|

"আবার তোরা মানুষ হ !"


Published: 2017-12-10 20:09:48 BdST, Updated: 2018-04-20 11:07:59 BdST

ডা. এনামুল হক চৌধুরী
শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ
মেমন মাতৃসদন হাসপাতাল
চট্টগ্রাম।
_____________________

 

মানুষ মাত্রেরই কিছু আবশ্যিক বৈশিষ্ট্য থাকতে হয়। রাগ- অনুরাগ, প্রেম- ভালোবাসা, ক্ষোভ, মান- সম্মান, অভিমান, নিজের অধিকার, আত্নরক্ষার কৌশল তথা অধিকার ইত্যাদি বোধ সম্পন্ন না হলে, শুধমাত্র মানুষ'র আকার- আকৃতি ধারণ করলেই একজন 'মানুষ' হয়ে উঠেন না। কিংবা উল্লিখিত বৈশিষ্ট্য গুলোর ন্যূনতম ঘাটতিতেও একজনকে 'মানুষ' বলা যাবে না, যতই দেখতে তাঁকে মানুষ'র মতো মনে হোক না কেন! সেই হিসেবে বাংলাদেশের ডাক্তারেরা আর মানুষের পর্যায়ে নেই!

বর্তমানে, বাংলাদেশে সব চেয়ে সহজ কাজ ডাক্তার লান্ছিত করা; তা সে শারীরিক, মানসিক কিংবা পেশাগত যে ভাবেই হোক না কেন! এবং তা এক প্রকার বিনা প্রতিবাদে ও প্রতিরোধে! আজকাল, যে কারও ইচ্ছে হলেই ডাক্তারের হাত- পা ভেঙ্গে দিতে পারেন, মাথা ফাটায়ে গুরুতর রক্তাক্ত- জখম করতে পারেন...(সর্বশেষ উদাহরণ ঢাকা মেডিকেল কলেজের ডা. শামীমের হাত ভেঙ্গে দেওয়া)! কিংবা যে কেউ চাইলেই কোনো মহিলা ডাক্তারকে নির্যাতনের পর হত্যাও করতে পারেন একেবারেই নির্বিবাদে (ঢাকার ব্র্যাক হাসপাতালে ওয়ার্ড-বয় কর্তৃক নাইট-ডিউটিরত নারী ডাক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যা)! এই সবের বিরুদ্ধে বলার কেউই নেই!


দেখারও কেউ আছে বলে তো মনে হয় না! এই ক্ষেত্রে আইন, সমাজ, সরকার, রাষ্ট্র সবাই বিকৃত আনন্দ- খুশিতে গদগদ যেন বা! আর যাঁরা আক্রান্ত হচ্ছেন তাঁরা এবং তাঁদের সমগোত্রীয়রা পাল্টা আঘাত তো দূরের কথা, নিয়মতান্ত্রিক জোরালো কোনো প্রতিবাদও করার মতো শক্তি- সাহস কিংবা হুস (আর কোনো যুৎসই শব্দ খুঁজে পাচ্ছি না) সন্চয় করতে পারেন না! কারণ? ঐ যে বললাম, তাঁরা আর মানুষের পর্যায়ে নেই! মানুষ হলেই তো একজনের মানবিক অনুভূতিগুলো জাগ্রত থাকবে।

 

কী ভাবে ডাক্তারেরা এই 'অমানুষ' এ পরিণত হলেন? উত্তর একেবারেই সোজা। পেশার রাজনীতিকরণ! কোনো পেশাজীবী সংগঠন যখন রাজনৈতিক দলের অঙ্গ সংগঠনে পরিণত হয়, তখন সেই সংগঠনের পক্ষে পেশাজীবীদের ন্যূনতম যৌক্তিক স্বার্থের দিকেও নজর দেওয়ার সময়- সুযোগ আর থাকে না। সেটি শুধু ঐ রাজনৈতিক দলের স্বার্থেই কাজ করবে। আর তাই, আজ ডাক্তারদের সামনে সময় এসেছে 'মানুষ' এ পরিণত হওয়ার জন্য কঠিন সিদ্বান্ত নেওয়ার। পেশা নিয়ে আর কোনো রাজনীতি নয়, নিজেদের মধ্যে আর কোনো কোন্দল- দলাদলি নয়, আর কোনো নোংরামি নয়...। যেই সব পেশাজীবীর এমপি- মন্ত্রী হওয়ার অনেক সখ তাঁরা যেন সরাসরি রাজনৈতিক দলে যোগদান করেন; নিজেদের হীন স্বার্থে পেশাজীবী সংগঠনকে আর যেন জিম্মি না করেন; ডাক্তারদের জীবন- সম্মান- জীবীকা নিয়ে যেন ছিনিমিনি না খেলেন।

যেমনটি সরাসরি রাজনীতিতে যোগদান করেছিলেন অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী, অধ্যাপক এম এ মতিন, ডা. আফসারুল আমিন, ডা. দীপু মনি...। যদিও সরাসরি রাজনীতিতে জড়িত থেকেও, চিকিৎসা পেশার সব চেয়ে বড় ক্ষতির শুরুটি করে দিয়েছিলেন অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী! ১৯৯১ সালের ৫ম সংসদ নির্বাচনের পর ঐ সংসদের উপনেতা এবং বর্তমানে 'বিকল্প ধারা' এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক বদরুদ্দোজা কর্তৃক 'ডক্টর এসোসিয়েসন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)' গঠনের মাধ্যম আমাদের অধঃপতনের শুরু। এবং নিউটনের তৃতীয় সূত্র অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালের ৭ম সংসদ নির্বাচনের পর 'স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ)' গঠনের মাধ্যমে ডাক্তারদের সর্বনাশের ষোলো কলা পূর্ণ হয়েছিল। যার ফল আমরা এখন সুদে- আসলে ভোগ করছি।

 

মাছের পচন শুরু হয় মাথা থেকে। বাংলাদেশের ডাক্তারদের ক্ষেত্রে এই কথাটি আরও অনেক বেশি সত্য। এখন আমাদের একমাত্র ভরসা তরুণ প্রজন্ম। যেমনটি আমরা দেখেছি বগুড়া মেডিকেল কলেজে। আর তাই, আসুন এখনই ঢাকা মেডিকেল কলেজের ইন্টার্ণ ডাক্তারদের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হই, 'মানুষ' হয়ে উঠার শেষ চেষ্টাটুকু করি। 'বয়স' মানুষের একমাত্র যোগ্যতা হতে পারে না। যদি তা ই হতো, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সভাপতি এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা হতেন না। দলের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ নেতাটিই হতেন।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।