|

রোগী কথনমোলার প্রেগন্যান্সিঃ বাচ্চা যেখানে থোকা থোকা আঙ্গুর!


Published: 2017-11-18 10:41:36 BdST, Updated: 2017-12-18 20:50:18 BdST

 

 

 




ডা.ছাবিকুন নাহার

_________________________________

 

আমি প্রায়ই বলে থাকি মেডিকেল সাইন্সে এমন কিছু ব্যাপার আছে যা গল্প উপন্যাস দুরে থাক রুপকথাকেও হার মানায়। কিছু কিছু ঘটনা এমন আজব এবং অদ্ভুত যে হজম করতে মেডিকেল পার্সনদেরই কষ্ট হয়। আর আমরা যারা রোগী তাদের অবস্থা আর কি বলব। আজকে এমনই শকিং কিছু একটা বলব, একটু শক্ত হয়ে বসেন। তার আগে আসুন একটু গপসপ করি। রিলাক্সেশন ভালো শক এবজর্বেন্ট হিসাবে কাজ করে।

 

নামিহা, আটাশের ঝকঝকে তরুনী। কর্পোরেট জব করে। অলক ওর বর। একটা বেসরকারি ব্যাংকে আছে। এজিএম। একটা বাচ্চার জন্য ক্লান্তিকর জার্নি ওদের। বছর দুয়েক হতে চলল কিন্তু কোন সুখবর নেই। অবশেষে...!
অনেকদিন থেকেই শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। পিরিয়ড ও বন্ধ। অলক এখনো জানে না।
নামিহা বাসায় এসে দেখে অলক টিভির সামনে। একটু হাই হ্যালো করে ও। তারপর তাড়াহুড়া করে ওয়াসরুমে ঢুকে যায়। আসলে সে হৃৎপিন্ডের ধুকপুকানি শাওয়ারের শব্দে আড়াল করছে। প্রাণপনে। একটু পরেই টুংটাং ডোর বেলের শব্দ। নামিহা জানে প্রেরক বিহীন কুরিয়ারটা এখন অলক অলকের হাতে। নামিহা বাসায় আসার আগে পোষ্ট করেছিল। নিউজটা এমনি এমনি দিতে ইচ্ছে করেনি। খামটা খুলতেই মিষ্টি একটা সুগন্ধ অলকের নাকে লাগে। একগোছা বেলি ফুল আর এক জোড়া বেবি সুজ সুন্দর করে রেপিং করা। সাথে একটা চিরকুট। অলক, চলো ঘুড়ি হই, একসাথে আকাশে উড়ি তবে নাটাই কিন্তু এখন থেকে বাবুনের হাতে...নামিহা।

 

একটু পর ওয়াশরুমের দরজায় ধুমধাম শব্দ আর খুশির চিৎকার সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। কলকল করে অলক বলতে থাকে, তুমি আমাকে আগে বলোনি কেনো? আরেহ্ আরেহ্ ছাড়ো ছাড়ো পড়ে যাব তো। না ছাড়ব না। নামিয়াকে পাঁজাকোলে করে অলোক ঘুরতে থাকে আর কি কি যেনো বলতে থাকে। বেশি আনন্দিত হলে মানুষ অর্থহীন অনেক কিছুই করে। নামিয়া রীতিমতো লজ্জা পেয়ে যায়। অলকের এই রুপটা ও কখনো আগে দেখেনি। বারবার চোখ ভিজে যাচ্ছে কৃতজ্ঞতায়, ভালোবাসায়।
অলোক খুব সতর্ক। নামিহাকে পাখির পালকের মতো ছু্ঁয়ে ছুঁয়ে থাকে। সব ধরনের ভাড়ি কাজ, লং জার্নি বাদ। খাবার দাবারে পরিবর্তন আনে। মোট কথা অনাগত জান বাচ্চা সবার আগে। একটু একটু করে স্বর্গ সাজায় তার জন্য। এই বাবা মা, বাবা মা খেলায় অদ্ভুত আনন্দ বিরাজ করে ওদের অন্দর জুড়ে। প্রায় তিন মাস হতে চ্লল। সব ঠিকঠাক। হঠাৎ একদিন ওয়াশরুমে নামিহা আর্তনাদ করে ওঠে।


তখনি হাসপাতালে, অলক এক বিন্দু সময় নষ্ট করতে রাজি নয়। ডাক্তার হিস্ট্রি নিয়ে জানলেন, নামিহার যোনীপথ দিয়ে রক্ত যাচ্ছে। সাথে ছোট ছোট আঙুরের মতো কি যেনো! কান্না এবং ভয়ের এক অসহনীয় অভিব্যাক্তি নামিহার অবয়ব জুড়ে। ডাক্তার সবটুকু শোনলেন। আল্ট্রাসনোগ্রাম করে আরো নিশ্চিত হলেন যে, নামিহার জরায়ুতে বাচ্চার বদলে তুষার কনার মতো( স্নো স্টর্ম) কি যেনো ভাসছে। মোলার প্রেগন্যান্সি! আহারে মেয়ে!


নাহ্! ইমোশনাল হলে চলবে না। ডাক্তারদের ইমোশন থাকতে নেই। ব্রেকিং ব্যাড নিউজ বলে একটা টার্ম ডাক্তারি ভাষায় আছে। সেটা যে কতটা দূরহ কাজ! এখন হাড় মাংসে টের পাচ্ছ ডাক্তার। ভেবে পাচ্ছে না আসলে কি ভাবে নামিয়াকে বলবে। চলুন নামিহার পাশে একটু বসি। ওর কষ্ট ভাগাভাগি করি।


* নামিহার কি হয়েছে?
নামিহা প্রেগন্যান্ট কিন্তু এটা স্বাভাবিক প্রেগন্যান্সি না। এখানে বাচ্চা এবং গর্ভফুল মিলে এক প্রকার টিউমার মতো হয়েছে। দেখতে আঙ্গুরের থোকার মতো। তার কিছুটা মাসিক পথে রক্তের সাথে বের হয়ে আসে। যা নামিয়া দেখতে পেয়েছিলো।
* এটাকে কি বলে?
এটাকে মোলার প্রেগন্যান্সি বলে। প্রতি দুশো জনে একজনের হয়। দক্ষিন এশিয়া অঞ্চলে ভাত যাদের প্রধান খাদ্য তাদের বেশি হয়।
* কেন হয়?
প্রকৃত কারণ জানা যায় না। তবে কিছু রিক্স ফ্যাক্টর থাকে। যেমন- ফলিক এসিড না খাওয়া, আমিষের অভাব, দারিদ্রতা, ব্লাডগ্রুপ এবি ইত্যাদি।

 

* ম্যাকনিজম কি?
সাধারনত মায়ের ডিম্বানু আর বাবার শুক্রানু মিলে সন্তান। মোলার প্রেগন্যান্সিতে মায়ের ডিম্বানু আসে না। এম্পটি থাকে। বাবার একটা স্পার্ম ডাবলিং হয়ে অথবা দুটো স্পার্ম মায়ের এম্পটি ওভামে নিষিক্ত হয়ে এই প্রেগন্যান্সি হয়। এখানে বাচ্চার কোন অবয়ব থাকে না। এটাকে কমপ্লিট মোল বলে। পার্শিয়াল মোলে অবশ্য কিছুটা বাচ্চার অংশ থাকে

 

* চিকিৎসা কি?
সাকশন ইভাকুয়েশন অর্থাৎ জরায়ু থেকে উল্লেখিত আঙ্গুর থোকাকে বের করে আনা। খুব সন্তর্পনে। একটু এদিক ওদিক হলেই জরায়ুু ফুটো হয়ে যেতে পারে। একটা দুটো আঙ্গুর কনা ছুটে যেয়ে লাংসের রক্ত নালী বন্ধ করে দিতে পারে, যাকে বলে পালমোনারি এম্বোলিজম। যার পরিনতি ভয়াবহ! মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে রেগুলার ফলোআপ। যতদিন ডাক্তার বলবেন। টাইম টু টাইম। দি মাষ্ট। কারন এই রোগ পারসিস্ট করতে পারে।
* চিকিৎসা না করালে কি হতে পারে?
- অতিরিক্ত রক্তক্ষরন,
- ইনফেকশন,
- ডিআইসি,
- জরায়ু ফুটা হয়ে পেটের ভিতরে রক্তপাত এবং
- কোরিওকারসিনোমা নামক এক ধরনের ক্যান্সার। প্রথম দুই বছর রিক্স বেশি। তবে এই ক্যান্সার শতকরা একশ ভাগ ক্ষেত্রে কেমোথেরাপি দিয়ে নিরাময়যোগ্য। এবং সঠিক চিকিৎসা করলে সুস্থ্য থাকা যায়, এমনকি বাচ্চাকাচ্চা ও হয়।
বলছিলাম না, কত অজানারে! কত বিচিত্র এবং বৈচিত্রময় এই মানব শরীর। তার চেয়ে শত বৈচিত্র ময় রোগের বসবাস এর ভিতরে! বাচ্চাকাচ্চা যে আঙ্গুর থোকা হতে পারে এটা কয়জনে ভাবতে পারে? আসলে ভাবার কথা ও না।
নামিহা অলোক আলাদা কেউ না। আপনার আমার মতোই। তাদের মতো আমাদের যে কারোই এমনটা হতে পারে। আসুন, নিজে জানি, অন্যকে জানাই। সঠিক চিকিৎসা নেই, কুসংস্কার দূর করি।

________________________________

ডা.ছাবিকুন নাহার
মেডিকেল অফিসার
ঢাকা মেডিকেল কলেজ।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।