DESK
Published:2026-01-19 19:50:30 BdST
"যে মহিলাকে আমি পাত্তাই দিতাম না, উনি পৃথিবীতে সেরা তিনজনের মধ্যে একজন"
তারিক হক
ডেস্ক
____________________
তারিক হক জার্মানী প্রবাসী একজন বিদগ্ধ লেখক ও সাহিত্য উপাসক। অনবদ্য লেখেন তিনি। তার "অহংকার- " শিরনামের লেখাটি প্রকাশ হল।
-----------------------
-অহংকার-
__________________
আমি তখন রাশিয়াতে ছিলাম। হেলিকপ্টারের ড্রাইভারি করতাম।
যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালিয়ে পড়তাম কতবার মুড়ির টিনের বাসে চেপে গুলিস্তান -সদরঘাট গিয়েছি তার হিসেব নেই।
যাহোক, আমার হেলিকপ্টারটি মুড়ির টিনের বাসের চেয়ে বেশ বড় ছিল। ২৪ জন প্যাসেঞ্জার নিতে পারতাম ( MI-8 Helicopter ) ।
পাইলটের ইউনিফর্ম পরে যখন ঘুরে বেড়াতাম সবাই তাকিয়ে দেখত, বিশেষ করে মেয়েরা। গর্বে বুক ফুলে উঠত, নাক উঁচু হয়ে যেতো।
আমার পাশের বাড়িতে থাকতেন গালিনা নামে এক রাশান ভদ্রমহিলা। ষাটের উপরে বয়স, বিধবা, একা থাকতেন। ভদ্রমহিলা খুব যে একটা সুন্দরী ছিলেন তাও না ।
উনি কয়েকবার চেষ্টা করেছিলেন আমার সাথে আলাপ করতে, আমি পাত্তা দেই নি।
আমি তো পাইলট, তাই না।
কাজের শেষে বাসায় ফিরে দেখতাম উনি দুয়ারে দাঁড়িয়ে দূর থেকে একটি গোলাকার ফলকের দিকে ছুরি নিক্ষেপ করছেন। এই ধরণের খেলা আমি শুধু সার্কাসে দেখেছি।
একজন সুন্দরী যুবতী ঘুরন্ত পাটাতনে দাঁড়িয়ে থাকেন, চোখ বন্ধ করে এক ভদ্রলোক তার দিকে ছুরি ছোঁড়েন।
প্রতিবারই দর্শকরা ভয়ে চিৎকার দিয়ে উঠেন। ছুরি কিন্তু একটাও গায়ে লাগে না।
যাহোক আমার প্রতিবেশিনী কি এই বৃদ্ধা বয়সে সার্কাসে নামবেন ?
মানুষের কত ধরণের সখই না থাকে।
আমার চেনা এক পাইলট একটি ক্যালকুলেটর কিনেছিল যেটা কথা বলে। ৪ দিয়ে ৪ পুরণ করলে সেই ক্যাল্কুলেটর কথা বলে উঠত ৪ পূরণ ৪ সমান ১৬।
আমি জানি , অনেক মানুষের মাথায় স্ক্রু থাকে না, কিন্তু এই রকম মাথা খারাপ আমি জীবনে দেখি নি, যে কিনা হিসেব করতে কথা বলা ক্যাল্কুলেটর ব্যবহার করে।
তো এভাবেই দিন যাচ্ছিল। হঠাৎ আমার প্রতিবেশিনী ভদ্রমহিলা একদিন নক করলেন আমার দরজায়।
দরজা খুলতেই বললেন, আমি কালকে কয়েকদিনের জন্য ফ্রান্সে যাচ্ছি। আপনি দয়াকরে আমার বাড়িটির দিকে একটু নজর রাখবেন ?
আমি হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক আছে বলে দরজা বন্ধ করলাম।
ভদ্রতার খাতিরে জিজ্ঞেসও করলাম না ফ্রান্সের কোথায় যাচ্ছেন, কতদিনের জন্য যাচ্ছেন।
হুম, আমি পাইলট তো, আকাশে উড়ি। এই ধরণের সাধারণ লোকের সাথে আমার কথা বলার কি আর সময় আছে ?
কয়েকদিন পর দেখলাম উনি একটি বিরাট বড় গাড়িতে ফিরে এলেন। হুম, আমার বয়েই গেছে জানতে উনি ফ্রান্সের কোন সার্কাসে গিয়েছিলেন।
এর মাঝে একদিন প্রচুর বরফ বৃষ্টির মধ্যে আমাকে ফ্লাই করতে হয়েছিল। অনেক কষ্টে যখন ল্যান্ড করতে গেলাম হেলিকপ্টারের পাখা টাচ করলো ইলেকট্রিক তারে, বেকায়দায় ল্যান্ড করতে গিয়ে মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা পেলাম।
যাহোক মাথা গেলে কি হবে হেলিকপ্টারকে তো বাঁচালাম।
মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়ে বাসায় বসে ইন্টারনেটে ঢুঁ মারছি।
হঠাৎ একটি ছবি দেখে চোখগুলি থেমে গেলো।
আমার প্রতিবেশিনীর ছবি। “World championship in knife throwing“ এ তৃতীয় আর “European championship“ এ প্রথম।
ভুল দেখছি না তো ?
যে মহিলাকে আমি পাত্তাই দিতাম না, উনি পৃথিবীতে সেরা তিনজনের মধ্যে একজন। সেই মুহূর্তে কড়া নেড়ে উঠলো।
কে এলো এই অসময়ে ? কে আবার ? আমার প্রতিবেশিনী।
আমাকে দেখে বলে উঠলেন, আপনাকে কয়েকদিন ধরে দেখি না। অফিসে যান না। আপনি ভালো আছেন তো ?
আমি কিছু না বলে তার ছবিটি এগিয়ে দিলাম। বললাম , এটা আপনি ? উনি লজ্জায় মাথা নিচু করে বললেন, হ্যাঁ।
আপনি ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন, ওয়ার্ল্ড কম্পিটিশনে ব্রোঞ্জ মেডেলের অধিকারিণী, অথচ আমাকে একবারও বলেন নি।
উনি আমার পাইলটিয় উন্নাসিকতাকে ভেঙে চুরমার করে বললেন,
এতে বলার কি আছে ?
( ভারতেও "চন্দ্র তোমার" নামে এক বৃদ্ধা শুটার রয়েছেন যিনি ৩০ বারের উপরে ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছেন। তাই পাঠক অহংকার করবেন না, অহংকার পতনের মূল)
#
আপনার মতামত দিন:
