|

লজ্জা হয় চিকিৎসক হিসাবে পরিচয় দিতে


Published: 2017-02-01 08:55:49 BdST, Updated: 2017-11-22 09:55:23 BdST


ডা. মো.শাব্বির হোসেন খান
_____________________________


সেবার মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা হাসপাতালে কর্তব্যরত অবস্থায় একজন চিকিৎসক লাঞ্চিত হওয়ার ঘটনায় ২৫০ শয্যা হাসপাতালের সব ডাক্তারদের সাথে আলোচনায় বসি আমরা মৌলভীবাজার বি এম এ;


সভার এক পর্যায়ে আমি মন্তব্য করেছিলাম, "চিকিৎসকদের সামাজিক মর্যাদা ও অবস্থান বর্তমানে খুবই নেতিবাচক অবস্থানে আছে এবং সেজন্য দায়ী গুটিকয়েক লোভী চিকিৎসকের অর্থলিপ্সা"।

এইসব ডাক্তার নিজের প্রেসক্রিপশন প্যাড থেকে শুরু করে স্টেথো-বিপি, বাড়ীর দৈনিক / মাসিক বাজার-হাট, টিভি-ফ্রিজ, এয়ারকুলার, গাড়ী, বাড়ী বানানোর জন্য সিমেন্ট ইত্যকার জাগতিক সব কিছুই ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানীর কাছ থেকে চেয়ে বা না চেয়েই পেয়ে / নিয়ে থাকে;


আরেকটা ট্রেন্ড চালু হয়েছে- কোম্পানীর কাছ থেকে নগদ মাসোহারার খাম নেয়া । শুধু কি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানী ? আছে ডায়াগনস্টিক সেন্টার, আছে ক্লিনিক......... এদের কাছ থেকে পার্সেন্টেজ এর খাম নেয়ার ব্যবস্থা তো অনেক পুরনো বিষয়। সর্বশেষ যে ট্রেন্ড মৌলভীবাজারে চালু হয়েছে বলে আমার কাছে তথ্য এসেছে, সেটা যদি সঠিক হয়, তা'হলে সেটা হবে চিকিৎসক সমাজের সম্মানহানির চূড়ান্ত পর্যায়।


মৌলভীবাজারের দুই একটি ক্লিনিক নাকি এখানকার ৩/৪ জন পুরুষ চিকিৎসককে "বিশেষভাবে এন্টারটেইন" করার ব্যবস্থা রেখেছে তাদের ক্লিনিকে; বিনিময়ে ওই চিকিৎসকরা তাদের রোগীদের ওই বিশেষ ক্লিনিকগুলোতে পাঠান অপারেশন করার জন্য। এরা মনে করে, তাদের এই "গু-খাওয়া"র বিষয়টা কেউ জানে না; ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানীর লোকজনই তাদের এই খাম খাওয়া বা "অন্যান্য খাওয়া"র খবর ফলাও করে গল্প করে বেড়ায় অন্য চিকিৎসকদের কাছে।

আমি নিজে যেহেতু প্রাইভেট প্র্যাকটিস করি না, ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানীর লোকজনেরা বেশীরভাগই আমাকে চেনে না। একদিন এক রেষ্টুরেন্টে চা খেতে বসে তেমনি কয়েকজন রিপ্রেজেন্টেটিভ এর উচ্চঃস্বর আড্ডা কানে আসলো--- মৌলভীবাজারের কয়েকজন ডাক্তারের নাম উল্লেখ করে তারা বলা-বলি করছে, কে কাকে এই মাসে কত টাকা দিয়েছে, কিন্ত "হারামজাদা"রা ঠিকমতো তাদের ঔষধ লিখছে না।


রেষ্টুরেন্টে বসা অন্য লোকেরাও তাদের ওইসব কথা-বার্তা আমার মতই পরিষ্কার শুনতে এবং বুঝতে পারছিল। তাদের-ই একজন ( আমার পরিচিত ) আমাকে বলে বসলো, "কি বি এম এ'র প্রেসিডেন্ট, শুনতেছো ঘটনা ?" লজ্জায় আমার মুখ দিয়ে কোন শব্দই বের হল না; অবনত মস্তকে হোটেল থেকে বেড় হয়ে এলাম আমি।


আসলে গুটিকয়েক এইসব ছ্যাঁচড়া গু-খোরের জন্য আমাদের সবাইকে বদনামের ভাগীদার হতে হচ্ছে। এইসব ছ্যাঁচড়া গু-খোরদের নাম আপনি-আমি সবাই জানি; কিন্তু কেউই তাদের কিছু বলি না।

অথচ তারা আমার-আপনার, সবার-- এক কথায় গোটা চিকিৎসক সমাজের সামাজিক অবস্থানকেই আজ নীচে নামিয়ে এনেছে। আজ সাধারন মানুষের কাছে চিকিৎসক বলতে যে চরিত্র ফুটে ওঠে, সেটা হচ্ছে-- " ক্লিনিক-প্যাথলজী- ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানীর পার্সেন্টেজ-খোর, লোভী, রোগীর সাথে দূর্ব্যবহারকারী ইত্যাদি ইত্যাদি সব নেতিবাচক গুনের অধিকারী ব্যাক্তি"।

 

চিকিৎসকদের ভাল কোন গুন বা কাজের কথা কখনই সাধারণ মানুষের কাছে শোনা যায় না। এর জন্য দায়ী কিন্তু আমরাই; আমরা আমাদের নিজেদের অসম্মানের বিষয়গুলোকে যথাসময়ে প্রতিরোধ করতে ব্যার্থ হয়েছি। আজ সময় এসেছে আমাদের হৃত সম্মান পুনরুদ্ধারের...... সময় এসেছে ওইসব গু-খোরদের নাম প্রকাশের। গু যারা খাচ্ছেন, আমরা তাদের চিনি; আপনারা গু খাবেন আর সেই দায় নিতে হবে পুরো চিকিৎসক সমাজকে, এটা কিন্তু চিকিৎসক সমাজ আর মানতে রাজী না; গু-খাওয়া যদি বন্ধ না করেন, আপনাদের বিষয়ে চিকিৎসক সমাজ যে কোন সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতে পারে যে কোন দিন। তাহলে কিন্তু মুখ দেখাতে পারবেন না বউ-বাচ্চা-সমাজের কাছে।


আর মৌলভীবাজারের কয়েকটি ক্লিনিকের "বিশেষ এন্টারটেইনমেন্ট" প্রসঙ্গে যে ৩/৪ জন চিকিৎসকের নাম উচ্চারিত হচ্ছে ( তারা নিজেরাও জানেন ), লোকলজ্জার ভয় থাকলে তারা সংশোধন হয়ে যাবেন আশা করি। আপনাদের বউ- বাচ্চা- পরিবার যদি টের পায়- তাহলে কি হবে, ভেবে দেখেছেন ? এখনও সময় আছে...............। পরে মাইঙ্কার চিপায় পড়বেন কিন্তু !
__________________________


বি দ্র.
লেখক জানিয়েছেন , লেখাটি প্রায় ৪ বছর আগে লিখে রেখেছিলেন। কিন্তু আজও প্রাসঙ্গিক বিধায় ডাক্তার প্রতিদিন প্রকাশ করল।
সম্পাদক

__________________________________

ডা. মো.শাব্বির হোসেন খান, প্রখ্যাত পেশাজীবী নেতা ,সভাপতি বিএমএ
মৌলভীবাজার। লোকসেবী চিকিৎসক।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।