Ameen Qudir

Published:
2018-10-01 11:34:13 BdST

ওসিডি'আমার ছেলে নাক,কানের ময়লা সবার সামনে শুঁকতে থাকে: কী অসহ্য বলুন ম্যাম!'


লেখকের ছবি।



ডা. সুলতানা আলগিন
__________________________


২৬বছর বয়সী ছেলেটি সামনে এসে বসল। গায়ে টিশার্ট। কিছুক্ষণ পর পর গেন্জীকে শরীর থেকে টেনে টেনে সরাচ্ছে। মনে হচ্ছে গায়ে লেগে যাচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে এ নিয়ে বড় অস্বস্তিতে আছে। সাথে ওর মা এসেছে।
জিজ্ঞাসা করলাম কি সমস্যা ?

ছেলেটা নড়েচড়ে বসল। উল্টা আমাকে প্রশ্ন করল আপনি কি কোন গন্ধ পাচ্ছেন ?
বললাম রুমে এয়ার ফ্রেশনারের গন্ধ পাচ্ছি ।
আবার জিজ্ঞেস করল না কোন বাজে গন্ধ আমার গা থেকে?
আমি বললাম না ।

সে এবার বলল ম্যডাম, এটাই আমার সমস্যা। আমার শরীর ঘামে প্রচন্ড ভিজে যায়। ভেজা ভেজা গা থেকে অস্বস্তি শুরু হয়। মনে হয় আমার আশেপাশে যারা আছে তারা আমাকে দেখে রুমাল ওড়না বা শাড়ীর আচল নাকে চেপে ধরছে। কেউ নাক টানছে । কেউ নাকটাকে কুচকাচ্ছে। আবার কেউ থুতু ফেলছে। এজন্য আমি অনেক ডিওডোরেন্ট ব্যবহার করি । এতে আমার স্কিনে এলার্জি দেখা দিয়েছে।


পাশে ওর মা বললেন আমি ওকে নিয়ে স্কীনের ডাক্তারের কাছে গিয়েছি। উনিই আমাদের আপনার কাছে পাঠালেন। আরও বললেন তার ছেলে কোন কিছু খেতে গেলে তার গন্ধ শুকে। এমন কিছু আচরণ করে যা বলতে লজ্জা লাগছে। কিন্তু ডাক্তারের কাছে লুকিয়ে লাভ নেই।

আমি বললাম ঠিক আছে । বলে ফেলুন।
মা জানালেন,
বগলে হাত নিয়ে, নাক,কানের ময়লা নিয়ে সবার সামনে শুকতে থাকে । কি যে বিচ্ছিরি লাগে বলে বোঝাতে পারব না। আমি মা হয়েও সহ্য করতে পারি না। অন্যদের কথাতো বাদই দিলাম।
ছেলেটিকে জিজ্ঞাসা করলাম সত্যিই কি তুমি এরকম কর ?
লাজুক স্বরে স্বীকার করল যে সে এই আচরণগুলো করে। আরও বলল আমি বুঝি এগুলো করা ঠিক না । তবুও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। আমার সমস্যা শুরু হয় কলেজ লাইফ থেকে। হোস্টেলে থাকতাম। বাইরে যেখানে সেখানে খেতাম। প্রথমে ভালই লাগত এসব খেতে। কিন্তু কিছুদিন পর থেকে আমার পেটে সমস্যা দেখা দিল। মনে হতো মল বের হয়ে প্যান্টে লেগে গেছে। সাথে সাথে বাথরুমে গিয়ে চেক করতাম। কোন মল লেগে আছে কিনা? কোন গন্ধ বের হচ্ছে কিনা । শুকে দেখতাম। তারপর নিচের অংশ ধুয়ে বের হতাম। এভাবেই শুরু।


ছেলেটির মা বলল ও ছোটবেলা থেকেই কিছু ব্যপারে নাক সিটকানো টাইপের ছিল। ওর টিউটর বইয়ের পাতা থুতু দিয়ে উল্টায় দেখে সে ঐ টিচারের কাছে পড়ে নাই। ক্লাশে কখনও সামনের সীটে ওকে বসাতে পারি নাই। ওর মনে হতো পিছন থেকে অন্যরা ওর মাথায় ঠিল ছুড়ে মারবে।
ছেলেটি এবার সাথে আরও যোগ করল ম্যাডাম আমার এখন রাস্তায় চলতে সমস্যা হয়।
কেন ?

সে বলল আমি সিগারেট চা এসব কিছু খাই না। কিন্তু কেউ যদি সিগারেট খায় আমি হঠাৎ করেই রাস্তার মাঝখানে থেমে যাই।দেখি লোকটির নাক বা মুখ দিয়ে সিগারেটের ধোয়া বের হলো কি না ? যতক্ষণ পর্যন্ত সেই ধোয়া বের না হয় আমি দাড়িয়ে অপেক্ষা করি। বড়ই অ¯^স্তি হতে থাকে । আমার বুক দম মনে হয় আটকে আসে। যখন ঐ লোকটির ধোয়া বের হয় আমি নিশ্চিত মনে পথচলা শুরু করি। যত দরকারই কাজ থাকুক না কেন আমি রাস্তায় থেমে যাই্ ।

ছেলেটির আবেদন আমি লোকজনের সামনে এমনসব অদ্ভুত আচরণ করে নিজেই লজ্জায় পড়ে যাই। এখন আপনার সাহায্য নিতে এসেছি। আমি কি এসব থেকে মুক্তি পাব?
তখন আমি বললাম এসব ”ওসিডি” রোগের লক্ষণ। তোমার ব্রেনের নিউরোট্রান্সমিটারের হ্রাসবৃদ্ধির কারণে এসব সমস্যা হচ্ছে। তোমাকে তুমিই সাহায্য করবে আর আমরা তোমাকে সাপোর্ট দিব।

বললাম ওষুধ নিয়মিত খেতে হবে । ফলোআপে আসতে হবে। খাবারের লিস্ট অনুযায়ী খাবে। ধৈর্য হারালে চলবে না। এসব ওষুধ কাজ করতে সময় বেশী নেয় । তাই হতাশ হওয়া যাবে না। পাশাপাশি বিহেভিয়ার থেরাপি চালিয়ে যাবে। তাহলে নিজেকে নিয়ন্ত্রন করা শিখতে পারবে । সুস্থ জীবনযাপন করতে পারবে।

______________________________

ডা. সুলতানা আলগিন । মানসিক সম্পর্ক বিদ।
সহযোগী অধ্যাপক, মনোরোগ বিদ্যা বিভাগ। কনসালটেন্ট , ওসিডি ক্লিনিক; বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।


মন জানে এর জনপ্রিয়