Ameen Qudir

Published:
2019-09-16 09:28:07 BdST

আমি কি হাসতে পারবো, আমি কি কাঁদতে পারবো?


মডেল ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।


ডা. মো. সাঈদ এনাম

__________________________

 

আমার বিয়ে হয় যখন আমার বয়স আঠারো বছর সাত মাস। আমরা পিঠাপিঠি দুই বোন। বড় বোনের বিয়েতে আমার ননদ আমাকে দেখে বেহুশ হয়ে যান। আসলে তিনি বেহুশ হননি। এক সুন্দরী নারী আরেক সুন্দরী নারী কে দেখলে কখনোই আনন্দে বেহুশ হয়না, যদি হয় তবে হিংসায়।

এক বিকেলে হঠাৎ গাড়িঘোড়া নিয়ে ঢাকঢোল বাজিয়ে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে তারা আমার বাসায় এলেন। এ যেনো গরিবের ঘরে হাতির পা। আমার বাবা জায়নামাযে বসে হাত তুলে ফরিয়াদ করে বললেন, 'হে আল্লাহ আমি কি এমন পুন্য করেছি যে আমার কলিজার টুকরো কে তুমি এতো সুখী করছো'। গাল বেয়ে ফোটা ফোট অশ্রুজ্বলে জায়নামাজ ভিজে যায়।আমার স্বামী অত্যন্ত ভালো মানুষ। আমিও রাজি হয়। এ বয়সে বিয়ের প্রস্তাবে মেয়েরা রাজি হয়, বুঝে কিংবা না বুঝে।বিয়ের সতেরো দিনের মাথায় এক গভীর রাতে তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে অজ্ঞান হয়ে যান। তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তিনদিন সি. স. ইউ. করোনারী কেয়ার ইউনিটে ছিলেন মৃতের মতো পড়ে। ধীরে ধীরে সেরে উঠেন। তার হার্টের ভালব গুলো সবই দূর্বল। চিকিৎসক আজীবনের জন্যে তাকে কিছু বিধিনিষেধ দেন। আর পরামর্শ দেন সম্ভব হলে হার্ট ট্রান্সপ্লান্টের।সেই থেকে আমার সংগ্রামের শুরু। আমার সকল রংগীন স্বপ্ন হারিয়ে যায় নিমিষেই। আমার বাবা আমার স্বামীর এমন অবস্থা শুনে পাথর হয়ে যান। আমাকে বুকে টেনে নিয়ে কেঁদে কেঁদে বললেন, 'মা জানিনা আল্লাহ কি পরীক্ষায় আমাদের ফেললেন'। তিনি প্রায়ই বলতেন, 'হে আল্লাহ আমাকে তুমি নিয়ে নাও বিনিময়ে আমার মেয়ের জীবন কে পূর্ন করে দাও'।আমার বাবা মারা যান ব্রেইন স্ট্রোক করে। আমি কাঁদতে পারিনি। কারন আমি কাঁদতে ভুলে গিয়েছিলাম।আমার দিন কাটতো অসুস্থ স্বামীর দেখভালো করে করে। আমাকে অসম্ভব স্নেহ করতেন আমার সেই ননদ। তিনি আমাকে আমার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে আগ্রহ দেন। আমি আবার কলেজে যাই, কলেজ শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমার শশুর বাড়ীর আমার চাকুরির ব্যবস্থা করে দেন। এরই মধ্যে আমার প্রথম সন্তানের জন্ম। আমি কিছুই টের পাইনি। আমার জীবন যেনো চলতে থাকে একটা রোবটের মতো।স্বপ্নহীন, প্রানহীন দেহ নিয়ে আমার দিন কাটতে থাকে। দিন যতো যায় আমার স্বামীর অবস্থা ততই খারাপ হতে থাকে। এক দুইপা হাটলেই তিনি থর থর করে কাঁপতে থাকেন। অথচ আমার ইচ্ছে করতো তাকি নিয়ে ঘুরে বেড়াতে। হারিয়ে যেতে দূর বহু দূর।

 

হঠাৎ একদিন আমার স্বামী আমাকে বললেন, 'জোছনা আমাকে তুমি ক্ষমা করো। আমি চাইনা তোমার জীবন এভাবে নষ্ট হোক। তুমি চলে যাও। আমাকে ডিভোর্স দিয়ে চলে যাও। তোমার কষ্ট আমার সহ্য হয়না'।আমি জিগ্যেস করলাম, 'আপনি আমাকে ভালোবাসেন, আপনারা এ নাটক না করলেও পারতেন'।আমি বুঝলাম না কেনো আমার শ্বশুর শ্বাশড়ী শেষ দিকে এমন আচরণ শুরু করলেন, যেনো আমি যা খুশি তাই করতে পারি। এমন কি ইচ্ছে করলে আমি যে কারো সাথে পরকিয়ায় জড়াতে পারি। আমার ননদের স্বামী ও একদিন সে ইংগিত দিলেন।আমি আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করলাম, 'হে আল্লাহ এ কি পরীক্ষায় আমাকে ফেললে? আমি'তো তোমার কাছে কিছুই চাইনি। কিছু চাইলেইতো তুমি তোমার বান্দাকে আগে পরীক্ষা করে দেখো। আমার চাওয়া পাওয়া মরে শেষ হয়ে গিয়েছে সেই কবে'।আল্লাহ আমার স্বামীর মনোবাসনা পূর্ন করলেন। তিনি অল্প ক'দিনের মধ্যেই মারা গেলেন। আমি এবারও, না কাঁদতে পারলাম না হাসতে পারলাম। অথচ এই আমি বিয়ের আগে হাসলে কিংবা কাঁদলে পৃথিবী হেলে পড়তো। পৃথিবীর ঘুর্নন থেমে যেতো। এখন কি যে হলো, কোন কিছুতেই আমার হাসি পায়না কান্নাও পায়না।"আমার কেনো এমন হয়? আমি কি আর হাসতে পারবো না, আমি কি আর কাঁদতে পারবো না? আমার ইচ্ছে খুব, হাসতে বা কাঁদতে। আচ্ছা এখন কি আমার কি হাসি বা কান্না ঠিক হবে? নাকি আবার বসতে হবে কোন কঠিন পরীক্ষায়....., স্যার?"।

 

"পরিকল্পনাহীন জীবন জীবন নয়। পরিকল্পনা হতে হবে ইস্পাত দৃঢ়, তবে পরিকল্পনা চিরস্থায়ী নয়। পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হয়, সময়ের প্রয়োজনে"।
__________________________

ডা. মো. সাঈদ এনাম

এমবিবিএস (ডি এম সি,কে ৫২)

সাইকিয়াট্রিস্ট

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়