Ameen Qudir

Published:
2018-12-05 13:44:07 BdST

রোগী কথনএক ডা. তামান্না :সেদিন সে এপ্রোন পরে আসেনি , এসেছে হোগলা পাতার চটে , ভ্যানে চড়ে 





ডা. ছাবিকুন নাহার
____________________________

এফসিপিএস সেকেন্ড পার্টের জন্য তিন বছর ট্রেনিং লাগে। তিন বছর শুনতে যত সহজ, কাজটা ততটা সহজ না। এই ট্রেনিং এর রাত নাই, দিন নাই। ঘর নাই সংসারও নাই। মজার ব্যাপার হচ্ছে যার এক বছরের নীচে বাচ্চা আছে তাকে ট্রেনিং এ নেয়াই হতো না। আসলেই তো, নিবে কিভাবে? বাচ্চাকাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াতে হবে, এমন অযুহাত কাহাতক শোনা যায়! আমি সে ক্ষেত্রে ভাগ্যবান। আমার প্রফেসর মানে যার আন্ডারে ট্রেনিং করব তিনি আমার হাজবেন্ডের সরাসরি টিচার। ফলে তিনি আমাকে ট্রেনিং এ নিয়ে নেন। অহন, বড় ছেলে, বয়স তখন মাত্র তিন মাস। তিন মাসের বাচ্চা সমেত ট্রেনিং করার সুযোগ পেয়ে আমি দারুণ খুশি! একবার ও মনে হয়নি বাচ্চা আমার কার কাছে থাকবে? কি খাবে? তারপরও বাচ্চার বাপ অভয় দিলেন, আরেহ্ আগে তো ট্রেনিং এ ঢোকো। তারপর দেখা যাবে। তার এইটুকু ভরসা আমার জন্য অনেক ছিলো।

বাসায় সাহায্যকারী বলতে তখন দশ এগারোর সীমা। গ্রামের আত্মীয়। আর আমার সব অসময়ের সহায় ছোট বোন শামীমা। তখন সে আনম্যারিড। অন এন্ড অফ চলে আসত। এখন সে এক বাচ্চার মা। এখনো প্রয়োজনে আগের মতো বুক দিয়ে আগলে রাখার চেষ্টা করে। আমার সংসার ধরে রাখতে তার সংসার টলোমলো হওয়ার যোগার। এখানে বলে রাখি, আমার শশুড় শাশুড়ি আমি এ বাড়িতে আসার আগেই পরপারে। কাজেই নিশ্চিন্তে সংসার করা কাকে বলে আমি জানিনা। সব সময় লোক ধার করে আমার জীবন চলে। বারো বছরের সংসার জীবনে হাউজ মেইডদের বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা নিয়ে রীতিমতো উপন্যাস লেখা যাবে।

যাহোক এমনি যখন ঘরের কন্ডিশন, তখন ট্রেনিং নামক কর্মযজ্ঞ হাড় ক্ষয় করে দিচ্ছে। দেয় যুগে যুগে। ডাক্তার মেয়েদের ক্যারিয়ার এমনি এমনি হয় না। হয় অনেক ত্যাগ তিতীক্ষার ঘাম ও জলে। এত কিছুর পর পাশের হার ২-৩%! বেশি হলে ৫%! এই ডিগ্রী করতে গিয়ে কত জনের যে সংসার তছনছ হয়েছে। কত বুক যে খালিই থেকেছে, পূর্ণ হবার আশায়! বুকে বাচ্চার খাবার জমে জমে শক্ত পাথর হয়ে ফেঁটে যেতে চায়, ওদিকে আমার বাচ্চা না খেয়ে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমায়। চোখের বারান্দায় বাচ্চার অবয়ব দুলে দুলে ঝুল খায় আর আমি ঝাঁপসা চোখে, রোগীর ফলোআপ দেই। ড্রেসিং করি। বাচ্চার মাকে ফিডিং শেখাই। রোগীর বাচ্চা চুক চুক করে মাতৃস্তন্য পাণ করে। আর তা দেখে, আমার বুক চিনচিন করে। ড্রাউট। ডাক্তারের চোখ জলে ভরে যায় কেনো রোগী খুঁজে পায়না। কিছু একটা চোখে পরেছে বোধহয়।

একদিন দীণাদি( ছদ্মনাম) আমার সিএ অনুযোগ করেন, নাহার ঠিকঠাক কাজ করছনা নাকি? হিমি( ছদ্মনাম) সব সময় তোমার পিছে লেগে আছে বোঝ না? আমাকে কৈফিয়ত দিতে হয়। হিমি আপু কেনো কৈফিয়ত নেবে? আপনি কি তার ইউনিটের কৈফিয়ত নেন? তা নেই না। কিন্তু সে তো একটু হাইপার জানোই। তোমাকে দশ এডমিশন সিজার দিতে মানা করেছে।

কয় কি! সারাদিন রোগী নিয়ে ছুটাছুটি করি, ফলোআপ দেই। রাত পাহারা দেই। শেষ রাতে যখন সবাই ক্লান্ত বিধ্বস্ত তখন কোন ইমার্জেন্সি সিজার লাগলে, ভাগে পাই একটা। পানিশমেন্ট হিসাবে। পানিশমেন্ট ই তো। এই সময়ে কে ই বা খুশি মনে অপারেশন করবে? যত রাত তত খারাপ রোগী, এটা কে না জানে? তখনো হিমি নামক চিজদের বাগড়া না দিলে চলে না! আজব সাইকোলজী মহিলার। এর সাঙ্গপাঙ্গ দুয়েকটা ছিলো আরো ক্যালাস! যাক সেদিকে না যাই।

অনারারী ট্রেনিং এর স্টীম রোলার যে কী সেটা ভূক্তভোগী ছাড়া কারো পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব না। হাড়ভাংগা খাটুনি কিন্তু কোন অনারিয়াম নেই। উল্টো টাকা দিতে হতো। এমন অমানবিক নিয়ম এই বাংলাদেশেই সম্ভব। অথচ বিশ্বের সব দেশেই ট্রেনিদের সম্মানজনক অনারিয়াম দেয়া হয়। তার উপর হিমি এবং গংদের আজাইরা ক্যাচাল কত ভালো লাগে? তাঁরা তখন স্বঘোষিত ব্রাক্ষ্মন।

একখান বিসিএস কত রং যে দেখালো! অসহ্য। উদ্দীনীয় সরকারকে সারা জীবন অভিষাপ দিয়ে যেতো আমার মা, যদি না ত্রিশতম বিসিএসে এসে সাতাশতম বিসিএসে কেড়ে নেওয়া চাকরিটা ফিরে পেতাম। সব খারাপেরই কিছু ভালো দিক থাকে। তা না হলে, আমারো অনারারী ট্রেনিং এর অমানবিক অবিবেচক অধ্যায়টা অজানাই থাকত। সেই তো ব্রাক্ষ্মন হওয়ার সুযোগ এলো, ততদিনে আমার ট্রেনিং শেষ! আহারে কত বঞ্চনার জীবন! কত দীনতার!

চিরকালই ঠোঁটকাটা আমি। তাই পানিশমেন্টেই যেতো আমার বেশির ভাগ সময়। এত কিছুর মাঝেও দারুণ কিছু মনের সহকর্মী পেয়েছিলাম। অনারারী আঠারোজন তো ছিলোই, জুনিয়র কিছু ছিলো। তাদের কাছে ঠোঁটকাটা আপুটাই সবচেয়ে মিষ্টি আপু। তাদের বঞ্চনার মুখপাত্র।

রাত দুটো তিনটা। সবাই যখন একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন চুপিচুপি উৎপল, নয়ন কখনো কখনো অন্য কোন ইন্টার্ণ নিয়ে রিকশায় চেপে বসতাম। মাত্র পনেরো মিনিটের জন্য আধা যোগ আধা এক ঘন্টা জার্নি। ভয়াল রাতকে তুড়ি মেরে রিকশা এগিয়ে চলত। বাচ্চাকে খাইয়ে আবার ফিরে আসতাম। কেউ কিছু বোঝার আগেই। উৎপল, নয়ন তোদের এই ভালোবাসা আমি কখনো ভুলি না। ভুলব না যতদিন বাঁচি।

ধান ভানতে শীবের গীত গেয়ে ফেললাম। কোথায় যেনো ছিলাম? ওহ মনে পড়ছে, দীণাদি আমাকে বকা দিচ্ছিলেন। আজকেও তোমার বেডের ফলোআপ দিছে তামান্না, হিমি বলল। বলার কথা তামান্নার। ও আমার কাজ করে দিয়েছে অথচ বলছে হিমি আপু! আজব তো, এই মহিলার সমস্যা কী? আমি আরেকদিক তামান্নার বেডের রোগীর ফলোআপ দিয়ে দেব। মামলা ডিসমিস। গ্রুপ তো এভাবেই করা। একজন না হলে অন্যজন। মনেমনে ফুসছি!

আপু আমার বাচ্চা তো ছোট... কথা শেষ করতে দেন না দীণাদি। বাচ্চাকাচ্চার অযুহাত দিবা না তো। তাছাড়া তামান্নার ও তো বাচ্চা আছে। দীনাদি, নাহারের বাচ্চা তো আমার বাচ্চার চেয়ে ছোট। সাথে সাথে তামান্না বলে ওঠে।

এই হলো তামান্না। আমার ট্রেনিংমেট। ও আমার কাজ করেছে। কোথায় একটু ভাব নেবে, তা না। কিছু বল্লাম না। আদ্র চোখে ওর দিকে তাকালাম। একেই বলে মানুষ। নিরবধি আরেকজনের কাজ করে। প্রতিদান আশা করে না। আর ওদিকে হিমিরা...। যাক আবর্জনা নিয়ে কথা বলতে ভালো লাগে না। কথা বলতে হয়, তামান্নাদের নিয়ে। তাদের আলোকিত মনের সৌন্দর্য নিয়ে।

এমনি এক এডমিশনের দিনে শুনলাম, তামান্না হাসপাতালে এসেছে। আসবেই তো এটা শোনাশুনির কী আছে? ওর ডিউটি আছে না? একটু পরই দুজন মিলে ফলোআপ দিব। কিন্তু নাহ্। তামান্না সেদিন রোগী দেখতে আসেনি। সুন্দর ধবধবে এপ্রোন পরে আসেনি। এসেছে হোগলা পাতার চটে মুড়ে, ভ্যানে চড়ে। ওর জীবনটা কে নিল সেটা জানার জন্য তামান্নাকে নিয়ে এসেছিল তার স্বজনেরা।

স্বামী শাশুড়ি বলে, আত্মহত্যা করেছে আমাদের তামান্না। আর স্বজনেরা বলে, এটা কিছুতেই হতে পারেনা। ওর মতো অসাধারন একটা মেয়ে, যার দেড় বছরের রাজপুত্রের মতো একটা ছেলে আছে। সে কখনো এ কাজ করতে পারে না। ওকে হত্যা করা হয়েছে।

আমার কিছুই মনে হচ্ছিল না। সব শূন্য শূন্য লাগছিলো। দৌড়ে গেলাম লাশকাটা ঘরে। হলুদ একটা ড্রেস পরা বন্ধু আমার। শুয়ে আছে লোহার শক্ত খাটে। চোখ মুখে রাজ্যের অভিমান! মায়াময় উদ্ভাসিত মুখটা বেদনায় নীল হয়ে আছে। গলায় একটা মোটা দাগ। হাত ধরে ঝাঁকুনি দেয়ার চেষ্টা করলাম। মনেমনে বলছি, ওঠ তো। এমন শক্ত বিছানায় কেউ শোয়? আয় রোগী দেখবি। পাথরের মতো শক্ত হাত, রাইগর মর্টিস! আমাকে ফিরতি ধাক্কা দিয়ে বুঝিয়ে দিলো, এ আর এজনমে হবার নয়। তোমাদের তামান্না আমি না। আমি সবকিছুর উর্ধ্বে।

মনে হচ্ছিল ভয়ংকর এক স্বপ্ন দেখছি। একটু পরেই জেগে দেখব তামান্না আমি মিলেমিশে রোগী দেখছি। অপারেশন করছি। আমার বেডের রোগীগুলোর ফলোআপ দিয়ে দিতে বলছি। আর তামান্না দাবড়ানি দিয়ে বলছে, আরেহ এত কাঁচুমাচু হওয়ার কী আছে? আমি আছি না? আগে বলো, বাচ্চা কেমন আছে। বাচ্চাকাচ্চা সবার আগে, বুঝলে?

তামান্না, আমি তো বুঝেছি, তুমি কেনো বুঝলে না? তুমি ছাড়া তোমার তাহমিদের কে খবর নেবে? কে আছে এত আপন? কেনো তুমি তোমার জীবনটা নিয়ে নিলে অথবা অন্যকে নিতে দিলে? জানো না পৃথিবীতে নিজের চেয়ে, নিজের সন্তানের চেয়ে অন্যকে গুরুত্ব দিতে হয় না। আমি তুমি কিংবা আমরা চলে গেলে কারো কিছু আসে যায় না। সত্যি আসে যায় না। শুধু আমাদের জন্মদাতা বাবা মায়ের বুকটা গনগনে চিতা হয়ে যায়। নিরবধি জ্বলে কিন্তু শেষ আর হয় না। আর তোমার তোমাদের সন্তান আরেকটা তুমি হয়ে যায়। পার্থক্য শুধু এই, তুমি জীবনহীন লাশ আর সে জীবন্ত লাশ।

মা পাখি কিভাবে উড়ে গেলে, অবুঝ হতভাগ্য ছানাকে একলা করে? যে বাচ্চার জন্য দিনরাত এক করে দিতে তামান্না, রিদিতা এবং আরো অনেক নাম না জানা তোমরা। সে বাচ্চাকে এখন কে দেখবে? যে মা তোমাকে দশমাস পেটে ধরেছিলো, যার রক্ত মাংস খেয়ে বড় হয়েছিলে, যার জন্মপথ ছিড়ে পৃথিবীতে এসেছিলে, তাদেরকে ভুলে, একটা ব্যর্থতা তোমাদের কাছে এত বড় হয়ে ওঠে? একটা প্রফ, একটা এফসিপিএস কিংবা একটা নির্দয় স্বামী কিংবা স্ত্রী, একটা প্রেমিক কিংবা প্রেমিকা জীবন থেকে হারিয়ে গেলে কী এমন হয়? অপমান অভিমান আসলে কাজের কথা নয়। অন্যের অসভ্য অবিবেচক কথাকে এত্ত গুরুত্ব দেয়ার কী আছে? কি এমন হবে ওই স্কুলে না পড়লে? বেঁচে থাকার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আর কী হতে পারে?
কী এমন হবে অকৃতজ্ঞ এই সমাজ ব্যবস্থাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখালে? তবু তো বাঁচো। মরবে কেনো? কেনো? কোন কিছুতে ব্যর্থতা মানে হেরে যাওয়া নয়। মরে যাওয়া মানে পরাজয় বরন করা, প্রকৃত হেরে যাওয়া।

প্লিজ কোন কিছুর জন্য আত্মহনন করার আগে একটিবার ভাবো। প্রিয় মায়ের কথা ভাবো। প্রিয় বাবার কথা ভাবো। সন্তানের কথা ভাবো। আর সবার আগে নিজের কথা ভাবো। বিশ্বাস করো, এই পৃথিবীতে নিজের চেয়ে বেশি অন্য কাউকে ভালোবাসতে নেই। অন্য কিছুকে তো নয়ই। ব্যার্থতা ছুঁড়ে ফেলো। নিজের জন্য বাঁচো। প্রাণ ভরে বাঁচো। সফলতা পায়ের কাছে গড়াগড়ি খাবে একদিন। বলে দিলাম লিখে রাখো।

___________________________

 

ডা. ছাবিকুন নাহার।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।


মেডিক্যাল ক্যাম্প এর জনপ্রিয়