Ameen Qudir

Published:
2017-10-05 18:56:11 BdST

ওসিডি ডায়েরি পর্ব ১২" তার ধারণা বীর্য থেকে জীবাণু ঘরে ছড়িয়ে পড়বে"


 

ডাক্তার পেশাজীবীদের হাজারও বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। শুনতে মানুষের অদ্ভুত জীবন কাহিনী। শুনতে হয় আমাকেও।

বোনটি জানাল তার ভাই স্বপ্নদোষের কারণে কাপড়চোপড় বাথরুমে নিয়ে বালতিতে ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রাখে। যতক্ষণ পর্যাপ্ত কাপড়গুলো ধোয়া না হবে তার বাথরুমে কাউকে ঢুকতে দিবে না।
ওসিডি ডায়েরি পর্ব ১২ ।

 

 

 

ডা. সুলতানা আলগিন
____________________________


২৩-২৪বছর বয়সী ছেলেটি বোনের সাথে এসেছে । রাগিরাগি চেহারা বিরক্তির ছাপ ১৬আনা। সমস্যা কি জানতে চাইলে ছেলেটি বলল যে তার বোন ,ভাগ্নী আর দাদী যখন থেকে তাদের বাসায় থাকতে শুরু করেছে তখন থেকেই তার সমস্যা শুরু।

 

সমস্যা গুলো কি ?
ওরা আসাতে আমাকে একটা কমন স্পেসে ঘুমাতে হয়। আমার কোন প্রাইভেসি নাই। আমার পড়াশোনা বন্ধ। আমার ঘুমের টাইমটেবিল পরিবর্তন হয়ে গেছে। সারা রাত জেগে থাকি আর ভোর ৫টায় ঘুমাতে যাই। দুপুর ২টায় উঠি।


কোন রকম নেশার অভ্যাস আছে নাকি ?
না। আমি চা পর্যন্ত খাই না।
বোন পাশ থেকে বলে আপা একবার বাথরুমে ঢুকলে কমপক্ষে ৪-৫ঘন্টা । তারপর যখন বের হয় টিস্যুপেপার দিয়ে কান নাকের ফুটা পষ্কিার করে। ওর ২দিনে ১টা টয়লেট টিস্যু লাগে। ওর রুমের বিনটা উপচে পড়ে।
ও রাতে যখন ঘুমাতে যায় বিছানা কয়েকবার ঝাড়ে। তারপর লাইট নিভানো থাকলেও মোবাইলের আলোতে বিছানায় কোন ময়লা ধুলাবালি মাকড়সার ঝুল আছে কিনা চেক করে।
সাথে সাথে ঝাঁঝাঁল স্বরে বলে ওঠে তোমার মেয়েটাই তো যত ঝামেলার মূল।
বোনটি কাতর স্ব রে বলে আপা আমার স্বামী বিদেশে যাওয়াতে আমরা বাবার বাড়ীতে থাকছি। মেয়ের বয়স ২বছর। ওকে একটুও দেখতে পারে না।

ছেলেটিকে জিজ্ঞাসা করলাম এত ছোট বাচ্চার সাথে তুমি এমন কর কেন ?
ও বলল বাচ্চাটির হাতে মুখে চকলেট, সুজি ,ভাত তরকারী সব আঠালো জিনিষ লেগে থাকে । আমার প্রচন্ডঅ¯স্বস্তি হয়। চকচক করা চিপসের প্যাকেটের কচকচ শব্দ অসহ্য লাগে। গায়ে হাত দেয় । কোলে আসতে চায়। আশেপাশে সারাক্ষণ ঘুরঘুর করে।


তাছাড়া আমার দাদী অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় পায়খানা প্রশাব করত, কচলে খাবার খাইয়ে দিতে হতো। এসব দেখে বিরক্ত লাগতো। মাস ৬ হলো উনি মারা গেছেন।
বোনটি বলে জানেন আপা ও ধাক্কা মেরে আমার মেয়েকে ফেলে দেয়। সে আরও জানায় ও কোন কাজ করার পর সেদিকে কিছুক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে থাকে।

 

কেন কর জানতে চাইলাম ?
বলল ল্যাপটপ রাখার পরে মনে হয় ঠিকমত রাখলাম কি না? আলনায় কাপড় রাখলে দেখি কোন কোণা বের হয়ে আছে কিনা ? সবকিছুতে এরকম সন্দেহ কাজ করে। সব ঠিকঠাক মনে হলে সরে আসি।
বোনটি জানাল এবারের কোরবানীর গরুর মাংস ওরা খেতে পারে নাই। একথা শোনার সাথে সাথে দেখলাম ছেলেটি মাথা নীচু করে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে।


ব্যপার কি ?
বোনটি জানাল তার ভাই স্বপ্নদোষের কারনে কাপড়চোপড় বাথরুমে নিয়ে বালতিতে ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রাখে। যতক্ষণ পর্যাপ্ত কাপড়গুলো ধোয়া না হবে তার বাথরুমে কাউকে ঢুকতে দিবে না।

তার ধারণা বীর্য থেকে জীবাণু ঘরে ছড়িয়ে পড়বে । তাতে বাড়ীর সবাই অসুস্থ হয়ে যাবে। ঈদের দিন বুয়া ওর বাথরুমে মাংসগুলো ধুতে নিয়েছিল । আর তাতেই ঐ ঝামেলার শুরু। কিছুতেই মাংস ঘরে রাখতে দিবে না। ওর কান্নাকাটি রাগারাগিতে আমরা সবাই অসহায় হয়ে পড়েছিলাম। বাধ্য হয়ে সব মাংস বুয়াকে দিয়ে দিতে হয়েছিল।

 

 

ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বললাম তাই নাকি ?
জানাল সত্যিই। সবাই যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে তাহলে কি হবে ? ওর চোখে আগুন,এক্সিডেন্ট,রক্ত ,লাশের ছবি ভেসে ওঠে । সেজন্য হাসপাতালে যেতে ভয় পায়।
প্রথমদিকে না বলতে চাইলেও শেষে বোনটি জানাল সেও এই ওসিডি রোগে ভুগছে । নিজের মেয়ে যখন ব্যথা পাচ্ছে তখনই তার টনক নড়ল।


সবশেষে জানালাম এইরোগ যে কোন সময় শুরু হতে পারে । অন্যান্য রোগ যেমন বলেকয়ে আসে না এক্ষেত্রেও তাই।। তেমনি ওসিডির জন্য কাউকে দোষারোপ করাও ঠিক না। তবে কিছু আচরন থেকে পূর্বধারণা করা যেতে পারে। কারও এই রোগ থাকলে তার নিকটাত্মীয়ের ৩-৫গুন এই ওসিডি হওয়ার সম্ভবনা থাকে। তবে লক্ষণের ভিন্নতা থাকতে পারে। নিয়মিত এবং পর্যাপ্ত ডোজে ওষুধ খেলে এর তীব্রতা কমে আসবে । । সাথে বিহেভিয়ার থেরাপী চলতে পারে। সুস্থ জীবন যাপন করতে সঠিক চিকিৎসা সিরোটনিন সমৃদ্ধ খাদ্য,শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবন কাম্য।

 


বি:দ্র: সিরোটনিন সমৃদ্ধ খাদ্যের একটা ছোট তালিকা দেয়া হলো। এসব খাবার আমাদের দেশে সবখানেই পাওয়া যায়। তবে কারও যদি কোন খাবারে নিষেধ থাকে তবে সেগুলো বাদ দিয়ে অন্যান্য আইটেম আপনার প্রতি বেলার খাবারে রাখতে পারেন। ওষুধের পাশাপাশি এসব সিরোটনিন সমৃদ্ধ খাদ্য আপনার শরীরে সিরোটনিনের চাহিদা মিটাবে ।
আমিষ জাতীয় খাদ্য:মাংস,কলিজা,ডিম ,দুধ ও দুধ জাতীয় দ্রব্য, সামুদ্রিক মাছ
ফলমূল :পাকা কলা,আনারস, খেজুর, বাদাম, আম,আঙ্গুর,এ্যাভোকেডো
শাকসব্জি: পালং শাক,পুইশাক,বেগুন, শিম জাতীয় বীজ,ফুলকপি, ব্রকলি, টমেটো, মাশরুম

________________________

 

 

প্রিয় সুজন ,
আপনি কি অবসেসিভ কমপালসিভ ডিজঅর্ডার (ওসিডি) বা শুচিবাই রোগে
ভুগছেন ?

 

একটু সময় দিতেই হবে আপনাকে আপনার ও সকলের স্বার্থে। প্রশ্নগুলো পড়ুন অনুগ্রহ করে।

 

১।আপনি কি অতিরিক্ত ধোয়া-মোছা করেন অথবা পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকেন?
২।আপনি কি কোন কিছু অতিরিক্ত চেক/ যাচাই-বাছাই করেন?
৩। আপনার মাথায় কি কোন অপ্রীতিকর/ অনাকাঙ্খিত চিন্তা আসে ? যা কিনা আপনি চাইলেও মাথা থেকে সহজে বের করতে পারেন না ?
৪।আপনার কি দৈনন্দিন কাজ শেষ করতে অতিরিক্ত সময় ব্যয় হয়?
৫। আপনার মধ্যে কি আসবাবপত্র, বই খাতা, কাপড়-চোপড় অথবা যে কোন জিনিস নির্দিষ্ট ছকে গুছিয়ে রাখার প্রবণতা আছে ?

 

 

উপরোক্ত প্রশ্নগুলোর যে কোন একটির উত্তরও যদি হ্যাঁ বোধক হয় তবে মানসিকরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন ।ভুক্তভোগীদের ওসিডি ক্লিনিক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকায় প্রতি মঙ্গলবার , সকাল ১০টা থেকে ১টায় অাসার অনুরোধ রইল।
এ জন্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকার আউটডোরের মাত্র ৩০ টাকার টিকেট নিতে হবে।

 

লেখার সৌজন্য

 

ওসিডি ক্লিনিক । বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা। প্রতি মঙ্গলবার ।
____________________________

 

ডা. সুলতানা আলগিন । সহযোগী অধ্যাপক , মনোরোগবিদ্যা বিভাগ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।


মন জানে এর জনপ্রিয়