|

ওসিডি ডায়েরি :৭" নিজের কন্যাকে হত্যার ইচ্ছা হয় : আতঙ্কে থাকি কখন মেরে ফেলি !"


Published: 2017-07-19 09:26:09 BdST, Updated: 2017-12-18 20:44:27 BdST

 

 

ডা. সুলতানা আলগিন

____________________________

ওসিডি ডায়েরি :৭


ত্রিশের কাছাকাছি একজন মহিলা স্বামীসহ এসেছেন । সাথে নয় মাসের মেয়ে। স্বামী বেসরকারী চাকুরীরত। কাজে প্রচন্ড চাপ। বাসায় চাইলেও পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না।

আপাতত রোগীর মা সাথে থাকছেন। স্বামীর প্রশ্ন আমার বাচ্চার কি হবে ? কেন কি হয়েছে জানতে চাইলে রোগী এতক্ষনে নড়েচড়ে বসে। চোখের পানি ধরে রাখতে কষ্ট হচ্ছে তার । বললেন, আপা আমার এই সমস্যা অল্প অল্প শুরু হয়েছে বাচ্চা পেটে থাকতে ৫মাসের সময় থেকে। আমি একা থাকতে পারি না । আমি এই বাচ্চা পালতে পারব কিনা জানি না। ওকে ধরে খাওয়াতে গোসল করাতে গেলে মনে হয় বোধ হয় ওকে মেরে ফেলব। মেয়েটাকে ছুঁয়ে দেখতেই ভয় হয় । মনে হয় মেয়েটাকে যদি মেরে ফেলি । এই আতঙ্কে থাকি সবসময়। সারাক্ষণ মরার ভয়ে থাকি । মনে হয় অনেক পাপ করেছি । কিন্তু আপা এরকম বড় কোন পাপ আমি করি নাই।


চোখের সামনে সারাক্ষণ দোজখের আগুন জ্বলতে দেখি । নিজেকে পুড়তে দেখি । যখন চুলা জ্বালাই তখন মনে হয় দোজখে এর থেকেও বেশী আগুনে পুড়তে হবে। রান্নাবান্না করি কিন্তু এভাবে কতদিন চলবে ? মন থেকে সহজে কোন চিন্তা সরাতে পারি না । বুকধড়ফড় করে গলা শুকিয়ে আসে। আল্লাহ আছে কিনা এই প্রশ্নও মনে জাগে। আপা আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি । আমার আর এই নিষ্পাপ বাচ্চার কি হবে ? স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলে ওকে কি দোষ দিব । ও যথেষ্ট সহ্য করে। কিন্তু কপাল খারাপ আমারই।


রোগীর এই সমস্যা তার ১২বছর বয়স থেকেই শুরু হয়েছে। কিন্তু এত তীব্র ছিল না। তিনি বললেন, কাপড়চোপড় বইখাতা গুছিয়ে রাখতাম । কোনকিছু আগোছালো দেখতে পারতাম না। ।এখনও পারি না। আপা দুঃখের কথা কি বলব । আমার আলমারী ভর্তি কাপড় ।

তিনি বলেন, কোনটা বের করে পরতে পারি না। বাচ্চার জন্য ঈদে কত সুন্দর সুন্দর জামা কিনেছি। ব্যগে গুছিয়ে রেখেছি । যখন দেশে যাব তখন নতুন জামাগুলো নিয়ে যাব। আমি কেমন মা ? আমার জন্য মেয়েটা ঈদে নতুন জামা পরতেই পারল না । কেন কি হয়েছে ? আপা একটা কাপড় যদি বের করি বুঝি টান পড়লেতো একটু এলোমেলো হবেই। কিন্তু আমি তা সহ্য করতে পারি না । তখন পুরো আলমারীর কাপড় বের করে গুছিয়ে না রাখা পর্যন্ত আমার অশান্তি অস্থির লাগে ।পুরো আলমারী গোছানো অনেক সময়ের ব্যপার।তাই দেশের বাড়ীতে যাওয়ার সময় ঐ ব্যগটা বের করার আর সাহস হয় নাই । শেষে আমার জন্য যদি অন্যদের বাস মিস হয় ।


ওসিডি রোগটি জীবনকে অথর্ব পঙ্গু করে ফেলতে পারে । পারষ্পরিক সর্ম্পক নিজেদের অজান্তেই নষ্ট হয়ে যায় । দোষারোপ করাটাই তখন অভ্যাস হয়ে যায় সেটা নিজেকে হোক বা অন্যকে । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা - ডব্লিউ এইচ ও-র মতে পৃথিবীতে যত অথর্ব পঙ্গু কারী রোগ আছে তার মধ্যে ওসিডি ১০তম। সুতরাং হেলাফেলা না করে জীবনকে,পরিবারকে রক্ষা করতে এর চিকিৎসা নিতে দেরী করবেন না। যত দ্রুত চিকিৎসা শুরু করবেন ততই মঙ্গল । পরিবারের সদস্য,নিকটাত্মীয়দের সাহায্য সহযোগিতা এক্ষেত্রে খুবই প্রয়োজন ।

 

 

 

 


প্রিয় সুজন ,
আপনি কি অবসেসিভ কমপালসিভ ডিজঅর্ডার (ওসিডি) বা শুচিবাই রোগে
ভুগছেন ?

 

একটু সময় দিতেই হবে আপনাকে আপনার ও সকলের স্বার্থে। প্রশ্নগুলো পড়ুন অনুগ্রহ করে।

 

১।আপনি কি অতিরিক্ত ধোয়া-মোছা করেন অথবা পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকেন?
২।আপনি কি কোন কিছু অতিরিক্ত চেক/ যাচাই-বাছাই করেন?
৩। আপনার মাথায় কি কোন অপ্রীতিকর/ অনাকাঙ্খিত চিন্তা আসে ? যা কিনা আপনি চাইলেও মাথা থেকে সহজে বের করতে পারেন না ?
৪।আপনার কি দৈনন্দিন কাজ শেষ করতে অতিরিক্ত সময় ব্যয় হয়?
৫। আপনার মধ্যে কি আসবাবপত্র, বই খাতা, কাপড়-চোপড় অথবা যে কোন জিনিস নির্দিষ্ট ছকে গুছিয়ে রাখার প্রবণতা আছে ?

 

 

উপরোক্ত প্রশ্নগুলোর যে কোন একটির উত্তরও যদি হ্যাঁ বোধক হয় তবে মানসিকরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন ।ভুক্তভোগীদের ওসিডি ক্লিনিক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকায় প্রতি মঙ্গলবার , সকাল ১০টা থেকে ১টায় অাসার অনুরোধ রইল।
এ জন্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকার আউটডোরের মাত্র ৩০ টাকার টিকেট নিতে হবে।

 

লেখার সৌজন্য

ওসিডি ক্লিনিক । বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা। প্রতি মঙ্গলবার ।
____________________________

 

ডা. সুলতানা আলগিন । সহযোগী অধ্যাপক , মনোরোগবিদ্যা বিভাগ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।