|

স্বর্গের রাস্তার শেষে কাঠের রাজপ্রাসাদে


Published: 2016-12-05 13:28:45 BdST, Updated: 2017-07-28 12:32:39 BdST



ডা. বিএম আতিকুজ্জামান
___________________________

চির সবুজ পাহাড়গুলোর মাঝে মেঘের ভেলার বসতবাড়ি। ভোর সকালে মেঘ এসে ভর করে পাহাড়গুলোর মাঝে। সূর্যের আলো উঁকি দিতে দিতেই মেঘ উধাও। ক'ঘণ্টা পর মেঘগুলো আবার দল বল নিয়ে হাজির। সে পাহাড় আর মেঘের রাজ্যে মায়াবী এক ছোট্ট শহর। নাম তার গ্যাটলিনবার্গ। টেনেসি অঙ্গরাজ্যের একটি অপূর্ব সুন্দর স্বর্গীয় গন্তব্য এ শহর।

এবারের গ্রীষ্মের ছুটিতে সারা দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আমরা পনেরজন বন্ধু পরিবার পরিজন নিয়ে হাজির হয়েছিলাম এ গ্যাটলিনবার্গের স্বর্গে।

 

 

দীর্ঘ তিন মাসের প্রস্তুতি।

কে কিভাবে এসে পৌঁছুবে, কোথায় থাকা হবে, খাবার দাবারের মেনু কি হবে, রান্নাঘর থাকবে কিনা, সারা রাত আড্ডা দেবার যায়গা থাকবে কিনা, একসাথে গান বাজনা আবৃত্তি করা যাবে কিনা, বাচ্চাদের খেলার যায়গা থাকবে কিনা, অবসরে কোথায় কোথায় ঘুরতে যাব, ... এ সব বিস্তর প্রশ্নের কথা মাথায় রেখে বন্ধু রুমি এক চমৎকার কেবিন খুজে বের করলো।

গ্যাটলিনবার্গের পরিসীমাতে পৌঁছানোর পর পাহাড়ের গা ঘেঁষে ঘন সবুজ পাইনের মাঝ দিয়ে আকাশের দিকে খানিকক্ষণ গাড়ি চালাবার পর পাওয়া যাবে " স্বর্গের রাস্তা" ( Road to heaven) । সে রাস্তার পাশে পনের কক্ষের তিনতালা এক কাঠের কেবিন ( কেবিন না বলে ছোটখাটো রাজবাড়ী বলা যায় তাকে)। কেবিনের সিঁড়ির কাছে নাম লেখা " স্বর্গের সিঁড়ি" (Stairway to Heaven)। স্বয়ং বিধাতাই যেন আমাদের কথা ভেবে তৈরি করেছিলেন এ কেবিনটা।

 

এ স্বর্গের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলেই বিশাল এক বসার ঘর। ঘর গরম করার জন্য রয়েছে এক কোনাতে আগুন জ্বালানোর কারসাজী ( Fire Place)। একদিকে বিশাল বসার জায়গা, যেখানে আমারা সবাই পুরো পরিবার পরিজন নিয়ে বসতে পারি। পাশেই সবার খাবার জায়গা। রাজকীয় রান্নাঘর সাথেই লাগানো। উপরে নিচে বাচ্চাদের জন্য বিশাল আয়োজন। পুল টেবিল, ভিডিও গেম থেকে শুরু করে সবকিছুই আছে। পনেরোটা কক্ষে আমাদের সবারি প্রশস্তিতে থাকবার আয়োজন হয়েছে সেখানে।

কেবিনের প্রতিটি তলাতে বিশাল বারান্দা। তাতে আনেক গুলো ইজি চেয়ার। বসলেই চোখে পড়ে সারি সারি পাহাড়, দৃষ্টির শেষ সীমা পর্যন্ত। তার পর অবারিত মেঘের ধোয়া। নাম তার " Great Smokey Mountains"। বিধাতা তার সীমাহীন সুন্দর ছড়িয়ে রেখেছেন চারদিকে।

বাংলাদেশ, বিলেত, ক্যানাডা আর দক্ষিন আমেরিকার নানা প্রান্ত থেকে ছুটে এসেছিলাম আমারা সবাই। অনেকের সাথে দেখা হয়নি গত দু যুগ। দেখা হতেই শুরু হয়েছিল, " বন্ধু, কি খবর বল"...... তারপর সীমাহীন আড্ডা।

বৃহস্পতিবার রাতে পৌঁছে গিয়েছিলাম প্রায় সবাই। গরম গরম খিচুড়ি আর ভুনা মাংস দিয়ে আমাদের সন্ধ্যে শুরু হোল। বাচ্চারা সব তাদের দল বল নিয়ে মহা উল্লাসে মেতে গেল। সবাই যেন সবার চির চেনা। আমাদের আড্ডা ডালপালা ছড়িয়েছিল সে রাতে। মাঝরাতে মিনু ভাবী ঝাল মুড়ি, মোয়া আর গরম চা এনে মনে করিয়ে দিলেন কাল সকালে আমরা সবাই মিলে পাহাড়ি নদীতে ভেসে বেড়াবো ( White water Rafting)। কেথায় তার কথা শুনে আমরা একটু বিশ্রাম নেব, বরঞ্চ মাঝ রাতে বনবাদাড়ের মাঝে সবগুলো বন্ধুমিলে আকাশের তারা গুনতে বের হলাম। একজন সহৃদয় মানুষ তার গাড়ি থামিয়ে আমাদের বললেন, "এখানে ভল্লুকের আনাগোনা প্রচুর। তোমরা তোমাদের কেবিনে ফিরে যাও।" সবাই ভদ্র বালকের মতো সুড়সুড় করে কেবিনে এসে আবার আড্ডা শুরু করলাম।

 

 

 

 

সে তিন দিন পাহাড়ি ঝর্না দেখেছি, ঝর্নার জলে ডুব দিয়েছি, মেঘের মাঝে হেটে বেড়িয়েছি, মাইলের পর মাইল হেটে পাহাড়ের চুড়াতে উঠেছি। ঘন সবুজ পাইনের বনে দল বেধে হেটে স্মৃতির সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেছি অনেকবার।

আমরা গান গেয়েছি গলা ছেড়ে, আবৃত্তি করেছি দ্বিধাহীন ভাবে, আমাদের ছেলে মেয়েরাও যোগ দিয়েছে তাতে।

বুনো প্রকিতির মাঝে আমাদের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়েছে বনের পাখি, হরিনের দল, এমনকি ভল্লুক ও।

দেখতে দেখতে তিন দিন শেষ। চোখের জলে বিদায় দেবার সময় আমরা সবাই জানি " এ দিন আর আসবে না"।

তারপরও খুব শিগগিরই দেখা হবার আশায় চোখ মুছে যে যার ঘরে ফিরে এলাম।

আমরা আগামিতে আরও বন্ধুদের ডেকে নিয়ে আসবো প্রকিতির মাঝে। জগত সংসারের প্রচলিত নিয়মের বাইরে আমাদের স্মৃতির ভান্ডারগুলো খুলে দেখবো আবার... এ আশা আমাদের সবার। সবারই ইচ্ছে আবার গ্যাটলিনবার্গে ফিরে আসার।

কিন্তু সে স্বপ্নের গুঁড়ে বালি। গত এক সপ্তাতে স্বর্গের এক প্রান্ত, গ্যাটলিনবার্গে আগুন লেগেছে। পুড়ে গিয়েছে বন, পাহাড়ের পর পাহাড়, কেবিনের পর কেবিন। আমাদের 'স্বর্গের সিঁড়ি' ও বাদ পড়েনি বুনো সে আগুনের আক্রোশ থেকে।

গ্যাটলিনবার্গ কেবল স্মৃতি হয়ে গেল। আরও অনেক স্মৃতির মতো, স্বপ্নের বাড়ির মতো। আর ছোঁয়া যাবে না তাকে। কেবল অনুভব করা যাবে।

" আমার স্বপ্নের দেখা বাড়ি...
শুধু মনে পড়ে; গভীর ঘুমের মধ্যে
একটি বাড়ি জেগে আছে, স্বপ্ন সমুজ্জল।"
(পরাবাস্তবের বাড়ি, রফিক আজাদ)


_______________________________

 

লেখক ডা. বিএম আতিকুজ্জামান । নিভৃতচারী কথাশিল্পী । আমেরিকা প্রবাসী প্রখ্যাত চিকিৎসক। সিএমসি ২৮। কলামিস্ট ও গায়ক হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তাধন্য।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।