|

ডায়াবেটিস রোগ নিয়ে সামান্য-কথন (২)ডায়াবেটিসের ১১ লক্ষণ


Published: 2016-12-19 15:24:36 BdST, Updated: 2017-03-27 04:45:37 BdST

 

নিয়মিত হাঁটায় আছে অনেক উপকার

 

_____________________________________

ডা. মোরশেদ হাসান

________________________
এটাই যেন খুব স্বাভাবিক। যেন এমনই তো হওয়ার কথা। ডাক্তারী পাশ করার পর বাসা থেকে টাকা নেওয়া যায় না। সে চাকরি থাকুক আর না থাকুক। অনারারি ফিজিশিয়ান হিসাবে ডিউটি করে যেতে হবে। তোমার শ্রম নেওয়া হবে বিনিময়ে তুমি মূল্যবান অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করবে। এটাই তো যথেষ্ট; আবার চোখ তুলে তাকাও কী জন্য? জীবনে চোখ নামিয়ে চলার চেষ্টা করো। আর ভালো না লাগলে বেরিয়ে যাবার দরজা খোলা আছে।
এই হচ্ছে নবাগত চিকিৎসকদের জন্য সমাজের সব শ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গি; এমন কী স্বজাতির ভাবনাও একই। ফাহিম জানে সমাজের এই শৃঙ্খল ভাঙা তার পক্ষে সম্ভব নয়। এই দেশে নবাগত কোনো চিকিৎসকের পক্ষেই তা সম্ভব নয়। অতএব রাতে ক্লিনিকে নাইট ডিউটি শেষে সকালে আবার হাসপাতালে অনারারি ডিউটি দিতে ছুটতে হয়। রাতে এক-দু’ঘণ্টা ঘুমিয়ে সারাদিন চলা এতেই এখন ফাহিম অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে।
সাত-পাঁচ ভাবছিল ফাহিম। শায়লা আর শায়লার চাচা চেম্বারে ঢোকায় তার ভাবনায় ছেদ পড়ে।
--ফাহিম ভাই, আপনি মনে হয় ভালো নেই। ফাহিম চোখ তুলে তাকায়। শায়লার কথা-বার্তা, চলা ফেরায় একটা স্বচ্ছন্দ ভাব আছে। ওর অ্যাপিয়ারেন্সটাই মিষ্টি। ফাহিম দ্রুত চোখ সরিয়ে নিতে নিতে বলে, না না; আমি ভালো আছি।
না, আপনার চোখ লাল কি না তাই জিজ্ঞেস করলাম। একটি সুদৃশ্য প্লাস্টিকের কৌটা ফাহিমের দিকে এগিয়ে দিয়ে শায়লা বলে, আম্মু আপনার জন্য একটু পায়েস পাঠিয়েছেন।
শায়লার চাচা চেয়ারে আয়েস করে বসতে বসতে বলেন—শায়লা মা, প্যাকেটটা খোল। ডাক্তার সাহেবের সঙ্গে আমিও একটু খাই। তমাল বাবুকে বল দুটো প্লেট দিতে। যা খাওয়ার ডায়াবেটিস ধরা পড়ার আগেই খেয়ে নিই---বলেই হা হা করে হাসিতে ফেটে পড়েন। শায়লা চাচার দিকে ভ্রুকুটি করতে গিয়েও হেসে ফেলে।
পায়েসের মিষ্টি সুঘ্রাণ রুমে ছড়িয়ে পড়ে। এক চামচ পায়েস মুখে পুরে শায়লার চাচা জিজ্ঞেস করেন,
আচ্ছা ডাক্তার সাহেব একটু বলেন তো ডায়াবেটিস হলে শরীরে কী হয়?
পায়েস মুখে দিয়ে কথা বলতে ফাহিমের বেশ লাগছে।
-- ডায়াবেটিস হচ্ছে একটি বিপাকজনিত রোগ। ডায়াবেটিস হলে শরীরে যে অবস্থার সৃষ্টি হয় তার নাম হাইপারগ্লাইসেমিয়া এতে রক্তে সুগার অতিরিক্ত বেড়ে যায়। আমরা খাবার খাওয়ার পর সেটি পাকস্থলী ও ক্ষুদ্রান্ত্রে এনজাইম ও অ্যাসিডের মাধ্যমে পরিপাক হয়ে বৃহদন্ত্রে গিয়ে শোষণ প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় গ্লুকোজ রক্তে আসে ও অপ্রয়োজনীয় অংশ শরীর থেকে বেরিয়ে যায়।

শায়লা জিজ্ঞেস করে বসে, আচ্ছা শব্দটি বিপাক কেন? আমরা তো মুখের কথায় বিপাক বলি না; বলি পাক যেটিকে আপনারা বলেন ডাইজেস্ট হওয়া।
--আমরা তো বিজ্ঞান বলি। কিন্তু মূল শব্দটি হচ্ছে ‘জ্ঞান’। বি—হচ্ছে উপসর্গ। উপসর্গের কাজ হচ্ছে শব্দের পূর্বে বসে সেটির ভাব বৃদ্ধি, হৃাস বা নতুন শব্দ তৈরি করা। সুতরাং বিজ্ঞান মানে হচ্ছে বিশেষ যে জ্ঞান। তেমনি বিপাক হচ্ছে বিশেষভাবে পরিপাক হওয়া। ---যা বলছিলাম খাবার বিপাক হওয়ার পর গ্লুকোজ শরীরের রক্তে মেশে। রক্ত থেকে গ্লুকোজ যায় মাংসপেশীর কোষে। সেখানে দহনের ফলে শক্তি ও পুষ্টি উৎপন্ন হয় যা আমাদের শরীরের কাজে লাগে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে রক্ত থেকে গ্লুকোজ নিজে নিজে শরীরের মাংসপেশীতে যেতে পারে না। গ্লুকোজকে মাংসপেশীর কোষে ঢুকতে সহায়তা করে হরমোন ইনসুলিন।

শায়লার চাচা বাধা দিয়ে বলেন, ইনসুলিন আবার কোথা থেকে আসে?
--আমাদের শরীরে পাকস্থলীর নিকটে অগ্ন্যাশয় বলে একটি গ্রন্থি আছে যাকে ইংরেজিতে বলে প্যানক্রিয়াস। এই প্যানক্রিয়াসের আইল্যেটস অব ল্যাঙ্গারহেন্স কোষপুঞ্জের বিটা সেল থেকে তৈরি হয় ইনসুলিন হরমোন। ফাহিম শায়লার দিকে তাকিয়ে বলে,
আচ্ছা শায়লা আপনি দেখেছেন এখনকার শহরাঞ্চলে ছোট বাচ্চাদের স্কুলে দিয়ে আসে বাবা-মায়েরা বা যাদের গাড়ি আছে তারা ড্রাইভারের সাথে গাড়িতে করে যায়। এখন যদি বাবা-মা কোনো কারণে যেতে না পারে, এমনকি ড্রাইভারও সেদিন না আসে তবে বলা হয় আজ বাচ্চার স্কুলে যাওয়ারই দরকার নেই। ঠিক তেমনি প্যানক্রিয়াসের বিটা সেল যদি প্রয়োজনীয় ইনসুলিন তৈরি করতে না পারে অথবা তৈরি করলেও শরীর তা ব্যবহার করতে না পারে তবে শরীরে যে অবস্থার সৃষ্টি হয় সেটিকে বলে ইনসুলিন রেসিস্ট্যান্স । ছোট বাচ্চারা যেমন বড় কারও সাথে ছাড়া স্কুলে যেতে পারে না; তেমনি রক্তের গ্লুকোজ ইনসুলিনের সহায়তা ব্যতীত মাংসপেশীর কোষে ঢুকতে পারে না।
আর মাংশপেশীতে গ্লুকোজ় যেতে না পারায় শরীর শক্তি পায় না; শরীর খুব সহজেই ক্লান্তি আর দুর্বলতা অনুভব করে। । সুতরাং তার ক্ষুধা লাগে বেশি, খাবার খায় বেশি। আর রক্তে গ্লুকোজ বেড়েই চলে। এক সময় রেনাল থ্রেশহোল্ড ১০ মিলিমোল/লিটার অতিক্রম করে। রেনাল থ্রেসল্ড অতিক্রম করলে প্রস্রাবের সাথে গ্লুকোজ বের হবে। বের হওয়ার সময় সাথে করে পানিও নিয়ে বের হবে। ফলে ঘন ঘন প্রস্রাব হবে। এতে তার তৃষ্ণাবোধ বেশি হবে; পানি পান করবে বেশি। কোষে গ্লুকোজ না ঢোকার কারণে শরীর অন্য জায়গা যেমন মাসল থেকে প্রোটিন সংগ্রহ করতে থাকে। এছাড়া অতিরিক্ত সুগার কমাবার জন্যে কিডনি অতিরিক্ত কাজ করে এজন্যে শক্তির দরকার হয়। ফলে ওজন হ্রাস হবে দ্রুতগতিতে।

শায়লা চোখ বড় বড় করে ফাহিমের দিকে তাকিয়ে আছে। সে দৃষ্টিতে শ্রদ্ধার সঙ্গে মুগ্ধতা মেশানো।
শায়লার চাচা বলেন, তা হলে কী ডাক্তার সাহেব ডায়াবেটিসের লক্ষণ আপনি যা এতক্ষণ বললেন এগুলোই।
ফাহিম মনে মনে হাসে। শায়লার বড় বড় চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে কথা বলতে তার ভালো লাগছে। মুখে বলে,
জি, এতক্ষণ যা বললাম তা-ই। তবে বইয়ের ভাষায় বললে,
ডায়াবেটিসের লক্ষণসমূহ :
(১) বার বার প্রস্রাব করা (Polyuria)
(২) অস্বাভাবিক তৃষ্ণা (Polydipsia)
(৩) অস্বাভাবিক ক্ষুধা (Polyphagia)
(৪) ওজন হৃাস
(৫) অল্প পরিশ্রমে ক্লান্তি
(৬) ক্ষীণাকৃতি চেহারা (Type-1)
(৭) স্থূলাকৃতি চেহারা (Type-2)
(৮) ক্ষতস্থান দেরিতে শুকানো
(৯) পায়ে অসাড় অনুভূতি
(১০) চোখের দৃষ্টিশক্তি আবছা হওয়া
(১১) চামড়ায় শুষ্কতা বা চুলকানি ভাব আসা।

এতক্ষণ আমরা যা কথা বললাম তা ডায়াবেটিস টাইপ-২ নিয়ে বললাম। এছাড়া টাইপ-১ আছে, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস ও অন্যান্য নির্দিষ্ট কারণভিত্তিক শ্রেণি আছে। এ নিয়ে আরেকদিন আলাপ করব। আজ উঠি...(ক্রমশ)

_____________________________

 

লেখক ডা. মোরশেদ হাসান ।
Works at Medical College, Assistant Professor.
Past: Works at Ministry of Health, Maldives and ICDDR,B

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।