Ameen Qudir

Published:
2019-04-17 21:47:07 BdST

এই মহিলা চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক বিস্ময়! কিন্তু কেন!


 



আজিজুল শাহজী
_________________________

হ্যা ,ঠিকই পড়েছেন,এই মহিলা চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক বিস্ময়।তিনি কোনো শারীরিক ব্যাথা বেদনা বুঝতে পারেন না আর এইখানেই তিনি হয়তো মানব কল্যাণের এক মহান কাজের ভাগিদার হতে পারেন।
আমরা সবাই শারীরিক যন্ত্রনা নিয়ে ভয়ে থাকি,এর ভাগিদার হতে কেউ চায় না।আপনি ব্যাথা নাশক কোনো ওষুধ খেলে আবার পার্শ প্রতিক্রিয়ার কারণে অন্য সমস্যায় ও পড়তে পারেন।এখনো আমরা এই ধরণের সমাধান পাই নি যাতে আপনি ব্যথা উপশম করতে পারেন কোনো অন্য শারীরিক ক্ষতি বা অসুবিধে ছাড়া।

আগে এই ধরণের কিছু প্রাকৃতিক ব্যতিক্রমের কারণে বেশ কিছু মানুষ গোটা মানব সমাজের উপকারে এসেছিলেন,একই ভাবে হয়তো এই মহিলাও আমাদের নতুন কোন উপায় বের করতে সাহায্য করবেন।তার এই ব্যাথা বোধহীন হওয়ার মূল কারণ যা জীব বিজ্ঞানীরা বিশেষতঃ জিনতত্ববিদরা খুঁজে বের করেছেন তা হলো তার একটি বিশেষ জীন গত বৈশিষ্ট্য আরো সোজা ভাষাতে জিনের আলাদা হওয়া।

একাত্তরের এই বৃদ্ধা যে তার গোটা জীবনে কোনোদিন ব্যাথা অনুভব করেন নি।মজার কথা হলো তার যখন ৬৫ বছর বয়েস একটি অপারেশনের সময় ওটা নজরে আসে।এই অপারেশনের আগে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে যে কোনো মানুষের অসম্ভব যন্ত্রনা ভোগ করার কথা অথচ তিনি এই ধরণের কিছুই অনুভব করেন নি। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা হয়তো ওটা এড়িয়ে যেতে পারতেন তবে তার এবং আমাদের সবার সৌভাগ্য যে এই ক্ষেত্রে তার চিকিৎসক ওটা গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি তার ডিএনএ পরীক্ষা করান এবং চিকিৎসকরা সবিস্ময়ে দেখেন তিনি শুধু শারীরিক যন্ত্রনাই না, মানসিক বা আবেগ জনিত কোনো যন্ত্রনা ও বোধ করেন না।

অতঃপর ব্রিটিশ এনেস্থেসিয়া(চেতনানাশক)একটি ম্যাগাজিনের লেখা থেকে জানতে পারা যায় যে ক্যামেরুনের এই যন্ত্রনা বিহীন জীবন হওয়ার কারন এক ধরণের দুর্লভ জিনের মিউটেশন বা পরিবর্তন যা আগে নির্ণয় হয় নি।আর এইখানেই গবেষকরা উৎসাহী হয়েছেন যে এই নির্ণয় হয়তো আমাদের মানুষের সার্বিক সমাধানের কাজ করবে। জিনের এই সম্পাদনা হয়তো দীর্ঘদিন শারীরিক যন্ত্রনায় ভোগা মানুষের জন্য নতুন আশার আলো নিয়ে আসবে।

এই সুবাদে বৈজ্ঞানিকরা এই ধরণের মানুষের সন্ধান করা শুরু করেছেন এবং নির্দিষ্ট ভাবে তথ্য মানে ডাটা সংকলন করছেন যাদের ব্যাথা কম হয় বা হয়ই না , এই তথ্যপঞ্জী মোটামুটি এক শতক ধরে একত্রিত করা হচ্ছে তবে মজার হলো বাকিদের থেকে পুরো ব্যতিক্রম ক্যামেরুন এর এই জিনগত পরিবর্তন আর কারোর ক্ষেত্রে কিন্তু দেখা যায় নি,অন্তত এখনো পর্যন্ত !

এই বয়স্কা মহিলার যন্ত্রণাহীন জীবন কিন্তু আগেও নজরে এসেছিল অথচ কেউ গুরুত্ব দেয় নি। তার ভাষায় ,সন্তান জন্মের সময়ে তার কাছে প্রসব বেদনা স্রেফ কাতুকুতুর মতো মনে হয়েছিল ,বুঝুন ব্যাপার ! অতীব ঝাল কিছু খেলে তার কাছে ওটা বেশ মোলায়েম একটা ঝাঁঝ গোছের মনে হয়। এছাড়াও তার জীবনের ইতিবৃত্ত ধরে দেখা গিয়েছে তিনি কোনো বিষাদ বা দুঃখে কাতর হন নি বরং একটা সদা আনন্দময় একটা মনের ভাব নিয়ে চলেছেন। এই কথা বা বিষয় স্রেফ উনার কথার ভিত্তিতেই না , পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে যে তার উদ্বেগ বা বিষাদের যে মাপকাঠি হয় তার নিরিখে তার অবস্থান অতীব কম প্রায় শূন্যের মতো ! বিশেষজ্ঞদের মতে এই ধরণের অস্বাভাবিক দারুন ফলাফলের কারন তার শারীরিক যন্ত্রনা বোধ না থাকার কারণেই মূলত হয়েছে।

ভদ্রমহিলা অকপটে স্বীকার করেছেন যে তিনি ভাবতেন তিনি স্বভাবের কারণেই সদা আনন্দময় তবে ৬৫ বছরে প্রথম জানতে পারেন এর কারণ কি। গৌরবের বিষয় হলো অনাবাসী চিকিৎসা বিজ্ঞানী ডক্টর দেবজিৎ শ্রীবাস্তব হলেন সেই ব্যক্তি যিনি সবার আগে এই বিষয়টি বুঝতে পারেন।তিনি বিষয়টা বুঝতে পারেন উপরে বলা তার জোড়া অপারেশনের সময়ে। তৎক্ষণাৎ তিনি এই বিষয়টা নিয়ে যোগাযোগ করেন লন্ডনের নির্দিষ্ট সংস্থা যাদের নাম মলিকুলার নসিপশন গ্রূপের সাথে যারা এই জীন এবং মানব দেহের এই ধরণের কাজের সাথে যুক্ত। এই সংস্থার পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে উঠে আসে যে ক্যামেরন এর দুটি জিনের পরিবর্তন মানে মিউটেশনের প্রমান। তাঁরা প্রমান পান যে এই দুটো জিনের পরিবর্তন শুধ শারীরিক না তার মানসিক অবসাদ বা দুঃখ দূরে রাখতে এবং সুখানুভুতি বজায় রাখার জন্য দায়ী।

 

এই দুটি জিনের একটির নাম FAAH যা বিশেষ একটি উৎসেচক মানে এনজাইম ক্ষরণ করে,এই উৎসেচক আবার আনন্দমাইড(আমাদের আনন্দময় কথার মতো লাগছে!)বলে একটি বিশেষ বস্তু যা মানুষের ব্যাথা/বেদনা বা অন্য অনুভূতির সৃষ্টির জন্য দায়ী ,এই বস্তুটি আবার গঞ্জিকা মানে গাঁজা খেলে ও উৎপাদন হয়। হে হে ...মানে এর বেশি ক্ষরণ হলেই ওই একই অনুভূতি আর ক্যামেরনের দেহে এই ধরণের দুটো জিনের ফলে দেহের ভিতরেই প্রাকৃতিক ভাবে বিনা গঞ্জিকা সেবনে একই আনন্দের(সাইড এফেক্ট ছাড়া কিন্তু !)এক রূপ বজায় থাকে যা সাধারণ মানুষের দেহে থাকে না।কি বুঝলেন?

এতেই শেষ না,তার দেহে একটি ডিএনএ তে থাকা FAAH-OUT বলে জিনের কথা জানা যাচ্ছে।এটি ওই উপরে বলা FAAH বলে সবার দেহে থাকা জিনের উপরে প্রভাব বিস্তার করে যা মানুষ আগে জানতো না। আশ্চর্যের হলো ক্যামেরন এর মা এই জিনের ধারক ছিলেন না এমনকি তার মেয়ের শরীরে ও নেই তবে তার ছেলের মধ্যে এসেছে,ধারণা করা হয় ওটি তিনি তার বাবার থেকে পেয়েছিলেন।

গবেষকরা অতীব আশাবাদী যে এই তথ্য আর জিনের এই কারিকুরি আমাদের নতুন পথ এনে দেবে যাতে এই অতীব সমস্যাকে প্রাকৃতিক ভাবেই দূর করা যায়।ক্যামেরুন নিজে আশাবাদী যে তার এই বিশেষত্ব নিশ্চই মানুষের মঙ্গল এনে দেবে আর তিনি আরো প্রত্যয়ী যে নিশ্চই তার মতো আরো মানুষ আছেন যাদের এই বিশেষত্ব আছে। তার আবেদন ,তাঁরাও যেন এগিয়ে আসেন এই হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা সমস্যা দূর করতে।

আগামী দিনগুলো হোক আলোয় ভরা এই আশায় থাকি প্রতিনিয়ত !

তথ্যসূত্র :
১. https://www.nytimes.com/…/28/health/woman-pain-anxiety.html…
২. https://www.sciencedirect.com/…/artic…/pii/S0007091219301382
৩. https://www.techtimes.com/…/genetic-mutation-causes-former-…
৪. https://www.theguardian.com/…/scientists-find-genetic-mutat…
৫. সম্পর্কিত একটি বইয়ের সন্ধান https://www.amazon.com/Chasing-Men-Fire-Story-…/…/0262037408
৬. https://www.abc.net.au/…/scientists-discover-genet…/10950380
__________________________

আজিজুল শাহজী । এই সময়ে বাংলা ভাষার ব্যাপক জনপ্রিয় বিজ্ঞান ও যুক্তি লেখক। ডাক্তার প্রতিদিনকে তাঁর লেখা প্রকাশের সদয় সম্মতি দিয়েছেন তিনি।
সৌজন্য : বাংলাভারতী চিন্তন সঙ্ঘ।

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়