|

এর নাম মাতৃস্নেহ ! এর নাম ভালোবাসা


Published: 2017-09-21 12:07:39 BdST, Updated: 2017-10-22 05:18:45 BdST

 

 

 



ডা. শিরীন সাবিহা তন্বী
________________________________

খুব ধীরগতিতে হাঁটছে লাবন্য।
সাধারনত অন্য দিনগুলোতে অফিস শেষ হবার পরে বাসায় যাবার জন্য হুড়মুড় করে সিঁড়ি ভেঙ্গে নেমে রিক্সা বা অটো যা পায় তা নিয়ে বাসায় দৌড়।
ঝুলন টা হাঁটতে শেখার আর আধো
বুলিতে কথা বলতে শেখার পর থেকে সারা পৃথিবীটা ম্লান লাগে লাবন্যর ঝুলনকে ছাড়া।

আজ আর লাবন্যর তাড়া নেই।

তৃপ্তি যেদিন লাবন্যদের অফিসে জয়েন করতে এসেছিল তখন সে পাঁচ মাসের অন্তঃস্বত্ত্বা।লাবন্যর ই বয়সী হবে মেয়েটি।কিন্তু ভীষন মন মরা আর চুপচাপ।মাঝে মাঝেই অসুস্থ ও থাকত।
খুব একটা আলাপ জমেনি তখন ও।বাবাকে নিয়ে রুটিন চেক আপ করাতে গিয়ে জড়োসড়ো একাকী গাইনী ডাক্তারের চেম্বারের সামনে তৃপ্তিকে দেখল লাবন্য।
ঐদিন ই আলাপ জমল।

তৃপ্তি মৃদু স্বরে জানাল।বেশ বড়লোক বাড়ীর ছেলে বৌ সে।ভালবেসে বিয়ে করার পর প্রথম দিন থেকেই শাশুরী ননদের যন্ত্রনায় অস্থির।এখন স্বামী বাবুটিও তাদের সাথে।অত্যাচারের মাত্রা সীমা ছাড়িয়েছে বলেই বড় বোনের বাসায় এসে উঠেছে।
বস কে বলে কয়ে বদলী নিয়েছে।
লাবন্য সকলকে ব্যাপারটা লুকিয়ে তার সর্বস্ব দিয়ে তৃপ্তির যত্ন করতে লাগল।অফিসের কাজ এগিয়ে দেয়া।রোজ বাসায় পৌছে দেয়া।এটা সেটা কিনে দেয়া!
তৃপ্তি মাতৃ পিতৃহীন।বড় বোন ছাড়া আপন বলতে আর কেউ নেই।এক ভাই আছে।যোগাযোগ নেই।
তাই লাবন্য যেদিন অফিসের সবাইকে নিয়ে সারপ্রাইজিং বেবী শাওয়ার পালন করল,তৃপ্তি তো কাঁদতে কাঁদতে বুক ভাসালো কৃতজ্ঞতায়।

আলট্রাসনোগ্রাম থেকে লাবন্য তৃপ্তি দুজন ই জানত কন্যা আসছে।এক বিকেলে হাত ধরে নদীর পাড়ে নিয়ে গেল তৃপ্তিকে লাবন্য।
তৃপ্তি জানত আগেই।আবার শুনল।এই গল্প অফিসে সবাই জানে।
পাঁচ বছর আগের কথা।


কিছুদিন ধরে নানারকম ব্যক্তিগত অসুস্থতায় গাইনী ডাক্তারের শরনাপন্ন হয়েছিল লাবন্য।ওর সমগ্র জরায়ু ভর্তি ছিল অনেক গুলো বড় বড় টিউমার।মাসের বিশেষ দিনগুলোর রক্তপাত এত বেশী ছিল যে রক্তশূন্যতা প্রকট।অপারেশন করাতে হলো।কোনদিন মা হতে পারবে না সে!

এই অফিসের ই প্রেমিক এনগেজমেন্ট রিং ফেরত দিল।গ্রাম থেকে সুশীলা বউ এনেছে।ফুটফুটে এক ছেলে তার।
অফিস পার্টিতে লাবন্য দূর থেকে ঐ দেবশিশুর দিকে তাকিয়ে থাকে।

নদীর দিকে তাকিয়ে নিজের অতীত বলতে বলতে বলেছিল লাবন্য,মেয়ের নাম হবে ঝুলন।

রাত তিনটের সময় তৃপ্তির বোনের ফোন এসেছিল।সিজার করে ঝুলনের জন্ম হলো।সাঁই সাঁই করে প্রেশার বাড়ছিল তৃপ্তির।ততক্ষনে তার ধনী স্বামী এসে পৌছেছে।
ঝুলনের জন্মের নয় ঘন্টা পর তৃপ্তি পৃথিবী ছাড়ল।ঝুলনের বাবা এই শহরেই ঝেড়ে ফেলা বউকে কবর দিয়ে চলে গেলেন।

সেই থেকে ঝুলন লাবন্যর।
লাবন্যের এক রঙ্গা ম্যাড়ম্যাড়ে জীবনে এ যেন এক শত রংয়ের বাহার।বড় ভাই তিন বাচ্চাসহ অষ্ট্রেলিয়া প্রবাসী।অবসরপ্রাপ্ত বাবা মা আর লাবন্যর কাছে ঝুলন যেন এক জ্যান্ত খেলনা।
ঝুলনের হাসি,ঝুলনের হামাগুড়ি,হামি খাওয়া।গুটি পায়ে হাঁটা!
প্রথম যেদিন মা ডেকেছে সেদিন যেন শুস্ক মরুতে অঝোর বর্ষন এলো।

ঝুলনের তৃতীয় জন্মদিনেই সকলকে চমকে দিয়ে ওর বাবা এলো।সাথে আলট্রা মর্ডান ক্লাসী নতুন মা।

ঝুলনকে নিয়ে যেতে চায় সে।বজ্রাহত কি মানুষ এভাবে হয়?
কেবল ই চোখের জল ঝরেছে লাবন্যর।দেয়ালে বেবী শাওয়ারের দিনের তৃপ্তির সাথে ওর ছবি।
কোথায় ছিল সেদিন এই সো কলড বাবা?ঝুলনের শরীরে এর রক্ত বইছে।লাবন্যর মৃত বন্ধুর অর্ধেক জীন বাকী অর্ধেক এই দায়িত্বহীন জঘন্য পুরুষের।

কেক কাটা হয়েছিল মাত্র।আর কিছু হয়নি।
ঝুলনের ব্যবহার্য কিছু নিতে অনিচ্ছুক তারা।তবু লাবন্য সব গুছিয়ে দিল।
পৃথিবীতে এমন কোন আইন নাই যা দিয়ে লাবন্য ঝুলনকে আটকে রাখতে পারে।দেশের আইন অন্তঃস্বত্তা স্ত্রীকে তাড়িয়ে দেয়ার অধিকার দেয় আবার চার বছর পর,পথ থেকে যে কুঁড়িয়ে নিয়ে স্বর্গ বানালো তাকে নিঃস্ব করবার অধিকার দেয়।
ঝুলন গাল ফুলিয়ে বসে ছিল।

রাত বারোটার দিকে শুয়ে পড়ে ঝুলন।একবার উঠিয়ে পিসি করাতে হয়।বোতলে থিন সুজি খেতে খেতে ঘুমিয়ে পড়ে আবার।দুপুরে খাবারের পর কোলে করে হাঁটতে হয় বলতে বলতে কান্নায় ভেঙ্গে পরল লাবন্য।
সন্ধ্যা সাতটার দিকে ঝুলন লাবন্যকে ছেড়ে চলে গেল।

আজ চার দিন।
কোন ফোন নম্বর রাখা হয়নি।ঠিকানাও জানা নেই।ঝুলন বলে অস্ফুটে ডেকে উঠল লাবন্য!
কি ভয়ানক কষ্ট!
মাতৃত্বের এ কি গভীর ক্ষতচিহ্ন!

 

ধীর পায়ে হেঁটে বাসায় এলো লাবন্য।কলিংবেল টিপে খেয়াল করল দরজা খোলাই আছে।
ভিতরে পা রাখতেই এক চিৎকার।
মাম্মাআআআআ!!!!

ঝুলনের বায়োলজিক্যাল পিতা ঝুলনকে নিয়ে এসেছে।ঝুলন এই চার দিনে এক ফোঁটা পানিও মুখে নেয়নি।মাম্মার কাছে যাবে!
হসপিটালাইজড করে স্যালাইন দিতে হয়েছে।অতঃপর এম্বুলেন্স যোগে এখানে।

বাইরে শ্রাবনের বর্ষন।লাবন্যর মা বারান্দা থেকে মেয়ের ঘরের দিকে অপলক তাকিয়ে আছেন।লাবন্যর বাবা শোকরানা নামায পড়ছেন।

লাবন্য ঝুলনকে বানিয়ে বানিয়ে ভূতের গল্প বলছে আর ঝুলন লাবন্যর বুকের মাঝে সেঁটিয়ে আছে।পৃথিবীর কোন আইন এই সম্পর্কের নাম না জানুক,প্রতিটি মা জানে।
এর নাম মাতৃস্নেহ।এর নাম ভালোবাসা !!!

 

__________________________


ডা. শিরীন সাবিহা তন্বী, সুলেখক।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।