|

চিকিৎসকবিদ্বেষ ও চাণক্যশাস্ত্র


Published: 2017-01-06 09:23:13 BdST, Updated: 2017-01-20 05:26:10 BdST

 

ডা. জামান অ্যালেক্স
__________________

 


প্রতি বছর বিজয় দিবসে আমি ফ্রি পেশেন্ট দেখি।প্রতিবার সাঙ্গপাঙ্গ থাকে, এদের সেলফি যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে কাউকে না জানিয়ে এবার একাই পেশেন্ট দেখছিলাম.....

একের পর এক পেশেন্ট দেখছি। এমন সময় এক যুবক ঢুকলো।চিকিৎসা সংক্রান্ত কথাবার্তা শেষ হবার পর পরিচিত হলেন।বুয়েটের প্রাক্তন ছাত্র, USA তে আছেন, মাঝে মাঝে দেশে আসেন।পরবর্তী কথাবার্তা নমুনা দেইঃ

যুবকঃআপনার উদ্যোগের প্রশংসা না করে পারছিনা....

আমিঃ ধন্যবাদ

যুবকঃ জনগণের টাকায় লেখাপড়া করে আপনারা ডাক্তার হন, কিন্তু আপনার মত দেশের জন্য কাজ কয়জন ডাক্তার করে-বলেন তো দেখি?....

এইবার ধাক্কা খেলাম।বুয়েটের প্রতি আমার ধ্যান-ধারণা অন্যরকম, কিন্তু USA এর হাওয়া গায়ে লাগিয়ে লোকটা বলেটা কি!! আসলেই বুয়েটের প্রোডাক্ট তো? মেজাজ চরম খারাপ হলো, বললামঃ

'আপনি তো বুয়েটে পড়েছেন, টাকাটা কার?'

যুবকঃ হে হে, ভাই কি ক্ষেপে গেলেন নাকি?

আমিঃ না তা না, তবে জানতে চাচ্ছিলাম যে, আমার মত আপনিও তো জনগণের টাকায় পড়েছেন-তা আপনি দেশের জন্য কতটা কি করলেন?

কথা না বাড়িয়ে যুবক নিষ্ক্রান্ত হলো....

২....

সন্ধার পর বাসার নিচের চায়ের দোকানে চা খাচ্ছিলাম।এলাকার এক ছোট ভাইয়ের সাথে দেখা। নিম্নস্তরের বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন মানুষ, একে দেখলেই মনে হয় কাঁঠাল পাতা ছিড়ে এনে মুখের সামনে দেই......

যাই হোক, তার এক শারীরিক সমস্যার সমাধান দিলাম।পরবর্তী কথাবার্তা নিম্নরূপঃ

আমিঃ(দুষ্টুমি করে) চিকিৎসা তো দিলাম, এইবার ভিজিট দাও মিয়া....

নিম্নবুদ্ধিঃ হে হে, আমাগো ট্যাক্সের টাকায় ডাক্তার হইছেন , আবার ভিজিট চান? সরকারের টাকা তো সব আপনাদের ডাক্তার বানাইতেই যায়গা.....

আমিঃ( বিড়বিড় করে বললাম) " ছাগলা কাহিকা".....

নিম্নবুদ্ধিঃ ভাই কি কিছু বললেন?

আমিঃ বাদ দাও।আচ্ছা, একটা কথা বলো।সরকার তো আমাকে মেডিকেলে পড়ালো, তোমারে পড়াইলো না কেনো? তুমি তো পরীক্ষা দিয়েছিলে.....

নিম্নবুদ্ধিঃ আরেহ! সরকার আমারে মেডিকেল পড়াইবো কেন? আমিতো চান্স পাই নাই...

আমিঃ Exactly...সরকার তোমারে পড়ায় নাই, কারণ তোমার সে যোগ্যতা নাই।যাদেরকে সরকার পড়ায়- তার কারণ তাদের যোগ্যতা আছে।মাকাল ফলের পেছনে সরকার টাকা নষ্ট করবেনা-এটাই স্বাভাবিক.....

৩....

যতদিন ডাক্তারী পড়েছি-ততদিন শুনতে হয়েছে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় ডাক্তারী পড়েছি। এখন সরকারী ডাক্তার হয়ে প্রাইভেট প্র্যাকটিসের সময় ভিজিট নিতে গেলেও শুনতে হয়-- "সরকারী ডাক্তারের আবার ভিজিট কিসের?"

এক যুগ্মসচিব সেদিন ফেসবুকে তার মতামত দিলেনঃ' সরকারী ডাক্তাররা যদি ভিজিট নেন তবে সেটা নাকি নৈতিকতার পরিপন্থী '। ভালোই বলেছেন!

বলি, সরকার কি আমার দিনের ২৪ ঘন্টাই কিনে নিয়েছে নাকি? সরকারী সময়ের বাইরে রোগী দেখে অতিরিক্ত পরিশ্রম করে ভিজিট নিলে- সেটা নৈতিকতার পরিপন্থী কিভাবে কোন্ বিবেচনায় হয়?

Alcoholic পেশেন্টরা নানারূপ অবাঞ্ছিত কথা বললে মানায়, সচিব সাহেব নিশ্চয়ই অ্যালকোহলিজমে আক্রান্ত নন....

৪......

Grind house এ বসে বসে Pizzger খাচ্ছিলাম, পিজ্জা+ বার্গারের কম্বিনেশন, আজব ব্যাপার -স্যাপার।সামনে আরো কত কি আসে কে জানে!....

এমন সময়, শাহরিয়ার দুঃখ করে আমাকে বললো, "ভাই, সচিব বা পুলিশ বা অন্যকোন পাওয়ারফুল ক্যাডারে যাইতে পারলেন না?"

আমি বললাম, "নাহ, পারিনাই, আমি অযোগ্য"...

শাহরিয়ার ভিমরি খেয়ে খাওয়া থামালো, বললো, "বলেন কি ভাই?"

আমি বললাম, "দেখো, দেশের প্রেক্ষাপটে আমার যে রেজাল্ট ছিলো তার জন্য আমাকে ডাক্তারই হতে হয়েছিলো।এদেশে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়াররা আসলে অন্য কোনো পেশার যোগ্য না"....

দিন বদলেছে।আজ সচিব সাহেব ডাক্তারদের গাইড করার চেষ্টা করেন- কোনটা আমাদের জন্য ভালো আর কোনটা খারাপ...

বড় হয়ে আজ বুঝি- এতটা লেখাপড়া আমাদের না করলেও চলতো-সরকারী টাকায় লেখাপড়ার খোঁটা বা সরকারী ডাক্তার হয়েও ভিজিটের খোঁটা তখন শুনতে হতো না। আফসোস!!!বড় হচ্ছি, আর একটু একটু করে অবাক হচ্ছি।Forrest Gump মুভিটির একটি ডায়ালগ বলি, ' Life is like a box of chocolates. You never know what you're gonna get'.....

৫.....

দুইটা কথা স্পষ্ট উল্লেখ করিঃ

●সরকারী মেডিকেল যারা পড়েছে বা পড়ছে- সেখানে সরকারের কিন্তু কোন কৃতিত্ব নেই। একটি দেশের ট্যাক্সের টাকা ঐ দেশের ব্রিলিয়ান্ট ছাত্রছাত্রীদের নার্সিং এর কাজে ব্যয় হবে, এটাই স্বাভাবিক। অন্য কথায় বললে বলতে হয়, যারা সরকারী টাকায় মেডিকেলে পড়ছে -এটা তাদের ব্রিলিয়ান্সির গিফট্, কোন করুণা নয়।

●দ্বিতীয় কথাটা হলো, সরকারী টাকায় খালি মেডিকেল স্টুডেন্টরা পড়ে না, সব সরকারী ভার্সিটির স্টুডেন্টরাই পড়ে এবং সরকারী ভার্সিটির স্টুডেন্টদের সংখ্যা মেডিকেল স্টুডেন্ট থেকে অনেকগুণে বেশী। আমি বরং মনে করি চিকিৎসক বানাতে সরকারের খরচ সবচেয়ে কম। আসেন প্রমাণ দেই.....

চিকিৎসক তৈরি করবার জন্য একটি প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বেশী খরচ হয় টীচারদের বেতন দিতে গিয়ে। এখন একটা তথ্য দেই-- জনগণের স্বাস্থ্য সেবায় সরকার দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কনসালটেন্ট নিয়োগ দিয়ে রেখেছে যারা শুধু চিকিৎসা দিবে।সরকার যখন এদের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পদায়ন করে- তখন এরাই হন অ্যাসিট্যান্ট প্রোফেসর, চিকিৎসা দেবার পাশাপাশি এরা তখন ছাত্রছাত্রী পড়াতেও বাধ্য থাকেন, সরকার কিন্তু এজন্য একটা টাকাও বৃদ্ধি করে না। অথচ, এই শুভঙ্করের ফাঁকিতেই কিন্তু সরকারী মেডিকেল থেকে প্রতি বছর হাজার সংখ্যক চিকিৎসক বের হচ্ছে, যে ক্ষেত্রে টীচার সংক্রান্ত ব্যয় শূন্য।

এবার চিন্তায় আনুন যেকোন একটি সরকারী ভার্সিটি।শুধুমাত্র একজন গ্রাজুয়েট বানানোর জন্য সরকারকে আলাদা ভাবে শিক্ষক নিয়োগ দিতে হয়। বলি, সরকারের টাকাটা খরচ বেশী হচ্ছে কোথায়?

এরপরও কোনো ছাগল এ ব্যাপারে উচ্চবাচ্য করলে তাকে কাঁঠাল পাতা ধরিয়ে দেয়াই শ্রেয়....

৬....

এবার আসি প্রতিদানের ব্যাপারে....

MBBS পাশের পর ৪ বছর মেডিকেলে সেবা দিয়েছি।সম্পূর্ণ বিনে পয়সায়। আমার মত শত-সহস্র চিকিৎসক এখনো তা দিয়ে চলছেন।দৈনিক ১০০০ টাকা করেও যদি ধরি, তবে ৪ বছরে সাড়ে চৌদ্দ লাখ টাকার সেবা দিয়েছি। সরকার কি আমার পেছনে এত টাকা খরচ করেছে বলে মনে হয়?

বেসরকারী মেডিকেলে পড়ে যারা চিকিৎসক হয়েছেন, তারাও কিন্তু অধিকাংশই এই ফ্রি সেবাটা দিচ্ছেন।তাদের প্রতিদানটা কি কেউ বুঝতে পারেন? তাদের আসলে প্রতিদান দেবার মত কোনো ইস্যু আসা উচিত কি?

ইন্টারেস্টিং পয়েন্ট টা হলো এখনো চেম্বারে এমন দিন নেই-যেদিন আমাকে ফ্রি রোগী দেখতে হয়নি....

সরকারের টাকায় বা জনগণের ট্যাক্সের টাকায় তো সবাই পড়ে। আমাকে আর এমন একটা প্রোফেশন দেখান-যেখানে এতটা প্রতিদান কেউ দেশের প্রতি দেখাতে পেরেছে.......

৭.....

দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকারের যে খরচ হয় সেটার বাই প্রোডাক্ট হিসেবে চিকিৎসক তৈরি হয়।অনেকটা বিনামূল্যে যেখানে চিকিৎসক তৈরি হচ্ছে- সেখানে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় ডাক্তার হয়- এ Rumor টা আসলে কারা ছড়ায়? তাদের উদ্দেশ্যটা কিন্তু শুভ নয়....

নামমাত্র মূল্যে চিকিৎসক তৈরি হয়, তারাই সবচেয়ে বেশী প্রতিদান দেন, তারাই জনগণের সবচেয়ে বেশী রোষানলে পড়েন, তারাই আবার মার খান, মিডিয়ায় আবার এদেরকেই ভিলেন হিসেবে দাঁড় করানো হয়। অদ্ভূত সিস্টেম বটে!

খ্রিষ্টপূর্ব ৩৭০ অব্দে ভারতবর্ষের পাটালীপুত্র নামক শহরে চাণক্য নামে এক পন্ডিতের জন্ম হয়েছিলো। চাণক্যের একটি উপদেশ ছিলো, ' যে দেশে বিদ্বান, জ্ঞানী ও কর্মঠ ব্যাক্তি প্রকৃত সম্মান পান না, সে দেশ ত্যাগ করা উচিত'।ইঞ্জিনিয়াররা প্রতিনিয়ত দেশ ত্যাগ করেন, চিকিৎসকেরা আর কতদিন দেশের মাটিকে আঁকড়ে থাকবেন?

Khalil Gibran এর একটি মোডিফায়েড কথা আমি আমার কাছের মানুষকে প্রায়ই বলি, কথাটি প্রতিনিয়ত আমার নিউরোনে অনুরোণিত হয়। কথাটি ভয়ঙ্করঃ

"Because my love for you is higher than words, I have decided to leave silently "......

চিকিৎসকদের প্রতি এদেশের মানুষের যে আচরণ আমি নিশ্চিত ভবিষ্যতে স্বদেশভূমি ছাড়ার পূর্বে এ ভয়ঙ্কর বাক্যটি অনেক চিকিৎসককে ব্যবহার করতে হবে।

_________________________

লেখক ডা. জামান অ্যালেক্স । দেশের শীর্ষ জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিকদের একজন।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।