Ameen Qudir

Published:
2017-12-14 20:41:06 BdST

পারিবারিক হত্যা, বিরোধ ও পরকীয়া সমাচার


 

 

 

 

 

 


প্রফেসর ডা. তাজুল ইসলাম

________________________________

অতি সম্প্রতি দুটি পারিবারিক হত্যার খবর জনগনের মনে তীব্র আলোড়ন তুলেছে।স্ত্রী কর্তৃক পরকীয়া প্রেমের কারনে নিজ মেয়ে ও স্বামীকে হত্যা,সম্পত্তির হাতিয়ে নেওয়ার লোভে স্ত্রী সহ নিজ ছেলে হত্যায় স্বামীর সংশ্লিষ্টতার খবরে অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে পারিবারিক বন্ধন কি শিথিল হয়ে পড়েছে? দাম্পত্য প্রেম কি পরকীয়া প্রেমের কাছে হার মানছে?
যেকোনো হত্যাকান্ডই ঘৃনিত ও নৃশংস কাজ।আর তা যদি হয় নিজ স্বামী, স্ত্রী বা পরিবারেরই অন্য কোন সদস্য দ্বারা তখন তা হয় আরো ভয়াবহ,মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে আমাদের পারিবারিক প্রথা,বন্ধন ও দাম্পত্য সম্পর্কে কি মৌলিক কোন অবক্ষয়, জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে? মনোচিকিৎসক হিসেবে এবিসি রেডিওতে প্রতি রবিবার " যাহা বলিব সত্য বলিব" নামে একটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠানে নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে থাকি।এ অনুষ্ঠানে একজন অপরাধী তার সারা জীবনের অপরাধের কনফেশন দিয়ে থাকে।বিচিত্র অপরাধের মধ্যে অনেক পারিবারিক নিষ্ঠুর, নির্মম অপরাধের কাহিনী ও সেখানে শুনতে হয়েছে।সে বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে পারিবারিক এ ধরনের হত্যা,বিরোধ ও সঙ্কট এর মনো- সামাজিক কারন নিয়ে লিখার ইচ্ছে ছিল।তবে স্হানাভাবের কথা চিন্তা করে এতো বড় ক্যানভাসে আলোচনা না করে শুধু পারিবািরিক হত্যা ও বিরোধের পিছনে দাম্পত্য প্রেমের ঘাটতি ও পরকীয়া প্রেমের জটিল রসায়নের ভূমিকা নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করতে চাই।

Image result for পরকীয়া


পরকীয়া বা পরস্ত্রী গামিতা,পরস্বামীগামিতা হচ্ছে বৈবাহিক বন্ধন হেতু নিজ স্ত্রী বা স্বামীর প্রতি মানসিক ও যৌনগত ভাবে যে " বিশ্বস্ততা,আনুগত্য " ( লয়েলটি) রক্ষা করে চলার কথা,সে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করা।দাম্পত্য জীবন শুরু করা মানে এই পবিত্র ও স্হায়ী সম্পর্কের "সীমারেখা "( বাউন্ডারি) স্পস্টভাবে জানা ও আজীবন তা বজায় রাখা।এটি শুধু ধর্মীয়,সামাজিক দায় নয়,এটি নৈতিক দায় ও বটে।এই " সীমারেখা " বজায় রাখতে হবে শুধু অনাকাঙ্ক্ষিত, অবান্চিত কোন তৃতীয় পক্ষের অনুপ্রবেশ রোধ করতেই নয়,পরিবারের সবার স্বার্থে ও।এর জন্য প্রয়োজন দৈনন্দিন জীবনে শত আবেগীয় ও যৌনকর্ম " প্রলোভন, প্ররোচনা" থেকে নিজকে " নিয়ন্ত্রণ " রাখা।
তবে কখনো কখনো স্বার্থপরতা,হিংসা,ঈর্ষা, ক্রোধ, লালসা,কামনা পারিবারিক বন্ধনকে শিথিল ও দাম্পত্য সম্পর্কের " দেয়ালে" ফাটল ধরাতে পারে।বিবাহিত জীবনের " আনুগত্য, বিশ্বস্ততার"যে বাউন্ডারি তাই সেটিকে কিভাবে মজবুত,পোক্ত করতে হবে প্রত্যেক বিবাহিত নর নারীর সেদিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে।
পেরেল(perel) তার " দ্যা স্টেট অব এ্যাফেয়ার" বইতে পরকীয়াকে ক্যানসারের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, জীবন যন্ত্রনার একটি অন্যতম কারন এই পর নারী/ পর পুরুষের সঙ্গে অনৈতিক,অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া।স্রাউট ও উইগেল(২০১৭) এ নিয়ে একটি তত্ব দেন ও বলেন পরকীয়া সম্পর্ক ভুক্তভোগীর মনে ক্রোধ, অশান্তি, শোক,অবিশ্বাস ও অশেষ মনো- যন্ত্রনার সৃষ্টি করে।নপ ও তার সহযোগীরা( knopp) তাদের আর্টিকেল " আর্কাইভ অব সেক্সুয়েল বিহেভিয়ার "- এ উল্লেখ করেন পরকীয়া, দম্পতিদের " আত্ম- পরিচিতির" মর্মস্হলে আঘাত হানে।এর ফলে দাম্পত্যের যে " ট্রাস্ট রাডার " সেটি বিনষ্ট হয়।
ফিনচান ও মে (Finchan and May-2017) তাদের গবেষনায় দেখিয়েছেন ২-৪% নর নারী প্রতি বছর বিবাহ- বহির্ভুত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং সারাজীবনে কারো এরকম সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা ২০%। শুধু আমাদের দেশের মতন রক্ষনশীল দেশেই নয়,সব দেশেই বিবাহ- বহির্ভুত যৌন সম্পর্ককে নিন্দা করা হয়।এক জরীপে দেখা যায় আমেরিকার ৭৭% মানুষ পরকীয়াকে " সব সময়ই ভুল" মনে করেন।

Image result for পরকীয়া


তবে মনে রাখতে হবে প্রকৃতি " একগামিতা"( মনোগেমি) নয় বরং " বহুগামিতাকে"( পলিগেমি) ও অনুমতি দেয়।বিবর্তন মনোবিজ্ঞান তত্বে বলা হয় " একগামিতা" সন্তান উৎপাদনে পুরুষের যত খুশী নারীর সঙ্গে মিলনে বাধা হয়ে দাড়ায়।আবার জীনগত উত্তম ও কাঙ্খিত পুরুষ নির্বাচনে একগামিতা নারীর পথে ও বাধা।তাই শতভাগ বিশ্বস্ততা প্রশ্ন সাপেক্ষ। এ ছাড়া কোমল,সংবেদনশীল,শৈল্পিক মনে সহজে রঙ ছড়ায়।অনেকে মনে করেন অল্প বয়সের কারনে দাম্পত্য জীবনের প্রথমদিকে এরকম পরকীয়া ব্যাপার বেশী ঘটে।তবে গবেষনায় বলে তরুন বয়সে স্বামী- স্ত্রী পরিবার,সন্তান ও নিজদের ভালো মন্দ বিষয়ে এতো বেশী " বিনিয়োগ " করে যে, তারা কমই পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে।বরং সন্তানরা বড় হলে সে ঝুকি বেড়ে যায়।তবে সব কিছুরই ব্যতিক্রম আছে।
পরকীয়ার নানান রকমফের আছে।যেমন : সাধারন ভাবে- যৌন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া ( সেক্সুয়াল এ্যাফেয়ার)বা আবেগ ও মানসিক ভাবে জড়িয়ে পড়া ( ইমোশনাল এ্যাফেয়ার) অথবা উভয়ভাবে জড়িয়ে পড়া।
আরো হতে পারে ১) সুযোগ সন্ধানী পরকীয়া- স্বামী - স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা ও বন্ধন ঠিকই থাকে,কিন্তু কাম- লালসার কারনে তারা অন্য কারো সঙ্গে সম্পর্ক তৈরী করে।২) বাধ্যতাজনক পরকীয়া -"ভয় বা অনুমোদন " পাওয়ার জন্য কেউ কেউ সম্পর্ক তৈরী করে।অফিসের বসকে হাত করতে কেউ তেমনটি করতে পারে।৩) রোমান্টিক পরকীয়া - এদের মধ্যে স্বামী বা স্ত্রীর প্রতি তেমন আবেগীয় আকর্ষণ থাকে না।তারা অন্য নর নারী থেকে মানসিক চাহিদা খুজে বেড়ায়।৪) দ্বন্ধমূলক রোমান্টিক পরকীয়া - একই সময়ে তারা একাধিক নারী বা পুরুষের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা ও যৌন আগ্রহ অনুভব করে।এটা বেশ জটিল পরিস্হিতি।এরা হয়তো কাউকে আঘাত করতে চাচ্ছে না,কিন্ত শেষ পর্যন্ত সবাই আহত হয় ৫) স্মৃতি রক্ষাকারী পরকীয়া - এরা স্বামী বা স্ত্রীর প্রতি বিশ্বস্ত ও অনুগত কিন্তু তার প্রতি কোন ফিলিংস নেই।এক মাত্র প্রতিজ্ঞা ও নৈতিকতার স্মৃতি তাদের সম্পর্ক টিকিয়ে রাখে।
বর্তমানে সাইবার এ্যাফেয়ার এতে যুক্ত হয়েছে- চ্যাটিং,টেক্সটিং,সেক্সটিং- সব কিছুই এর মধ্যে পড়ে।
কিভাবে নিজেদের সুরক্ষিত রাখবেন:

 


এটা মনে করার কারন নেই আমরা সুখী পরিবার,পরস্পরের প্রতি অগাধ ভালোবাসা তাই এসব নিয়ে আমাদের দুঃশ্চিন্তার প্রয়োজন নেই।সব দুর্ভেদ্য দুর্গেই " সিকিউরিটি এলার্ম" থাকে।আমাদের অনেক অজানা অংশ থাকে( ব্লাইন্ড স্পট)। এগুলো জানা ও সতর্ক থাকা প্রয়োজন, তা না হলে হঠাৎ করে কোন বিষাক্ত সাপ সুখের সংসারে ঢুকে পড়তে পারে।তাই সবশেষে হঠাৎ বিস্মিত হয়ে,উদভ্রান্ত,ক্ষিপ্ত হয়ে আচরন করার চেয়ে পূর্ব থেকে সম্পর্ক ঝালাই করে নেওয়া,নবায়ন করা ও পরিচর্যা করার দিকে নজর দিতে হবে।

Related image


১। নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা করে যোগাযোগের ক্ষেত্রে কোনগুলো " অনুমোদন যোগ্য " ও কোনগুলো " গ্রহণ যোগ্য " যোগাযোগ সে ব্যাপারে একমত হয়ে নিন
২। সাইবার এ্যাফেয়ার সম্বন্ধে সতর্ক থাকুন- মনে রাখবেন একাকী টেক্সট করা আর বদ্ধ রুমে অন্যের সঙ্গে একাকী আলাপ করা সমান কথা।৩। আবেগগত ভাবে বিশ্বস্ত থাকুন ও যৌন ব্যাপারে খোলা মেলা আলোচনা করুন ৪। কিছু বিষয় আছে যা কেবল " বিবাহের ছাতার" নীচেই করা উচিৎ, অন্য কোথাও নয় ৫। নিজের চোখ- কানকে পবিত্র রাখুন- ইসলাম ধর্মে ও আছে চোখ,কান,জিহ্বার পর্দা করার কথা,শুধু সারা শরীর হিজাব দিয়ে ঢাকা পর্দা নয়।৬। সততার সহিত নিজেদের " অস্বস্তি বা নিরাপত্তাহীনতার" বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ করুন ৬। মাঝে মাঝেই নতুন,পুরনো সহকর্মী বা বন্ধুদের নিয়ে নিজেদের মধ্যে মতবিনিময় করুন ৭। যখন " গুরুতর" কিছু ব্যত্যয় ঘটে একটি সীমারেখা টানুন ৮।আপনি হয়তো নিজের অজান্তে অ- বাচনিক এমন ভাবে আচরন করেন যা আপত্তিজনক ও ঝুকিপূূর্ন।সে ব্লাইন্ড স্পট গুলো জানুন ও শোধরে নিন ৯। মনে রাখবেন পূর্ব রাতের নিজেদের মধ্যকার মনোমালিন্য পূর্ব রাতেই মিটিয়ে ফেলার পরও তা পরদিন ও দগদগে ঘা হিসেবে থাকতে পারে।তখন অন্য কারো সঙ্গে আবগীয়ভাবে ঘনিষ্ঠ হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।সতর্ক থাকুন ও নিজেদের অস্বস্তি, অসন্তোষ অব্যাহতভাবে মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করুন১০। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে সময় সীমিত করুন ও প্রয়োজনে কাউকে ব্লক ও করতে হতে পারে।১১। ফেইসবুকে অন্যদের তথ্য দিয়ে নিজেদের তুলনা করবেন না১২। বাইরের সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুধু নিজে ঠিক আছি এ হলে হবে না,অন্য পক্ষ দুর্বল হয়ে পড়ছে কিনা সেটি ও বিবেচনায় রাখতে হবে।পরিস্হিতি গুরুতর বা " অপমানজনক " অবস্হায় নামার উর্ধ্বে নিজকে থামিয়ে রাখুন১৩। নিজের রিদয় বা অন্তরকে চেক করে নিন- স্বামী বা স্ত্রীর প্রতি সম্মান, শ্রদ্ধা এবং আনুগত্য ও বিশ্বস্ততা রয়েছে নাকি উচ্ছৃঙ্খল, প্রতারনাপূর্ন,নৈতিক বন্ধন মুক্ত,বেপরোয়া জীবন- যাপন করছেন? সুখী ও সম্মানিত দাম্পত্য জীবন মানে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কাজে,কর্মে,কথায়,আচরনে পরস্পরকে শ্রদ্ধা করে যাওয়া।১৪। কাপলিং টেকটিকস ( দুই অংশের মধ্যে সংযোজন হওয়ার প্রক্রিয়া) সম্বন্ধে সতর্ক থাকুন- প্রথমে যতই প্লেটনিক লাভ মনে হোক,এক সময় তা ভিন্ন খাতে গড়াতে পারে।১৫। ডিজিটাল মাধ্যমকে ইলুসন ভাববেন না।এটি বাস্তব জীবনকে ও প্রভাবিত করে।১৬। " অপর পাড় অধিক সবুজ", ওরা খুব সুখে আছে,আপনি একাই কষ্টের সংসার করছেন- এ রকম ভুল ধারনা মন থেকে ঝেড়ে ফেলুন১৭। যখনই দাম্পত্যে সঙ্কট দেখা দেয়, মনে হতে পারে " ভুল মানুষের" সঙ্গে সংসার করছি। এ জন্য যদি প্রায়ই সংসার ভাঙ্গার হুমকি দেন,সে বিষাক্ত অভ্যাস ত্যাগ করুন।বাইরের সবাই " সঠিক" মানুষ, এ ভুল ধারনা পরিত্যাগ করুন।১৮। তর্কে বা যে কোন ভিন্ন মতে নিজে জিততে চাইবেন না- স্বামী - স্ত্রী একই টিমের লোক।আপনি জিততে চাওয়া মানে নিজকে ভিন্ন টিমের মনে করা।তাই একই টিমের মনে করলে হয় দুজনে একত্রে জিতবেন, না হয় একত্রে হারবেন।১৮। পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়বেন না,পরস্পরের জন্য লড়বেন ১৯। দাম্পত্যে কোন লুকোচুরি চলবে না- এক মাত্র সারপ্রাইজ পার্টি দেওয়া বা উপহার দেওয়ার পূর্বে লুকানো ছাড়া দাম্পত্য জীবনে কোন " গোপনীয়তা " রাখবেন না। দাম্পত্য জীবন থাকবে পূর্ন স্বচ্ছ ও বিশ্বস্ত ২০। স্বামী বা স্ত্রীর চেয়ে বন্ধু,বাইরের আড্ডা, অর্থ, ক্যারিয়ার এমনকি মা- বাবার প্রতি ও অধিক আনুগত্য বান্চনীয় নয়।স্বামী বা স্ত্রী হবে প্রথম ও সর্বোচ্চ আনুগত্য পাওয়ার অধিকারী/ অধিকারিনী।২১। ভুল হল তা স্বীকার করে নিন, সত্যিকার অর্থে ক্ষমা প্রার্থনা করুন-দাম্পত্য জীবনে সবচেয়ে শক্তিশালী ও আরোগ্য প্রদানকারী উক্তি হচ্ছে:" আমার ভুল হয়েছে।আমি সত্যিই দুঃখিত। দয়া করে আমাকে মাফ করে দাও ও আমি যে বিশ্বাস ভঙ্গ করেছি,সেটি পুন: নির্মান করার সুযোগ দাও"

_______________________________

প্রফেসর ডা. তাজুল ইসলাম
সোশাল সাইকিয়াট্রস্ট
অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
কমিউনিটি এন্ড সোশাল সাইকিয়াট্রি বিভাগ
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল,ঢাকা
e- mail: [email protected]
phone:01715112900


মানুষের জন্য এর জনপ্রিয়