|

ওসিডি ডায়েরি-৯‌‍'কতদিন ওষুধ কিনে খাওয়াতে হবে তোমাকে ? সারাজীবন আমি টানতে পারবো না'


Published: 2017-08-06 14:02:26 BdST, Updated: 2017-12-18 20:48:42 BdST

 

ডা. সুলতানা আলগিন

__________________________________

 


মেয়েটির বয়স ২৩-২৪ হবে । বিবাহিত । এক সন্তানের মা । স্বামী ব্যবসায়ী। চেম্বারে মেয়েটি একাই এসেছে । মেয়েটির চোখে পানি। । এই নিয়ে সে ৩বার এসেছে। চিকিৎসায় অনেক উন্নতি হয়েছে । বারবার বলা সত্ত্বেও তা্র স্বামী সাথে আসে নাই। আসার সময় সে বিছানায় শুয়েছিল।

বলেছে এইভাবে কতদিন ওষুধ কিনে খাওয়াতে হবে তোমাকে ? সারাজীবন আমি টানতে পারবো না।
এসব কথা জানিয়ে মেয়েটি চেম্বারে আমাকে বলল ,

আপা আমার কি দোষ ? এইটাতো রোগ । আমি তো ইচ্ছা করে আনি নাই । স্বামী এখন ২য় বিয়ে করতে চায় । শাশুড়ীর মুখ ঝামটা আর সহ্য করতে পারছি না।


সমস্যাটা জানতে চাইলে সে বলল, কাজ নিখুত ভাবে না করলে আমার অস্বস্তি হয় । অনেক সময় লেগে যায়। এতে শ্বশুরবাড়ীর লোকের কথা উঠতে বসতে শুনতে শুনতে আমি ক্লান্ত।

সকালে ঘুম থেকে উঠে দাঁত মাজতে গেলে পেস্টের মুখ লাগাতে ২-৩ঘন্টা লেগে যায় । মুখ ১৫-২৫বার ধুতে হয় ।দাতমাজা মুখ ধোওয়া মাঝে মাঝে বন্ধ করে দেই।

নামায পড়তে গেলে ওযু কয়েকবার করতে হয় । নামায পড়ার সময় মনের মধ্যে অল্লাহর বিরুদ্ধে গালিগালাজ আসে। আমি এটা মানতে পারছি না। বুঝি এসব ঠিক না । তারপরও করতে হয় । কোন কিছু বন্ধ করতে গেলে বেশী সমস্যা হয় । যেমন কল খুলতে পারি। কিন্তু বন্ধ করার সময় প্যাচ দিতে দিতে অনেক গুলো কল নষ্ট করে ফেলেছি ।

চুলার প্যাচ কেটে গেছে । নতুন চুলা কিনতে হয়েছে।এজন্য রান্না করা রান্নাঘরে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছি। ড্রয়ার চেপে চেপে আটকাতে গিয়ে ভেঙ্গে গেছে । জানালা আটকাতে গিয়ে বারবার চাপ দিয়ে দেখি ঠিকমত বন্ধ হয়েছে কিনা ? জানালার রাবারের ফিতাগুলো ঢিলা হয়ে গেছে।রাতে ঘুমানোর আগে মোবাইল চেক করি কয়েকবার । দেখি ঠিকমত বন্ধ হয়েছে কি না ? ওয়াল পেপারটা দেখা যাচ্ছে কি না ? বুঝি সংসারে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে । কিন্তু এখনতো আমি অনেক ভাল । নিজেকে নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারি।


আরও আছে। জানাল বাইরে গেলে রাস্তাঘাটে বাচ্চা দেখলে মনে হয় ধাক্কা মেরে ফেলে দেই। ফিরে তাকাই পড়ে গেল কি না ? ফেলে দিলাম কি না ? মনে হয় পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে। আমার এই দোষে ফাঁসি হবে। বাসে বা যে কোন জায়গায় অন্য পুরুষের পাশে বসলে বাজে কথা মনে আসে। সেক্স সংক্রান্ত চিন্তা আসলে সেটা সরাতে পারি না। এতে গুনাহ হবে। মনে মনে তওবা কাটি। দোয়া পড়ি। চিন্তাটা যে যায় না। এগুলো আমি ইচ্ছা করে করি না । চিকিৎসা নিয়মিত নিতে চাইছি । অথচ স্বামীর সহযোগিতা পাচ্ছি না । তারা এটাকে ভড়ং ভাবে ।

 

রোগী সমস্যা সম্পর্কে সচেতন হওয়া সত্বেও তার রোগকে প্রাধান্য না দেয়াটা আমাদের অজ্ঞতারই প্রকাশ। অথচ এই ওসিডি রোগটি অন্যান্য শারীরিক রোগের মতই একটি রোগ। চিকিৎসায় রোগী তার সমস্যা চিন্তা কম্পালশনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।সুস্থ স্বাভাবিক জীবন যাপন তার জন্য সহজ হয় । অথচ রোগী বোঝে এটা রোগ । আর যারা নিজেদের সুস্থ ভাবে তারা নিজেদের অজান্তেই জীবন দুর্বিষহ করে ফেলছে। তাদের অমানবিক আচরণ, সংসারে ভাঙ্গন,নিত্য ঝগড়াঝাটি কোনটাই কাম্য নয়। তাই রোগটির সঠিক চিকিৎসা নিয়ে সপরিবারে সুস্থ থাকুন।

 

___________________________

 

 

প্রিয় সুজন ,
আপনি কি অবসেসিভ কমপালসিভ ডিজঅর্ডার (ওসিডি) বা শুচিবাই রোগে
ভুগছেন ?

 

একটু সময় দিতেই হবে আপনাকে আপনার ও সকলের স্বার্থে। প্রশ্নগুলো পড়ুন অনুগ্রহ করে।

 

১।আপনি কি অতিরিক্ত ধোয়া-মোছা করেন অথবা পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকেন?
২।আপনি কি কোন কিছু অতিরিক্ত চেক/ যাচাই-বাছাই করেন?
৩। আপনার মাথায় কি কোন অপ্রীতিকর/ অনাকাঙ্খিত চিন্তা আসে ? যা কিনা আপনি চাইলেও মাথা থেকে সহজে বের করতে পারেন না ?
৪।আপনার কি দৈনন্দিন কাজ শেষ করতে অতিরিক্ত সময় ব্যয় হয়?
৫। আপনার মধ্যে কি আসবাবপত্র, বই খাতা, কাপড়-চোপড় অথবা যে কোন জিনিস নির্দিষ্ট ছকে গুছিয়ে রাখার প্রবণতা আছে ?

 

 

উপরোক্ত প্রশ্নগুলোর যে কোন একটির উত্তরও যদি হ্যাঁ বোধক হয় তবে মানসিকরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন ।ভুক্তভোগীদের ওসিডি ক্লিনিক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকায় প্রতি মঙ্গলবার , সকাল ১০টা থেকে ১টায় অাসার অনুরোধ রইল।
এ জন্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকার আউটডোরের মাত্র ৩০ টাকার টিকেট নিতে হবে।

 

লেখার সৌজন্য

ওসিডি ক্লিনিক । বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা। প্রতি মঙ্গলবার ।
____________________________

 

ডা. সুলতানা আলগিন । সহযোগী অধ্যাপক , মনোরোগবিদ্যা বিভাগ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।