|

মেডিকেল ছাত্রের আত্মহত্যা এবং


Published: 2016-12-27 10:08:16 BdST, Updated: 2017-09-21 07:26:26 BdST

তানভীর আহমেদ তালুকদার, এমবিবিএস শিক্ষার্থী

___________________________________


আবির কিভাবে Painless death হয় সেটা চিন্তা করতে থাকলো।
.
গাড়ির নিচে চাপা পড়ে বা গলায় দড়ি দিয়ে সিনেমাটিক স্টাইলের মৃত্যু সে নিজের জন্য চায় না।
.
একবার ভাবলো সে বিষ খাবে।কিন্তু বিষ খেয়ে মরার বদলে যদি হাসপাতালে নিয়ে Stomach wash দিলে সেটাও কষ্টের!
.
আবির মৃত্যুর চিন্তা করছে কারন সে আজ লেকচার ক্লাসে বকা খেয়েছে।
.
ইদানিং সব জায়গাতেই সে ঝাড়ি খাচ্ছে।আইটেমের টেবিলে ঝাড়ি! ওয়ার্ডে ঝাড়ি!
.
মেডিকেলে পড়ার ইচ্ছা আবিরের একদম ছিলো না।বাবার চাপে সে মেডিকেলে আসতে বাধ্য হয়।তার ইচ্ছা ছিল ফিজিক্স নিয়ে পড়াশুনা করার।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্সও পেয়েছিল।কিন্তু সেই ভাগ্য তার আর হয়নি।
.
প্রথম প্রথম সে একদমই ক্লাসে মনযোগ দিতে পারতো না।সবার কাছ থেকে আলাদা থাকতো।কারো সাথে মিশতো না।বন্ধুহীনতায় ভুগছিল।পরে অবশ্য কামাল নামের একজনের তার বেশ ভালো সখ্যতা গড়ে উঠে।
.
আজ স্যার খুব অপমান করে তাকে।ক্লাসে সবাই হো হো করে হেসে উঠে।আবির খুব লজ্জা পায়।চোখ মুখ লাল হয়ে যায়।রুমে এসে একা একা কাঁদে।তাই সে ডিসিশন নিয়েই নিয়েছে,সে মরে যাবে।
.
তখন গভীর রাত।একবার ভাবলো ব্লেড দিয়ে ক্যারোটিড আর্টারি কাটবে! নাহ! তাতে প্রচুর রক্তপাত হবে।আবির রক্ত দেখলে ভয় পায়।
.
সে ভাবতে থাকলো।ভাবতে ভাবতে একসময় ঘুমিয়ে পড়লো।
.
পরদিন সকালে উঠে তার মনে হলো,আরেহ! তার তো মরার কথা ছিল।গতকাল যেহেতু হয় নাই।আজ সে মরবেই।যে করেই হোক।
.
সকালে লেকচারে সে আর গেলো না।একেবারে ওয়ার্ডে গেলো।ওয়ার্ডে যেতেই স্যার হিস্ট্রি নিতে বললো।
.
আবির এক রোগীর হিস্ট্রি নিতে গেল।লোকটা গরীব।বয়স্ক।হিস্ট্রি নেয়া শেষে তিনি আবিরের সাথে তার সংসারের গল্প বলা শুরু করলেন।আবিরও মনোযোগ দিয়ে সব শুনতে লাগলো।
.
: জানো বাবা,তোমার মত আমার একটা ছেলে ছিল।তোমার মতই দেখতে,ফর্সা,লম্বা।খুব মেধাবী।
: সে এখন কি করে?
: আমার ছেলের খুব ইচ্ছা ছিলো মেডিকেলে পড়ার।কিন্তু অল্প বয়সেই তার ক্যান্সার ধরা পড়ে।
: সে কি বেঁচে নেই?
.
আবিরের এই প্রশ্ন শুনে লোকটি কাঁদা শুরু করলো।সে বুঝতে পারলো লোকটির ছেলে বেঁচে নেই।
.
: তোমাকে যখন প্রথম দেখি,তোমাকে দেখেই আমার ছেলের কথা মনে পড়ে যায়।তাই তোমার সাথে আমার পরিবার নিয়ে এত গল্প করলাম।লোকটি চোখ মুছতে মুছতে তার ছেলের কথা বলতে লাগলো।
: চাচা, শান্ত হোন।
: বাবা,তুমি আমার ছেলে হবা?
.
আবির ইমোশনাল হয়ে গেলো।আবিরের মন শক্ত।কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে আগে কখনো পড়েনি।সে নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে বললো, "জ্বী চাচা,আমিতো আপনার ছেলের মতই! আজ থেকে আমিই আপনার ছেলে"
.
আবির ক্লাস শেষে রুমে এসে অনেক্ষন লোকটার মুখের কথা ভাবলো।লোকটার মুখে কি মায়া! উনার কথা ভাবতে ভাবতে সে আত্মহত্যার কথা ভুলেই গেলো।
.
এমন হাসি দেখার জন্য হলেও বেঁচে থাকা দরকার।লোকটা যে মায়ায় আবিরকে জড়িয়ে ধরেছিলো,সে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলে লোকটার কোল আরো খালি হয়ে যাবে।লোকটার কেউ নেই।একটা মাত্র ছেলে ছিল।অল্প বয়সে সেও মারা গেলো।এখন সেও যদি মারা যায়,তাহলে লোকটি আরো বেশি কষ্ট পাবে।
.
আবির জানে,মেডিকেলের পড়া অনেক কঠিন।অনেক শ্রম দিতে হয়।অনেক খাঁটতে হয়।একসময় সে সব সয়েও যাবে।সব ঠিক হয়ে যাবে।সাময়িক কষ্টটাই সে মানতে পারছিলো না।
.
আবির সিদ্ধান্ত নিলো,সে আর কখনো ভুলক্রেমেও মরে যাওয়ার কথা চিন্তা করবে না।আজ থেকে আবিরের দুই বাবা,সে দুই বাবার কষ্টের কারন হতে চায় না।
এটা বিগত বছরগুলোতে যেসব মেডিকেল স্টুডেন্ট আত্মহত্যা করে তাদের উৎসর্গ করে।

________________________________

 

তানভীর আহমেদ তালুকদার, এমবিবিএস শিক্ষার্থী , রংপুর মেডিকেল কলেজ।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।