|

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ


Published: 2017-09-18 10:13:13 BdST, Updated: 2017-10-22 05:19:33 BdST

 

 


ডা. সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়

_____________________________________


(Gabriel García Márquez)
গাব্রিয়েল হোসে দে লা কনকর্দিয়া গার্সিয়া মার্কেজ লাতিন আামেরিকার কলম্বিয়া দেশে জন্মান ১৯২৭ সালের ৬ই মার্চ। তিনি ঔপন্যাসিক, ছোট গল্প লেখক এবং সংবাদদাতা র কাজ ও করেছেন। সারা লাতিন আমেরিকাতেই তাঁর পরিচয় --- গাবো বা গাবিতো -- এই ডাক নামে। তাঁকে গত শতাব্দীর উল্লেখ্য লেখকদের একজন বলে গণ্য করা তো হয়ই, এবং এস্পাইনিয়ল বা স্পেনীয় ভাষায় খ্যাতকীর্তি সমৃদ্ধ একজন কথাশিল্পী বলে মান্যতাও দেওয়া হয়।

 

গাব্রিয়েল এর জন্ম আরাকাতকা, কলম্বিয়া তে। পিতা -- গাব্রিয়েল এলিজিও গার্সিয়া। মা -- লুইসা সান্তিয়াগা মার্কুয়েজ ইগুয়ারান। জন্মের অব্যবহিত পরেই তাঁর বাবা - মা পেশাগত কাজের জন্যে বারানকিঈয়া ( Barranquilla )তে চলে যান। গাবো বড় হন মাতামহ -- মাতামহী বা দাদামশায়, দিদিমার কাছেই। বালক গাবো, তাঁর দাদুর কাছে শৈশবে গল্প শুনতে ভালোবাসতেন খুব। তাঁর দিদিমা ও চমৎকার গল্প শোনাতে জানতেন।।
সুক্রে ( Sucre) তে থাকতে আরম্ভ করার পরে গাবোর নিয়মিত পঠন পাঠন শুরু হয় এবং একপ্রকার নিয়মিত পড়াশুনো করার জন্যে তাঁকে বারানকিঈয়া তেই পাঠানো হয়। বারানকিঈয়া, একটি বন্দর নগরী, রিও মাগদেলেনা বা মাগদেলেনা নদীর কূলে। এখানকার বিদ্যালয়ে তাঁর শান্ত ছেলে হিসেবে নামকরণ হয়। গাবোর সখ ছিলো মজার কবিতা এবং মজার কমিক স্ট্রিপ আঁকা। চুপচাপ গাবোর আরেকটি নাম হল বন্ধুদের দ্বারা -- El Viejo, এল ভিয়েহো , যার বাংলা হচ্ছে বুড়ো।

 

প্রথমে যে বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন তিনি তার নাম কলেজিও হেসুইতা সান ওসে ( Colegio jesuita San Hosé.)তে -- ১৯৪০ সালে, এবং সেখানেই বিদ্যালয়ের ম্যাগাজিনে হুভেন্তুদ ( Juventud) বা তারুণ্য তে তাঁর প্রথম কবিতাগুলি প্রকাশিত হয়। অত:পর একটি সরকারি বৃত্তি পেয়ে তিনি ভর্তি হন রাজধানী বোগোতার লিসিও নাসিওনাল দে জিপাকিরা ( Liceo Nacional de Zipaquira ) যার অর্থ হোলো জিপাকিরার জাতীয় বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয় টি রাজধানী বোগোতা থেকে এক ঘন্টা মোটরগাড়ি র দূরত্বে।


এই সময়ে তাঁর খেলাধুলা র প্রতি আকর্ষণ বাড়ে এবং বিভিন্ন খেলাধুলায় তিনি লিসিও নাসিওনাল দলের অধিনায়ক হন, ফুটবল, বেসবল এবং মাঠের দৌড় প্রতিযোগিতা তে।


১৯৪৭ সালে স্নাতক হবার পরেও গাবো থেকে গেলেন, বোগোতা তেই, এবং আইনের ছাত্র হলেন য়ুনিভারসিদাদ নাসিওনাল দে কলম্বিয়া তে ( Universidad Nacional de Colombia)। এখানেই ফ্রাঞ্জ কাফকার লা মেতামরফোসিস পড়েন হোর্গেস লুইস বোর্গেস এর অনেকাংশ ভুল অনুবাদে। এই বইটি গাবো কে ভীষণ উদ্দীপ্ত করে। এই বইখানি তার জীবনধারা কেই পালটে দেয় বললেও অত্যুক্তি হবে না একটু ও। লেখক হওয়ার বাসনা জাগে মনোমাঝে। তাঁর একটি লেখাও বেরোয় প্রথম শ্রেণী র সংবাদপত্র -- এল এস্পেক্তাদোরে ( El Espectadore) এ, ১৯৪৭ এই।
তাঁর রুচিতে লেখকস্বত্ত্বা ভিড় করলেও তিনি পিতার ইচ্ছায় তাঁর আইন পড়া চালাতেই থাকলেন। হটাৎ ১৯৪৮ সালের এপ্রিল মাসে, শীতকালে হত্যা করা হয় জনপ্রিয় নেতা হোর্গে এলিয়েসের গাইতান কে। ( Jorge Eliècer Gaitán )। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায় অনির্দিষ্ট কালের জন্য এবং যে বাড়িটিতে তিনি থাকতেন, তাও ভস্মীভূত হয়। বাধ্য হয়ে য়ুনিভার্সিদাদ দে কার্তাজেনা তেই ভর্তি হন। তাঁর পাঠ সম্পন্ন হলো না এবং তিনি সাংবাদিক হিসেবে কাজ করতে আরম্ভ করেন এল এরাল্দো ( El Heraldo) নামক নামী সংবাদপত্রে।


রাজনীতি --- মারকুয়েজ বরাবর ই কমিটেড লেফটিস্ট ছিলেন। যদিও এই শব্দবন্ধের অর্থ আমার নিজের কাছেই আদৌ স্পষ্ট নয়। তাঁর একনায়ক ফিদেল কাস্ত্রো র সঙ্গে বন্ধুতা ছিলো।
গার্সিয়া মারকুইজ এর সঙ্গে মেরসেডেজ বার্চার সঙ্গে প্রথম প্রেম ও প্রণয় হয় স্কুলজীবনেই। কিন্তু তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে বিবাহ হবে শিক্ষার অন্তে। মারকুইজ কে সাংবাদিকতার জন্যে ইউরোপ পাঠানো হলে, মেরসেডেজ ( Mercedes) তাঁর ফেরার জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন বাররানকিঈয়া তে। ইউরোপ থেকে ফিরলে তাঁদের বিবাহ হয়, ১৯৫৮ ক্রিস্টাব্দে। পরের বছর বা ১৯৫৯ তে জন্ম হয় তাঁদের প্রথম পুত্র রদ্রিগো গার্সিয়ার। ১৯৬১ তে গার্সিয়া পরিবার আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে যান, এবং শেষ পর্যন্ত থাকতে আরম্ভ করেন মেহিকো সিটি তে (Mexico)। ৩ বছর পরে জন্ম হলো গনজালোর। ( Rodrigo & Gonzalo)।
লা ওহারাস্কা ( La Hojarsca) যার ইংরেজি অনেকটা Leaf Storm গার্সিয়া মার্কেজ এর প্রথম ছোট উপন্যাস বা নভেলেত্ ( Novellete)। আরো আশ্চর্য যে এটির প্রকাশক যোগাড় করতে তাঁকে সাত টি বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল।
সিয়েন আইনোস দে সোলেদাদ ( Cien años de soledad ) বা একশ বছরের নি:সঙ্গতা বা ইংরেজিতে One hundred years of solitude।
একদিন মেহিকোর আকাপুলকো শহরে গাড়ি চালাতে চালাতে হটাৎ এই প্রতিভাবানের মাথায় লেখার ভূত চাপে, এবং মার্কেজ টানা দেড় বছর প্রতিদিন ই লিখতেন অন্ততপক্ষে বেশ কয়েক ঘন্টা। এই সময়ে তিনি মাত্র দূটি দম্পতি র সঙ্গেই দেখাসাক্ষাৎ করতেন এবং নিজের লেখা নিয়ে আলোচনা করতেন। এঁদের নাম -- এরান কার্মেন ও আলভারো মুতিস এবং মারিয়া লুইসা এলিও ও হোমি গার্সিয়া আস্কত। ১৯৬৭ সালে সিয়েন আইনোস দে সোলেদাদ পুস্ততকাকারে প্রকাশিত হয়। বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ ও হয়। এটি সর্বাধিক বিক্রীত উপন্যাস হিসেবে গণ্য হয়। ৩০ কোটির ও বেশী বিক্রি হয় এই বইটি।

 

এই বইটি এতো জনপ্রিয় হয় যে, নোবেল পুরস্কার ছাড়াও বইটি ' প্রেমিও রোমুলো গাঈয়েগোস ' ( Premio Romulo Gallegos) পুরস্কার ও পায়। উইলিয়াম কেনেডি মন্তব্য করেন যে বইটি সব্বাইকার পড়া উচিৎ।
এই বইটির বিপুল জনপ্রিয়তার পরে গার্সিয়া মার্কেজ, বার্সেলোনা, এস্পানাতে সপরিবারে চলে আসেন এবং থিতু হন এখানেই।
এর পরে মার্কেজ লিখলেন --- এল ওতোঈনো দেল পাত্রিয়ার্কা ( El otoño del patriarcha ) যা ইংরেজি অনুবাদে দাঁড়ায় Autumn of the patriarch ।
এরপরে লেখেন --- ক্রনিকা দে উনা মুয়েরতে আনুনসিয়াদা ( Crônica de una muerte anunciada )। ইংরেজি তে Chronicle of a death foretold। এই বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৮১ তে আর গার্সিয়া মার্কেজ ১৯৮২ তে নোবেল পুরষ্কারে সম্মানিত হন।

 

এল আমর এন লস তিয়েম্পোজ দেল কলেরা ( El amor en los tiempos del cólera )বা ইংরেজিতে --- Love in the time of cholera.
সিনেমা এবং নাট্যরুপ ----
আবারো মার্কেজ পরিবার বার্সেলোনা থেকে মেহিকো তেই ফিরে আসেন। এখান থেকে ফিদেল এর আমন্ত্রণে যান কুবার রাজধানী আবানা তে (Havana, Cuba)। তিনি কয়েকটি স্ক্রীন প্লে লিখতে এবং প্রস্তুত করতে সহায়তা করেন।হুয়ান রুলফোর -- এল গাঈয়ো দে ওরো ( El gallo de oro) বা The golden rooster। ওনার অন্য চিত্রনাট্য গুলি ছিল তিয়েম্পো দে মরির ( Tiempo de morir) এবং উন সেঈনর মুই ভিয়েহো কন উনাস আলাস এনর্মেস (Un señor muy viejo con unas alas enormes) Eng. ( A very old man with huge wings)
তাঁর বেশ কয়েকটি ছোটগল্প ও বিখ্যাত খুব। এর অনেকগুলি চলচ্চিত্রেও রূপায়িত হয়েছে। এর মধ্যে ১. লা ভিউদা দে মন্তিয়েল ( La viuda de Montiel) Eng. ( The widow of montiel).; ২. মারিয়া দে মি কোরাজোন ( Maria de mi corazôn) Eng. ( Maria of my heart )। ৩. এল কোরোনেল নো তিয়েনে কুইয়েন লে এস্ক্রিবা ( El coronel no tiene quien le escriba) Eng. ( The cornel has none to write to him)।

 

১৯৯৯ সালে গাব্রিয়া মার্কেজ লিম্ফ্যাটিক ক্যান্সার,সম্ভবতঃ হজকিন লিম্ফোমা তে আক্রান্ত হন এবং লস আঞ্জেলিসে তাঁর কেমোথেরাপি দেওয়া হয় এবং আবার সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি।
২০১২ তে তাঁর ভাই জেইমে ঘোষণা করেন যে গাব্রিয়া স্মৃতিবিলোপ বা আলঝাইমার্স এ ভুগছেন।
২০১৪ তে গাব্রিয়া মেহিকোর হাসপাতালে ভর্তি হন। মেহিকো এবং কলম্বিয়া র রাষ্ট্রপতি তাঁকে দেখতে আসেন হাসপাতালে।
এই প্রতিভাবান লেখকের মহাপ্রয়াণ হয়, ৮৭ বছর বয়েসে, ১৭ ই এপ্রিল, ২০১৪ ক্রিস্টাব্দে।
অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া র পরে তাঁর নশ্বর দেহের ছাই নিয়ে যাওয়া হয় স্মৃতির চিহ্ন স্বরুপ তাঁর বাড়ী র অদূরে পালাসিও দে বেঈয়াস আর্তেস এ শেষ অন্ত্যেষ্টি র জন্যে।

________________________________

 

 

 

 

লেখক ডা. সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায় । কলকাতার প্রখ্যাত লোকসেবী চিকিৎসক। সুলেখক । কবি।

Diabetes & Endocrinology Consultant
M.D. at University of Madras । প্রাক্তন :
Calcutta National Medical College and Madras Medical College (MMC)

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।