RAHANUMA NURAIN AONTY
Published:2026-01-14 20:26:28 BdST
এরিক ফন দানিকেন :কল্পনার জগতে এক নতুন ধারার ধারণার প্রবর্তক
তুষার মুখার্জির লেখা: লেখকের সৌজন্যে
_________________________________
১১ জানুয়ারি ৯০ বৎসর বয়সে মারা গেলেন প্রখ্যাত লেখক এরিক ফন দানিকেন।
তিনি লেখার জগতে কল্পনার জগতে এক নতুন ধারার ধারণার প্রবর্তক ছিলেন।
ওনার লেখা থেকেই আমরা জেনেছি ভিনগ্রহ থেকে আসা অ্যালিয়েনরা পিরামিড বানিয়েছিল, ইনকার পাহাড়ি গুহায় পাহাড় প্রমান সোনা রয়েছে, এবং নাজমা মরুভূমি সম এলাকায় কিলোমিটার মাপের সুচিত্রা অঙ্কন করে গেছে।
ওনার "অনুপ্রেরণায়" আমরা ভাবছি
মহেঞ্জোদারো শহরে পারমাণবিক বিষ্ফোরন ঘটেছিল। আর ইলোরার কৈলাস মন্দির বানিয়েছিল সেই মহান অ্যালিয়েনরা। এবং মেসোপটেমিয়ার গিলগামেশ মহাকাশ যাত্রা করেছিলেন। সুমেরু সভ্যতার তথা গোটা মানব সভ্যতার জন্ম দিয়েছিল নুব্রা গ্রহের অ্যালিয়েনরা।
এক কথায় তাঁর লেখা আমাদের কল্পনার জগতের দরজা এতটাই হাট করে খুলে দিয়েছিল যে তার সামনে কল্পবিজ্ঞান যেকোন চার প্রকৃত বিজ্ঞানও হার মেনে যাবে।
বিজ্ঞানের সাথে তিলমাত্র সম্পর্ক নেই এমন কিছু যুবক পাড়া চায়ের দোকানে লোকাল ট্রেনের ভিড়ে গলা উঁচিয়ে প্রমাণ করে দিতে থাকলেন ক্রমাগত,.... মহাকাশ থেকে আসা এলিয়েন নিয়ে নানা তথ্য।
না শুধু দানিকেনের যৌবন বয়সে, যখন তার লেখা বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে তখনই নয়, যখন তার লেখা থেমে গেছে, তিনি লেখা ছেড়ে অ্যামিউজমেন্ট পার্ক চালানোতে বেশি মনযোগী হয়েছেন, তাঁর কথা আর বিশেষ আলোচনা হয় না, তখনও বহু লোক তাঁর বলে যাওয়া এলিয়েন তত্ত্বে ভরসা রাখেন প্রায় ধর্মপ্রাণ ভক্তের অন্ধবিশ্বাসের মত।
এই দানিকনেরে ভক্তরা এখনো তর্ক করেন পিরামিড বানিয়েছিল এলিয়েনরা কৈলাস মন্দির বানিয়েছিল এলিয়েনরা মহেঞ্জোদারোতে পারমাণবিক বোমা ফাটিয়েছিল এলিয়েনরা
আপনি যতই তথ্য দেখান বই দেখান খবরের কাগজ দেখান তাঁরা দানিকানের বলা কথা থেকে এক পা ও নড়বেন না। তাঁরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন দানিকেনের বলার মতই আবার এলিয়েনরা আসবে পৃথিবীতে ।
এরিক ফন দানিকেন ১৯৬৮ তে চ্যারিয়টস অফ দ্য গডস লিখে এলিয়েনদের পৃথিবীতে আগমনের কথা প্রথম জানাতে শুরু করেন এই প্রথম বই প্রকাশ অবশ্য সহজে হয়নি। প্রকাশক পাওয়া কঠিন ছিল। যাও পাওয়া গেল তারপরেও প্রকাশক শর্ত দিলেন, গোটা বই ঝেড়ে নতুন করে লিখতে হবে। এবং প্রকাশক একজন পেশাদার লেখক জোগাড় করে দিলেন।
সেই পেশাদার লেখক দানিকেনের ড্রাফট লেখাটিকে আগাও পাশতলা বদলে নতুন করে লিখে দিলে বইটি প্রকাশিত হলো চ্যারিয়টস অফ দ্যা গডস নামে।
এবার দানিকানের প্রথম বইটি সত্যি কতটা দানিকেনের নিজের, সেটা বলা একটু কঠিন। কারণ ড্রাফ্ট বইটা তো আমরা কেউ দেখিনি ।
যাই হোক সেই প্রথম বই চ্যারিয়ট্স অফ দ্যা গডস দিয়েই তিনি আমাদের বিশ্বাস করান পিরামিডের মত বিশাল স্থাপনা মানুষ বানাতে পারে না। সেটা এলিয়েনরা বানিয়েছিল। সেই একই থিমে তিনি পরপর ২৪টি বই লেখেন এই বইগুলো ৩২ টি ভাষায় অনুবাদ হয়ে ছয় কোটি কপি বিক্রি হয়। আর্থিক দৈন্যতা ঘুচে তিনি ধনবান ব্যাক্তি হয়ে যান।
১৯৩৫ সালে সুইজারল্যান্ডে জন্ম নেওয়া দানিকেনের কর্মজীবন শুরু হয়েছিল একটি হোটেলের ওয়েটার হয়ে। আর্থিক দৈন্য তাঁকে সৎ থাকতে দেয়নি। ফলে নানা আর্থিক অপরাধে তিনি কারাবাসেও কাটান বেশ কিছু সময়।
দানিকেনের ছোটবেলার সমাজ ছিল ধর্মীয় গোঁড়ামির সমাজ। তার সাথে ছিল প্রবল আর্থিক অনটন। দুই-এ মিলে তার ছোটবেলা মোটেই সুখকর ছিল না। হয়তো তিনি সেই অন্ধকার জীবন থেকে পালাতে কল্পনার জগতে আশ্রয় নিয়েছিলেন সেই কল্পনার জগতে তাঁকে উদ্ধার করতে এগিয়ে এলো ভিন্ন জগতের ভিন্ন মানসিকতার মানুষেরা, এলিয়েনরা।
তিনি তার কল্পনার জগত আমাদের সামনে মেলে ধরেছিলেন তার লেখার মধ্যে দিয়ে। সে লেখায় ডালপালা মেলে ছিল ছদ্মবিজ্ঞান ছদ্ম প্রত্নতত্ত্ব আর দুই মিলে এক ছদ্ম ইতিহাস।
লেখক এরিখ ফন দানিকেল আমাদের উপহার দিলেন এক ছদ্মইতিহাসের জগত। আমরা সেটাই গ্রহণ করলাম সত্য বলে ।
কেন এই প্রশ্নহীন ভাবনায় তার লেখা গৃহীত হলো জনমানসে?
আসলে দানিকেন খুব নতুন কিছু আমাদেরকে দেননি অনেকটা সেই প্রবাদ বাক্যের মত নতুন বোতলে পুরোনো
মদ পরিবেশন।
দানিকেল আমাদের যা বলেছেন আমাদের ধর্মগ্রন্থগুলো এতকাল আমাদের সে কথাই বলে এসেছে। দেবতারা আকাশ থেকে এসেছে এবং আমাদের যা কিছু ভালো যা কিছু উন্নত সবই তাদের কল্যাণে আমরা পেয়েছি।
দানিকেন তাই বলেছেন। শুধু দেবতাকে বলেছেন তাঁরা এলিয়েন আর স্বর্গলোককে বলেছেন সেটি একটি বিশেষ গ্রহ।
ব্যাস আর তো কিছু পাল্টাননি।
নতুন কল্পনার জায়গা খুব একটা বেশি থাকলো না।
চির পরিচিত ধর্ম কথা আরেকবার শোনানো হল দানিকেনিয় ভাষায়।
দানিকেনকে নিয়ে আলোচনায় অনেকে বলেন তিনি ধর্মীয় গোড়ামির খাচা ভেঙ্গে বের হতে চেয়েছিলেন।
আমি মনে করি, না , তিনি সেটা করেননি। তিনি তাঁর পরিচিত ধর্মের খাঁচার ভেতরেই আরেকটি সুন্দর খাঁচা তৈরি করেছিলেন।
সেই খাঁচায় আমরা আমাদের বোধ বুদ্ধিকে বিনা শর্তে বসবাস করতে দিয়েছি।
হয়তো দানিকেন যদি দু হাজার বছর আগে জন্ম নিতেন তবে হয়ত তিনি একজন ধর্মপ্রচারক হিসেবেই আজ পরিচিত হতেন।
চিত্রকৃতজ্ঞতা
লেখার সাথের ছবির মালিক : মিশেল মানাস। নিজস্ব কাজটি সংগৃহীত হয়েছে উইকিমিডিয়া কমন্স এর সৌজন্যে।
আপনার মতামত দিন:
