুড়ি লক্ষ বছর দাপটে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়িয়েছিল হোমো ইরেক্টাসরা। আর আমরা উন্নত বুদ্ধিমত্তা নিয়ে এক লক্ষ বৎসরেই লোপাট হবার পথে। তাহলে কি উন্নত বুদ্ধিমত্তাই আমাদের সর্বনাশের মূলে?
আমাদের উন্নত বুদ্ধিই আমাদের সর্বনাশের কারণ?
আমাদের বুদ্ধি আসলে আমাদের ভুল পথে চালাচ্ছে?
কবে থেকে এই সর্বনাশা বুদ্ধিমত্তা আমাদের মগজে ঢুকলো?
বেশি না মাত্র ১ লক্ষ বছর আগে।
একটি জেনেটিক মিউটেশন নোভা-১হিউম্যান এই সর্বনাশের মুলে।
নোভা-১ হোমো ইরেক্টাস সহ নিয়েন্ডারথল থেকে ডেনিসোভান সবার মস্তিষ্ক গঠনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে। শুধু আমাদের বেলা এক লক্ষ বছর আগে হঠাৎ তার একটা আপডেট এসে গেল নোভা-১হিউম্যান।
আর আমাদের গোটা মগজটাই উলটপালট হয়ে গেল। আমরা হয়ে গেলাম যে জেন-এম। এম ফর মডার্ণ।
অন্য কেউ বলেনি, অন্য কারোর বলার তোয়াক্কা রাখিনি আমরা, নিজেরাই ঢাকঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করেছি আমরা আধুনিক মানব। উন্নত মস্তিষ্কের উন্নত বুদ্ধিমত্তার অধিকারী মানবজাতি। আমরা হোমো ইরেক্টাসদের আধিপত্যবাদ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিয়েছি।
সে এক বিশাল আন্দোলন হয়েছিল। বিশাল বিপ্লব হয়েছিল । গোটা পৃথিবী উলটপালট করে দিয়ে আমরা নিজেদেরকেও ওলটপালট করে দিয়েছি।
তা সেই আন্দোলনের নেতা কে ছিল? অর্থাৎ কে সেই লোক যার মস্তিষ্কে এই প্রথম নোভা-১ হিউম্যান অ্যালেলের আবির্ভাব হল?
তার জন্মস্থান কোথায়?
সে নারী না পুরুষ?
জাতি কি?
ইত্যাদি ইত্যাদি এবং ইত্যাদি
সেই শুরুটা কি আমরা জানতে পেরেছি?
না।
কেন না? তদন্ত হচ্ছে? তদন্ত এগোচ্ছে? কবে জানতে পারবো? আদৌ কোনোদিন জানা যাবে?
না।
ষড়যন্ত্রী অপদার্থের দল। সত্য লুকোতে ওস্তাদ।
জানা যাবে না কেন?
এই সত্যটা জানার জন্য প্রাইমারি স্কুলে পড়াটা আবার নতুন করে পড়ে আসতে হবে।
পড়ি একটু
আমাদের মানে আধুনিক সেপিয়েন্সদের বয়স আগে ছিল আনুমানিক ২ লক্ষ ৫ হাজার বৎসর। বার্থ প্লেস পূর্ব আফ্রিকা। ইথিওপিয়া।
আরে ধুর! কবেকার বার্থ সার্টিফিকেট এটা? পোকায় খাওয়া । ভালো করে পড়াও তো যায় না।
SIR ERO সেই বার্থ সার্টিফিকেট নাকচ করে দিয়েছেন।
তাদের নতুন আপডেট করা নির্দেশ বলছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য সার্টিফিকেট হল ২০১৭ তে আপডেট করা বার্থ সার্টিফিকেট।
২০১৭ আপডেটেড বার্থ সার্টিফিকেট:-+++-
তিন লক্ষ বৎসরের প্রাচীন স্যাপিয়েন্স দেহাবশেষ পাওয়া গেছে মরক্কোর জেবেল ইরহুদ গুহাতে। পূর্ব আফ্রিকার বদলে উত্তর আফ্রিকায়।
গুহাবাসের খোঁজ পাওয়া গিয়েছিল 2004 এ । তারপরে খনন অনুসন্ধান এইসবের লম্বা সময় পার করে পাঁচটি আংশিক কঙ্কাল ও পাথরের হাতিয়ার ঘেঁটে থার্মোলুমিনেসেন্স পরীক্ষা করে ২০১৭ তে জানা গেল বয়স তিন লক্ষ বছর।
বেশ বেশ ।
তা তিন লক্ষ বছর আগের মানুষদের চেহারা কি রকম ছিল? আমাদের মত না তাদের চারটে হাত পাচটা ঠ্যাং ছিল?
না না। দেখা হয়েছে। বেশ যত্ন করে দেখা হয়েছে খুলি চোয়ালের হাড় আর দাঁত থেকে পরিষ্কার বোঝা গেছে তারা আমাদের মত মানুষ তথা স্যাপিয়েন্সি ছিল।
তবে হুবহু এক ছিল না। এট্টুস ফারাক ছিল।
একদম আমাদের মত না হলেও প্রায় আমাদের মত। আরো আগেকার হোমিনিনদের মতো তাদের মুখ সামনের দিকে এগিয়ে ছিল না । এখনকার মতো খুলির নিচেই ছিল। তাদের গাল আমাদের মতই চ্যাপ্টা ছিল। এমনকি তাদের থুতনিও ছিল।
শুধু খুলিতে একটু গোলমাল। তাদের খুলি আমাদের মত গোলাকার ছিল না । খুলি ছিল একটু লম্বাটে, উপরের দিকে উঁচু গোল না হয়ে একটু নিচু আর পেছনের দিকে ঢালু ছিল। তা একটু উপরের দিকে চাপা থাকলেই বা কোন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায়। আরে পৃথিবীটাই তো উত্তর-দক্ষিণে কিঞ্চিত চাপা। সেই বেলা তো কোন দোষ ধরি না।
গোলমাল একটাই ছিল। বড় গোলমাল। খুলির আকার গোল না হওয়া অবধি আধুনিক মস্তিষ্ক তৈরি হয়নি সেটা নিশ্চিত।
এইতো। পয়েন্ট । পয়েন্ট।
আগে খুলি গোল না আগে মস্তিষ্কের পূর্ণতা? কোনটা আগে?
জেন-এম হতে হলে দুটোই তো দরকার। অথচ বলছেন একটা না হলে আরেকটা হবে না। দানিকেন ফ্যাক্টর?
না।
না হলে বলতে হবে কে সেই মহান নেতা যার একসঙ্গে দুটোই হয়েছিল। গোল খুলিতে পূর্ণ আধুনিক মস্তিষ্ক।
আজগুবি কথা কল্পনা করে কোন লাভ নেই। একসাথে একজনের মধ্যে দুটো একত্রে ঘটার কোন সম্ভাবনা নেই। কারণ দুটো ঘটনাই জিন নিয়ন্ত্রিত। আর আর জিন কাজ করে অতি ধীর গতিতে এলোমেলো পদ্ধতিতে। এলোমেলো লক্ষে। তার থেকে বেছে নিতে হয় বিশেষ প্রয়োজনীয় টুকুকে। অনেক লম্বা সময় লাগে । অনেক নমুনা লাগে । অনেক বাতিল হয় । তারপরে শেষ পর্যন্ত ফিনিস প্রোডাক্ট বের হয়ে আসে। এবং ফিনিশ প্রোডাক্টটিও আসলে ফিনিশ প্রোডাক্ট নয় সেটা তখনও বদলাতেই থাকে অন্ধ জিন তার নিজের মন মর্জি মতো উলটপালট করে যেতে থাকে অনবরত।
কাজেই সেই প্রাচীন প্রায় আধুনিক মানুষদের লম্বা খুলি গোল হওয়ার পর্ব আর তার মধ্যে উন্নতম মস্তিষ্কের সংগঠন প্রক্রিয়া চলেছে দীর্ঘ ১ লক্ষ বছর ধরে গোটা আফ্রিকা মহাদেশ জুড়ে হাজার হাজার প্রায় আধুনিক মানুষদের নিয়ে।
দুই লক্ষ বছর ধরে আফ্রিকার প্রায় আধুনিক মানুষেরা গোটা আফ্রিকায় ছড়িয়ে গেছে। চষে বেড়িয়েছে। মাইগ্রেশন করেছে। তখন মাইগ্রেশনে পাসপোর্ট ভিসার বালাই ছিল না তাই কোন অসুবিধা হয়নি।
যার যখন ইচ্ছে হয়েছে ভালো খাবার খোঁজে ভালো সঙ্গীর খোঁজে যেখানে খুশি সেখানে চলে গেছে।
নতুন জায়গায় গিয়ে নতুন লোকেদের সঙ্গে মিশেছে নতুন সংসার পেতেছে । তার পুরনো জিন নতুন লোকেদের নতুন জিনের সাথে মিশিয়ে দিয়েছে।
এই মিশ্রিত খিচুড়ি জিনের অধিকারীই আমাদের জেন-এম ফর মডার্ন স্যাপিয়েন্স। এনাটমিকালি মডার্ন স্যাপিয়েন্স।
এই বিবর্তন এই পরিবর্তন কোন একক নেতা বা দলের গোষ্ঠীর কৃতিত্ব ছিল না এটা ছিল একেবারে প্রকৃত জন আন্দোলন।
2 লক্ষ বছর পরে তাদের খুলি গোল হল তাদের গোলাকার খুনির ভেতরে নোভা-১ হিউম্যান অ্যালেলে সৃষ্টি করল এক সুগঠিত সংগঠিত মস্তিষ্ক। যা যুক্তিসঙ্গত বিমূর্ত ভাবনায় সক্ষম।
পৃথিবী পেল বুদ্ধিমান আধুনিক মানব গোষ্ঠী।
তাদের ভাষা?
ভাষার জন্য প্রয়োজনীয় জিন সেই প্রায় আধুনিক স্যাম্পিয়েন্স এর মধ্যেও ছিল যেমন ছিল তাদের অন্য দুই সহচর নিয়েন্ডারথল ও ডেনিসোভানদের মধ্যেও।
কিন্তু সমস্যা ছিল তাদের স্বরযন্ত্র আর ঠিক তার ওপরের থাকা ছোট্ট গোলাকার হয়েড অস্থিটি যথাস্থানে এবং যথাযথ গোলাকার ছিল না । ফলে স্বরযন্ত্রের মাধ্যমে স্বরযন্ত্রের আওয়াজ বের হলেও তার বৈচিত্র ছিল খুবই সীমিত।
সেই আদ্যিকালের মানুষদের সীমিত বৈচিত্রের কয়েকটি শব্দ দিয়ে চারপাশের জীব-জীবন বৈচিত্র্যের নামাকরণ চিহ্নিত করণ ও নিজেদের মনোভাব প্রকাশ ছিল অসম্ভব। সেই সীমিত শব্দে পরস্পরের মধ্যে একটা যোগাযোগ সম্ভব হলেও সেটা ছিল অতি নিম্ন স্তরের।
জেবেল ইরহুদ গুহাবাসীদের পাথরের অস্ত্র ও সেখানে পাওয়া পশুর হাড় ইত্যাদি দেখে বোঝা গেছে তারা আগুনের ব্যবহার করত নিয়মিতভাবে। দলবদ্ধভাবে শিকার করত এবং সেই শিকার আর খাদ্যের, তার সাথে সম্ভবত নিরাপত্তারও প্রয়োজনে তারা একই জায়গায় দলবদ্ধভাবে বসবাস করত । সব মিলিয়ে বলা যায় তাদের একটি সামাজিক জীবন ছিল।
এই জেবেল ইরহুদ গুহার প্রায় আধুনিক স্যাপিয়েন্সের অস্তিত্ব জানার পরে বেশ কিছু কাল আগে থেকে পাওয়া এবং না বোঝা নানা তথ্য মিলিয়ে আফ্রিকার সেই প্রথম দিকের ঘটনাবলীর একটি নতুন যুক্তিযুক্ত সত্য এখন বের হয়ে আসছে।
সেই পরম সত্যটি হইল এতকাল আমরা যাহা জানিতাম তাহা ভুল জানিতাম
বিবর্তন বিশেষ করে আজকের এই আলোচ্য মানব বিবর্তন সিঁড়ি ভাঙ্গার মত ধাপে ধাপে উত্তরণ বা অবতরণ কোনটাই নয়।
সিঁড়ির মত নয়? তবে কি সেই আরেকটি ধারণা ডালপালা ছড়ানো গাছের মতো?
না তাও না
গাছের উপমায় বলা হত একটি গুড়ি হল প্রধান প্রজাতি আর তার শাখা প্রশাখা বৈচিত্র্যময় বিভিন্ন প্রজাতি মানবপ্রজাতিতে সেই গুঁড়ি হবে মানব প্রজাতি আর তার বহু শাখা প্রশাখা হবে তার নানা বিবর্তিত জাতি।
মনোমত?
যুক্তিতে সমস্যা দেখা দিয়েছে। আধুনিক মানবদের বিবর্তনের সেই গাছের উপমা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না।
আফ্রিকায় এখন যেমন নানা ধরনের আধুনিক জাতিগোষ্ঠী দেখা যায় অতীতে তার চেয়েও বহু গুণ বেশি জাতি গোষ্ঠীর দেখা গিয়েছিল যারা বিবর্তনের বিভিন্ন স্তরে বৈচিত্র্যময় দৈহিক রূপের অধিকারী ছিল। তাদের দেহাবশেষ ও সময় রেখা মিলিয়ে কোন অভিন্ন চিত্র দাঁড় করানো সম্ভব হচ্ছিল না
ভাবা হলো আমাদের পরিচিত মাত্র এক লক্ষ বছরের ইতিহাসে যদি এত বৈচিত্র থাকে তবে অতীতের 2 লক্ষ বছরের তার বহুগুণ বেশি বৈচিত্র থাকবে। কারণ জনগোষ্ঠীগুলি পরস্পরের থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন ছিল।
এবার তারা সবাই গেল কোথায়? জেনেটিক তথ্য বলে কিছুই বিলুপ্ত হয়নি । অদেখার পরিমাণ অতি সামান্য। তাহলে লোক গুলো গেল কোথায় ? কেন তাদেরকে আমরা দেখতে পাচ্ছি না?
এই সমস্যার সমাধানে নতুন তত্ত্ব বলছে আফ্রিকায় থাকা সেপিয়েন্সরা ছিল গোটা আফ্রিকা জুড়ে একটা জালের মত।
জালের সুতো তাদের জিন আর জালের খোপগুলো তাদের ছোট ছোট জনগোষ্ঠী।
এই সুতো আর খোপ জুড়ে গঠিত জাল থেকেই আমাদের আধুনিক সেপিয়েন্স মানব গোষ্ঠী তথা, জেন-এম দের উৎপত্তি।
জেন-এম এর কোন একক নেতা ছিল না । কোন একক দল ছিল না।
আধুনিক স্যাপিয়েন্স এর কোন একক পিতা বা মাতা ছিল না। একক জনগোষ্ঠী ছিল না। সম্ভব নয়।
একনায়ক তন্ত্র নয় দলীয় গণতন্ত্র ও নয় জনগনতন্ত্রই ছিল আমাদের মানব জাতির অতীত।
আপনার মতামত দিন:
