|

গত শতাব্দীর জাঁদরেল মায়েরা বনাম এখনকার মা


Published: 2017-01-09 10:45:39 BdST, Updated: 2017-01-20 05:28:50 BdST

 

 

 

ডা. নাসিমুন নাহার
___________________________

আমাদের জেনারেশনের আম্মুরা মোটামুটি সবাই জাঁদরেল টাইপ ছিলেন ।কারো আম্মু যদি ভুল করেও নরম ছিল তো তার আব্বু দারোগা ভাবমূর্তি দিয়ে সিউর তা পুষিয়ে দিতেন । মোট কথা, আমাদের স্কুল কলেজ জীবনে আমাদেরকে মানুষ করে গড়ে তোলার মিশনে বাবা মায়ের শাসনের যথেষ্ট উল্লেখ যোগ্য ভূমিকা ছিল।

আমার এখনও মনে আছে লেখাপড়ার জন্য ক্লাস এইটে আমি আম্মুর হাতে শেষ মাইর খেয়ে ছিলাম রেকেট দিয়ে । আমার দোষ ছিল - আমি সম্পাদ্য উপপাদ্য মুখস্থ করে ফেলতাম পৃষ্ঠা নম্বরসহ।


আমার সারা জীবনই প্রবল অংক ভীতি।এদিকে টেলেন্টপুলে বৃত্তি না পেলে আমাকে ক্লাস নাইনে তোলা হবে না- আম্মুর এহেন হুমকিতে সদ্য কৈশোর প্রাপ্ত নাদান বালিকা আমি কি আর করতে পারতাম বলেন ?


যদিও আব্বু এসব মারামারি খুবই অপছন্দ করত।তাই আম্মু টেকনিক্যালি সমস্ত মারামারি বকাবকি এশার আজানের মধ্যেই আব্বু বাসায় ফেরার আগেই শেষ করে ফেলত।মা'রা যে কত ইয়ো ইয়ো বুদ্ধি ধরে ছোটবেলাতেই জেনে ফেলেছিলাম !!

 

এরপর জীবনের শেষ মাইর খেয়েছিলাম মেডিকেল কোচিং করার সময়।সেটা মনে কিঞ্চিত প্রেম প্রেম উড়ু উড়ু ভাব আসার জন্য । রিক্সাওয়ালার সাথে বিবাহ দিয়ে দেয়া হবে--- এই ভয়াবহ হুমকি দিয়ে সেই যাত্রায় প্রেমে পড়া রোধ করা হয়েছিল। কি নিষ্ঠুর !! কি নিষ্ঠুর !!

 

ফোন ধরবি না/ছাদে যাবি না/বারান্দায় উঁকি দিবি না/কোচিং এ ছেলেদের ব্যাচে পড়তে হবে না/ স্যারের সামনে হুজুরের সামনে এমনে যাবি ওমনে যাবি না/চাচাতো মামাতো ফুফাতো খালাতো ভাইয়ের সাথে কথা কম বলবি/রাস্তা দিয়ে মাথা নিচু করে হাঁটবি/এত টিভি দেখার কি আছে/পার্লারের চেহারা তো মেডিকেলে এসে প্রথম দেখেছি/ ফ্যামিলির মান সম্মানের কথা মনে রাখবি............ব্লা ব্লা ব্লা এততত এততত নিয়ম !
কম বেশি আমাদের সময়ের সবার গল্পটাই অনেকটা এরকম।

 

যাহোক এসব প্যাচাল পারার কারন বর্তমান জেনারেশনের বাবা মায়েরা বড্ড ই উদার !
এতটাই উদার যে সন্তানের সাথে সম্পৃক্ততাও তাদের খুবই কম।সবকিছুতেই অবাধ স্বাধীনতা।চাওয়ার আগেই সব পাওয়ার এই জেনারেশন !

আগে মায়েরা বেশিরভাগ হাউজ ওয়াইফ হওয়াতে বাবা ব্যস্ত থাকলেও সন্তানদের একাকীত্বে ভুগতে হতো না। কিন্তু বর্তমানে বেশিরভাগ পরিবারে বাবা মা দুজনেই কর্মজীব হওয়াতে সন্তানকে সময় দেবার ব্যাপারটি আসলেই একটা সামাজিক ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।এর ফলশ্রুতিতে অনেক অসংগতির সাথে আজকাল অহরহ কিশোর অপরাধের কথা শোনা যাচ্ছে। এই যে বাবা মায়ের এত পরিশ্রম তা তো সন্তানের জন্যই।কিন্তু সেই সন্তানই যদি সুস্থ সুন্দর স্বাভাবিক ভাবে বেড়ে না ওঠে তো কি হবে এত বৈধ-অবৈধ উপার্জনের,এত পরিশ্রমের ?

 

পরিবারেই প্রতিটি মানুষের প্রথম স্কুলিং হয়।যতই নামিদামি স্ট্যাটাস বজায় রাখতে গিয়ে উচ্চ মূল্যের স্কুল কলেজ, টিউশন দেন না কেন, দিনশেষে বাবা মা পরিবার'ই একজন সন্তানের সবথেকে বড় শিক্ষক।
Quality time সন্তানের সাথে কাটানো জরুরি।
শুধুমাত্র সন্তানের বাবা মা না হয়ে, বন্ধু হবার চেষ্টা করা প্রয়োজন।

শুধু দামী দামী খেলনা গ্যাজেট পোষাক না, বরং একসাথে মেঝেতে বসে দাবা লুডু চোর পুলিশ খেলাতে, টিভি দেখাতে, একসাথে গল্পের বই পড়াতে, ঘর গোছানোতে, রান্ন করাতে, কাচা বাজার করাতে,মসজিদে একসাথে নামাজ পড়তে যাওয়াতে , অন্য ধর্মের প্রার্থনা সন্তানের সাথে মিলে করাতে-- এরকম টুকরো টুকরো গল্পে তৈরি হতে পারে অটুট বন্ধন।

প্রয়োজনে অবশ্যই শাসন করা যেতেই পারে।তবে গায়ে হাত তুলে নয় বরং গলার স্বরের পরিবর্তনে কিংবা ভ্রু কুঁচকে তাকানোতেই যেন সন্তান বুঝতে পারে মা বাবা অসন্তুষ্ট আমার উপর, কষ্ট পাচ্ছে আব্বু আম্মু। সুতরাং আমাকে আমার এই কাজ /আচরন নিয়ে ভাবতে হবে দ্বিতীয় বার করার আগেই। এই অনুভুতিটুকু যদি টেকনিক্যালি এবং সিস্টেমিক ওয়েতে সন্তানের ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়া যায় ব্যাপারটা দারুন হবে, trust me really it works.


পৃথিবীতে সবার আগে আমার সন্তান আমার কোলেই থাকে।সুতরাং আমি যেভাবে ইচ্ছে সেভাবেই তাকে গড়েপিটে তৈরি করার বিরাট সুযোগটা কেন নিব না ?

যাহোক সন্তান জন্ম দেয়া খুব একটা কঠিন কাজ নয়।যদি সৃষ্টিকর্তা সহায় হোন বিয়ের ছত্রিশ সপ্তাহ না ঘুরতেই
আপনি জন্মদাতা জন্মদাত্রীর স্বাদ পেতে পারেন।কিন্তু 'বাবা মা' হতে হলে সন্তানকে বুকে জড়িয়ে কখনো ক্যাঙ্গারু মা, কখনো বাঘিনী মা, কখনও মমতায় বাবা, কখনো চোখের জলে মা, চোখের শাসনে বাবা হয়ে ফুল টাইম জব হিসেবেই দায়িত্বটা নিতে এবং পালন করতে হবে।বাকীটা আপনার কপাল।আল্লাহ না করুন সন্তান বখে গেলেও( সম্ভাবনা নেই বললেই চলে) সান্ত্বনা থাকবে আপনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন।নতুবা সারাজীবন 'আহারে আর একটু সময় দিলে হয়তো আমার বাবুটা আজ নষ্ট হয়ে যেত না' হায় আফসোসে কাটাতে হবে।

 

সৃষ্টিকর্তা আমাদের সবার সন্তানকে সারাজীবন Sound জীবন কাটানোর তৌফিক দান করুন।


_______________________________

 

লেখক ডা. নাসিমুন নাহার । জনপ্রিয় কলাম লেখক।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।