|

রোগ ও রোগী কাহিনী‌''ছেলে দুটিকে গলা কেটে মেরে নিজে মরতে চাই ''


Published: 2016-11-11 00:10:16 BdST, Updated: 2017-05-27 14:08:44 BdST

                                    


অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম

 

-----------------------------------

''ছেলে দুটিকে গলা কেটে মেরে নিজে মরতে চাই ''___

প্রায়ই পত্রিকায় খবর হয় যে মা নিজ সন্তানদের হত্যা করে নিজে আত্মহত্যা করেছে

আমরা বিস্মিত হই এমনটি কিভাবে সম্ভব? মা এতো নিষ্ঠুর হতে পারে?

কিন্তু সব হত্যা নিষ্ঠুরতা থেকে হয় তা নয়,কিছু হত্যা গভীর ভালোবাসা-মমতা ও করুনা থেকেও হতে পারে ।

কাহিনী-১:

মাত্র ৩০-৩২ বছরের নারী।দু'সন্তানের জননী

রোগের ইতিহাসও বেশী দিনের নয়,৬ মাসের।

তেমন কোন ব্যক্তিগত বা পারিবারিক দন্ধ,,সংঘাত বা মনোমালিন্যের ইতিহাস নেই।

এই প্রথম বারের মতন চিকিৎসায় এসেছেন,তাও স্বামীর অনেক পীড়া-পীড়ির পর।

ইতিহাস ও মনস্বতাত্বিক অবস্হা পরীক্ষা করে বুঝতে পারলাম তিনি গভীর বিষন্নতায় ভুগছেন।

রোগ কাহিনী বলতে গিয়ে তিনি বার বার কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছিলেন।
তিনি বলতে লাগলেন ওদেরকে(দু'ছেলে) গলা কেটে নিজে মরতে চাই কিন্তু সাহসে কুলায় না

(আমি প্রফেশনাল অভিজ্ঞতা থেকে জানতাম কেন মায়েরা আত্মহত্যার আগে সন্তানকেও হত্যা করে)

তবুও তার বেলায় ব্যাখ্যাটি কি তা জানতে প্রশ্ন করলাম

এরা আপনার আপন সন্তান না? কিভাবে নিজ হাতে তাদের মারতে চান? কেন মারতে চান?

তিনি কাদতে কাদতে বললেন" আমি না থাকলে এরা কেমনে বাচবে,এদের কষ্টের মধ্যে রেখে কিভাবে মরবো?"

আমি জানতে চাইলাম, এদের মারলে এরা কষ্ট পাবে না? এটা সহ্য করবেন কি ভাবে?
তিনি কিছুক্ষন চুপ থেকে বললেন এরাতো কষ্টে থাকবে

(তার মনে তিনি না থাকলে এরা কষ্টে থাকবে এ চিন্তাটিই বার বার বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে,অন্য বিষয়গুলো তেমন স্পস্ট ভাবে অনুধাবনে আনতে পারছেন না)

উল্লেখ্য মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখাতেও তিনি আগ্রহী ছিলেন না।কি হবে ডাক্তার দেখিয়ে,এ সব কথা কি বলা যায়-- ইত্যাদি

তাৎক্ষনিক কিছু কাউন্সিলিং করে ঔষধ দিয়ে ৩ দিন পর দেখা করতে বললাম(তারা ভর্তি হতে রাজী হচ্ছিলেন না)।সঙ্গে সুইসাইডাল প্রিকশন মানতে।

১৫ দিনের মাথায় ইনসাল্লাহ রোগী অনেকটা সুস্হ হয়ে উঠলেন
সন্তান হত্যার কথা মনে করিয়ে দিলে যারপরনাই লজ্জায় পড়ে যান এবং জীবনে কখনো এরকম কুচিন্তা মাথায় আনবেন না বলেন i

 

                                 

 

কাহিনী২:

৩ বছর পূর্বের কথা
এক তরুনীকে মানসিক বিপর্যস্ত অবস্হায় চেম্বার আনা হয়।
সব জেনে, পরীক্ষা করে বুঝলাম একুউট সাইকোসিসে ভুগছে।

কাহিনী সংক্ষেপ হলো তার ইমেডিয়েট বড় ভাই মাদকাসক্ত ছিল।অনেক চিকিৎসায়ও তেমন উন্নতি হয়নি।
সে বিভিন্ন অপরাধী গ্রপের সঙ্গেও যুক্ত ছিল।

অার্থিক টানাটানি,পুলিশের হয়রানী,প্রতিপক্ষের হামলা,পারিবারিক দন্ধ, মানসিক অবসাদ সব মিলিয়ে তার ভাই বিষন্নতাসহ নানাবিধ মানসিক সমস্যায় ভুগতো।

তাকে সবাই ঘৃনা করতো,এমনকি মা-বাবাও।

তার এক মাত্র সহমর্মী ও সঙ্গী ছিল এই ছোট বোনটি।

সেই তাকে আগলিয়ে রাখার চেষ্টা করতো কিন্তু বাগে আনতে পারেনি।

প্রায়ই সে বোনকে আত্ম হত্যার কথা বলতো,কিন্তু বোনটি তাকে সাহচর্য্য দিয়ে,মমতা দিয়ে আটকানোর চেষ্টা করতো।তবে কোন মনোচিকিৎসকের কাছে নেননি।

সে দিন রাতে ভাইটি খুবই অস্হির হয়ে উঠলো,।
বোনকে বার বার বলতে লাগলো চল আমরা দুজনে আত্ম হত্যা করি,তুইও আমার সঙ্গে থাক।

বোনটি অনেক কাকুতি মিনতি করে।কিন্তু তার অস্হিরতা কাটে না।

অবশেষে সে প্রস্তাব দেয় চল বাইরে যাই,ঘুরলে হয়তো মন ভালো হবে।

তখন রাত ৩টা

কিন্তু ভাইয়ের শোচনীয় অবস্হা চিন্তা করে সে যেতে রাজী হয়।

তাদের বাসা ছিল বুড়িগঙ্গা সেতু-২ এর কাছে।

এই গভীর,অন্ধকার রাতে দুভাই বোন সবার অগোচরে বুড়িগঙ্গা সেতুতে পায়চারী করতে লাগলো।

বোনটি ভাইকে অনেকভাবে বুঝানোর চেষ্টা করে।
কিন্তু সে বলে তোকে আমি অনেক ভালোবাসি চল এক সঙ্গে মরে যাই,কি হবে এ পৃথিবীতে বেচে থেকে।

 

                  

                   

এ ভাবে মিনিট ১৫ হাটাহাটির করে তার ভাই একটি পিলারের খুব কাছে গিয়ে উকি মারে।
পরক্ষনে সে ঝাপ দিয়ে নদীতে পড়ে।

একটি মাত্র ঝপাত শব্দ

বোনটি চিৎকার করতে করতে পাশের বাড়ীতে ঢুকে পড়ে পাগলামী করতে থাকে।

তারপর তো সব ইতিহাস
(আত্মহত্যার আগে খুব কাছের জনকেও অনেকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চায়,এটি তার আরেকটি উপাখ্যান)

আমি চাদপুরে শুক্রবারে চেম্বার করতে যাই।
সেই সেতুর নীচ দিয়েই যেতে হয়।

ঘটনাটি আমাকে ও এতটুকু স্পর্শ করেছে যে প্রতিবার সেতুর কাছ দিয়ে গেলে সে বিভৎস্য স্মৃতির কথা মনে পরে
( ডাক্তাররাও মানুষই তো)

 


অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম

লেখক: Professor of Psychiatry at National Institute of Mental Health, Sher-E-Bangla Nagar, Dhaka

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।