Ameen Qudir

Published:
2018-02-20 11:50:41 BdST

ডা. গোলাম মাওলা:যার নেতৃত্বে নির্মিত হয় প্রথম শহীদ মিনার


 


ডা. ফরিদা ইয়াসমিন

_____________________


শিশুটি জন্মের সাতদিনের মধ্যেই অসুস্থ হয়ে গেল।কিছুই খাচ্ছেনা।চিৎকার করে কাঁদছে শুধু।একসময় কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত হয়ে গেল। শুধু আঁ..আঁ..ধরনের একটা অবোধ শব্দ করছে থেমে থেমে।মা খেয়াল করলেন, শিশুটির শুকিয়ে যাওয়া নাভীর চারিধারে একটু শক্ত হয়ে নীলবর্ন ধারন করেছে।জন্মের পর শিশুটির মাথার কাছে রাখা হয়েছে লোহার টুকরা,দোরগোড়ায় রাখা কচ্ছপের চাড়া,ঝাড়ু...!!! নানীদের অশুভ শক্তির অনুপ্রবেশ ঠেকানোর যতচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে শিশুটি অসুস্থ হয়ে গেল।তরুন মা- বাবা ভীষন চিন্তিত। এই অজপাড়াগায়ে কোন ভালো চিকিৎসক নেই। শিশুটির নানা, গ্রামের প্রাইমারী স্কুলের প্রধান শিক্ষক,সিদ্ধান্ত নিলেন চিকিতসার জন্য মাদারীপুর যাবেন। সেখানে আছেন ডাঃ গোলাম মাওলা। মাদারীপুরের প্রথম এমবিবিএস ডাক্তার।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একটি নৌকা কেরায়া করে শিশুটিকে নিয়ে মা,নানা- নানী রওয়ানা দিলেন, সাথে পর্যাপ্ত খাবার দাবার, কারন মোটামুটি একদিনের পথ। সকালে যাত্রা শুরু করলে বিকালে পৌঁছানো যাবে।

সময়টা ১৯৫৮ সাল।শিশুটি আমার বড় ভাই।

মাদারীপুরে পৌছানোর পর ডাঃ গোলাম মাওলাকে নৌকায় নিয়ে আসা হলো। শিশুরোগীকে উনি চৌদ্দটা ইঞ্জেকশন প্রেস্ক্রাইব করলেন। একদিন পর একদিন। গ্রামে ফিরে গ্রাম্য ডাক্তার হরিপদকে ঠিক করা হল ইঞ্জেকশন দেয়ার জন্য। সে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য।শিশুটির তারস্বরের চিতকারে মা- খালা- নানীরা কাঁদতে বসে। এত ছোট শিশুকে এতগুলি ইঞ্জেকশন দিতে দেখার অভিজ্ঞতা গ্রামবাসীর প্রথম।

কয়েকদিন পর মা হঠাত খেয়াল করল,শিশুটির অনেকক্ষন যাবত সাড়াশব্দ নাই। মায়ের বুক কেঁপে উঠে। সে দৌড়ে শিশুটির কাছে যায়.....!! এক অপার্থিব সুন্দর দৃশ্য তার চোখে ধরা দেয়।। শিশুটি হাত- পা নেড়ে খেলা করছে আপনমনে। তার চেহারার এতদিনের কষ্টের চিহ্নের বদলে প্রশান্তি। কাছে গিয়ে দেখা গেল, শিশুটির শুকিয়ে যাওয়া নাভী আবার কাঁচা হয়ে গেছে! সেখান থেকে বেড়িয়ে এসেছে ঘন আঠালো সবজেটে পুঁজ!!

শিশুটি সুস্থ হয়ে গেল আল্লাহর রহমতে। সকলের মুখে হাসি।সমস্যা দেখা দিলো অন্য জায়গায়। বাবার নাম আবদুর রহমানের সাথে মিলিয়ে শিশুটির নাম রাখা হয়েছিলো মশিউর রহমান। কিন্তু সবাই শিশুটিকে গোলাম মাওলা নামেই ডাকছে।ডাক্তারের প্রতি কৃতজ্ঞতায় সবাই নত। সমস্যা সমাধানে যথারীতি আবার এগিয়ে এল নানা আব্দুল গফুর মুন্সী। সে সিদ্ধান্ত দিল, ঠিক আছে, হুবহু একই নাম রাখার দরকার নাই। ডাক্তারের নামের সাথে মিলিয়ে আবার নতুন করে শিশুর নামকরণ হোলো গোলাম কিবরিয়া। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে জন্মানো গোলাম কিবরিয়ার আরো পাঁচ ভাই এর নামের আগে গোলাম যুক্ত হয়ে গেল।

 

 

 

এই 'গোলামের ইতিহাস' বহুবার শুনেছি আম্মার মুখে, সাথে ডাঃ গোলাম মাওলার কথা। যিনি পরবর্তীতে মাদারীপুরে আমাদের প্রতিবেশী ছিলেন। মেঝভাই গোলাম ফারুক তার স্বভাবজাত রসিকতা করে মাঝে মাঝে বর্ননা করত, কিভাবে সে ও তার ক্ষুদে বন্ধুরা ডাঃ মাওলার বাড়ীর বেড়ার ফাঁক দিয়ে দেখতে যেতেন সেখানে বেড়াতে আসা এক উদীয়মান জনপ্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে।

এতকিছু শোনার পরও আমি ডা: মাওলার প্রবাদপ্রতিম পরিচিতি সম্পর্কে তেমন কিছুই আঁচ করতে পারিনি।২০০৫ সালে চাকুরীসুত্রে ঢাকা মেডিকেলে পোস্টিং হয় আমার।সেখানে ঢাকা মেডিকেল থেকে বের হওয়া ম্যাগাজিন দেখতে গিয়ে চমকে উঠি। সেখানে বক্স করে ডাঃ মাওলা সম্পর্কে লেখা হয়েছে।হায়!!! দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া...!!!

ঢাকা মেডিকেল কলেজের কৃতীছাত্র ডাঃ গোলাম মাওলা দেশবিভাগের পর কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে এসে দ্বিতীয় বর্ষে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন।১৯৫২ সালে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র সংসদের ভিপি ছিলেন। ২০ শে ফেব্রুয়ারি তিনি ১৪৪ ধারা ভাংগার পক্ষে জোরালো বক্তব্য দেন।রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন। ডা: মাওলা প্রথম শহীদ মিনারের স্থাপনের একজন রূপকারও। ২২ শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেলের মেধাবী ছাত্র বদরুল আলম ও সাঈদ হায়দার শহীদ মিনারের ডিজাইন করে দেন। ডিজাইন অনুযায়ী ডাঃ মাওলা ও মঞ্জুর হোসেনের নেতৃত্বে মেডিকেলের ছাত্র ছাত্রীরা সে রাতেই নির্মান করে প্রথম শহীদ মিনার। ১৯৬২ সালে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য ( এম এন এ) নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৬৭ সালে মাত্র ৪৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরন করেন।

 

দীর্ঘ পনের বছর পর মাদারীপুর গিয়ে আমাদের পুরানো বাড়ী দেখতে গেলাম।এই এক অভ্যাস হয়েছে ইদানীং।সুযোগ পেলেই পুরানো বাসস্থানগুলিতে ফিরে যাই। ষাট বছর আগে নানাবাড়ীর গ্রাম ক্রোকচর থেকে মাদারীপুরের নদীপথের একদিনের দূরত্ব, এখন স্থলপথে মাত্র তিরিশ মিনিটের পথ।আব্বার প্রথম জীবনের শখের বাড়ী বহু আগেই বিক্রি হয়ে গেছে সময়ের প্রয়োজনে। বাসার সামনে বিশাল মাঠে এখন ইটের বস্তি। পাশেই ডাঃ গোলাম মাওলার বাড়ী.... এখনো আছে।বাড়ীর সামনেই তাকে সমাধিস্থ করা হয়েছে। এই ক্ষনজন্মা ভাষাসৈনিকের সমাধি পরিদর্শন করে শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ হাতছাড়া করলাম না।

একুশে পদকপ্রাপ্ত (মরণোত্তর) ভাষা সৈনিক ডাঃ গোলাম মাওলার নাম আমরা অনেকেই জানিনা।দু:খজনক! এদেশের সূর্যসন্তানদের এভাবে ভুলে গেলে ইতিহাসের কাছে আমরা জাতি হিসাবে দোষী হয়ে থাকব।

______________________________

 


ডা. ফরিদা ইয়াসমিন । সুলেখক।

Asstt. Professor at Dhaka Dental College & Hospital
Studied MBBS. at Chittagong Medical College


মানুষের জন্য এর জনপ্রিয়