|

ডায়াবেটিস রোগ নিয়ে সামান্য কথন (১)


Published: 2016-12-13 11:33:13 BdST, Updated: 2017-03-26 07:33:29 BdST

  

ডা. মোরশেদ হাসান
___________________________

তালুকদার ফার্মেসির পেছনে ছোট্ট একটি খোপে ফাহিম গুটিশুটি হয়ে চেয়ারে বসে আছে। শীতের মধ্যে নেভি ব্লু জ্যাকেট পরিহিত ফাহিমকে দেখতে কেতাদুরস্ত ডাক্তার বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু রোগীর কোনো দেখা নেই। ফাহিমের মতো নতুন পাশ করা ডাক্তারের চেম্বারে রোগীরা আসে না। সর্দি-কাশি নিয়ে দুইঘণ্টা সিরিয়াল দিয়ে বসে থাকতে হয় এমন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে যেতেই তাঁরা পছন্দ করেন। সহজ জীবন-যাত্রা কেন যেন এ শহরের মানুষের পছন্দ নয়। রাত নয়টার পরে বাসায় রোগী নিয়ে বিপদে পড়লে তখন দু'একজন আসে। দোকানের কেমিস্ট তমাল বাবু পর্দা সরিয়ে উঁকি দিয়ে বলে,
বাসার কল। যাইবেন নি, ডাক্তার সাহেব?

ফাহিম দ্রুত ব্যাগ গুছিয়ে নেয়। রাত দশটায় নাইট ডিউটিতে শেফা ক্লিনিকে যেতে হবে। এই নাইট ডিউটির মাসকাবারি টাকাটাই তার সম্বল। সকাল ৭টায় উঠেই আবার অন্য ডাক্তারকে ডিউটি বুঝিয়ে দিয়ে শিশু হাসাপাতালে অনারারি ডিউটি করতে ছুটতে হবে। আবার বিকাল থেকে তালুকদার ফার্মেসি। ঘড়ির কাঁটার মতোই জীবন।
এ মুহূর্তে ফাহিম "ডেভিডসন প্রিন্সিপালস এন্ড প্র্যাকটিস অব মেডিসিন" বইটি খুলে বসে আছে। এমন সময় একটি ৬০/৬৫ বছরের মানুষ পর্দা সরিয়ে চেম্বারে ঢোকেন। পেছন পেছন যে অপরূপ মেয়েটি আসে তাকে ফাহিম চেনে। দোকানের মালিক তালুকদার সাহেবের বড় মেয়ে শায়লা। শায়লা আশা ইউনিভার্সিটিতে অনার্সে পড়ে। শায়লার বড় বড় চোখ দুটির দিকে তাকালে ফাহিমের প্রথমেই পানি-ভর্তি টইটম্বুর ডোবার কথা মনে পড়ে। চোখে দিব্যি জলাশয় ধারণ করে আছে এ মেয়ে।

-- স্লামালিকুম ফাহিম ভাই। কেমন আছেন? আমার বড় চাচাকে নিয়ে এলাম। চাচা তাঁর সমস্যা নিয়ে আপনার সঙ্গে আলাপ করতে চান।
শায়লার চাচাকে সম্মান দেখিয়ে ফাহিম দাঁড়িয়ে বলে, ওয়ালাইকুম আস সালাম। বসুন।
শায়লার চাচা জিজ্ঞেস করেন,
-- ডাক্তার সাহেব কেমন আছেন?
-- জি, ভালো আছি।
-- ডাক্তার সাহেব কী মেডিসিনের উপর কোনো বড় ডিগ্রি করছেন?
- জি না। তবে ভবিষ্যতে করার আশা করছি। আপনার কী সমস্যা বলুন।
- বড় ডিগ্রি করছেন না এখনও! লোকটার মুখে হতাশার ছাপ। শায়লা পাশের চেয়ার থেকে দ্রুত উঠে যায়।
-ফাহিম ভাই, আপনি চাচাকে দেখুন। আমি আসি। পিঠ ছাপানো মেঘের মতো কালো চুলে একটি বাঁক নিয়ে শায়লা উঠে যায়।

ফাহিমের সামনে বসা মানুষটির নাক অস্বাভাবিক লম্বা ও সূচাগ্র। ছোট ছোট চোখে কুতকুত করে ফাহিমের দিকে তাকিয়ে আছে। ফাহিম প্রমাদ গোনে। এ রোগী বড় যন্ত্রণা দেবে।
-ডাক্তার সাহেব কয়েকদিন ধরে শরীরটা বড় দুর্বল লাগে। ঘন ঘন পেসাপ আসে। ভাবলাম ডায়াবেটিস হইলো কি না। ফার্মেসির তমাল বাবু তাঁর যন্ত্র দিয়া দেইখ্যা কইলো ডায়াবেটিস নাই। তয় ডাক্তার সাহেব শরীরটা এত দুর্বল লাগে ক্যান?
ফাহিম দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে জিজ্ঞেস করে, আপনার র‌্যান্ডম ব্লাড সুগারের রিডিং কত এসেছে?
-- তমাল বাবু ৬.৫ কইলো। কইলো ভালো আছি।
-- আপনি যে টেস্টটি করেছেন তার নাম RBS (Random Blood Sugar)। শুধু এ রিপোর্ট দিয়ে কারও ডায়াবেটিস আছে কি না নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। এ পরীক্ষা দিয়ে শুধু ধারণা করা যায়। যাঁদের আগে থেকে উচ্চ মাত্রায় ডায়াবেটিস আছে তাঁদের বর্তমানে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণের ভিত্তিতে ডায়াবেটিসের কন্ডিশন বলা যাবে। আপনাকে যেটি করতে হবে সেটি হচ্ছে OGTT (Oral Glucose Tolerance Test)।
-- ডাক্তার সাহেব, একটু বুঝাইয়া না দিলে তো বুঝি না। র‌্যান্ডম যে একটা কথা কইলেন এর মানে কী? ওজিটিটি দিয়া কী বুঝায়?

ফাহিম বুঝে ফেলে এ রোগীর কাছ থেকে ভিজিট পাওয়া যাবে না। এ হচ্ছে আলাপ করা রোগী। ফাহিম দশ সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলে,
র‌্যান্ডম শব্দের মানে হচ্ছে এলোপাথাড়ি। অর্থাৎ আপনি দিনের যে কোনো সময় গ্লুকোমিটার যন্ত্রের মাধ্যমে আঙুলের অগ্রভাগ থেকে একটু ব্লাড নিয়ে স্ট্রিপের মাধ্যমে জানলেন ব্লাড সুগারের অবস্থা। সাধারণত রোগীরা দুপুরে খাবারের পর বিশ্রাম নিয়ে বিকালে বা সন্ধ্যায় ডাক্তারের চেম্বারে দেখিয়ে টেস্ট করতে যায়। দুপুরে খাওয়ার পর বিকেল বা সন্ধ্যায় রক্ত পরীক্ষা করাতে গেলে অনেকটা সময় পেট খালি থাকে। এতে করে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা এমনিতেই কমে যায়, যার ফলে RBS পরীক্ষায় ডায়াবেটিস ধরা পড়ার সম্ভাবনা কম থাকে।

এ জন্যই ডায়াবেটিসের নির্ভরযোগ্য টেস্ট হচ্ছে OGTT টেস্ট। Oral-শব্দের মানে হচ্ছে মুখ। মুখে গ্লুকোজ খাওয়ার পর সহনশীল ক্ষমতা পরিমাপ করা হয়। অবশ্য এই টেস্ট করার সুনির্দিষ্ট নিয়ম আছে। আপনি এই টেস্ট করার পূর্বে কয়েকদিন স্বাভাবিক যে ভাবে ভাত-তরকারী খেতেন সেভাবেই খাবেন। যেদিন সকালে টেস্ট করাবেন তার আগের রাত থেকে মিনিমাম আট ঘণ্টার মধ্যে কোনো খাবার খেতে পারবেন না অর্থাৎ সকাল ৮টা বাজে টেস্ট করালে রাত বারটার আগেই আপনাকে খাওয়ার পালা চুকাতে হবে।
সকালে কোনো কিছু এমনকি পানিও না খেয়ে আপনাকে ভালো কোনো ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে ব্লাড দিতে হবে। প্রথমবার ব্লাড নেওয়ার পর ল্যাব টেকনিশিয়ান আপনাকে এক গ্লাস অর্থাৎ ২৫০ মিলি পানির সাথে ৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ মিশিয়ে শরবত বানিয়ে খেতে দেবেন। এটি খাওয়ার পর আপনি দুঘণ্টা পানি, চা, কফি, পান, সিগারেট কিছুই খেতে পারবেন না। এমনকি দুই ঘণ্টা তিনতলা বাসায় গিয়ে রেস্ট নিয়ে আসবেন তা-ও করবেন না। দু’ঘণ্টা বসে কাটানোই উত্তম। দু’ঘণ্টা পর ল্যাব-টেকনিশিয়ান আবার আপনার ব্লাড নেবেন। হয়ে গেল আপনার OGTT টেস্ট।

--ডাক্তার সাব, আপনার OGTT টেস্টের মাধ্যমে কীভাবে বোঝা যাবে ডায়াবেটিস আছে না নেই।
--ডায়াবেটিসের কিছু স্বীকৃত পরিমাপ আছে। যেমন ধরুন আপনি খালি পেটে প্রথমে একবার রক্ত দিলেন সেটির রিডিং এবং গ্লুকোজ খাওয়ার পরের রিডিং দেখে ডাক্তাররা বুঝতে পারেন আপনি ডায়াবেটিসের রোগী অথবা আপনি প্রি-ডায়াবেটিস বা ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে আছেন অথবা আপনার ডায়াবেটিস নেই। প্রিডায়াবেটিসের রিডিংকে বলা হয় Impaired Glucose Tolerance (IGT) ও আরেকটি রিডিং হচ্ছে Impaired Fasting Glucose (IFG)।
-- তা ডাক্তার সাহেব এ তিনটি রিডিংযের মাধ্যমে কীভাবে বোঝা যাবে ডায়াবেটিস আছে বা নেই অথবা আপনি যে বললেন প্রিডায়াবেটিস বা ডায়াবেটিসের ঝুঁকির মধ্যে আছে সেটি?
ফাহিম শান্তকণ্ঠে বলে,
পরীক্ষার রিডিং যদি----
**সকালে খালি পেটে ৭.০ মিলিমোল/লিটার বা তার বেশি হলে অথবা গ্লুকোজ খাওয়ার ২ ঘন্টা পর ১১.১ মিলিমোল/লিটার বা তার বেশি হলে বুঝতে হবে ডায়াবেটিস আছে।
** সকালে খালি পেটে ৭.০ এর কম হলে এবং গ্লুকোজ খাওয়ার ২ ঘন্টা পর ৭.৮--১১.১ এর কম হলে ইম্পেয়ার্ড গ্লুকোজ টলারেন্স (IGT)।
** সকালে খালি পেটে ৬.১--৭.০ এর কম হলে এবং গ্লুকোজ খাওয়ার ২ ঘন্টা পর ৭.৮ এর কম হলে ইম্পায়ার্ড ফাস্টিং গ্লুকোজ (IFG)।
IGT ও IFG দুটিই ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস রোগ হওয়ার সংকেত দেয়।

** সকালে খালি পেটে ৬.১মিলিমোল/লিটার এর কম হলে এবং গ্লুকোজ খাওয়ার ২ ঘন্টা পর ৭.৮ মিলিমোল/লিটার এর কম হলে ডায়াবেটিস নেই।

-- এখন ডাক্তার সাহেব কী করব?
-- আপনি আগে OGTT টেস্ট করে আসুন। তারপর বাকি আলাপ করা যাবে।
-- আসলামু আলাইকুম ডাক্তার সাহেব।
-- ওয়ালাইকুম আস সালাম।
ফাহিম দ্রুত তার ব্যাগ গুছিয়ে নেয়। তাকে এখনি ছুটতে হবে ক্লিনিকের নাইট ডিউটিতে। হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সে প্রায় চলন্ত একটি রিকশায় উঠেই বলে ভাই, দ্রুত চলেন...(ক্রমশ)

_____________________________

 

লেখক ডা. মোরশেদ হাসান ।
Works at Medical College, Assistant Professor.
Past: Works at Ministry of Health, Maldives and ICDDR,B

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।