|

মোহিনী মালদ্বীপ দ্বিতীয় কিস্তিমোহিনী মালদ্বীপ থেকে হাহাকার: হায় মাতৃভূমি আমার!


Published: 2016-12-04 11:41:10 BdST, Updated: 2017-04-30 05:14:38 BdST


ডা. মোরশেদ হাসান
____________________________

 



_______________

The main problem is that we don't know about our future.
আমি যেদিন মালে এয়ারপোর্টে নামি সেদিন ছিল ৫ জুলাই, ২০১৫। আমি চিকিৎসকের দায়িত্ব নিয়ে এ দ্বীপদেশটিতে আসি। মিহিন লঙ্কা বিমানে চড়ে ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে প্রথমে কলম্বো এয়ারপোর্টে আসি। কলম্বোতে দুইঘণ্টা যাত্রা বিরতি ছিল। তারপরই ভারত মহাসাগরের ওপর দিয়ে আকাশপথে মালদ্বীপ যাত্রা। সময় চল্লিশ মিনিট।
মালদ্বীপ এয়ারপোর্টে আমাকে যে ছেলেটি রিসিভ করতে এসেছিল তার নাম উরফান। বয়স বড়জোর বাইশ/তেইশ হবে। ছেলেটিকে প্রথম নজরে দেখে গুলিস্তান সিনেমা হলের ব্ল্যাকার ছাড়া অন্য কিছু মনে হলো না। উস্কো-খুস্কো চুল, গায়ে খুবই সাধারণ পরিচ্ছদ, পাথরের মতো চোখ দুটিতে কোনো অভিব্যক্তি নেই। সে আমাকে দাম দস্তুর করে ট্যাক্সিক্যাব ভাড়া করে দিলো। ট্যাক্সিক্যাবে উঠে ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে থতমত খেয়ে গেলাম। চেহারা দেখে মনে হলো ভাড়া নিয়ে বিরাট অসন্তোষ তার মনে। স্বাভাবিক চেহারার লেশমাত্র নেই। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আর ইউ ওকে?
সে নিশ্চুপ।
আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম-- হোয়াটস ইয়োর নেম? সে পাথরের মতো মুখ করে বলল, সুলায়মান।
- সো ইউ আর দ্যা গ্রেট কিং সুলায়মান।
সে আমার দিকে হা করে চেয়ে রইল।
আমি বললাম, কিং সোলায়মান। ডোন্ট ইউ হিয়ার দ্যা নেম?
সে আমার দিকে রাগতভাবে তাকিয়ে রইল। অথচ বাইরে মুক্তোর মালার মতো ঝলমলে আলোয় শহরটি সজ্জিত। নতুন দেশ -- একটু কথা বলা, গল্প করার জন্য আমার মন উচাটন তখন। ড্রাইভারের বয়স মনে হলো পঞ্চাশের কাছাকাছি।
বেচারার পাথরের মতো মুখ করে রাখাটা খুব অস্বস্তি দিচ্ছিল আমাকে।
আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, আর ইউ অ্যাংগ্রি উইথ মি?
- নো।
এ দেখি ইয়েস - নো ছাড়া কিছুই বলে না।
- ডু ইউ ওউনড দিস কার?
সে ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
মনে হলো ইংরেজি তেমন বোঝে না।
আমারও ব্যাটার মুখ থেকে কথা বের করার জেদ চেপে বসল।
আবার বললাম, ইজ দিস ইউর ওউন কার?
এবার ওর মুখে হাসি ফুটল।
-ইয়েস।
আমার মুখেও হাসি। --সো ইউ আর্নিং এ লট। ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড হাউ ম্যানি কিডজ ইউ হ্যাভ?
ব্যাটা আবার নিশ্চুপ। মনে হলো না বুঝেছে বলে।
গাড়ি একটা বাঁক নেওয়ার পর জিজ্ঞেস করলাম,
আর ইউ ম্যারিড?
আমার দিকে হা করে তাকিয়ে সামনের দিকে নজর দিলো।
আমারও অদ্ভুত রোগ চেপে ধরল। এই রাত্রিবেলা ভুতুড়ে লোকজনের সংগে চলাফেরা করব নাকি!
মনে মনে বললাম, ধুর ব্যাটা। মুখে বললাম,
ডু হ্যাভ ইউ ওয়াইফ?
এবার সে বলল, নো, নো ওয়াইফ। লেডিস আর স্যাকারা।
তার উত্তর শুনে আমি হো হো করে হেসে ফেললাম। 'স্যাকারা' না বুঝলেও এর অন্তর্নিহিত অর্থটি আমি হৃদয়াঙ্গম করতে পারলাম বলেই মনে হলো। অচেনা ভাষার অর্থ এক সময় ভূতে যোগান দেয়।

ড্রাইভার আমাকে যে হোটেলটির সামনে নামিয়ে দেয় তার নাম রাম্বাবিন। রাতে খাওয়া দাওয়া সেরে পরিশ্রান্ত শরীর বিছানায় ছেড়ে দিলাম। নতুন জায়গা ঘুম সহজে আসছিল না। বারবারই ভাবছিলাম জীবন আমার আবার নতুন একটি পথে মোড় নিল।
পরদিন আমার ছাত্রী ডা. রেখা ও তার স্বামী শফিক এল। এক সময় আমি মেডিকেল কলেজে পড়াতাম। আলাপের একফাঁকে রেখাকে গতরাত্রিতে ড্রাইভারের সঙ্গে আমার আলাপের অংশবিশেষ বললাম। কে বলে মহিলাদের রসবোধ কম!সব শুনে রেখা হেসে কুটি কুটি। হাসি থামিয়ে বলল, স্যার আপনি 'স্যাকারা' মানে বুঝেছেন?
আমি নির্মোহভঙ্গিতে হাসলাম।
-স্যার, এদের ভাষায় 'স্যাকারা' মানে হলো খারাপ। ড্রাইভার বলতে চেয়েছে --লেডিসরা হলো খারাপ।
সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লাম।
সবচেয়ে জোরে শোনা গেল আমার ছাত্রীর স্বামীর হাসি।
ছাত্রী তার স্বামীর দিকে কটমট করে তাকাতে গিয়ে নিজেই আরেক প্রস্থ হেসে ফেলল।
আমি না দেখার ভান করে জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকালাম। শুভ্র মেঘের ভেলারা আনমনে আপনালয়ে ফিরে যায়।

­­­­­­­­­­­­­­­­­­­হোটেল রাম্বাবিনে চারদিনের মতো ছিলাম। এরমধ্যে উরফান এসে আমাকে মালদ্বীপ হেলথ মিনিস্ট্রিতে নিয়ে যেত। অফিসিয়াল আনুষঙ্গিক কাজ সারতে এই চারদিন লেগে গেল। বিকালের দিকে হোটেল থেকে বেরিয়ে কিছুটা রাস্তা পেরিয়ে সাগর তীরে চলে যেতাম। এখানে সাগরের পানি গাঢ় নীল। শহরের একপ্রান্তে যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেখানে সাগরের কোনো বেলাভূমি নেই। পানির স্রোত থেকে শহরের উচ্চতা খুব সামান্যই।মালদ্বীপ সাগর পৃষ্ঠ থেকে গড়ে পাঁচ থেকে ছয় ফুট উচ্চতায় দাঁড়িয়ে আছে। চারদিকে পাথর দিয়ে সাগরের পাড় বেঁধে দেওয়া হয়েছে মনোরমভাবে।
আনমনে বসে সাগরের স্রোতের দিকে তাকিয়েছিলাম অনেকক্ষণ। কতটা সময় পেরিয়ে গেছে ঠিক বলতে পারব না। চমক ভাঙল কাছেই একজনের সেল ফোনে কথা বলার শব্দে।
- আব্বু, কেমন আছ? হ্যালো … হ্যালো, আমার কথা শুনতে পাচ্ছ? তোমরা সবাই ভালো আছ তো, আব্বু? আমি ভালো আছি। তোমার আম্মুর কথা মন দিয়ে শুনবে।
বাংলায় কথা বলা শুনে মন সেদিকে আকর্ষিত হল। একজন বাংলাদেশি তার বাচ্চাদের সঙ্গে কথা বলছেন,
-এই তো আব্বু আর দুমাস। আর দু’মাস পর ঠিক দেশে আসছি। না আব্বু; এবার আসব। তোমার জন্য বড় একটা সুন্দর পুতুল নিয়ে আসব।
অপর প্রান্তের কথা খুব আবছাভাবে কানে আসে।
-আব্বু, তুমি তো সবসময়ই বলো আর দুমাস পরেই আসবে। তোমাদের ওখানে দুমাস কতদিনে হয় বলো তো আব্বু?
- না মা; এবার ঠিক আসব।

অন্ধকারে লোকটির মুখ দেখতে পাচ্ছি না। তবে আকাশের গায়ে জ্বলজ্বলে শুকতারাটিকে দেখতে কোনো অসুবিধা হচ্ছিল না।
লোকটি কথা বলে যাচ্ছে। এত আবেগঘনভাবে দ্রুত কথা বলে যাচ্ছে যেন সাগরের দুরন্ত স্রোত পাথরের গায়ে তীব্রভাবে আছড়ে পড়ছে।
আমি কিছুক্ষণ মানুষটির দিকে তাকিয়ে আবার দূর সাগরের দিকে তাকাই। কিছুক্ষণ পরপর দ্বীপ থেকে যখন কোনো ফেরি আসে তখন সাগরের ঢেউ উথাল-পাথালভাবে দোল খেতে খেতে পাথরের প্রাচীর ডিঙিয়ে পায়ের কাছে ছিটকে পড়ে।

 

তাকে ভাগ্যান্বেষণে বেরিয়ে যেতে হবে অন্য কোনো ঠিকানায়, অন্য কোনো ভূমে।

 

 

রাতের গাঢ় অন্ধকার ধীরে ধীরে জমাট বাঁধে; সেই অন্ধকার নিশ্ছিদ্রভাবে আমাকেও গ্রাস করে।
স্বদেশ থেকে প্রায় তিন হাজার কিমি দূরে আমি দাঁড়িয়ে আছি। কত কথা, কত স্মৃতি হৃদয়ের বেলাভূমিতে আছড়ে পড়ে।
লোকটি এখনও কথা বলে যাচ্ছে। প্রিয় বাংলা ভাষায় কথা বলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে পারলে ফোনের ভেতর দিয়ে প্রিয় মানুষগুলোর কাছে এখনি পৌঁছে যেত।

আকাশ জুড়ে তারার মেলা পুঞ্জীভূত অন্ধকার ভেদ করে মনের অলিগলি তীব্রভাবে আলোড়িত করে। আজ আমি বুঝতে পারি, কেন মানুষ বিমানের চাকায় চড়ে হলেও (নব্বই দশকে এক হতভাগ্য যুবক সবার অলক্ষ্যে বিমানের চাকায় চড়ে ঢাকা থেকে সৌদি আরব যায় এবং যথারীতি মৃত শরীরে পড়ে থাকে।) বিদেশ পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করে; খাবার-পানি ছাড়া ছোট্ট নৌকায় চড়ে অকূল দরিয়ায় নিজেকে ভাসিয়ে দেয়।
তাকে ভাগ্যান্বেষণে বেরিয়ে যেতে হবে অন্য কোনো ঠিকানায়, অন্য কোনো ভূমে।

হায় স্বদেশ, হায় মাতৃভূমি আমার!

_______________________

লেখক ডা. মোরশেদ হাসান ।
Works at Medical College, Assistant Professor.
Past: Works at Ministry of Health, Maldives and ICDDR,B

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।