Ameen Qudir

Published:
2018-12-04 12:05:46 BdST

প্রতিবাদ করতে কেউ রাজি না,বেড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে?


 

 

ডা. নাহিদ ফারজানা
___________________________

 

রাত সাড়ে অাটটা-নয়টার দিকে নৈশকালীন ক্রিকেট খেলা শেষে বাসায় ফিরে বড় ছেলে অারিন প্রথম কথাটি বলল,"কে যেন সুইসাইড করেছে। কাছেই। সবাই বলাবলি করছে।"

ছেলের এই একটা বাজে স্বভাব। প্রায়ই এসে গুজব ছড়ায়, অমুক ফ্ল্যাটে একজন একটু অাগে মারা গেছেন, অমুকের মা একটু অাগে হার্ট অ্যাটাক করে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন, মাইকে অ্যানাউন্স করেছে ইত্যাদি। " তুই নিজের কানে শুনেছিস"? না, সে নিজের কানে শোনে নি, বন্ধুর কাছে শুনেছে, কিন্তু শতভাগ নিশ্চিৎ খবর। পরে খোঁজ -খবর নিয়ে দেখা যায় ,ভূয়া সংবাদ।

তাই ছেলে যখন বলল, কে যেন সুইসাইড করেছে,ফেসবুক চালাতে চালাতে বললাম,"আর কতজনকে মেরে ফেলবি তুই?" আর সাথে সাথেই নিউজ ফিডে চলে এল অরিত্রীর আত্মহত্যার সংবাদ, সেই অরিত্রী যে পরীক্ষা চলাকালীন অবস্থায় গোপনে মোবাইল কাছে রেখেছিল, যে ভিখারুননেসা স্কুলের শক্ত প্রশাসনের কাছে এক ভয়ংকর দাগী অাসামী, আর যে অামার কাছে এক নিষ্পাপ, অবুঝ,অভিমানী কন্যা। কন্যাতো বটেই, সংবাদ পড়ে জানতে পারলাম, সে আমার অারিনেরই সমান, নবম থেকে দশম শ্রেণিতে ওঠার জন্য বার্ষিক পরীক্ষা দিচ্ছিল, আরিনের পরীক্ষা ঠিক তার অাগের দিন শেষ হয়েছে। তাহলে অরিত্রী অামার কন্যা নয় তো কি?

মানুষ মাত্রই ভুল করে। আর অরিত্রীর যে বয়স, তা ভুল করারই বয়স। ভুল করবে,সংশোধন করা হবে। ভুলের থেকে সে শিক্ষা নিবে, আগুনে পুড়ে পুড়ে খাঁটি সোনা হয়ে উঠবে।

আমি খুবই স্বনামধন্য একটি স্কুলের ছাত্রী ছিলাম এবং দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় অামি ও খুব বড় একটা ভুল করেছিলাম। নকল নয়, বা প্রেমের বিষয় নয়, কিন্তু একই লেভেলের অন্য একটি ভুল। ভয়ে -লজ্জায় অামি একেবারে ভেঙে পড়েছিলাম। কিন্তু ঠিক ওই ভয়ংকর সময়টিতে অামার বাঘা বাঘা টিচাররা একদম মাটির মানুষ হয়ে গিয়েছিলেন। যাঁদের প্রত্যেকের হাতে চিকন লিকলিকে বেত থাকত, যাঁদের চোখগুলো পড়া না পারলে অাগুনের ভাটার মতো ধ্বকধ্বক করত, আবার যাঁদের ভিতরের মমত্বটুকুও অামরা হৃদয় দিয়ে অনুভব করতাম, তাঁরা আমার ভুলের জন্য আমাকে দূরে ঠেলে দিলেন না, বরং আরও নিবিড় স্নেহে আমাকে কাছে টেনে নিলেন। সবারই এক বক্তব্য ছিল,"যা হয়েছে,ভুলে যা। মানুষ মাত্রই ভুল করে,এই বয়সেও অামরা কত ভুল করি, ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হয় মা। " আমাদের হেড স্যার ভুলের শাস্তি হিসেবে অামার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন অনেকক্ষণ, মমতামাখা গলায় অনেক উপদেশ দিলেন, বললেন,"তুমি একদিন অনেক বড় হবে।" আমি যেন হীনমন্যতা বা বিষন্নতার শিকার না হই,এজন্য উনারা অামাকে আগের চেয়েও বেশি স্নেহ করা শুরু করলেন, মজার মজার কথা বলতেন, পড়া ধরতেন বেশি করে। আর স্কুলের প্রটোকল অনুযায়ী গার্জিয়ানকে তো ডাকতেই হয়। আম্মার সাথে তাঁরা এত নম্র, বিনয়ী অাচরণ করেছিলেন, আমার অনুপস্থিতিতে আমার সম্পর্কে এত সুনাম করেছিলেন যে, আম্মা অভিভূত হয়ে যান।

উনারা যদি অামাকে বকতেন,মারতেন,টি.সি দিতেন, তাহলে অামি হয়তো অাজকের অামি হয়ে উঠতাম না।
আমার হৃদয়ের অনেক বড় জায়গা জুড়ে অামার সেই মহান,উদার শিক্ষকদের স্থান।

আমার স্কুল মতিঝিল অাইডিয়াল হাই স্কুল, আমাদের সেই দেবতুল্য প্রধান শিক্ষক ফয়জুর রহমান স্যার, আমরা প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রী তাঁকে অন্তরের অন্তঃস্থল হতে ভালবাসি, সারাজীবন ই ভালবাসব। তিনি ই আইডিয়ালের প্রতিষ্ঠাতা, ছাপড়া স্কুল থেকে অাজকের এই যে আইডিয়াল স্কুল, তার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব স্যারের।এই স্যারকেই পরবর্তীতে ষড়যন্ত্র করে তাঁরই প্রতিষ্ঠিত স্কুল থেকে অপসারণ করা হয়, কারণ স্কুল কমিটিগুলোতেও তখন ঘুণে ধরা রাজনীতি ঢুকে পড়েছে অার সেই কমিটি স্যারকে দিয়ে কোন অন্যায় কাজ করাতে পারে নি।

অরিত্রির স্কুল যথেষ্ট বিতর্কিত স্কুল। ওখানকার সব অভিভাবকদের একই কথা, ক্লাসে কোন পড়া-লেখা হয়না, প্রতি বিষয়ে প্রাইভেট পড়তে হয়। স্কুল টাইমেও অভিভাবকেরা সন্তানকে নিয়ে যান কোচিং সেন্টারে। অনেককে বলেছিলাম,সব গার্জিয়ান একসাথে হয়ে প্রতিবাদ করেন না কেন? স্কুলে বেতন দিচ্ছেন, কিন্তু বাচ্চাকে ক্লাসে দিচ্ছেন না, কোচিঙ এও টাকা ঢালছেন, আপনি না হয় ধনী মানুষ, কিন্তু যারা নিম্নবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত, তাঁরা এই রাজকীয় খরচ চালাবেন কি করে? প্রতিবাদ করতে কেউ রাজি না,বেড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে?

আমাদের প্রাণের অাইডিয়াল সম্পর্কেও এমন এমন কথা শোনা যায় যে ,হতভম্ব হয়ে যেতে হয়।

দিন যত যাবে, শিক্ষাব্যবস্থা তত উন্নত হবে এমনটি হওয়ায় স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু বাস্তবে ঘটছে উল্টোটা। জিপিএ ফাইভ অার গোল্ডেন জিপিএ ফাইভ ...এর বাইরে কোন কথা নেই।

সিলেবাস, সাজেশন, নোট....এসবের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে সৃজনশীলতা, সুকুমারবৃত্তি, শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য।

ছাত্র-ছাত্রীদের অাত্মহত্যার প্রবণতা আশংকাজনক ভাবে বাড়ার কারণ, অসংখ্য সাবজেক্ট-পড়ার অতিরিক্ত চাপ-বিশ্রামের অভাব-অভিভাবকদের অতিরিক্ত প্রত্যাশা-অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা-পরিবার ও প্রতিষ্ঠানে নৈতিকতা না থাকা।

আর কোন অরিত্রীকে যেন মরতে না হয়। শিক্ষা বাণিজ্য বন্ধ করা, দেশের প্রতিটি স্কুলে উন্নত মানের লেখাপড়া নিশ্চিৎ করা-ছাত্রবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা অতি জরুরি। আদর-শাসন দুটার মাঝে ব্যালান্স রাখতে হয়। আমরা অধিকাংশ অভিভাবক সন্তানদের পড়াচ্ছি শুধুই দুর্দান্ত রেজাল্ট এর জন্য, হাই-ফাই কিছু বানানোর জন্য, অন্যকে টেক্কা দেওয়ার জন্য, স্ট্যাটাস মেইনটেইন করার জন্য, প্রকৃত মানুষ বানানোর জন্য না।

এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। এখন খুব দ্রুত প্রয়োজন মানবিকতা,সচেতনতা, সর্বক্ষেত্রে নৈতিকতা।
সন্তান-ছাত্রকে সুশিক্ষা দিন, আর এই মুহূর্ত থেকেই বাচ্চাকে শিক্ষা দান করার জন্য নিজে সুশিক্ষিত হোন।

___________________________

ডাঃ নাহিদ ফারজানা
মেডিকেল অফিসার,সার্জারি বিভাগ,
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা।


মানুষের জন্য এর জনপ্রিয়